আমার ভ্রমণিয়া দিন

পর্ব ৩৪

হামিদ কায়সার

প্রকাশিত : জুলাই ১৩, ২০১৮

দাদাবাড়ি নানাবাড়ি
আমি আমার দাদাবাড়ির আমি আমার নানাবাড়ির প্রতিটি গাছের প্রতি কৃতজ্ঞ, প্রতিটি ঘাসের প্রতি কৃতজ্ঞ। প্রতিটি পাখি, পাখির প্রতিটি পালকের প্রতি কৃতজ্ঞ। মাটি, মাটির প্রতিটি ধূলিকণার কাছে আমার অনেক ঋণ আছে। প্রকৃতিই আমাকে অফুরন্ত আনন্দ যুগিয়েছে, বাঁচবার প্রেরণা জুটিয়েছে, পৃথিবীর প্রতি তৈরি করেছে আমার ভেতরে মায়া টান।

আমি এখনো আমাদের নামার কোপাকান্দি বিল-সংলগ্ন হিজল গাছগুলোর কথা ভুলতে পারি না, হিজল ফুলগুলো এখনো প্রায়শই আমার মনের ওপর অভিঘাত তৈরি করে যায়। ঘন সবুজ পাতার গাবগাছটার গভীর ছায়াতলের ছায়া পেতে আমার মন এখনো উন্মুখ হয়ে থাকে। আমি যখনই আমার দাদাবাড়ি কিংবা নানাবাড়ির উন্মুক্ত প্রান্তরে বেড়াতে যেতাম, বাতাসে দোলদোলানো ফসলের ক্ষেতগুলোকে মনে হতো যেন আমাকেই অভিনন্দিত করছে। সরিষার ফুলগুলো যেন ফুটে আছে শুধু আমারই জন্য!

ফাল্গনী উদাসী হাওয়ায় যখন গাছের পাতাগুলো ঝরতো, ঝরে ঝরে আমার উপর এসে পড়ত, মনে হতো আমি যেন ঈশ্বরের বিশেষ আশীর্বাদ লাভ করছি। কী করে ভুলি সেই শিমুল ফোটার দিনে তুলাগুলোর বাতাসে বাতাসে ওড়াওড়ির সেই মনোহর দৃশ্য! আমার বালকবেলা সেই তুলা ধরতে ধরতেই তো শুধু সারা গ্রাম হাতড়ে ফিরেছে।
 
শুধুই কী প্রকৃতি! প্রকৃতির উদার হাওয়ার বুকের ভেতর আশ্রিত যে মানুষগুলো, আমার কাছে তারাও প্রকৃতি, প্রকৃতির অংশ। পথে হাঁটার সময় নামা থেকে গরু নিয়ে ফেরা যে কৃষক, যে জেলে নদীতে নৌকা বাইছে মাছ ধরছে, এমনকি ক্ষেতে ক্ষেতে চাষ করছে, বাড়ির কোণাকাঞ্চিতে ফসলের শস্যের আবাদ করছে, তারা সবাই ছিল আমার কাছে প্রকৃতির মতোই শ্যামল, আনন্দ-জাগানিয়া গান। আমার দাদাবাড়ির গ্রামের মানুষের ভালোবাসার কথা আমি কোনোদিন ভুলবো না। কোনোভাবেই ভোলা সম্ভব নয়। আমি তাদের আদর অফুরন্তভাবে পেয়েছি, আমি তাদের ভালোবাসা অগুন্তিভাবে লাভ করেছি।

এই যে আমার আজকের বেঁচে থাকার শ্বাস, যতটুকু জীবনীশক্তি এ বুঝি সবটাই তাদের শুভাশীষ। আমি জানি না, কী কারণে গ্রামের মানুষগুলো আমাকে পছন্দ করতেন, ভালোবাসতেন খুব! জানি না কী কারণে, পথে দেখা হলেই হাসিমুখে সুখ-সম্ভাষণ করতেন, মুরুব্বিরা মাথায় হাত বোলাতেন। সে-আমার পরমপ্রাপ্তি! খুনখুনে বুড়ো হযরত পলান, যার ছিল না একটিও দাঁত, মাথার চুলগুলো দাঁড়িগুলো সব পাকা অথচ হাঁটার মধ্যে কী এক উদ্যমতা! যেন সাড়ম্বরের ঘোষণা, না না, আমি জীবন ছাড়ব না! আমি সামনে পড়লেই হলো, তিনি চিৎকার দিয়ে ওঠতেন, ক্যাপাসটিং কট! তারপর হো হো হো করে একটা প্রাণখোলা অট্টহাসি! আজো সেই কণ্ঠটা কানে ভাসে আর নিজের মনেই আমি অর্থ খুঁজে বেড়াই, আচ্ছা ক্যাপাস্টিং কটটা কি? বুড়ো হয়রত পলানের ছিল বড্ড তাস খেলার নেশা। সারাদিন তিনি তাস খেলে বেড়াতেন। পরে শুনেছি জুয়াও খেলতেন! তিনি ছিলেন বয়সের ভার জয় করা জীবনমুখীনতার এক চূড়ান্ত প্রতীক!

