করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ২৪৬৬৭৪ ১৪১৭৫০ ৩২৬৭
বিশ্বব্যাপী ১৮৭২০৪৭৩ ১১৯৩৬৪১৭ ৭০৪৬৪৫

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব প্রকাশনা বিভাগ: জ্ঞানচর্চার পথে একধাপ

জগলুল আসাদ

প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ০৪, ২০১৯

প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েরই থাকা উচিত তার নিজ নামে পরিচালিত একটি প্রকাশনা সংস্থা। পশ্চিমের উল্লেখযোগ্য সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন প্রকাশনা সংস্থা আছে। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরও এমন এক প্রকাশনা সংস্থা ছিল একদা! উহা এখন পঙ্গুপ্রায় ও শয্যাশায়ী! অন্য বিশ্ববিদ্যালয়েরও নাই বলেই জানি।

পশ্চিম থেকে আমরা তো অনেক কুকথা-কুকাজ শিখি। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত প্রকাশনা সংস্থা থাকার এই ভালো ঐতিহ্যটা কেন বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গ্রহণ ও কার্যকর রাখছে না, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃত লক্ষ্যই হচ্ছে জ্ঞানবিস্তার ও গবেষণা? তবে এ কথাও মনে রাখা দরকার যে, পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ও পদ্ধতিতে জ্ঞানচর্চার রয়েছে শত শত বছরব্যাপী ঐতিহ্য। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন সবচেয়ে পুরনো প্রকাশনা হচ্ছে ক্যাম্ব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস যা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৫৩৪ সালে। অর্থাৎ ৪৮৪ বছর আগে। অজস্র গুরুত্ববহ প্রকাশনা আছে এ প্রতিষ্ঠানের। বাইবেলের অথরাইজড ভার্সন ও নিউভার্সনসহ ক্যাম্ব্রিজ মডার্ন হিস্ট্রি নামক সুবিখ্যাত প্রকাশনায় এ প্রেসের নাম জড়িয়ে আছে। শেক্সপীয়ারের কমপ্লিট ওয়ার্ক্স ও ভাষ্যসহ নানা রচনার সংস্করণ বের হয়েছে এ প্রকাশনা থেকে।

আইনস্টাইন ও আর্নেস্ট রুদারফোর্ডের বই প্রকাশ করত ক্যাম্ব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস। ১৮৯৩ সালে এ প্রেস জার্নাল প্রকাশ শুরু করে, ও এখন এখান থেকে বের হয় প্রায় ৩০০ জার্নাল। ১৫৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস। এটা ৪৩২ বছর আগের কথা। অক্সফোর্ড ইংলিশ অভিধানসহ বিজ্ঞান ও সমাজতত্ত্বের অসংখ্য আকরগ্রন্থ প্রকাশ করে বিশ্বময় খ্যাত হয়েছে এ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। অক্সফোর্ড ইউনিভারসিটি প্রেস এ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগ এবং এখানে কর্মরত আছেন ১৫ জন একাডেমিসিয়ান, যারা ডেলেগেটস অব দ্য প্রেস নামে পরিচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইসচ্যান্সেলর এই একাডেমিক্সদের নিয়োগ দিয়ে থাকেন।

যাহোক, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসের শাখাও আছে। ইউনিভারসিটি অব শিকাগো প্রেস পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ একাডেমিক পাব্লিশার। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৯১ সালে। ইতিহাস, ভাষাতত্ত্ব, রাজনৈতিক দর্শন ও সাহিত্যতত্ত্বের অজস্র গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশিত হয় শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। আমেরিকান ইংরজিতে বাইবেলের অনুবাদ ও গ্রীক ট্রেজেডিগুলোর অনুবাদ এ প্রকাশনা সংস্থাকে খ্যাতিমান করে তোলে। বিশেষত রিচমন্ড লাটিমোরের হোমারের ইলিয়াড অনুবাদ বিশ্বময় জনপ্রিয় হয়। এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনার তিনটি বিভাগ আছে: একটা হচ্ছে, পুস্তক বিভাগ, আরেকটি জার্নাল বিভাগ ও অপরটি হচ্ছে বিতরণ বা ডিস্ট্রিবিউশন বিভাগ। একাডেমিক লেখালেখির ক্ষেত্রে এ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক তৈরিকৃত সাইটেশন পদ্ধতি ‘শিকাগো ম্যানুয়াল’ গবেষক মহলে বেশ জনপ্রিয়।

পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসগুলোর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস থেকে যা যা জানা যায় তা হচ্ছে:

এক. বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শুধু পাঠদান করা নয়, জ্ঞানসৃষ্টি, গবেষণা ও তা বিতরণের প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজনও (যদিও টিচিং ও রিসার্চ য়ুনিভার্সিটি বলে পশ্চিমে আলাদা জাতের বিশ্ববিদ্যালয়ও ছিল, এবং এখন এ দুটোর সমন্বয়েই অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় গঠিত)।

দুই. এই প্রেসগুলোর  সবাই দেশিভাষায় গ্রন্থ প্রকাশ করেছে, ও অন্যভাষা থেকে কৃতবিদ্য অধ্যাপক দ্বারা বই অনুবাদ করে প্রকাশ করিয়েছে।

তিন. বাইবেলের অনুবাদ ও ভাষ্য প্রকাশ করেছে প্রায় সবগুলো স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়। তার মানে, জাতির ধর্মপ্রশ্ন নিয়েও বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণা করতে হয়, প্রকাশনা হাজির করতে হয়

চার. নিজ দেশের ভাষার অভিধান প্রণয়নসহ ভাষার প্রকাশক্ষমতা পরীক্ষা ও বিকাশের জন্য গবেষণাকর্ম প্রকাশ করেছে।

পাঁচ. নিজ দেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করে অধ্যাপকবৃন্দের একের পর এক গ্রন্থ প্রকাশ করেছে এই প্রকাশনালয়সমূহ। যেহেতু নাম বিশ্ববিদ্যালয়, তাই বৈশ্বিক কিছুই এর আওতা বহির্ভূত নয়। ভিনদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, রাজনীতি-অর্থনীতি নিয়েও বই প্রকাশ করা হতে থাকে।

ছয়. জাতির মনন ও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা গঠনে ভূমিকা রাখে প্রধানত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকবৃন্দের পুস্তকাদি।

সাত. বিশ্ববিদ্যালয়ে উৎপাদিত জ্ঞান ও গবেষণার সহায়তা নিয়ে রাষ্ট্র তার নানামুখী উন্নয়ন নীতি গ্রহণ করতে পারে। রাষ্ট্র গঠন-পুনর্গঠনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্ববহ। ইত্যাদি।

শত শত বছর ধরে রচিত হয়েছে ইউরোপের ও আমেরিকার প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যম ও ভিত। সেখানকার প্রায় সব বিদ্যাপীঠই পশ্চিমা জ্ঞানচর্চার পোক্ত ঐতিহ্যের ভিতের উপর দাঁড়ানো। আমাদের দেশে দু`চারটি তত্ত্বীয় বই পড়েই যে হামবড়া ভাব নেয়া যায়, একাডেমিসিয়ানরা যে-আবেগ দিয়া কথা বলেন, আর অধ্যাপকবৃন্দ যে রাজনীতিবিদদের মতো বুলি ঝাড়েন, তার কারণও কিন্তু ওই জ্ঞানচর্চার পোক্ত ঐতিহ্যের অভাব। জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য সৃষ্টিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে দীর্ঘযাত্রা দরকার তার সূত্রপাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব প্রকাশনা বিভাগ।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক