এলোমেলো অংক

রিফাহ সানজিদা

প্রকাশিত : মার্চ ২০, ২০১৮

প্রায়ই বড় রাস্তায় যখন একটা  ট্রাক সাঁই করে ছুটে যায়, আমি তাকিয়ে থাকি, আর ভাবি, একদিন, হ্যাঁ, একদিন অমন একটা ট্রাকে করে আমি ঘুরে বেড়াবো। পুরো দেশটা ঘুরে বেড়াবো। ট্রাক কেন? ট্রাকের ছাদে বসে হাওয়া খেয়ে, রাস্তার পাশে মস্ত বড় গাছের ডগায় পাতা ছুঁয়ে ছুটে চলে আর কোন গাড়ি ? ট্রাক নাকি রাস্তার রাজা। আর ‘হাইওয়ে’ সিনেমাটা তো এতে বাড়তি মাল-মশলা জুগিয়েছে। আমি সেই কবে থেকে স্বপ্ন দেখছি ট্রাকে এমন ভ্রমণের।

জীবনে কি এমন আশা-আকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে না? আমার কোনো পিছুটান নেই। কোনো কিছুর জন্য বাঁধা পড়তে হবে, এমন নিয়ম নেই। আমার কেবল ঘুমাবার একটা ছোট্ট রুমের ঠিকানা থাকলেই মনে হবে, বেশ ভালো আছি। আর ট্রাকে এমন ভ্রমণের সুযোগ থাকলে কে আটকায়? জীবনে আমরা যা যা প্ল্যান করি তার অনেকটাই পেয়ে যেতে পারি, তবে সবটাই যেভাবে চাইবেন সেভাবে পাবেন, এমন কি কথা আছে? সবার যে সুখের ঘর হবে, সবাই যে মানসিক শান্তি নিয়ে বেঁচে থাকবে, এটাও তো ঠিক নয়। তেমন না হলেই বোধকরি ভালো। জীবন তো আমাদের অবাক করবে। আশ্চর্য সব মোড় নিয়ে বুঝিয়ে দেবে, তুমি বেঁচে রয়েছ। আমি একটু অল্প বয়েসেই এত মানুষ দেখেছি, এখন ভাবলেই অবাক হই। আবার ভালো বোধ করি এই ভেবে যে, মরে গেলেও জানবো, দেখা হয়েছে অনেক।

ছোটবেলা থেকেই মানুষকে পড়ার একটা আগ্রহ ছিল। কাজে দেয়নি যদিও, চারপাশের যারা নিজেকে আপন ভাবাতে চেয়েছে তাদেরই চিনিনি একদম। তবে, এর মধ্যে সবচেয়ে জটিল যে উপলব্ধি হয়েছে তা হলো, মানুষের হিসেব-নিকেশ। আমরা সবাই খুব হিসেব-নিকেশ করতে পছন্দ করি। সম্পর্ক-বন্ধুত্ব-শত্রুতা সব হিসেব-মতো করি। আর তাতে ভুলটা বেশিই হয়। কারণ অংকের মতো এখানে সমীকরণ থাকে না। মানুষ প্রথম অভিজ্ঞতা দিয়েই সব কিছু বিচার করে। ব্যাপারটা অস্বাভাবিকও নয়। যেমন আমি গার্লস স্কুলে পড়েছি। স্বভাবতই আমি কিংবা আমার মতো কেউ ছেলেদের স্বাভাবিক আচরণগুলো সম্পর্কে অজ্ঞ। আবার একটা বয়েজ স্কুলের ছেলের জন্যও তাই। মেয়েদের স্বাভাবিক অনেক কিছুই তার কাছে অস্বাভাবিক ঠেকতে পারে। সমাজের এত নির্বোধ সিদ্ধান্তে আমি কিংবা আমরা হারিয়ে গেছি কোথাও যেন। স্বাভাবিক অনেক কিছুই আমাদের অস্বাভাবিক মনে হয়।

তাই আমরা হিসেব করতে বসি। লাভ-ক্ষতির সেসব সূত্রহীন ভ্রান্ত অংক আমাদের জন্য আরও বিভ্রান্তি তৈরি করে। কেউ প্রথমবার কোথাও ঠকে গেলে পরেরবার সেখানে ঠকানোর প্রস্তুতি নিয়ে যায়। যদিও মানুষ-স্থান-কাল সব বদলে যায়। আমরা সমাজের গ্যাঁড়াকলে পিষ্ট হয়ে এত জটিল হয়েছি যে, কোথাও আসলে এতটুকু স্বপ্ন-আশা বেঁচে থাকলে সেটা হয়তো নিজেরাই খুন করে ফেলি অজান্তে। স্বাভাবিকভাবে নিতে কি শেখায় সমাজ? প্রেম-ভাঙন-ডিভোর্স-বিয়ে-কর্ম-জন্ম-মৃত্যু সব তো সেই নিয়মের ঘেরে বাঁধা। সব তো আজকাল কেবল লোক দেখানো। তবে খারাপ কিছু করে ফেললে আমাদের ভয় হয়, এটাও লোকে দেখে ফেলল না তো? এবার কি হবে? এমন সব ভয়, এমন সব দুর্বলতা একটা অসুস্থ হাওয়ার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে। এর মধ্যে কোথায় নিষ্পাপ প্রেম? আর কোথায় সরল স্বপ্ন? হ্যাঁ, স্বপ্ন একটা আমার রয়েছে, ট্রাকে ঘুরে বেড়াবো একদিন। হাওয়ায় হাওয়ায় মাতালের মতো অনুভূতি ভাসিয়ে দেব। যেখানে কেউ জানতে চাইবে না, পালটা সন্দেহে আমি সত্যি কী মিথ্যা। আমার শরীর-সর্বস্ব সত্তা যেখানে বিলীন। কেবল আমিই থাকবো। এই আমি মানুষটা যে
অদৃশ্য সত্তা নিয়ে বেঁচে রয়েছি।