ভূত বিলাসের ঘর

আত্মজীবনী পর্ব ৫

শ্রেয়া চক্রবর্তী

প্রকাশিত : মে ২৩, ২০১৮

আমাকে আমার নিজের দিদিমার মতোই ভালোবাসতো বাবুইয়ের মা। দুপুরবেলা ওদের বাড়ি গেলে স্নেহ আমায় লতায়-পাতায় জড়িয়ে ধরতো সমাদরে। পাতে পড়তো সবচেয়ে বড় মাছের মুড়োটা, আরো নানা ব্যঞ্জন। বাবুইদের বাড়িতে একটা কুলগাছ ছিল। গাছভর্তি টোপা কুল। দিদা বয়াম ভর্তি কুলের আচার বানিয়ে রাখতো। দুপুরবেলা সবাই যখন ভাতঘুমে জর্জরিত, আচারের কুলগুলো সাগ্রহে অপেক্ষা করতো কখন কচি আঙুলের স্লাইডে তারা আমার জিহ্বাগ্রে এসে নিরাভরণ হবে।

সবার অগোচরে আমার প্রিয় খেলা ছিল জলপরি। যেন আদিগন্ত বিস্তৃত জল আমার সামনে। গামছা দিয়ে বানানো নকল বিনুনি ভেজাবো বলে পা টিপে টিপে যখন নামছি সেই কাল্পনিক সমুদ্রে, কে যেন পা ধরে টেনে নিতো রোজ। তারপর হেরে গিয়ে ডুবে যেতাম অনেক স্রোতের অতলে। ডুবে যেতে যেতে দেখতাম আমার ভেসে থাকা বিনুনির গোছার ওপর দিয়ে চলে গেল একঝাঁক ডোরাকাটা মাছ, আমার চারপাশে আকাশি জলের মাঝে ভেসে আছে জুপ্ল্যাংক্টন আর বটলগ্রীন শ্যাওলার সাম্রাজ্য। আমি সেই অদ্ভুত পৃথিবীতে ডুবে যেতে যেতে দেখতাম, আমার বুকের ওপর কয়েক গ্যালন জলের জ্যাকেট ভেদ করে সূঁচের মতো ঢুকছে ওপিঠের পৃথিবীর আলো। সে আলোয় প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠছে কত নুড়ি কত ঝিনুক। আর আমি ডুবছি যতক্ষণ না আমার ডুবে যাওয়ার তরঙ্গ সীমার ওপর সাদা ফেনার মতো বুদবুদ ঘন হয়ে উঠছে। সেই তবে থেকেই জল আমার বড় প্রিয় অনুষঙ্গ। সে যেন কত শান্তি নিজের বুকের মধ্যে নিয়ে চুপচাপ বসে আছে। জলের মতো হিলিং আর কেউ দিতে পারে না। মাতৃগর্ভের অন্ধকারে তোমার প্রথম প্রকাশের কালে সেই তোমায় ভাসিয়ে রাখে আদরের নৌকোয়, আবার সেই মুছে দিতে পারে জীবনের যাবতীয় ক্ষয় ও বেদনার দাগ।

সেসময় দাদুর বাড়ির পাশেই আমাদের নতুন বাড়ি তৈরি হলো। মানে আমার মায়ের বাড়ি। তার নিজের উপার্জিত অর্থে তিল তিল করে তৈরি হলো সেই অনাবিল আশ্রয়। ওই বাড়ির ভিত যখন গাঁথা হচ্ছে আমি উঠোনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম, বালি সিমেন্ট মাখা ইটের ওপর ইট গাঁথা, যেমন শব্দের সাথে শব্দ রহস্য দিয়ে গেঁথে কবিতা তৈরি হয় সেই বাড়িও তার চেয়ে কম কিছু ছিল না। যখন একটি ঘর তৈরি হলো, তার কাঁচা মেঝেতে চক দিয়ে প্রথম অ আ লেখা শিখলাম। আমার মেয়ের কাছে যেমন ম্যাজিক শ্লেট আছে তেমন আমার কাছে ছিল না, কিন্তু ও বাড়ির দেয়াল লাল কালো মেঝে আমার কাছে আগামী পঁচিশ বছরের জন্য অনেক সঙ্কেত অনেক না বলা কথার অদৃশ্য যবনিকা হয়ে উঠেছিল, যেখানে অনেক অক্ষর হঠাৎ ফুটে উঠে হঠাৎই মিলিয়ে যেতো আর আমি একান্তে রচনা করতাম তার নিজস্ব বর্ণমালা।

