বিজ্ঞাপন শিল্পে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়

পর্ব ১

নজরুল ইসলাম তোফা

প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৮

শিল্প-সুন্দর মন ও জীবনের জন্যই সৃষ্টি। সৌন্দর্যের শৈল্পিক ব্যবহার যুগ যুগ ধরেই আবহমান বাংলায় মানব জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। শিল্পের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। বিজ্ঞাপন শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার সৃষ্টির সাহিত্যতত্ত্বে সৌন্দর্য সম্পর্কে আলোকপাত করতেই বলেছেন, সুন্দরের হাতে বিধাতার পাসপোর্ট আছে, সর্বত্রই তার প্রবেশ সহজ। অর্থাৎ সুন্দর সব কিছুতে খুব সহজেই প্রবেশাধিকার পায়। তাই সুন্দরের প্রতি আকর্ষণ বোধ হওয়া মানুষের চিরন্তনী স্বভাব। বিধাতার পাসপোর্টধারী এ সুন্দর শিল্পকলার মধ্যে বিজ্ঞাপন শিল্প অস্তিত্ব ত্বরান্বিত হওয়ার জন্যই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, খেলাধূলা, বিনোদন ও মানবাধিকার ইত্যাদি কর্মকাণ্ড জড়িত। বিজ্ঞাপন একটি নিপুণ শিল্প শৈলী মাধ্যম। সাধারণ অর্থে বলা যায়, পণ্যদ্রব্যের পরিচিতি ও বেচাকেনার জন্য ক্রেতাকে আকৃষ্ট করার ব্যবসায়িক কৌশলই বিজ্ঞাপন। ব্যবসায় বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই বিজ্ঞাপন শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। পণ্যদ্রব্য সম্পর্কে ক্রেতাদের মধ্যে জানাজানি এবং তা ক্রয়ের জন্য এক ধরনের প্রভাবিত করার লক্ষ্যে ভাড়া করা জায়গায় চাপানো অথবা বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে সংবাদ চাপানোর নাম বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপন শিল্পকে বলা চলে বাণিজ্যের প্রসাধন।

মেয়ে যেমন প্রসাধন দিয়ে নিজকে আকর্ষণীয় করে তোলে, ঠিক তেমনই পণ্যকে শিল্পসম্মতভাবে প্রকাশ করে ক্রেতাদের কেনার আগ্রহ বাড়ানোর এক সেতু বন্ধনের অনবদ্য শিল্প কৌশল বিজ্ঞাপন। সংবাদপত্রে দেখা যায় অজস্র প্রকারের বিজ্ঞাপন। আবার রেডিও শুনতে যাওয়া হোক না, সেখানেও শ্রবণ ইন্দ্রিয়কে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে বিজ্ঞাপন। টেলিভিশনের সামনে বসুন না, সেখানেও চোখ-কান দুটোকে আকৃষ্ট করছে বিজ্ঞাপন। সিনেমা দেখতেও বাড়তি আকর্ষণ পাওয়া যায় বিজ্ঞাপনের। পথচারী পথ চলতে গেলেও পেয়ে থাকে বিজ্ঞাপনের অনেক দৃষ্টিনন্দন আবহ। লঞ্চ, স্টীমার, রেলগাড়ি, বাস বা বিমান যাতেই চলাফেরা করা হোক না কেন, দেশীয় বিজ্ঞাপনের সঙ্গে পরিচয় ঘটবেই। হাট-বাজারে, গঞ্জে ও শহরে ক্যানভাসাররা ছায়ায় মতো অনুসরণ করবেই বিজ্ঞাপনের পসরা সাজিয়ে। সেলসম্যানেরা দোকানে দোকানে পণ্যের বিজ্ঞাপন করেন। তারা বলেও থাকেন, অন্য পণ্যের চেয়ে তার কোম্পানির পণ্য মানেগুণে শ্রেষ্ঠ। এক সময় দেখা গেছে, গ্রামাঞ্চলের গঞ্জে ও হাটে বাজারে মুড়ির টিন বা তেলের টিনে শব্দ সৃষ্টি করে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য মজার মজার বিষয়ভিত্তিক বিজ্ঞাপন বা বার্তা প্রচার করা হতো। এখন সে প্রক্রিয়া বিলুপ্তির পথে হলেও তাকে বিজ্ঞাপনের আওতাতেই গণ্য করা হয়। সকল দিক বিবেচনা করে বলা যায়, বর্তমান যুগ যেন গুরুত্বপূর্ণ এক বিজ্ঞাপনের যুগ।

