শিখরে চীন

অনুবাদ পর্ব ৫

উ শিয়াওবো

প্রকাশিত : জানুয়ারি ২৮, ২০১৮

শক্ত একটি অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে আজকের চীন। এ অবস্থায় পৌঁছতে এ জাতির রয়েছে নানা ত্যাগ ও পরিকল্পনা। পশ্চাৎপদ চীনা জনগোষ্ঠীকে সুসংবদ্ধ একটি অর্থনৈতিক পাটাতন পেতে যে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, তার বর্ণনা দিয়েছেন উ শিয়াওবো। শিখরে চীন শিরোনামে এটি ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন সাজ্জাদ হায়দার। আজ প্রকাশিত হলো পর্ব ৫

এলাকাটি যখন ‘বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’ হিসাবে অনুমোদন দেয়া হয়, তখন এলাকার উন্নয়নে বরাদ্দ করা হয় ৩০ মিলিয়ন চীনা মুদ্রা। এই মুদ্রা নিয়ে মাত্র দুই বর্গ কিলোমিটার এলাকার উন্নয়ন সম্ভব। যেখানে পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্তের দূরত্ব পঞ্চাশ কিলোমিটার ও শেনঝেনের মোট আয়তন তিনশো ২৭ দশমিক ৫ বর্গ-কিলোমিটার। সাধারণত চীনের উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় বরাদ্দ হয় ‘তিনটি সংযোগ ও একটি ‘সমতল করণ’ কর্মকাণ্ডে। সংযোজন হলো পানি, বিদ্যুৎ ও রাস্তা এবং সমতলকরণ হলো ভূমি। এ চারটি ক্ষেত্রের  কর্মকাণ্ডের জন্য অর্থ সংগ্রহের জন্য শেনঝেন কর্তৃপক্ষ চীনা সরকারি বরাদ্দের চেয়ে ভালো একটি উপায় খুঁজে বের করল। এরা ভূমিকে মুদ্রা সংগ্রহে কাজে লাগালো। ১৯৮০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে  টাকার বিনিময়ে ভূমি লিজ দেয়া শুরু হলো।

তখন অনেকে বিষয়টি বিবেচনা করল অর্থের বিনিময়ে দেশ বিক্রি হিসাবে। কী কী কারণে জমি লিজ দেয়া যেতে পারে, সেই যুক্তি লেনিনের নির্বাচিত লেখা থেকে তুলে ধরল কেউ কেউ। লেনিনের বক্তব্য হলো, ক্রান্তিকালীন সময়ে গৃহ, কারখানা অথবা অন্য কিছু কোনও ব্যক্তিবিষেশ কিংবা সমবায়কে প্রদান জরুরি নয়। একই সময়ে ব্যক্তিমালিকাধীন জমি ব্যবস্থা উচ্ছেদে জমি লিজ বাতিলও দরকার নেই। সমাজের কাজে লাগে এমন জমির পরিবর্তন ঘটানোও নেহায়েত অপ্রয়োজনীয়।
শেনঝেনের পার্টিকর্মীরা স্থির বিশ্বাসে তখন এই বাণী আউড়াতেন। ১৯৮২ সালে শেনঝেনে ইওয়ান গেং নামের ব্যক্তি, যিনি শেকু বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রতিষ্ঠাতা, তিনি শেকু ব্যবস্থাপনা কমিটির কার্যালয়ে প্রবেশ পথে ফলকে লিখে রাখলেন, ‘সময়ই টাকা, আর দক্ষতা হলো তোমার জীবনধারা।’ দৈব বাণীর মতো এই উপদেশ চীনে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

জমি লিজ ব্যবস্থা বিরামহীন স্রোতের মতো অর্থ-বিত্ত সৃষ্টি করে এবং হংকংয়ের ব্যবসায়ীরাই প্রথম এ স্বাদ গ্রহণ করে। শেনঝেনের জমি ব্যবহারের ‘কর’ হংকংয়ের উপকূলবর্তী এলাকার ১১ ভাগের একভাগ। শেনঝেন এই করের টাকা জমি সমতলকরণ, উপত্যকা ভরাট, ডাক ব্যবস্থা চালুকরণ, রাস্তা নির্মাণ, বিদ্যুৎ ও পানি সঞ্চালন ব্যবস্থা ইত্যাদি কাজে ব্যয় করে। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৫ পর্যন্ত সময়ে শেনঝেন ১ দশমিক ২৮ বিলিয়ন চীনামুদ্রার সমপরিমান বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে। যোগাযোগ ব্যবস্থা, টেলি যোগাযোগ, প্রকল্পের পরিকাঠামো নির্মাণসহ ৯টি বিশেষ শিল্প এলাকার জন্য ৭ দশমিক ৬৩ চীনামুদ্রা বিনিয়োগ করা হয়।

