মেয়ে ও মা

মেয়ে ও মা

আমি সত্যিই জানি না আম্মাটা কই

রাহিমা আফরোজ মুন্নী

প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ০৮, ২০১৮

সবাই আমার কত পরোয়া করে আর কত ভালোবাসে আর তা বুঝাইতে কতপ্রকারের আচরণ কতকম কিংবা কতবেশি শব্দে সাজাইয়া গুছাইয়া পরিবেশন সম্ভব আর তা নিয়া কত কম কথায় আমার পক্ষ থেকে একখানা নিবন্ধ তৈয়ার সম্ভব তা ভাবছিলাম...

জানুয়ারির ১৫ তে, মাহি চলে গেছে টের পাইছি বিকাল ৪টা নাগাদ। কাঁদা বলতে যেমন বুঝায় তেমন কইরা কাঁদি নাই। প্রথম আধঘণ্টা সমানে চিৎকার করছি আঁ আঁ কইরা। তারপর ওর রুমের ওয়ালে, দরজায় ঘুষি মারছি সাথে গলা ফাটাইয়া যত জোর আছে চিৎকার, কান্না, মাথার চুল নিজের হাতে টাইনা, ফ্লোরে কতক্ষণ গড়াগড়ি এইসব কইরা ক্লান্ত হইয়া হাল ছাইড়া দিছিলাম। শরীর নিস্তেজ হইয়া আসলে বাহ্যিক প্রকাশ আপনা আপনি বন্ধ হইয়া যায়, দেখলাম নিজেরে দেইখাই।

আমার আম্মা, আব্বা তখন ছিল পাশের রুমেই। আমি কাউরে জড়াইয়া ধইরা কাঁদি নাই, আজ পর্যন্তও না। আমার আসে নাই এমন আসা, কি করব? দেখাইয়া করার তো কিছু নাই? শুভ আকাঙ্ক্ষা নিয়া বলছে কেউ কেউ, ‘ওরে কান্দান’। আরে, আমারে কেন ওদের দেখাইতে হইব কান্দাকাটি? বললাম, ‘হাতুড়ি নিয়া আসো, বাইড়াইয়া দেখো কান্দা বাইর হয় নাকি?’

৫:৪১ নাগাদ আমি একদম শান্ত। ফেসবুকে প্রথম পোস্ট দিলাম। আমার রুমের বাইরের দুনিয়ার মানে রইল না আমার কাছে। মাহিরে বলতেছি, মাহিরে লিখতেছি, মাহিরে বকতেছি, মাহির জন্য আহাজারি করতেছি...এর মধ্যে কল আসতেছে সমানে, ধরি না, তবুও আসতেছে। ফেসবুকে এক্টিভ দেইখা মেসেঞ্জারে ননস্টপ কল, বিদেশ থেইকাও, ধরতেছি না, তাও আসতেই আছে...

ঠিক ৭:৩৭ এ একজন টেক্সট করছে মেসেঞ্জারে, ‘ডু ইউ হ্যাভ এনি ক্লু?’ আরেকজন লিখছে, ‘খুবই স্যাডিস্টিক ব্যাপার’। আচ্ছা, স্যাডিস্টিক মানে যে ধর্ষকামী বা মর্ষকামী এইটা সে জানে না? এরা সবাই কবি, লেখক... অর্থ না বুইঝা ব্যবহার তো ঠিক না, তাই না? গতকাল আরেকজন কবির অভিযোগ শুনলাম অন্য মারফত, সে আসছিল আর,‘তাকে বের করে দেয়া হয়েছে’ আমি জানি না কি বা কেন..কিন্তু আমার মনে হইছে আমার কানে এইভাবে কথাটা না পৌঁছাইলেও চলত।

সেদিন আরেক বড় কবি এবং বুদ্ধিজীবী আমারে ফোনে স্যালুট দিলেন। আমার হিম্মতের প্রশংসা করলেন, মেয়ে মইরা গেছে তখন আমি কেমনে না মইরা পারলাম তা বইলা... সত্যি, আমার ঠাস কইরা সতীদাহ প্রথার কথা মনে পইড়া গেছিল। সবাই জানতে চায়, ইশারায় কেউ, সরাসরি কেউ... ‘কারণ কি?‘, ‘আগে বুঝেন নাই’, ‘সব এত স্পষ্ট, তাও কেন বুঝলেন না?’ শুভ আকাঙ্ক্ষার কমতি নাই এমন একজন বলছেন, ‘তুমি যদি কবি না হইতা, তাহলে হয়তো...’ আরেকজন বলছেন, ‘কবিতা বাদ দিয়া সংসার দেখতে’। কালকে ফোনে হাসতেছিলাম যার সাথে, সেই-ই অবাক, ‘তুই ঠিক আছিস? এমন হাসতেছিস কেন পাগলের মতো?’ বললাম, ‘কেন? কি হইছে?’ বিকট এক চিৎকার দিয়া সে অবাক হওয়া বুঝাইল, ‘তুই ভুইলা গেছিস? মাহি কই?’ আমি সত্যিই জানি না আমার আম্মাটা কই...

ধারাবাহিক