অলঙ্করণ: পাপিয়া জেরিন

অলঙ্করণ: পাপিয়া জেরিন

শরীরী জীবন

শর্মিলা

প্রকাশিত : মার্চ ১৬, ২০১৮

অফলাইন অনলাইন মানে পুরো জীবনটা কী যে বিচ্ছিরি লাগো! মেয়ে হয়ে জন্মানোর জন্য আমার ভেতরে কোনও ভালো লাগা নাই। কোনও গর্ব নাই। যা আছে, শুধুই বিতৃষ্ণা।

জামাটা যুতসই হইতেই হবে।আমার ছেলেবন্ধু যে এক শার্ট দশদিন গায় দিতেছে সেও আমারে বলতে পারে সহজেই, একজামা ক্যান রোজ পরি। সাজলে ব্যাটাদের জন্য সাজছি। না সাজলে খ্যাৎ।

কিন্তু আমার তো কোনও কোনও দিন সাজুগুজু করে পুতুল হয়ে থাকতে মন চায়। এরপরের দিন থেকে আবার সপ্তাহখানেক চুল আঁচড়াইতে ইচ্ছা হয় না। আয়না দেখতে ইচ্ছা হয় না। ভালো মেয়েরা তো এমন না, তাই না? আমি কি খারাপ? নাইলে ক্যান করি?

আমি তো মেয়ে, ক্যান এমন করি? আমার কি ইচ্ছা করে না রাতবিরেতে যখন তখন ঘর থিকা বাইর হইয়া যাইতে। বাপ-মা পর্যন্ত মনে করে, মেয়ে মানুষের বাইর হওয়া কিসের এত! কই যাই, কার কাছে, কেন যাই। বিয়ে দিয়ে দেয়া উচিত। কিন্তু আসলেই কই যাই?

গাছতলায় বইসা থাকি। এইটা কেমন কথা? একটা মেয়ে গাছতলায় ক্যান বইসা থাকবে? আমার ইচ্ছা করে আমি দুইটা জামা গায় দিয়া বছর পার কইরা ফেলি। চুল ন্যাড়া কইরা ফেলি। গরমে হাফ প্যান্ট পইরা থাকি। পায়ের পশম না চাঁছি। কিন্তু পশম না চাইছা সেক্সি না হইয়া হ্যাফ পরা অন্যায়। আর হাফপ্যান্ট পরা অশালীন।

কোনও ছেলের সাথে আমার কোনও দিন জিগরি বন্ধুতা হয় নাই। জামাইর সাথে হয়তো হইছে। কিন্তু সে তো অন্য সম্পর্কের নাম। অলরেডি পায়া বসছে। ছয়সাত বছর ধইরা এক মেডিকেল কলেজে পইড়াও কোনও ছেলের সাথে আমার স্রেফ জিগরি বন্ধুতা হয় নাই। কেন হয় নাই? তারা ইনটিমেডেটিং। তাগো সেক্সিস্ট জোক্স, আমার শরীর আমার বান্ধবীদের শরীর নিয়া স্রেফ মজামাস্তির মন্তব্য শুইনা আমি হাইসা ফেলি। কারো সাথে ঝগড়া করি না। কিন্তু আমার কলিজা পুরতে থাকে। আমার মন চায় আমাদের সব মেয়েদের শরীর আমি বস্তায় ঢুকায়া ফেলি। আমরা খালি এমন শরীর শরীর ক্যান? আমি যখন দেখি, আমার সামনের মেয়ের পাছার দিকে এক লোক তাকায়া আছে তারে পাস করে আগানোর পর আমার গা ঘিনঘিন করে। কারণ এইবার সে আমারে দেখতেছে। মন চাইলে একটু ছুঁইয়াও দিয়া যাবে। আজকাল শুনি ব্লেড দিয়াও পোঁচ দেয়।

সারা দিনরাত পড়ার পরেও আমরা মেয়েরা চেহারা দেখায়া পাশ করি। স্যারেরা আমাদের পাশ করায়া দেয়। তাও তো দেয়। যা বাবা! চাকরি তো কেউ দিতে চায় না। কে দিবে নিরাপত্তা? জিগায় কবে বাচ্চা নিবা, বাচ্চা নিলে তো গ্যাপ হবে। চাকরিতে আসতে পারবা না। কিন্তু চাকরি দাতাও তো মায়ের পেট থিকাই বাইর হইছে। তাই আছে কোটা। না না, মেয়েদের কোটা বন্ধ করো। সমান অধিকার থাকা লাগবে। আমার সব এচিভমেন্ট আমার শরীর দেখায়া কেনা। দুনিয়ার সব ফেইলরের কারণ আমার শরীর। একদিন সূর্য না উঠলে তার কারণ হবে পৃথিবীতে মাইয়া মানুষ আছে। এই মাইয়া মানুষ তার শরীর আছে ভালো, কিন্তু সেক্সুয়ালিটি নাই। তার ইচ্ছা নাই, থাকলে স্লাট। ইচ্ছা থাকলে নাকি এমন ইচ্ছা সেই সবিতা ববিতা ভাবীদের গল্পের মতো। বাজার দিতে যে আসে, দুধ দিতে যে আসে, প্লাম্বার সবার লগে শুইয়া পরে। জোর জবরদস্তি করলে নাকি আনন্দ পায়। তাদের সব হিসাব মেলানো আছে। সব কিতাবে লিখা আছে। কেউ কি আমাদের কথাটা শোনার জন্য আছো? কী যে বিরক্ত লাগো!

এই হরমোনাল ওঠা নামার প্যারা, এই এক ফোঁটা এলকোহল না ছুঁইয়া উলটপালট লাগার প্যারা। কারো সাথে ঝগড়া না কইরা খিটমিট লাগা, এই পেটে ব্যথা, হাতপা চাবানো। কী অসহ্য। কী যে অসহ্য। বাচ্চা পয়দা দেখলে ভাবি, কেমনে পারতেছে মহিলাগুলা। লালনপালন দেখে ভাবি, কেমনে পারতেছে মহিলাগুলা। কেমনে পারতেছে সব জারজ চুতিয়াদেরও বুকের দুধ খাওয়ায়া, ভালোবাসা দিয়া বড় করতে। মাগো তোমরা ক্যামনে পারো? ক্যামনে পারো...

ধারাবাহিক