নাঈমুল ইসলাম খান

নাঈমুল ইসলাম খান

‘তোমার বউ-ভাগ্যতো ঈর্ষণীয়!’

সাঈফ ইবনে রফিক

প্রকাশিত : অক্টোবর ০৭, ২০১৯

২০০৭ সালের ২৩ জুন।
আগের দিন বিয়ে হয়েছে। বাসায় অনেক মেহমান। আমার ফোন নিয়ে খালারা কথা বলছেন অন্যান্য আত্মীয়দের সাথে। এমন সময় বারবার ফোন করে বিজি পেয়ে ম্যাসেজ করলেন পার্থ তানভীর নভেদ ভাই। কাল চ্যানেল আইয়ে জয়েন করতে হবে।

ম্যাসেজ পেয়ে পার্থদাকে ফোন দিলাম। বললাম, আমি বরিশাল। গতকাল বিয়ে করলাম। ঢাকা ফিরতে দু-চারদিন লাগবে। ১ আগস্ট থেকে আমাকে পাবেন চ্যানেল আইয়ে।

ঢাকা আসলাম। চ্যানেল আইয়ে জয়েন করলাম। সাত-আটদিন কাজ করে পরিস্থিতি বুঝে গেলাম দৈনিক আমাদের সময়ে। সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খান অভিনন্দন জানালেন। না, চ্যানেল আইয়ের খবর তিনি তখনও জানেন না। অভিনন্দনটা বিয়ের। অভিনন্দনের রেশ কাটতে না কাটতেই বললাম, নাঈম ভাই, কাহিনিতো আরো আছে! আমিতো চ্যানেল আইয়ে জয়েন করে ফেলেছি।

হাসিমুখে নাঈম ভাই বললেন, তোমার বউ-ভাগ্যতো ঈর্ষণীয়! দাম্পত্য জীবনের শুরুতেই চমক।
মিষ্টি আনালেন। গোটা অফিসকে নিজের খরচে মিষ্টিমুখ করালেন।
বললাম, নাঈম ভাই, কাহিনিতো আরো আছে।
এবার প্রিয় সম্পাদক বললেন, কী?

বললাম, বিয়ের জন্য যে ২০ হাজার টাকা অ্যাডভান্স নিয়েছিলাম, সেটা আমি ফেরত দেব না। আপনার উপহার হিসেবে সংসারের কাজে লাগাবো।
স্বভাবসুলভ অট্টহাসি দিয়ে নাঈম ভাই বললেন, ঠিক আছে। একাউন্টসের কামরান ভাইকে ডেকে বললেন, ওর অ্যাডভান্সটা রিটেন অফ।

দৈনিক আমাদের সময়। যেখানে আড়াই বছরের মতো কাজ করেছি। ছয় হাজার টাকা বেতনে জয়েন করার পর আড়াই বছরে আমার বেতন দ্বিগুণ হয়েছে। মিডিয়া নামের একটা ব্যতিক্রমী পৃষ্ঠা চালাতাম। সাব-এডিটর, সিনিয়র সাব-এডিটর এরপর পদোন্নতি পেয়ে অ্যাসিসটেন্ট নিউজ এডিটর। এমন হোমলি পরিবেশে অফিস আজও পাইনি। সেন্ট্রাল রোডের অফিসের বাইরে যখন ঘনবর্ষায় পানি জমে থাকতো, থ্রি-কোয়ার্টার পড়েই অফিসে ঢুকে পড়তাম।

বাংলা মোটরে বহুতল ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ডের অফিসে বসে নোয়াম চমস্কি বা রবার্ট ফিস্কের কলামের বাংলা লিখতে লিখতে কখন যে কীবোর্ড হাটুর ওপর চলে আসতো, কখন যে আমার পা চলে যেত টেবিলের ওপর, তার ঠিক ছিল না। একদিন ভোরে গভীর মনোযোগে একটা কলাম অনুবাদ করছি। এমন সময় পায়ের আওয়াজে পিছে ফিরে দেখি নাঈম ভাই পায়চারী করছেন। দ্রুত পা ডেস্ক থেকে নামালাম। নাঈম ভাইয়ের বকার জন্য অপেক্ষা করছি, এমন সময় ভাই বললেন, সরি, তোমার মনোযোগ ভাঙার জন্য আমি দুঃখিত। আমারই সাবধানে পায়চারি করা উচিত ছিল।

বাংলাদেশের সেরা সম্পাদকের কাছ থেকে শিখলাম, কিভাবে অনুজদের কাছ থেকে কাজ আদায় করে নিতে হয়!

নাঈম ভাই সাংবাদিক ঠকান, কম বেতন দেন; এ সব অভিযোগ যেমন দশকের পর দশক ধরে শুনে আসছি; তেমনি তার কোনো প্রজেক্টে তরুণ সাংবাদিকের ঘাটতিও দেখিনি। তার সাথে কাজ করা লোকের অভাব নেই। যে যখনই বিপদে পড়েছে, তিনি আশ্রয় দিয়েছেন। আরেকটা বিষয় পরিষ্কার, নাঈম ভাই আমাকে কখনো ঠকাননি। বাজারদরের চেয়ে বরং বেশিই দিয়েছেন। বেতনে পোষাচ্ছে না বলে এনজিওর খ্যাপ ম্যানেজ করে দিয়েছেন। আমি জানি, গভীর সংকটে পড়লে এখনও তিনি আমাকে সাহায্য করবেন।

সম্প্রতি এক সাংবাদিক তার বিরুদ্ধে অফিসে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ এনেছেন। একটা সাংবাদিক সংগঠনে নালিশও গিয়েছে। সেই ঘটনার সাথে এই লেখাটার কোনো সম্পর্ক নেই।

ধারাবাহিক