সেই সব মানুষগুলো, যারা আজ অনেকেই নেই, পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গিয়েছেন পরপারে, কেউ বা আবার নিজের ভিটেবাড়ি বিক্রি করে বসত গড়েছেন অন্য কোথাও। কেউ বা আবার গ্রামের শিল্পাঞ্চলের চোরাকুঠুরিতে কোথায় যে হারিয়ে ফেলেছেন নিজের সত্তা, আমি আর তাদেরকে দৃশ্যমান দেখি না। কীভাবে দেখবো, আমার সেই গ্রামটিই তো নেই। কবেই মরে গেছে ক্ষেতের বাতরে বাতরে দৃঢ় প্রহরীর মতো সেঁটে থাকা সেই কাঁঠাল গাছের সারি, খেঁজুর বাগানের সমারোহ, কবেই বিলীন হয়ে গেছে তুরাগের ঢলোঢলো সজীবের পাখোয়াজ অস্তিত্ব। ধুঁকছে সে এখন ভয়াবহ শিল্পের দূষণে।
 
তুরাগে যাবার যে হালট ছিল গ্রাম থেকে, যে নামাপথ দিয়ে গরুর গাড়িতে তুরাগ পাড় আর কোপাকান্দির বিল সংলগ্ন মাঠ প্রান্তর থেকে আসত ধান, সে রাস্তা রুদ্ধ করে গড়া হয়েছে ডান্ডি ডাইং। নামা থেকে টানে ওঠার এই একমাত্র সড়কটি বন্ধ করে যখন ডান্ডি হলো কোনো একটি মানুষও তার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়নি, প্রতিবাদ করেনি। কীভাবে করবে, জলে বাস করে কী আর কুমিরের সঙ্গে লড়াই করা চলে? গ্রামের একটা জনম জনম ভরে জুড়ে থাকা পথের মৃত্যু দেখে মানুষ কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখালেও, প্রকৃতি কিন্তু ঠিকই বিরস হয়েছে। সেই থেকে জরুনে কুঁজ গোটা পাওয়া যায় না, চন্দন ফুটে না, হিজল শিমুলেরা কোথায় উধাও! আমার সেই গ্রামের কংকালের করোটিতে করোটিতে এখন শুধু গার্মেন্টস-এর জটাজট আর মানুষ, কিলবিলে মানুষ, উপচানো মানুষ। এত মানুষ যে মানুষের ভিড়ে আর আমার সেই চেনা মানুষগুলোকে কিছুতেই চোখে পড়ে না, চোখে পড়তে চায় না, যদিওবা চোখে পড়ে সে-মুখ নাগরিক ক্লেদে জড়ানো, হিসাবের কু- বোঝাই।

আমি আমার ভ্রমণিয়া দিনে আমার জন্ম থেকে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত বয়সকালের একটা ভ্রমণচিত্র শুধু আঁকবার চেষ্টা করেছি। এটা কোনোক্রমেই আত্মজীবনী নয়, আমার বেড়ে ওঠার দিনের যে-ভ্রমণাংশ, যা আমাকে চিনিয়েছে প্রকৃতি, প্রকৃতির মানুষকে, আমি শুধু তার সারবত্তাকেই তুলে ধরতে চেয়েছি। কিন্তু সম্পূর্ণভাবে কী পেরেছি তা? কত কথাই যে বাকি থেকে গেল, কত গানই যে গাওয়া হলো না, এখন অনেক কিছুই মনের ভেতর থেকে একসঙ্গে প্রকাশের জন্য উপচে পড়তে চাইছে। হয়তো বা অসংলগ্ন মনে হবে অথবা খাপছাড়া, তবু এই এলোমেলোমিটুকু যেন না করলেই নয়!