বিজ্ঞাপন শিল্প সর্বপ্রথম কোথায় বা কবে থেকেই শুরু তার সঠিক ইতিহাস এখনও জানা না গেলেও ধারণা করা যায়, অতি প্রাচীন কাল থেকেই বিজ্ঞাপন শিল্প বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ভাবেই ব্যবহার হয়। ছাপার যন্ত্র আবিষ্কারের আগে প্রধানত মুখে মুখে প্রচার করেই বিজ্ঞাপন শিল্পের এমন বৃহৎ কাজটি সম্পাদন করা হতো। সুতরাং বলা যায়, পঞ্চাদশ শতাব্দীতে ইউরোপে বিজ্ঞাপন ব্যবস্থা চালু ছিল। ১১৪১ সালে ফ্রান্সের বৈরী শহরে খুব চিৎকার করে উৎপাদিত পণ্যদ্রবের কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। ওই সময় ১২ জন লোকের একটি দল বৈরী শহরে উৎপাদিত পণ্যের জন্য একটি বিজ্ঞাপন কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছিল। এ সংস্থাকে ফ্রান্সের অষ্টম লুই স্বীকৃতি দিয়েছিল। সম্ভবত এটিই হবে পৃথিবীর প্রথম রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বিজ্ঞাপন সংস্থা। সুতরাং এ উপমহাদেশের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, সর্বপ্রথম বিজ্ঞাপন শুরু বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমেই। কিন্তু বিগত শতাব্দীতে এ দেশে বিজ্ঞাপন হয়েছিল ঢোল পিটিয়ে এবং কণ্ঠধ্বনির চিৎকার ঘটিয়ে। অনেক পণ্ডিতের মতে, বিজ্ঞাপন পোস্টার শুরু হয় প্রাচীন গ্রীস ও রোমে। গ্রীস ও রোমান ব্যবসায়ীরা দোকানে সাইনবোর্ড ছাড়াও কাঠের ফলকে অথবা দেয়ালে প্রচারকেরা বৌদ্ধ জীবন যাত্রার নানা ঘটনা চিত্রায়িত করে সেগুলোকে মুখের কথার দ্বারা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরে ঘুরে প্রচার করতো।

১৯৫৬ সালে আরও আধুনিক পদ্ধতির মাধ্যমে ছাপার নানা কায়দা তারা আবিষ্কার করে। ছাপাকে বিভিন্নভাবে বিজ্ঞাপন করে ও পণ্যদ্রব্যের প্রচারের কাজে লাগাতে শুরু করে। আবার বিলেতে ছাপাখানার প্রবর্তন হয় উইলিয়াম ক্যাক্সটনের মাধ্যমে ১৪৭৭ সালে। শুধুমাত্র অক্ষর বিন্যাসেই তা ছাপা বিজ্ঞাপন হয়ে উঠতো। তাকে দোকানে দোকানে লটকিয়ে তার প্রকাশিত বইয়ের বিজ্ঞাপন প্রচার করেছিল। অবশ্য এ বিজ্ঞাপনটি ছিল হ্যান্ডবিলের আকারে ছাপানো। পরবর্তীতে পুস্তক-পুস্তিকা, সাময়িকী ও সংবাদপত্র ইত্যাদির প্রসার ঘটার সঙ্গে অথবা যোগাযোগ ব্যবস্থার অগ্রগতির ফলে বিজ্ঞাপনের বিভিন্ন দিক জোরালো হয়। সেই সময়ে বিভিন্ন কারণেই বিজ্ঞাপন ব্যবহার হতো। তবে তখন সবচেয়ে বেশি বিজ্ঞাপন ছিল উৎপাদিত মালামাল সম্বন্ধে জনসাধারণকে অবহিত করা। পরে আবার লিথোগ্রাফির ব্যবহারে আধুনিক জগতে সর্ব প্রথম রঙিন পোস্টার আর্টের মাধ্যমে বিভিন্ন ধাঁচের বিজ্ঞাপন নির্মাণ করে ফরাসি চিত্রশিল্পী জুলেসেরে। ১৯৬৬ সালে ফ্রান্সে তার নিজের লিথোগ্রাফিক প্রেস থেকে প্রথম রঙিন বিজ্ঞাপনী পোস্টার বের করেছিল। এরপরই তিনি থিয়েটার মিউজিক হল, রেস্তরাঁ এবং আরও অজস্র রকমের জিনিসপত্রের বিজ্ঞাপনের জন্য নানা প্রকার রূপরেখা বেঁধে দেন।

সেটা হলো রঙিন ছবির সঙ্গে খুব কম লেখার সমন্বয় ঘটিয়ে এমন একটি ভিস্যুয়াল জিনিস দাঁড় করেছিল, যা খানিকটা দূর থেকেই সে বিজ্ঞাপন গুলো লোকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করাতে পারতো। পথচারীরাও সে বিজ্ঞাপনটিতে কি বলতে চেয়েছিল তা একঝলকে দেখেই, খুব দ্রুত বুঝে নিতে পারতো। অর্থাৎ জ্বলজ্বলে রঙিন ফর্ম, জোরদার লাইন এবং স্পষ্ট অক্ষর মিলিয়ে মিশিয়ে জুলসেরেই তৈরি করেছিল যুগসেরা শ্রেষ্ঠ ম্যুরাল। বিজ্ঞাপন বিষয়কে কেন্দ্র করে এমন একজন শিল্পী আরও যে সব অপরূপ পোস্টার অংঙ্কন করেছিল সেগুলো শৈল্পিক বিজ্ঞাপনে সমাদৃত হয়েছিল সারা দুনিয়ায়। আসলে তখন বিজ্ঞাপন শিল্পীর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, পণ্যের কাটতি। এই বিজ্ঞাপনের সাহায্যেই ব্যক্তি তথা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন প্রয়োজনকে অত্যাবশ্যক করে তোলে।

লেখক: অভিনেতা, চিত্রশিল্পী, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও প্রভাষক

ধারাবাহিক