দ্য নরটন এনথোলজি অব পোয়েট্রি

কাজল শাহনেওয়াজ

প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৯

১৯৮৪ সালের দিকে হবে। ময়মনসিংহে একটা অনুষ্ঠানে মঞ্চের সাইড থেকে উপস্থাপনা করছিলাম। আমার সাথে ছিল একজন ধারালো চেহারার চশমাওয়ালি। খুব ধীর স্থির। উচ্চারণ স্পষ্ট ও ক্রিসপি, শব্দগুলি সুরেলা হয়ে কানে ঢুকে গেলেও শেষে একটা ধানের খোসার মতো খসখসে অনুভূতি দেয়। এই শহরে এমন কণ্ঠস্বর আমি তেমন শুনি নাই আগে। তসলিমা নাসরিন নামের এক তরুণ কবির সাথে উপস্থাপনা করেছি, কিন্তু শে ছিল আবেগী। বিশেষণে ভরে তুলতো ঘোষণা। যাকে পছন্দ হতো তার নামের গুণগানে মৌ মৌ করতো হলঘর। যেমন অভিনেতা গোলাম মোস্তফাকে উপস্থাপন করতে গিয়ে বলেছিল, ‘যার কণ্ঠে ভর করে ঈশ্বর’ বা এরকম কিছু। মানে খুব বেশি অতিশয়োক্তি আরকি। লোকজন ক্ষেপে যাচ্ছিল, দ্রুত মাইক ধরে ম্যানেজ করতে হয়েছিল।

কিন্তু শিরিন ছিল শান্ত স্থির। তেমন বিশেষণ নাই, কিন্তু মাঝে মাঝেই দু’এক লাইন ফৃ বর্ণনা দিয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করছিল। ওর কণ্ঠ প্রক্ষেপণই ছিল বিশেষ। অনুষ্ঠান শেষে তাকে প্রশংসামূলক কিছু একটা বলতেই বলল, আচ্ছা, তাহলে তো আপনাকে আমন্ত্রণ জানাতে হয়, পরশু সন্ধ্যায় আসেন না মুকুল নিকেতনে। আমার পারফর্মেন্স আছে! উচ্চাঙ্গ সংগীতের।

সন্ধ্যা না, একটু রাতেই, যখন অনুষ্ঠান নিবু নিবু, শিরিন কিছু একটা গাইল। প্রথম সেকেন্ডেই বুঝতে পারলাম, ব্যাপক শিখে আসা কণ্ঠ। আমি ক্লাসিক্যাল শিখে আসা কোনও তরুণীকে আগে এত কাছ থেকে দেখি নাই। তার গলার মডুলেসন আর দরদ খুব আছে, যদিও দম কিছুটা ক্লান্ত!

আমাদের বেশ ভাব হয়ে গেল। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র আমাকে ফোন নম্বর দিয়ে বলল, ভাবি ধরবে, জেরায় টিকতে পারলে আমাকে পাবেন!
মানে!
আমার ফোন ধরা বারণ।
বুঝতে পারলাম, সাহিত্যের ছাত্রীর নানা রকম ছলাকলা থাকতেই পারে। আমি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিফোন একচেন্জে বসে অপারেটরের সাথে বিকেলবেলা গল্প করি, আর মাঝে মাঝে শিরিনকে ফোন করবো বলে ভাবি। তারপর একদিন ফোন করি।

শিরিনদের বাসাটা এরকম শহরের তুলনায় বেশ। দোতলা মনে হয়, কারণ লিভিং থেকে একটা সিঁড়ি উঠেছে দেখা যায়। ঘরের ছাদের দিকে দেয়ালে মাউন্ট করা শিংসহ হরিণের মাথা। আলমারি ভর্তি বই। ওর প্রিয় কবিদের মধ্যে আমেরিকান হার্ট ক্রেন শুনে আমি তো মুর্ছা যাচ্ছিলাম। কারণ ক্রেনের কয়েকটা মাত্র কবিতা পড়েছিলাম। আর তাতেই তার প্রতি আমার মুগ্ধতা ছিল অনেক।

শিরিন ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। একদিন একটা ঢাউস সাইজের বই আমাকে দিয়ে বলে, দ্যাখো তো, বইটা কেমন? দ্য নরটন এনথোলজি অব পোয়েট্রি। খুলে দেখি, বাহ, এ যে দেখি খনি! যদিও টেক্সট বই, কিন্তু খুব যত্ন করে প্রায় দুই হাজার কবিতার বিশাল সংকলন এটা। আমার অনেক প্রিয়, চেনা-অচেনা কবির কবিতা রয়েছে। আমি তো আনন্দে বইটাকে ধরেই রাখি।

ও বলে, কি, পড়তে চাও?
অবশ্যই। আচ্ছা।
এই বইটা থেকেই কবিতা টুকে নেই আমি, আর রেললাইনের উপর হেঁটে হেঁটে পড়ি।

আমি বললাম, বইটা দিচ্ছ তো, সময় লাগবে কিন্তু ফেরৎ দিতে।
ও বলে, নিশ্চয়ই। পড়তে থাকো, যতদিন লাগে।
আমি বললাম, এরকম বই তো অনিঃশ্বেষ্য। কতদিন যে লাগে! ততদিন তো তোমার সাথে যোগাযোগ নাও থাকতে পারে।
ও বলে, তা হোক। সেটা তো ভবিতব্য!

লেখক: কবি ও কথাসাহিত্যিক

ধারাবাহিক