গুজরাট ও জিগনেশ মেভানি প্রসঙ্গে

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশিত : ডিসেম্বর ২৫, ২০১৭

গুজরাট বিধানসভার একটি আসনে তরুণ দলিত নেতা জিগনেশ মেভানি জয় লাভের পর বেশকিছু বিক্ষিপ্ত বক্তব্য চোখে পড়ছে। এ নিয়ে কোনও কোনও কমরেডের সঙ্গে আলোচনাও হয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে সংক্ষিপ্তাকারে নিজের অবস্থান ব্যক্ত করাটা জরুরি মনে করছি।
প্রথম কথা হলো, জিগনেশ মেভানি কী কমিউনিস্ট? যদি তিনি কমিউনিস্ট না হয়ে থাকেন, তবে বিপ্লবী কমিউনিস্টদের তাকে মিত্রশক্তি হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে। এখন পর্যন্ত জিগনেশ তার কথা অনুযায়ী কাজ করেছেন, সমঝোতা করেননি। সামনের দিনগুলোই বলে দেবে জিগনেশ কোনদিকে যাচ্ছেন। এখনও সে সময় আসেনি। জিগনেশ যে প্রশ্নগুলো একজন দলিত হিসেবে উত্থাপন করছেন, তা বিপ্লবীরা আগেই করেছেন। কিন্তু এখনকার বাস্তবতা ভিন্ন। সেই বাস্তবতা থেকেই পরিস্তিতির বিশ্লেষণ করাটা জরুরি।
গুজরাট গণহত্যার কথা, আশা করি আমরা ভুলে যাইনি। তখন কেন্দ্রে বিজেপি সরকার, তারা কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। আবার হিন্দুত্ববাদী গণহত্যায় যারা অংশ নিয়েছিল, তাদের মধ্যে ওই দলিতরাও ছিল। তখনও টার্গেট ছিল, ধর্মীয় সংখ্যালঘু মুসলিমদের আক্রমণ করে সাম্প্রদায়িক উসকানিতে হিন্দুত্ববাদের পা শক্ত করা। সে অবস্থার সঙ্গে এখন নতুন অনেক কিছু যুক্ত হয়েছে। এ সময়ে ওই দলিতরাই আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু। ওই দলিতরাই জিগনেশকে সাপোর্ট করছে, সেই জিগনেশ– যে কীনা ভূমি বণ্টন ও শ্রেণির প্রশ্ন তুলছে, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সঙ্গী করে লড়াইয়ের কথা বলেছেন। জিগনেশ সরাসরিই বলছেন, শ্রেণির প্রশ্ন সামনে না এনে ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তি সম্ভব নয়।
এখন যে সাধারণ মানুষগুলো জিগনেশকে সমর্থন করছে, তারা তাকে আপন মনে করছে, কারণ তারা নিজেরা যে অবস্থায় বসবাস করছে, জিগনেশ সেখান থেকেই এসেছেন। তিনি তাদের মনের কথাটাই বলছেন।
এখনকার অবস্থা মৌলিকভাবে আগের থেকে ভিন্ন। কারণ হিন্দুত্ববাদের এ রূপ এরআগে ভারত কখনো প্রত্যক্ষ করেনি। এমনকি গুজরাটে মোদির গণহত্যার পরও নয়। এ অবস্থার কারণেই জিগনেশ আজ শ্রেণির প্রশ্ন আনছেন। আম্বেদকারও শ্রেণির প্রশ্ন সামনে আনেননি, আনেননি আদিবাসীদের কথা। যা জিগনেশ বলছেন বুক চিতিয়ে। আর এটা এক জিগনেশের কথা নয়, জনগণের কথা। এজন্যই সমর্থন পেয়েছেন তিনি। এর আগে ১৯৯২ সালে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সময় হিন্দুত্ববাদী তাণ্ডবকালে কেন্দ্রে কংগ্রেস ক্ষমতায় ছিল। হিন্দুত্ব ভোট হারানোর ভয়ে তারা কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। বস্তুত, ওই সময়েই সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে ভারতে সংঘ পরিবারের হিন্দুত্ববাদী দাপট সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছাতে থাকে। কার্যত কংগ্রেস জন্মলগ্ন থেকেই ‘নরম হিন্দুত্ববাদ’কে ধারণ করে তার রাজনীতি কার্যকর রেখেছে। মোহন দাস গান্ধী থেকে শুরু করে এই ‘নরম হিন্দুত্ববাদের’ কোনও ব্যতিক্রম ঘটেনি। এবার গুজরাটে রাহুল গান্ধীর মন্দিরে মন্দিরে ধর্ণা দেয়াকে তারই ধারাবাহিকতা বলে বুঝতে হবে।
এখন প্রশ্ন থাকতে পারে, জিগনেশ বিধানসভাতে গিয়ে দলিতদের দুর্দশার কথা তুললেন, কৃষকদের দুর্দশার কথা তুললেন, জিএসটি আর ছোট উদ্যোক্তাদের কথা বললেন, ৯৯ শতাংশ বিধানসভা সদস্য কি তা মেনে নেবেন? আর তা মেনে না নিলে কী হবে? ধরে নিলাম, জিগনেশ প্রশ্ন তোলা ছাড়া আর কিছুই করতে পারলেন না, ৯৯ শতাংশ হিন্দুত্ববাদের বিধানসভায়। তখন কি শোষিত জনগণ বসে থাকবে? হিন্দুত্ববাদের নিপীড়নে যেভাবে উত্থান ঘটেছে দলিতদের তা ভারত রাষ্ট্রের জন্মের পরে নজিরবিহীন। আর এখন দলিতদের সামনে নেতৃত্বও আছে। যদি জিগনেশ নিজেকে না বিকিয়ে দেয়, তাহলে গুজরাটে বিপ্লবী আন্দোলন নিশ্চিতভাবেই শেকড় ছড়াবে, তা আমি হলফ করে বলতে পারি। কারণ হিন্দুত্ববাদ তার শোষণ–নিপীড়ন কমাবে না, বরং দিনকে দিন বাড়াবে, আর নিপীড়িতের সামনে যা আছে, তা নিয়েই কিন্তু প্রতিরোধ হবে।
আগে থেকে অনুমান করে আমরা বাস্তব অবস্থার বিশ্লেষণ ছাড়া মূল্যায়ন টানলে, তাতে গোড়ামিবাদী চেতনারই প্রতিফলন ঘটবে। একটা একটা সিঁড়ি ধরেই উঠতে হয়, এক লাফে ১০ তলায় ওঠা যায় না। মানুষ এমনি এমনি সংগ্রামে আসেনি কখনও, আসবেও না। বরং বিপ্লবী পরিস্থিতিতে ও বিপ্লবী মতাদর্শিক পার্টি নিজের যোগ্য নেতৃত্বে জনগণকে সংগঠিত করে। সেখানে শত্রু–মিত্র নির্ধারণ, রণনীতিকে আঁকড়ে ধরে রণকৌশল নির্ধারণ করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়গুলো এড়িয়ে বিপ্লবী আন্দোলন এ পাও এগোতে পারে না। আন্তরিক বিপ্লবী বন্ধুদের তা অনুধাবন করাটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছি।
ভারতের সংবিধান প্রণেতা ও দলিত নেতা আম্বেদকারের সঙ্গে তৎকালীন সিপিআইয়ের নেতা ডাঙ্গের যে দ্বন্দ্ব ছিল, তা আশা করি আমরা অল্প–বিস্তর জানি। ডাঙ্গে অচ্ছুৎ শ্রমিকদের অধিকারের বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছিলেন। হিন্দুত্ববাদী জাতি–বর্ণ প্রথার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে অস্বীকার করেছিলেন। অপরদিকে, ডাঙ্গের সমালোচনা করতে গিয়ে আম্বেদকার কমিউনিস্টদেরই তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। এই সেই ডাঙ্গে, পরবর্তীতে কমরেড চারু মজুমদার যার ছবি পায়ে মাড়িয়ে বিপ্লবী পার্টি (সিপিআই–এমএল) গড়ে তুলেছিলেন। প্রথমবারের মতো রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের প্রশ্নটি সামনে এনেছিলেন। আজ বিপ্লবীদের এসব ইতিহাস মাথায় রেখেই মিত্রদের সঙ্গে কাজ করতে হবে। জিগনেশ জয় পাওয়ায় কেউ খুশি হতেই পারেন। এতে দোষের কিছু নেই। হিন্দুত্ববাদের রাজত্বে একজন অচ্ছুৎ বিধানসভায় যাবে, এতে খুশি হতে পারে যে কেউ। তবে কমিউনিস্ট নামধারী সুবিধাবাদীরা যখন জিগনেশের জয়কে নিজেদের নির্বাচনপন্থাকে জায়েজ করার জন্য ব্যবহার করে, সেটা তাদের সংশোধনবাদী মতাদর্শেরই প্রতিফলন বলে বুঝতে হবে। এর সমালোচনা করতে গিয়ে গুজরাটের বাস্তবতা ও জিগনেশের অবস্থানকে লঘু করে দেখার সুযোগ নেই।
মনে রাখতে হবে, বামপন্থী–কমিউনিস্ট নামধারী পেটি–বুর্জোয়া, সংশোধনবাদীরা জীবনভর যা করে এসেছে, সামনেও তাই করবে– দালালি। তাদের সমালোচনা করতে গিয়ে আমরা যেন বাস্তব পরিস্থিতি ও মিত্রদের ক্ষেত্রে ভুল ব্যাখ্যা না করি।

