গিটারযাপন ও একজন আইয়ুব বাচ্চু

সুমন সরকার

প্রকাশিত : অক্টোবর ১৮, ২০১৮

বিদায় বাচ্চু ভাই।

প্রেসিডেন্সির মাঠে প্রথমবার দেখেছিলাম আইয়ুব বাচ্চুকে। LRB সেবার কাঁপিয়ে দিয়েছিল প্রেসিডেন্সী। আইয়ুব বাচ্চুর মায়াবী গিটারের অদ্ভুত গণসম্মোহনে আমরা হয়ে উঠেছিলাম ক্ষ্যাপাক্ষেপী। মনে হচ্ছিল যেন ১৯৬৯ এর উডস্টকে দাঁড়িয়ে বেলবটমে দণ্ডায়মান গিটারের যাদুকর জিমি হেনড্রিকসের বাজনা শুনছি। যদিও এর কয়েক বছর আগে নজরুল মঞ্চে LRBর অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ হারিয়েছিলাম। তখন ফসিলসের শো দেখতে গেছিলাম নজরুল মঞ্চে। যতদূর মনে পড়ছে, ফসিলস LRB কে মঞ্চে ডেকে একটা গান গেয়েছিল। জানি না স্মৃতি রাস্তা ভুল করতে পারে। একসময় পাগলের মতন শুনেছি `সেই তুমি`। আমি কেন, আমার মতন অনেকেই। আমি ভেসে গেছি আইয়ুব বাচ্চুর কণ্ঠের জাদুতে...

মেয়ে তুমি কি দুঃখ চেনো, চেনো না,
মেয়ে তুমি কি আকাশ চেনো, চেনো না,
তবে চিনবে কেমন করে এই আমাকে...

বাংলাদেশের ব্যান্ডমিউজিকের সঙ্গে আমার খুব বেশি পরিচয় নেই। তবে আইয়ুব বাচ্চুর গানের মাধ্যমেই আমাদের প্রতিবেশী দেশের ব্যান্ড মিউজিকের সঙ্গে আমার পরিচয়। সেখান থেকেই পরিচয় গুরু আজম খানের সঙ্গে। বাংলাদেশের পপ সম্রাট আজম খান মুক্তিযুদ্ধের সৈনিক ছিলেন। ওঁর সঙ্গীতের মধ্যে এক অদ্ভুত মুক্তিকামী রোম্যান্স আর ভালোবাসার তীব্র উচ্চারণ ছিল। আইয়ুব বাচ্চুর তখন বয়স কম, একদিন টিভিতে গানের একটি প্রোগ্রামে দেখলেন পপ সম্রাট আজম খানকে। অনেক আগে থেকেই আজম খানের ভক্ত ছিলেন বাচ্চু। মন্ত্রমুগ্ধের মতন শুনছিলেন পপ সম্রাটের গান। পাশে ঝাঁকড়া চুলের এক গিটারবাদক। গিটারে ভানুমতী দেখাচ্ছেন বোতাম খোলা শার্টে। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম কিংবদন্তী গিটারিস্ট নয়ন মুন্সি।

সে সময়কার অনেক পরিচিত গান, যেমন- এই নীল মনিহার, মন শুধু মন ছুঁয়েছে, মেলায় যাই রে, আবার এলো যে সন্ধ্যা প্রভৃতি কালজয়ী গানের গিটারিস্ট তিনি। তার এই অনবদ্য বাজনা শুনে হয়তো তিনি ঠিক করে ফেললেন, জীবনে আর কিছু চান না, শুধু এমন অসাধারণভাবে গিটার বাজাতে চান। এরিক ক্ল্যাপটনের জীবনী পড়ে জেনেছি, উনি একসময় বুঝতে পারছিলেন না জীবনে কী করবেন। অদ্ভুত এক হতাশা ঘিরে ধরেছিল তাকে। তখন তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন গিটারকে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এই পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ যেভাবে জীবনযাপন করে সেটা তার জন্য নয়। ওর জন্য গিটারযাপন লেখা রয়েছে। এই পৃথিবীর খুব কম মানুষই এটা করতে পারে। কেউ গিটার, কেউ পিয়ানো, কেউ হারমোনিয়াম, কেউ কলম, এদের মধ্যে খুঁজে পায় বেঁচে থাকা।

এই কথাগুলো মুখে বলে দেয়া খুব সহজ। কিন্তু রক্তে হিমোগ্লোবিনের জায়গায় পেন্টাটনিক মাইনরের আধিক্য খুব কম মানুষেরই থাকে। আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন সেইরকম একজন অসামান্য গিটারিস্ট। আমি আইয়ুব বাচ্চুকে খুঁজতে গিয়ে খুঁজে পেয়েছিলাম আজম খানের গান। পাগল হয়ে গেছিলাম এই গানে:

আমি যারে চাই রে, সে থাকে মোরই অন্তরে,
আমি তারে পেয়েও হারাই রে...

যদিও লিরিকের দিক থেকে আইয়ুব বাচ্চুর গান আমায় খুব টেনেছে এটা বলা ভুল হবে। বরং মিউজিকটা লিরিকের চেয়ে অনেক বেশি আকৃষ্ট করেছে আমায়। বিশেষ করে আইয়ুব বাচ্চুকে লাইভ শোনার মধ্যে এক অদ্ভুত মাদকতা আছে। মঞ্চে একজন যাদুকরের হাতের জাদুদণ্ড আর রকস্টারের হাতের গিটার সমার্থক। রকস্টারের আঙুলের ডগায় খেলা করে যাওয়া গিটারের নোট আর যাদুকরের যাদুমন্ত্র সমার্থক। আমি খুব ভাগ্যবান জীবনে একবার আইয়ুব বাচ্চুকে লাইভ শুনেছি। আজ সকালে খবর পেলাম আইয়ুব বাচ্চু চলে গেছেন পৃথিবী ছেড়ে। প্রণাম...

ধারাবাহিক