অকৃতকার্যদের স্বপ্নপুরুষ

নাঈমুল হাসান হিমেল

প্রকাশিত : জানুয়ারি ১২, ২০১৮

ডন লরেঞ্জো মিলানি, একটি নাম নয় একটি স্বপ্ন। ক্রিসমাসের রাতে সকল শিশুরাই অধীর আগ্রহে বসে থাকে সান্টা ক্লজ আসবে অনেক উপহার নিয়ে। সান্টা আসে না, কিন্তু তবুও অপেক্ষায় থাকে সকলে। বিধাতা এমন কিছু মানুষ পৃথিবীতে পাঠান যারা মানুষকে আলোর পথ দেখায়, করেন নতুন সভ্যতার সূচনা, ভেঙে দেন সমাজের চিরায়ত কঠোর বাস্তবতাকে। তৈরি করেন ইতিহাস। আলোর পথ দেখান অন্ধদের। তেমনি একটি নাম ডন লরেঞ্জো মিলানি বা ফাদার মিলানি।
তৎকালীন ইতালির শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি বরাবরই খুঁতখুঁতে ছিলেন মিলানি। গীর্জায় নৈশ বিদ্যালয় স্থাপন করে সাধারণ মানুষের কাছে যেমন হয়েছিলেন জনপ্রিয়, কর্তা ব্যক্তিদের কাছে তেমনই হয়েছিলেন তিরষ্কৃত।  যার ফলশ্রুতিতে ফ্লোরেন্সের গীর্জা থেকে বদলি হয়ে চলে আসতে হয় বারবিয়ানাতে। ছবির মতো সুন্দর বারবিয়ানা প্রাকৃতিকভাবে যতই অপূর্ব দৃষ্টিনন্দন হোক না কেন, সেখানকার শিক্ষার অবস্থা দেখে ফাদার মিলান ভীষণ মর্মাহত হন।
তিনি লক্ষ্য করলেন, সেখানকার শিশুদের শিক্ষার অবস্থা ভীষণ শোচনীয়। উপত্যকার ২০টি খামারে বসবাসরত শিশুরা শিক্ষার প্রতি ভীষণ আগ্রহহীন। তিনি বিদ্যালয় এবং তৎকালীন শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে বুঝতে পারলেন, প্রায় ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে উপনীত হয়েছে বারবিয়ানার শিক্ষা ব্যবস্থা।
অকৃতকার্য হয়ে ঝরে পড়ছে প্রায় সকল শিশুই। মর্মাহত হলেন মিলানি কিন্তু থেমে থাকেননি। অকৃতকার্য, স্কুল পালানো ১০ শিশুকে নিয়ে গড়ে তুললেন এক অপ্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যালয়। গড়ে উঠল মিলানির বিখ্যাত বারবিয়ানা স্কুল যা সমগ্র বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
ইতালির টাসকানি প্রদেশের পার্বত্য এলাকায় বিচ্ছিন্ন এক জনবসতি বারবিয়ানায় সূচনা হলো ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়ের। মিলানির দেখানো পথেই তার স্কুলের ৮ ছাত্র মিলে লিখলেন Letter to a Teacher by his school Barbiana, যা বাংলায় আপনাকে বলছি স্যার। এটি পরে বই হলেও মূলত একটি চিঠি। স্কুল পালানো, অকৃতকার্য পারিবারিক এবং শিক্ষকের কাছ থেকে তিরষ্কার শোনা ৮ কিশোরের মনের কথা খুব সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই বইটিতে। প্রাঞ্জল ভাষায় রচিত এই চিঠিতে তাদের মনের কথা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
বারবিয়ানা স্কুলে পুরনো ছাত্ররাই ছিল নতুন শিক্ষার্থীদের শিক্ষক। এ স্কুলে একটি বড় টেবিলে ক্লাস করানো হতো। সকলে একসাথে বসে পড়ত এবং এই টেবিলেই খাওয়া দাওয়া হতো। টেবিলে বসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে একজন বই নিয়ে সকলকে পড়াতেন। বর্তমান সময়ে আমাদের প্রেক্ষাপটে তা স্বপ্নিল মনে হলেও এমনটিই ছিল বারবিয়ানা স্কুল। যতক্ষণ পর্যন্ত পড়া সকলের বোধগম্য না হতো, ততক্ষণ পর্যন্ত চলত এই পাঠদান।
ফাদার মিলানি শুরু করেছিলেন স্বপ্ন যাত্রা, লক্ষ্যে পৌঁছেছেনও। কিন্তু তার মৃত্যুর পর বেশিদিন টেকেনি এই বিদ্যালয়। তবে যে আশার বীজ তিনি রোপণ করে গেছেন, তা আলোর মুখ দেখিয়েছে পৃথিবীর অসংখ্য শিক্ষার্থীদের। আমাদের বাংলাদেশে ২০১৭ সালে প্রাথমিকে পাসের হার ৯৫.১৮ শতাংশ এবং ইবতেদায়িতে পাসের হার ৯২.৯৪ শতাংশ। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের শিক্ষকরা ভালো ফল করা কথিত A+ পাওয়া শিক্ষার্থীটির মুখে মিষ্টি তুলে দিয়ে উল্লাস করেন। কিন্তু কোমলমতি কষ্টে জর্জরিত অকৃতকার্য শিক্ষার্থীটির কথা একবারও চিন্তা করেন কি?
আমরা ভালো ফল আশা করি। কিন্তু বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুটির কথা কি একবার চিন্তা করি? অবুঝ কোমলমতি সদ্য অকৃতকার্য শিক্ষার্থীটিও হয়ত আপন মনে কোনও সান্টা ক্লজের অপেক্ষায় আছে। যার সান্নিধ্যে হয়ত অকৃতকার্য তকমাটা তার দেহ থেকে চির তরে ঘুচে যাবে। এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের যেখানে অকৃতকার্য  শব্দের অর্থ জানার আগেই শিশুটি অকৃতকার্য বলে গণ্য হয়।
তবে সুদিন আসবে। ফাদার মিলানির মতো কেউ কিংবা আমরা সকলেই আলোর দিশারী হয়ে অন্ধকারকে মুছে একদিন জাতিকে সত্যিকারের শিক্ষিত মানুষ রূপে গড়ে তুলব।

লেখক: শিক্ষা ও গবেষণা অনুষদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

ধারাবাহিক