হংকংয়ের ব্যবসায়ীরা এখানে কোম্পানি ও কারখানা চালু করে। এখান থেকে দক্ষিণা বাতাস উত্তরে বইতে শুরু করল। এবং খোলা নীতি আর দমিয়ে রাখা গেল না। শেনঝেন ও অন্যান্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ফলে চীনে স্রোতের মতো পুঁজি ও মেধাবী মানুষ জড়ো হতে লাগল। এর ফলে চীনা অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তনের সূচনা হলো। সুযোগ সন্ধানীরা এটা লুফে নিল। তারা শুরু করল চীনে কেনাবেচা ব্যবসা। চীনের দ্বৈত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তারা কাজে লাগালো। তাদের ডাকা হতো কেনাবেচার ওস্তাদ বলে। বাজার মূল্য সম্পর্কে তাদের গভীর ধারণা ছিল। তারা বেছে নিত যে সব অঞ্চলের নিয়ম-নীতি শিথিল, মুক্ত অর্থনীতি গ্রহণে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে, এমন অঞ্চল। এসব ‘ধূসর’ এলাকায় তারা অবাধে পণ্য সামগ্রীর হাট বসাতো। সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে যোগসাজোশের মাধ্যমে এরা বেইজিং ও শেনঝেনে যাতায়াত করত। রাতের মধ্যেই তারা বিপুল বৈভবের মালিক বনে যেত।

পরিকল্পিত অর্থনীতির ফাঁক-ফোকড় গলিয়ে তারা তাদের কর্মকাণ্ডের পরিধি বাড়িয়ে যেত। জণগণ এদের কর্মকাণ্ডে সন্দেহ করত, অথচ তাদের বিত্ত-বৈভবের জন্য ‘হিংসা’ করলেও অর্থনীতিতে তাদের অবদান ছিল। অল্প সময়ের মধ্যে ‘ওস্তাদ কেনা-বেচাকারীদের’ কল্যাণে শেনঝেন হয়ে ওঠে সমগ্র চীনের বেচাকেনা মহাকেন্দ্র। বিভিন্ন প্রদেশে সরকারি কর্মকর্তারা শেনঝেনের বিশেষ সুবিধা কাজে লাগিয়ে সরাসরি কেনবেচা চালিয়ে যাওয়ার জন্য এখানে বানিজ্যিক কার্যালয় খুলে বসে। হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের এশিয়া বিষয়ের গবেষক ড. থমাস চেন শেনঝেনের কর্মকাণ্ডের ওপর গবেষণা চালান এবং দেখতে পান, ইওয়ান গং ও অন্যরা শেনঝেনের জন্য যে চারটি লক্ষ্য নির্ধারণ করেন, ১৯৮৩ সালেই তার অনেকগুলো গৌণ হয়ে যায়। প্রথম লক্ষ্য ছিল, উৎপাদন ও রপ্তানি। কিন্ত রপ্তানির চেয়ে আমদানি হয় ৪৮৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি। দ্বিতীয় লক্ষ্যটি ছিল, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি আমদানি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, হংকং ও জাপানের বাতিল যন্ত্রপাতি মেরামত করে শেনজেনে বসানো হয়েছে। তৃতীয় লক্ষ্যটি ছিল, বৈদেশিক বিনিয়োগ। কার্যত বৈদেশিক বিনিয়োগ ছিল ৩০ শতাংশ, বেশির ভাগ বিনিয়োগ এসেছে হংকং থেকে। চতুর্থ লক্ষ্য ছিল,অর্থনৈতিক কাঠামোয় শিল্পের উন্নয়ন। কিন্তু ১৯৮৩ সালে শেনজেনে শিল্প উৎপাদন হয় ৭২০ মিলিয়ন চীনা মুদ্রার, অন্যদিকে এ এলাকার মধ্য দিয়ে ১.২৫ বিলিয়ন চীনা মুদ্রার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য-সামগ্রী খুচরা বাজারে প্রবেশ করে। শিল্পের ক্ষেত্রে পণ্য বিক্রির আয়ের  চেয়ে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রের আয় ছিল বেশি।

সেই সময় শেনঝেনের ভবিষ্যতটা খুব স্পট হয়নি। এ কারণে ঠাট্টা মশকরায়ও শেনঝেনের নাম উচ্চারিত হতো। অর্থনীতিক সমস্যা জটিল হলেই জনগণ শেনঝেনের নাম উল্লেখ করে টিপ্পনি দিত। এমনও বলা হয়, অগ্রগামি লড়াই ক্ষেত্রটি চীনের অগ্রগতির চেয়ে বেখাপ্পা রকম দ্রুত চলছে। ১৯৮৫ সালে মুদ্রা স্ফীতি ঘটে এবং চীন প্রথমবারের মতো মুদ্রা সরবরাহ কঠোর করে সমস্টিক অর্থনীতির সমন্বয় সাধন করলে শেনঝেনের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ে। অনেক বছর পরে গুয়াংডং প্রাদেশিক পার্টির প্রথম সচিব রেন ঝোনঘি বলেন, সেই সময়ে গুয়াংডং প্রদেশকে নানামুখি ধকল পোহাতে হয়। চাপও ছিল প্রবল। সুভবিষ্যতের ইশারা থাকলেও বিরূপ এ সমালোচনা মোকাবেলা করতে হয়েছে। গুয়াংডং প্রাদেশিক কমিটি সঠিক পথেই অবিচল ছিল। বিশ্বের জন্য চীনা দরজা খোলার লক্ষ্য থেকে প্রদেশটি কখনো পিছু হটেনি।

