ইসলামের ধ্রুপদী সহজতা

জগলুল আসাদ

প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ০৯, ২০১৯

ইসলামের নানা বিষয়ে ও বক্তব্যে এক ধরনের সহজতা আছে, যেটা ইসলামের আদি যুগের শ্রোতাদের চিত্তকে মুগ্ধ করেছিল। সেই আদিম সহজতা, স্পষ্টতা ও আদবের দীপ্রতার অভাব আছে অনেক ইসলামিস্টদের মধ্যেই। আমি ইসলামি চিন্তনে `ঐতিহ্যিক` আলেমদের পছন্দ করি। যারা স্পষ্ট, সরাসরি, `অনাধুনিক` ও আপাত দৃষ্টিতে যারা আনস্মার্ট, কিন্তু বচনে ও ব্যক্তিত্বে আন্তরিক, অপর ব্যক্তিমানুষের কল্যাণকামী, অতিথিবৎসল ও সহায়তাপ্রবণ।

অনেকেই, মডার্নিজমের ক্রিটিক করতে যেয়ে মডার্ন সাজারই অবচেতন বাসনা পোষণ করেন। দয়া করে, আপনারা আপনাদের নিজস্বতা বজায় রাখুন, আদবে, লেহাজে ও বক্তব্যে। ইসলামকে ছদ্ম-দার্শনিকতা থেকে মুক্ত করুন। খুব বেশি সেকুলার শব্দ-ভাষা ব্যবহার যদি আলেমেরা করা শুরু করেন (যেমনটি টিভি টকশোতে ও তাদের প্রেস ব্রিফিংয়ে দেখি) তবে যোগাযোগ খুব সহজ ও হৃদয়গ্রাহী হবে, বা এতে বক্তব্য মানুষের বোধের খুব কাছাকাছি আসবে, তা নয় মোটেও।

আলেমরা খুব দুনিয়াবি হয়ে গেছে, এমন কথাই শুনতে হবে তখন। আর খুব আরবি বা ধর্মীয় পরিভাষা ব্যবহার করলেও তথাকথিত আধুনিক শিক্ষিতরা, তখন হয়তো বুঝে উঠতে পারবে না সবটুকু। আপনি পশ্চাৎপদও বিবেচিত হবেন হয়তো। সমস্যা দুদিকেই। তাই প্রচুর কোরআন-হাদিসের শব্দ ব্যবহারের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ইংরেজি-বাংলা পরিভাষাও ব্যবহার করতে হবে। ভাষা ব্যবহারে কমুনিকেশনের স্বার্থে এক মধ্যপন্থি গদ্যের আবিষ্কার ধর্মীয় চিন্তাবিদদের এক আশু জরুরি কাজ।

ইসলামপন্থীদের অতি আধুনিক হওয়ার সাধনাকে আমি প্রত্যাখ্যান করি। সেকুলার পরিভাষা ব্যবহার করার পরামার্শ আমি দেই না তাদের, বরঞ্চ কোনো কোনো ক্ষেত্রে বর্জন করতে বলি। ইসলামের পরিভাষাকেই চালু করুন, কোরআন-হাদিসের শব্দকেই পরিভাষা হিসেবে গ্রহণ করুন, প্রচলিত করুন। আপনার পরিভাষাই ধীরে ধীরে সেকুলাররা বুঝতে শিখবেন, গৃহীত হবে সমাজে। আরো বুঝবেন, জগতের বহু কিছুর জন্য ইসলামের স্পেস আছে; ইসলামে ইসলামের বরাত ছাড়াও স্বাধীনভাবে দুনিয়াবি বিষয় নিয়ে ভাবা ও রায় দেয়ার স্কোপ আছে। ইসলামের ভেতর সেকুলার পরিসর আছে। তবে মজা হচ্ছে, এই পরিসরটার অনুমতি ইসলামই দেয়। তাই এই পরিসরও ইসলামবহির্ভূত নয়।