জাতীয় জাদুঘরে চলছে চলচ্চিত্রের মহাযজ্ঞ!

জাতীয় জাদুঘরে চলছে চলচ্চিত্রের মহাযজ্ঞ!

জানুয়ারি ১৮, ২০১৮

বাংলাদেশে তিনটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব হয়। এর একটি দ্বিবার্ষিক এবং দুইটি প্রতিবছর হয়। তিনটি উৎসবই হয় স্বেচ্চাসেবীদের আয়োজনে। এর মাঝে দুইটি উৎসবের আয়োজক দুইটি ফিল্ম সোসাইটি বা চলচ্চিত্র সংসদ। এই উৎসবগুলো আয়োজনের পেছনে অনেক কষ্টের গল্প থাকে।

মূর্তিকারিগরে প্রতিমূর্ত এক শহর

মূর্তিকারিগরে প্রতিমূর্ত এক শহর

ডিসেম্বর ১১, ২০১৭

প্রতিটা ইটই প্রাণ পেতে চায়। কিছু একটা হতে চায়। প্রতিটি ভবনের আত্মা আছে, আছে মন। যে ভবনের আত্মা নেই সেটির প্রেতাত্মাও আছে হয়তো। ওই রকম ভবনে থাকলে গা ছমছম করতেই পারে।