গোপী নাপিত আসত কাশিমপুর বাজার থেকে মাসে এক কী দু’বার। লম্বা ঢ্যাঙঢ্যাঙা মানুষটা। তার মাথার বাবরি বাবরি চুল সব সময়ই থাকত অশৃংখলিত, অথচ সেই তিনিই কিনা মানুষের চুল কেটে বেড়াতেন, সাজিয়ে দিতেন চেহারাটাকে নতুন ছাঁচে। চোখটা তার সবসময়ই লাল থাকত। না, কোন রকমের নেশাভাংয়ের অভ্যেস ছিল না। বিড়ি সিগারেট হয়তো খেতেন। তবে আমাদের সামনে কখনো খেতে দেখিনি। বগলের মধ্যে একটা কাপড়ের ব্যাগে রাখা ক্ষুর কাঁচি বয়ে বেড়াতেন। পিড়ির মধ্যে বসে মাথাটা তার সামনে নুয়ে দিয়ে বসে থাকতে হতো। শুধু কি মাথা নুয়ানো? কানটাও ঢলে ঢলে লাল করে দিতেন গোপীকাকু। আর বড়াই করে বলতেন, নাপিতের কানঢলা খায়নি এমন কোন মানুষ আছে নাকি রে? দেখাইতে পারবি? ফকির থেকে শুরু করে রাজাবাদশাকেও নাপিতের কানঢলা খেতে হয়! নাপিতের ওপর কেউ নাই। কোন শালার ক্ষমতা নাই নাপিতের কান ধরে! সে কি গর্ববোধ গোপী কাকুর!

পরবর্তীকালে ঢাকা শহরে যাদের কাছেই চুল কাটিয়েছি সকৌতুকে লক্ষ্য করেছি কান ধরে কিনা, হুম ধরে, ধরতে হয়, কিন্তু গোপী কাকুর মতো কেউ অতো টানাটানি করে না, হয়তো মনে মনে সেই গর্ববোধও নেই কারোর মধ্যে যে, আমিই একমাত্র সেই ক্ষমতাধর ব্যক্তিত্ব যে কিনা রাজাবাদশাহ মন্ত্রী মিনিস্টার সবারই কান ধরার ক্ষমতা রাখি এবং ধরেও থাকি অহরহ। নাকি মনে মনে তারা এই গর্ববোধটুকু করে? করতেই পারে, সে অধিকার তাদের রয়েছে! তবে গোপী কাকুর মতো গাল ফুলিয়ে প্রকাশ করে না এই আর কী! আহা করুক না অমন গালভরা গর্ব! আমার তো আর কানের কোন ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে না! কান বরঞ্চ সেই সুযোগে টান টান উত্তেজনা লাভের সুযোগ পায়!   

গোপী কাকু নেশা ভাঙ করতেন না বটে, তবে বানেশ্বর ছিলেন বাংলা মদের রাজা। তখন বাংলা মদটার খুবই প্রচলন ছিল আমাদের গ্রামে। পেপার খুললেই যেমন সিনেমার বিজ্ঞাপনে দেখা যেত নায়করাজ রাজ্জাক মদের বোতল হাতে ঢুলু ঢুলু চোখে তাকিয়ে আছেন, রেডিও ছাড়লেই তেমন ভেসে ওঠতো আবদুল জব্বারের গান, আমি তো বন্ধু মাতাল নই, তবু যদি... । আমাদের গ্রামে যেন বাংলা মদ পানের রীতিমতো মচ্ছব চলতো। বাংলা মদ খাও আর বাড়ি ফিরে এসে বউ পেটাও! জীবনের যত না পাওয়া যত গ্লানিগুলো বউয়ের পিঠে সব ঝাড়ো, বউয়ের মুখে ছুঁড়ে মারো! কী যে সেই বন্যতা! আহা ম্যাক্সিম গোর্কির মা-তেও আছে! পাভেলের সামনেই ওর মাকে কী নিষ্ঠুরভাবেই না মদ্যমাতাল বাপের মার খেতে হয়েছে! পাভেল একবার বাপকে মারতে হাতুড়িও উচিয়েছিল।

চলবে