লাল মটরসাইকেল

এস এম শাহরুখ পিকলু

প্রকাশিত : জুন ০২, ২০১৮

আসাদগেটে একটা দুর্ঘটনা ঘটলো রাত ৮টার দিকে। বাসের ড্রাইভার আর হেল্পার ছেলেটা পড়ি কী মরি করে যেদিকে পারে ছুটেছে। ভিতরের মানুষগুলো কিছুক্ষণ বোকার মতো বসে থেকে নড়েচড়ে উঠছে। কেউ কেউ জানালা দিয়ে মাথাটা বাইরে বের করেছে। মানুষ জড়ো হতে শুরু করেছে চকিতে। দৌড়ে বাঁশি বাজিয়ে বেজায় ভুড়ি নিয়ে দৌড়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছতে চেষ্টা করছে দায়িত্বরত পুলিশ কন্সটেবল। সন্ধ্যারাতের ছককাটা শহরের নৈমিত্তিক ঘটনাচক্রে একটা করুণ ছেদ।

জারিনের বয়স পঁচিশ পেরিয়ে ছাব্বিশ। কিন্তু মানুষ তার নামের আদ্যক্ষর Z খেয়াল করে না। ডাকে জারিন। যেন তার নামটা J দিয়ে লেখা। ও মাঝে মাঝে ভাবে ‘জিয়া’ নামটা যে মানুষ হরহামেশা ভুল উচ্চারণ করে তাতে কি কারো কিছু এসে যায়? বোধ হয় না। তা না-হলে সবাই এত নির্লিপ্ত কেন? এমএ-টেমে পাশ করে একটা ভালো চাকরি সে করে বটে, কিন্তু সেই নয়-দশ বছরে হারানো মায়ের জন্য একটা দুঃখবোধ তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। বাবাই তার বাপ-মা একসঙ্গে। বাবা তার এক দেবতা। যৌবন থাকতেও আর বিয়ে করেননি। কোনোদিন এসে জারিনকে বলেনি, এইটা তোমার নতুন মা। সারাটা জীবনের সাধ-আহ্লাদ জলাঞ্জলি দিয়ে যেন পাদ্রির মতো কাটিয়ে দিলেন তার বাবা, মেয়েই তার বিশ্ব।

আর আছে আরিফ। আরিফ তার আজকের ভাষায় বয়ফ্রেন্ড। ও আসলে চরমভাবে ভালোবাসে আরিফকে। বাবাকে যেমন ভালোবাসে, দুইটায় রকম ফের আছে। সেটা কাউকে বোঝানো দরকার নেই। একটা মিল অবশ্য আছে, দুজনেই লাল মটরসাইকেল চালায়।

‘সেই কখন থেকে তোমার অপেক্ষায় বসে আছি, আরিফ। বললাম তোমায় যে, আজ আবার বাবার আসতে দেরি হবে। সেই আশুলিয়া থেকে, মটরসাইকেলের বাড়তি সুবিধা থাকতেও, আজ দেরি হবে। রাত আটটা পেরিয়ে নয়টা হবে, দশটা হলেও হতে পারে, বাবা যে বলে গ্যাছে। সে তো মিথ্যা বলে না। মিথ্যা বললে তো সরকারি চাকরিটা করেই আজ গুলশানের ফ্ল্যাটে রাখতো মেয়েকে। বিয়ে দিতো লোক দেখিয়ে কোনো পাঁচতারা হোটেল ভাড়া করে। কোনো বিদেশে থাকা ছেলের সঙ্গে। দেশে কোন ভালো ছেলেটা আর থেকে গেছে? কিন্ত না...’

‘সেই কখন থেকে তোমার অপেক্ষায় বসে আছি, বেলি ফুলের মালা পরে। স্নিগ্ধ ট্যালকমের পরশে, পারলারের ছাঁটা চুল নিয়ে, তোমারই দেয়া জামদানি শাড়িটা পরে। গাঢ় নীলে হলুদ ছোট ছোট ফুল তোলা সে শাড়িতে, ফ্রেঞ্চ পারফিউম। ওটা বাবা দিয়েছেন। কিন্তু কোথায় তুমি? সেই বিকেল পাঁচটার সময় আসবে বলে রাত প্রায় আটটা। বাবা যে চলে আসবে। আমাদের সেই মিলন কি অধরাই রয়ে যাবে? একরাত বাবাকে মিথ্যা বলে যে এক ঘিঞ্জি হোটেলে কাটিয়েছিলাম। যেদিন বিছানার চাদর রক্তাক্ত করেছিলাম, লজ্জায় তিন ঘণ্টা কথা বলতে পারিনি। তার পরের পর্ব যে আজই শুরু হবে, হবার কথা ছিল। কিছু কথা, কিছু কবিতা, দীর্ঘ চুমু, একে অন্যের মাঝে হারিয়ে যাওয়া, তারপর, তারপর... কিন্তু কোথায় তুমি?’

আসাদ গেটের এক্সিডেন্টের ভিক্টিম একটি লাল মটরসাইকেলের চালক। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু। তার পকেট হাতরে মোবাইল ফোন আর মানিব্যাগ কখন পাবলিক নিয়ে গেছে। সেটা অবশ্য নিকটস্ত বস্তির একটা ছোট্ট ছেলে দেখেছে। তার কৌতূহল আকাশ ছুঁয়েছে। সে সুযোগ বুঝে পকেট হাতড়েছে। পেয়েছে একটা গোলাপি প্লাসটিকের চৌকোণ জিনিস। তার ভিতরে একটা বেলুন জাতীয় কী যেন। সে ফুঁ দিয়ে তা ফুলিয়েছে। বেলুনের মাথায় আবার চোখ থাকে সে আগে কখনো দেখেনি। পুলিশের লোক বুট পায়ে তা দর্শনমাত্র ফুটো করে দিল। কে মরলো, কী তার পরিচয়, সবাই জানতে আগ্রহী। পরিচয় জানা গেল তার রক্তে মাখা লাইসেন্স থেকে। সেটা পাশে ড্রেনের ধারে অন্য ময়লার সাথে পড়ে ছিল।

‘সরি, ডার্লিং, কালকে কাজে আটকে গেছিলাম।’... আরিফের ফোন। সে দুর্ঘটনার কিছুই জানে না।

ঢাকা
৩০ মে ২০১৪

ধারাবাহিক