প্রহর

জোবায়ের রাখি

প্রকাশিত : নভেম্বর ১৬, ২০১৮

ইদানিং বিকেলের সময়টা আমার বাসার ছাদে কেটে যাচ্ছে, আপাতত খোলা ছাদ আমার সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গী। দোলনায় বসে হেলান দিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যাচ্ছে নিজের অজান্তে, এক পলক তোমায় দেখব বলে প্রহর কাটাচ্ছি। তোমার ছাদে আসার সময় টুকু আমার জানা থাকার পরও ঘন্টার পর ঘন্টা ‘তোমায় দেখবো বলে’ অপেক্ষায় কি যেন এক শান্তি খুঁজে পাই! কাউকে এক নজর দেখার মাঝে এতোটা প্রশান্তির অনুভূতি কোথা থেকে আসে, তা আমার জানা নেই। এত দূর থেকে তোমাকে দেখেও হার্টবিট কিন্তু কেন জানি ধী থাকে না। জানি, তোমার ক্ষেত্রেও হয় তোবা তেমনটা হয়। সপ্তাহে ১ দিন দেখা করার সুযোগ আমাদের, তাও আবার ঘন্টা খানিকের জন্যে। তোমার সাথে দেখা করার দিন প্রতিবার হার্টবিট যেন বাড়তে বাড়তে বন্ধ হবার উপক্রম হয়! 

 

মনে আছে সে দিনের কথা! 
যে দিন আমরা বাদাম খেতে খেতে জিয়া উদ্যানে হাঁটছিলাম, আর তখন দূর থেকে তোমার চাচাকে দেখে কি চুলা দৌঁড়ই না দৌঁড়েছিলাম। পুলিশের দৌড়ানি খেলেও হয় তোবা এত ভয় কাজ করতো না!  এরপর, পুরো ১ মাস এই ভয়ে তুমিও বাসা থেকে বের হও নি। যদিও বা তোমার চাচা আমাদের দেখেছেন বলে আমার মনে হয় না। 

 

মনে আছে শীতের রাতে মাঝ বিল থেকে তোমার জন্যে লাল শাপলা আনার কথা! চোরের মত বাসার পাইপ বেয়ে তা দিয়ে যাওয়ার মাঝে কত বেশি ভালোবাসা কাজ করত তা বলে বুঝানোর মত না। 
তোমাদের বাসার দারোয়ানটার কথা মনে আছে? সন্ধ্যার পর আমায় তোমাদের বাসার সামনে দেখলে ঐ বেটা খবিশ নিজের হাতের থাকা ডান্ডা নিয়ে আমাকে দৌঁওড়ানি দিবে বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতো, কিছু বুঝে উঠার আগে আমি নিজে ভাগা দিতাম।

 

এই!
তোমার কি মনে আছে, রিক্সা থেকে নামতে গিয়ে আমার প্যান্ট ছিঁড়ে গিয়েছিলো? কি অবস্থা ই না হয়েছিলো! শেষে আমার ইজ্জত বাঁচিয়েছিল তোমার স্কুলের রিপোর্ট কার্ড।  মনে আছে, টিএসসিতে আমার উপর হিজড়াদের আক্রমণ! পকেটে আমার ৫ টাকা ছিল আর ওরা ১০ টাকার নিচে আামায় ছাড়বে না। আর, তুমি হেসে হেসে মজা নিচ্ছিলে। যদিও বা ৫ টাকা ধার এর বিনিময়ে তুমি আামাকে দিয়েছিলে।

 

মনে আছে, স্কুল ফাঁকি দিয়ে পদ্মার পাড়ে ইলিশ খাবার কথা। ইলিশের কাঁটা গলায় বিঁধে কি অবস্থা না আমার হয়েছিলো। মনে আছে, ধানমন্ডি ৫ নাম্বার এ নাগা মরিচের বেলপুরি খেয়ে কি অবস্থা না তোমার হয়েছিল। ঝালে লাল হওয়া সেই মুখটা এখনও চোখ বন্ধ করলে চোখের সামনে ভেসে উঠে। তোমার ছাদে দেখা করতে গিয়ে তোমার মায়ের হাতে ধরা পরার কথা তো ভুলার মত না। জীবনে এর চেয়ে বেশি ভয় কখনো পেয়েছি বলে মনে হয় না। আশা করি তোমার মায়ের হাতের উত্তম-মধ্যম এর কথাও স্পষ্ট মনে আছে তোমার। প্রাইভেট এর টাকা মেরে সিনেমা দেখা আর শাহাবাগ মোড়ে চটপটি খাওয়া কথা মনে আছে তো!

 
একবার প্রাইভেটের টাকা মারার কথা বাসায় জেনে যাওয়ায় কি মাইরটা না মেরেছিল আম্মা! সোনালী দিনের সোনালী মুহূর্তগুলো স্বপ্নের মতো কেটে যাচ্ছিলো, দেখতে দেখতে ৫ টা বছর কেটে গেল! আচমকা, তোমার একটা চিঠি আমার জীবনকে উলটে-পালটে দিলো। আর, সেদিনটির জন্যে আামি কখনো প্রস্তুত ছিলাম না। সোজা-সাপ্টা ভাবে বলে দিয়েছিলে যে, আমার মতো বেকার ছেলের সাথে তোমার থাকা সম্ভব না। তোমার বাবা মাও মানবে না। 

 

তোমার হাতের লেখাটা যদি না চিনতাম তবে কখনো তা বিশ্বাস করতাম না। সবে মাত্র আামার পড়াশোনা শেষ হয়েছে। রেজাল্টও নেহাত মন্দ না। ভালো চাকরি পাওয়ার জন্যে আশা করি যথেষ্ট। 
তবে কেন তোমার এই অভিযোগ? 

 

কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না। অনেক যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও কোন ভাবে কিছু করতে পারলাম না। তোমার ভাই এর কাছে তোমার বিয়ের খবরও পেয়েছিলাম! রাগ-অভিমান-কষ্ট নিয়ে নিজেরে চেপে গেলাম তোমার হাসিমুখের কথা ভেবে! পারলাম না। 

 

কিছু দিন পর আামার বাসা থেকেও আমার বিয়ের জন্যে চাপ আসতে লাগল। এক সময়, আমিও রাজি হয়ে গেলাম। তখন আমি তোমাকে আনেক বেশি ঘৃণা করতেও শিখে গেছি। আর, আজ ২০ বছর পর ঐ ছাদের সে জায়গায় বসে আছি। তোমায় নিয়ে প্রতিটি স্মৃতি আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছি আজও! 

 

কেনো সেদিন বলোনি যে, নির্মম ক্যান্সার বাসা বেঁধেছিল তোমার শরীরে! কেনো তবে এতো মিথ্যের বেড়াজালে জড়ালে আমায়! বিয়ে তো আমারও করা হয়নি। তোমায় নিয়ে পরপারে থাকার আশায় মৃত্যুর প্রহর গুনছি। পরপারে আবার বাদাম খেতে খেতে তোমার চাচার দৌঁওড়ানি খাবো। এখন, ছাদে বসলে বুকের হার্টবিটটাও আর বাড়ে না। তোমার ছাদের দেয়ালে এখন শৈবালের বসবাস, দোলনাটাও আর দেখা যায় না। 

এভাবে খুব ভালো সময় যাচ্ছে আমার, কবে যে দেখব তোমায়।