ধীরে ধীরে বুঝতে হবে যে, এ দেশে প্রগতিশীলতার নামে যে চর্চা হয় তার একটা প্যাটার্ন আছে। এই প্যাটার্নটি ইসলামধর্ম সংশ্লিষ্ট যা কিছু, সেটার বিরোধী। আর ‘প্রগতিশীল’ শব্দটিও মিসনোমার। ধার্মিকও বুদ্ধি ও যুক্তি ব্যবহার করে, আর প্রগতিশীল বলে যে নিজেকে দাবি করে তারও যাতায়াত আছে বিশ্বাসের নানা পরিসরে। একসময়, মার্ক্সিস্টদের প্রগতিশিল বলা হতো; এখন এ দেশে বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের প্রগতিশীল বলা হয়; যারা প্রায় আনক্রিটিকালি ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ এ `বিশ্বাস` করে তারাও প্রগতিশীল হিশেবে আমাদের দেশে অভিবাষিত। ইসলামকে তিনটি গালি দিলে আপনি প্রগতিশীল বলে গণ্য হবেন এই দেশে। এখানে প্রগতিশীলতার দাবিদাররাও খুব রক্ষণশীল ও অসহনশীল, ক্ষমতাসীনদের পদলেহিও। ঘৃণার কারবারি তারা, পরগাছা টাইপেরও বটে। যে দোষে অন্যকে দুষ্টভাবেন তারা, নিজেরাও দোষী তারা একই দোষে। বিরোধীপক্ষের জানাজার জন্য উদগ্রীব থাকে তাদের হৃদয়।

পরিপ্রেক্ষিত বিচ্যুতভাবে ইসলাম থেকে রেফারেন্স টেনে নিজের মতাদর্শ প্রমাণে সচেষ্ট হলে তো আপনি খুবই এলেমদার প্রগতিশীল বলে গণ্য হবেন। আমাদের প্রগতিশীল মহলের বেশির ভাগই ধর্মের দার্শনিক ব্যাঞ্জনা বোঝে না, তার সমাজতত্ত্ব ও ভাষার তাৎপর্যও বোঝে না। খেয়াল করতে হবে, ‘বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতি’ কিন্তু কোনো উটকো ও আয়াসসাধ্য ব্যাপার নয়। আর এটাও ইসলামে উন্নতির একমাত্র মাপকাঠিও না। যেটাকে প্রগতির ধ্বজাধারীরা ‘সংস্কার ও রক্ষণশীলতা’ বলেন। চিন্তকের দায়িত্ব হচ্ছে, সেগুলোর ঠিকুজি অনুসন্ধান করা। কিছু সংস্কার সংস্কৃতি, কিছু রক্ষণশীলতা বিশেষ সমাজের বৈশিষ্ট। আমেরিকার বিপুল অংশ এক অর্থে রক্ষণশীল। প্রগতিশীল বলে যারা পরিচিত তারাও নানা সংস্কার নিয়ে বাঁচে। উন্নতি-পশ্চাদপদতা, যুক্তি-বিশ্বাস, বুদ্ধি-আবেগ এই বাইনারি সৃষ্টি করা হয় যেটা আবার ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্টের একরৈখিক উপলব্ধিজাত। এই বাইনারির প্রথম পক্ষ নিজেদেরকে প্রগতিশীল ডাকে, এবং এটাকেই সর্বজনীন ভাবে। মনে রাখতে হবে, তথাকথিত প্রগতিশীলরাই বিশ্বাসীদের গাল দেয় মৌলবাদী বলে, উন্নতি বলতে তারা শুধু বুদ্ধির উন্নতিই বোঝে। আমি প্রগতিশীল বলে যা কিছু পরিচিত সেগুলোকে প্রশ্ন করি।

কুপমণ্ডুকতা, নিজের জানাকে প্রশ্ন না করা, অপরকে অপরের জায়গা থেকে বুঝতে চেষ্টা না করা, নিজের চিন্তায় অপরের অস্তিত্ব ও ভাবনাটুকু না রাখা তথাকথিত প্রগতিশীল ও কিছু কিছু ধার্মিকেরও মূল বৈশিষ্ট্য। আমার লক্ষ্য উভয়েরই পর্যালোচনা। আরেকটি কথা, বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনায় ধৈর্য রাখতে হয়। তাড়াহুড়ো করে আজকেই এই টেবিলেই সব চিন্তার সংকট আমারা সুরাহা করে ফেলবো, এমন চাঞ্চল্য জ্ঞানের ও প্রজ্ঞার পথে বিঘ্ন। তাই পাঠ ও পর্যবেক্ষণ জারি রাখা প্রয়োজন। লোকে প্রশ্ন করতে যত আগ্রহী, উত্তর খোঁজার শ্রমে ততটা আগ্রহী নয়।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক

ধারাবাহিক