১৯৭৯ চীনের অর্থনীতিতে সেলুলার প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অধুনিকতার ছোঁয়া লাগে। মার্চে চীন বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় দেখভালের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রশাসন প্রতিষ্ঠান গঠন করে। একই বছর চীনা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা সমিতি গঠিত হয়। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভি এই বছরই প্রথম তাদের বিজ্ঞাপন বিভাগ চালু করে, যা বিশ বছর পর চীনের অন্যমতো শক্তিশালী বিজ্ঞাপন সংস্থায় পরিণত হয়। ১৯৭৯ সালের ১ মে প্যাকিং হাসের পুরানোদিনের রেস্টুরেন্ট ‘কুয়াংজুদে’ পুনরায় চালু হয়। সাংহাইয়ে কয়েকজন সাবেক ব্যবসায়ী ও প্রবাসী চীনারা মিলে ‘সাংহাই মিউনিমিপ্যাল ইন্ডাসট্রিয়াল অ্যান্ড কর্মাশিয়াল প্যাট্রিয়ট কনসট্রাকশন কোম্পানি’ গঠন করে। পরে প্রতিষ্ঠানটি চীনের প্রথম বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি পায়। শত বছরের প্রাচীন বাণিজ্যিক ঐতিহ্যধারী একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থা নগরীতে পুনরায় আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৭৯ সালে ১৫ মার্চ সাংহায়ের সংবাদপত্র ‘ওয়েনহুই বাও’ পত্রিকায় সুইস ঘড়ি কোম্পানি র‌্যাডোর প্রথম বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে। একই দিন সাংহাই টেলিভিশন র‌্যাডো ঘড়ির বিজ্ঞাপন প্রচার করে। ইংরেজি এই বিজ্ঞাপনে চীনা ভাষার সব-টাইটেল ছিল। যদিও কম সংখ্যক চীনারা এই বিজ্ঞাপন উপলদ্ধি করেছিল। এরপরও প্রচারের তিনদিনের মধ্যে ঘড়ি কেনার জন্য সাতশোর বেশি ক্রেতা হুয়াংপু জেলার অবস্থিত র‌্যাডো ঘড়ির ডিপার্টমেন্ট স্টোরে ভিড় করে। চীন কি পুঁজিবাদী রাস্তায় হাঁটবে? এই প্রশ্ন করে হংকংয়ের অর্থনীতিবিদ স্টিভেন এন.এস. চিওয়াং ১৯৭৯ সালে লেখেন, আমার ধারণা, সামনের সময়ে চীন সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ব্যক্তি মালিকানা অনুমোদন করবে। আমি বিশেষ করে বলতে পারি, উৎপাদনে জড়িত শ্রম, আবাসন ও ভূমির জন্য চীন ‘দখলি-স্বত্ব” ও“হস্তান্তর অধিকার” প্রদান করতে পারে। ভবিষ্যতে চীন “সম্পত্তি হস্তান্তর” কিংবা “ব্যাক্তিগত ব্যবহার অধিকার” অনুমোদন করলেও, চীন তাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে “পুঁজিবাদী অর্থনীতি হিসাবে অবিহিত করবে না অথবা শুধু মাত্র ব্যক্তি মালিকানাকে অনুমোদন করবে না। দশ বছর পর তিনি লেখেন, তার ভবিষ্যতবাণী প্রায় ফলে গিয়েছে। ২০০০ সালের মধ্যে চীনে ব্যাক্তি মালিকাধীন সম্পত্তি সরকারিভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০০৪ সালে গণচীনের সংবিধানে লিখিতভাবে ব্যক্তিমালিকানাদীন সম্পত্তিরক্ষা আইনের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়া হয়।

নানা চড়াই-উৎরাই পেড়িয়ে চীনা সংস্কার চলতে থাকে। বড় দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নানা বাধা মোকাবেলা করতে হয়। কিন্তু চীনের ক্ষেত্রে অনেক কিছুই ছিল অপ্রত্যাশিত। সংস্কার চালাতে গিয়ে যখনই বাধা এসেছে তখনই নানা ধরণের ‘সম্বন্বয়’ করতে হয়েছে। সার্বিকভাবে চীনের অর্ধনীতি উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে।

চলবে...

ধারাবাহিক