ততদিনে মায়ের গানের স্কুলটা বেশ বড়সড় হয়ে উঠেছিলো। প্রচুর ছাত্র-ছাত্রী, একদল তরুণ পায়রা যেন রোজ ডানা ঝাপটাতে আসতো। কী সুন্দর কী নবীন সেসব ছেলেমেয়েরা, হারমোনিয়াম বাজাতে বাজাতে তারা হেসে হেসে মায়ের গায়ে ঢলে পড়তো। আমি ছোট্ট বালিকাটি, সবে অ আ ক খ শিখছি, হারমোনিয়ামের ওপার থেকে পাখির মতো গলা বাড়িয়ে দেখতাম আর ভাবতাম, কবে আমারও এমন ডানা হবে? কবে গোটা আকাশটা আমি পাবো? কবে এমন উচ্ছ্বাসে লপক ঝপক করে আমিও বৃষ্টিতে ছাতা মাথায় প্রেমিকের সাইকেলে চেপে গানের ইস্কুল যাব? কবে বিরহী পাপিয়ার মতো আমিও পিউ পিউ করবো? কবে আমারও একখানা গানের দিদিমণি হবে? কবে আমিও তার গায়ে হেসে হেসে লুটিয়ে পড়বো আর দিদিমণি আঁচল ছেড়ে গাইবো,
সুরে ও বাণীর মালা দিয়ে তুমি আমারে ছুঁইয়াছিলে
অনুরাগ কুমকুম দিলে দেহে মনে
বুকে প্রেম কেন নাহি দিলে?
আমারে ছুঁইয়াছিলে...

এমনই সুরের মূর্চ্ছনায় যখন ভরে থাকতো আমাদের ঘর, বাবা বলে মানুষটি এলেই তা কেমন ঝুপ করে অন্ধকার আর বিষাদের মধ্যে চলে যেতো। ওনার সাথে আমার সম্পর্ক আর চার পাঁচজন স্বাভাবিক বাবা মেয়ের সম্পর্কের মতো ছিল না। এর জন্য নিশ্চয়ই আমি দায়ী ছিলাম না। কারণ ও বয়সের মন তো একতাল মাটির মতো। যেমনভাবে খুশি গড়া যায়, যদি স্নেহ দাও যদি আঘাত দাও যদি অবদমন দাও যদি বন্ধুতা দাও যদি বঞ্চনা দাও যদি আলো দাও যদি অন্ধকার দাও, যাই দেবে সে নিজের মতো করে রিসিভ করবে। তারপর একদিন দ্বিগুণ অভিঘাত নিয়ে এই পৃথিবীর মুখোমুখি হবে। একরাশ বোবা অভিমান নিয়ে দেখতাম ওনার উপস্থিতিতে বাড়ির আকাশটা কেমন মেঘে ছেয়ে যেত। ঝোড়ো হাওয়া দিত, সেই হাওয়া সামলাতে দরজার কোণে ঢুকে দাঁড়িয়ে থাকতাম আর শুনতাম উচ্চস্বরে কথা কাটাকাটির শব্দ। তারপর একসময় সে আওয়াজ থেমে যেতো। মেঘ গর্জন নয়, এবার শুনতে পেতাম বৃষ্টিপাত। দরজার আড়াল থেকে নিজেকে আস্বস্ত করবো বলে যখন বেরিয়ে আসতাম, দেখতাম ও বৃষ্টিপাতের শব্দ বাইরে কোথাও নয়, ও বৃষ্টি আমার মায়ের চোখে।

লোকটার ওপর খুব ঘৃণা হতো আমার। বাবা ছাড়াও মেয়ে দিব্য বড় হতে পারে। বীজ থেকে যেমন গাছ হয় তারপর একা একাই মহীরূহ হয়, মানুষও তেমন পারে, এই জল হাওয়া আলো আর অনন্তের সাহচর্যে তার চিরঅধিকার। এসব দায়-দায়িত্ব সামাজিকতা ভালোবাসার আরোপ মানুষের অনুরূপ ভাবনার সৃজন। কিন্তু এসবের বাইরে থেকেও কেউ তার নিজস্ব গল্পকার হতেই তো পারে, কোনো অভাবকেই অভাব বলে গ্রাহ্য না করে। কিন্তু মানুষটার ওপর রাগ হতো এই কারণে যে, সে আমার করুণ শৈশবকে কেবল অস্থিরতা আর অন্ধকারের উত্তরাধিকারে ভরে দিয়েছিল। তার সাথে এ জীবনে দেখা না হলে আমার বড় ক্ষতি হতো না, কিন্তু ওই মেঘ ঘনিয়ে আসার এক একটা মুহূর্ত আমার শৈশবের পুতুল খেলার অনেক নরম সময়কে হঠাৎ বৃষ্টিপাতে আর বজ্রবিদ্যুৎ সহযোগে এলোমেলো করে দিয়েছিলো অনধিকার চর্চার মতোই।

এমনই মেঘ রৌদ্র আর বৃষ্টিপাতের অরণ্যে যখন আমার শৈশব মোহ মুগ্ধতা আর বিস্ময় নিয়ে চোখ মেলছে, তখন একদিন বাবুই খবর নিয়ে এলো আমি নাকি স্কুলে ভর্তি হবো। স্বপ্নের মতো নাকি সেই স্কুল। সবুজ ঘাস আর বেগুনি ফুলে ছাওয়া। আমি চোখ বন্ধ করে দেখলাম, দোলনা থেকে হাত বাড়িয়ে কারা যেন আমাকে ডাকছে, আয় আয়, খেলবি? আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আমি কোথায় এসেছি? তোমরা কে? তারা উত্তর দিলো, আমরা ঈশ্বর। তোর বন্ধু হই। খেলবি না? সেই স্বপ্নের নাম ছিল দেবিশ্বরী।

চলবে

লেখক: কবি

ধারাবাহিক