সংগৃহিত

সংগৃহিত

ধার্মিক হবার আর কী মানে থাকে!

যূথিকা জাকারিয়া

প্রকাশিত : জুন ০৪, ২০১৮

রাত এখন কত, জানে না রোদেলা। বাকি অনেক অনেক রাতের মতো এই রাতটাও হয়তো নির্ঘুম কেটে যাবে, তবু সমাধান মিলবে না কিছুতেই। জীবন আজ তাকে যে বাঁকে এনে দাঁড় করিয়েছে...

সকালে দুই বাচ্চার স্কুল আর স্বামীর অফিস। সকালটা ঝড়ের বেগে কাটে তার। তবু চিন্তারা তারে ছাড়ে না, তিষ্ঠোতে দেয় না একদণ্ড। বহু ভেবে সে হাতে সেলফোন তুলে নেয়। ওপারে হ্যালো শুনে নিজের পরিচয় দেয়। জানতে চায়, ওপারের পরিচয়। জানতে চায়, রাতের পর রাত, দিনের পরে দিন তার স্বামীর সঙ্গে কী এত কথা!

রোদেলার স্বামী ফেরে বিকেল নাগাদ। একটা নামকরা পত্রিকায় সে কাজ করে। সন্ধে হতেই বেরিয়ে যায়, ফেরে সেই রাতে। এলাকার লোকেরা বলাবলি করে, রোদেলাকে জানায় যে, সাদি মানে তার স্বামী রোজ ফোন হাতে উদ্দাম গল্পে মাতে গান করে কাউকে শোনায়। ফোনের ওইপ্রান্তে কে জানতে মরিয়া রোদেলা নাম্বার সংগ্রহ করে কৌশলে। নাম্বার তো একটা নয়, একাধিক।

সন্ধেয় বাড়ি ফিরে আজ ভিন্ন মূর্তি ধরে সাদি। অবশ্য ভিন্ন আর কী! নানা ছুতায় আক্রোশে ফেটে পড়া আর গায়ে হাত তোলা তার প্রাত্যহিক স্বভাব। ঝড় থামলে আড়ষ্ট শরীরেই ঘরের কাজ সারে, খেতে দেয় সাদিকে। বাচ্চা দুটোকেও খাওয়ায়। ভাবতে থাকে নিজের অতীত, বর্তমান। নাহ, ভবিষ্যৎ ভাবে না সে। ভাবতে পারে না, প্রচণ্ড অপরাধবোধে ভোগে।

বন্ধু বলতে কেউ নাই রোদেলার। নাই তেমন কোন আত্মীয়। পাড়া-প্রতিবেশী বহুজনে তাকে আইনের আশ্রয় নিতে বুদ্ধি দিয়েছে ঠিকই, তার সাহস হয়নি। নিজের মাকে দেখেছে রোদেলা তার বাবার অত্যাচারে ঘর ছাড়তে। এ কারণে পড়ালেখা হলো না। স্কুলের গণ্ডিও সে পেরোতে পারেনি। একসময় ভাসতে ভাসতে এসে ওঠে এই বাড়িতে। রোদেলা আর তার মাকে সাদির মা আশ্রয় দেন।

এক সপ্তাহের মধ্যে সাদির মা-বাবা মারা যান। দাফন-কাফন সেরে কুষ্টিয়া থেকে ফেরে সাদি। রোদেলার মা-ই তখন পুরা ঘরের কর্ত্রী। তবু সাদি আর রোদেলার মেলামেশা কি তার বয়স্ক চোখে ধরা পড়েনি? নাকি তার নীরব প্রশ্রয় ছিল তাতে? রোদেলা আর ভাবতে পারে না, নাকি চায়ও না!

কেবল মনে পড়ে, নিজের ভিতর যখন আরেকজনের অস্তিত্ব টের পেল, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ডাক্তার যখন জানাল, সে প্রায় পাঁচমাসের অন্তঃস্বত্তা আক্ষরিক অর্থেই পায়ের নিচে যেন মাটি সরে গেল। সাদিকে বহু বোঝানো হলো, বহু কাকুতি-মিনতি করেও তাকে বিয়েতে রাজি করানো গেল না। তাদেরই ঘরের আশ্রিতা কন্যা তার স্ত্রী হবে, এটা সে কিছুতেই মানবে না। তখন রোদেলার মা নিজেদের অবস্থান বুঝতে পেরে শেষ চালটা চাললো। হয় সাদ বিয়ে করবে রোদেলাকে নয়তো তারা মা-মেয়ে আত্মহত্যা করবে।

একপর্যায়ে সাদি মেনে নেয়, তবে সে নতুন এক ফতোয়া আনে। সে কোরান শরিফ আনে। রোদেলাকে ওজু করে আসতে বলে। এরপরে তারা কোরান ধরে শপথ করে, আজ থেকে তারা স্বামী-স্ত্রী। রোদেলা আজ এত বছর পরে ভাবে, পরহেজগার, নামাজি ফের তাবলিগ জামায়াত করা সাদির এ কেমন আচরণ! সে কী জানে না কোরান ধরে বিয়ে হয় না, বিয়ের একটা নির্দিষ্ট নিয়ম আছে? রোদেলার মতো একটা সামান্য মেয়ের সঙ্গে যে প্রতারণা করতে পারে, তার আর ধার্মিক হবার কি মানে থাকে?

ধারাবাহিক