করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ১৮৬৮৯৪ ৯৮৩১৭ ২৩৯১
বিশ্বব্যাপী ১৩২৪৯৫৭৫ ৭৭১৮৩০৭ ৫৭৫৮৪৪

লোকে যাতে আমাকে কবি না বলে, সেটা আমি চাইতাম

মাহবুব মোর্শেদ

প্রকাশিত : জানুয়ারি ১৩, ২০২০

১৯৯১ বা ৯২ সালের ঘটনা হবে। আমরা তখন দিনাজপুরে থাকতাম। সেতাবগঞ্জ নামের এক মফস্বল শহরে। তখন বিশ্বের নানাস্থানে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠছে। যুদ্ধের ভয়াবহতা নিয়ে আমি একটা কবিতা লিখেছিলাম। নাম, এ কীসের শব্দ। তখন আমার বয়স ১৪ কি ১৫ হবে। পত্র-পত্রিকার লোকজনকে চেনার প্রশ্নই আসে না। সেতাবগঞ্জ থেকে যোদ্ধা নামে একটা সাপ্তাহিক বা পাক্ষিক প্রকাশিত হতো। আব্বা আমার কবিতা সে পত্রিকায় দিয়েছিলেন। পত্রিকায় ছাপা হয়ে যেদিন কবিতাটা আমার হাতে এলো, সেদিন আমাদের পাশের বাসার ছাদে পিকনিক হচ্ছিল। পিকনিকের ডামাডোলের মধ্যে পত্রিকাটা নিয়ে যখন গেলাম, তখন সবাই অবাক হয়ে গেল। আমার কবিখ্যাতি বেশ ছড়িয়ে পড়লো। আমি ভেতরে ভেতরে একটা শিহরণ অনুভব করছিলাম। সম্ভবত এ ঘটনার বছর দুয়েক আগে জীবনের প্রথম কবিতাটি আমার কাছে আসে।

১৫ বছর বয়সে আমি গল্প লিখতেও চেষ্টা করেছি। তখন সেবা প্রকাশনীর গোয়েন্দা গল্প ও সেবা ক্ল্যাসিক পড়তাম। রবিনসন ক্রুসোর গল্প পড়ে আমিও একই ধরনের একটা গল্প লেখার চেষ্টা করেছিলাম বলে মনে পড়ে। এরও বছর দুয়েক পর ১৯৯৪ সালে আমি কুষ্টিয়ায় গিয়ে প্রথম একটা গল্প লিখি। গল্পটা আর কারো অনুকরণে নয়। আমার জানা একটা কাহিনিকে সম্পূর্ণ উল্টে দিয়ে লেখা ওই গল্পটার নাম ছিল, তরুলতা। তরুলতা এক নারী। যে মুসলিম এক ছেলেকে বিয়ে করে ঘর ছেড়েছিল। সে ছেলের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় বাপের বাড়ি ফিরছে। তার মনে নানা ক্রাইসিস। ট্রেনে ফেরার সময় কথকের সঙ্গে তার দেখা হচ্ছে।

গল্পটা লিখে ফেলার পর আমার মনে হয়, আমি মূলত গল্পকার হবো। তখন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আমার খুব প্রিয় ছিলেন। আমি মানিকের মতো হতে চাইতাম। আমার মনে হতো, কুড়ি বছর বয়সের পর আমাকে দিবারাত্রির কাব্যের মতো একটা উপন্যাস লিখে ফেলতে হবে। মানিকের ব্রণ ও বসন্ত খচিত পোড়ো মুখায়বব আমার ভালো লাগতো। আমি ভাবতাম, ওরকম চেহারা আমার হলে মন্দ হয় না।

যাই হোক, আমার প্রথম বই প্রকাশিত হয় ২৯ বছর বয়সে। আমি খুব আর্লি লেখা শুরু করেছি। সে হিসেবে প্রথম বই ২৩ না হোক ২৫ বছরে প্রকাশিত হলে ভালো হতো। প্রথম বই প্রকাশ করার সময় অনেক গল্প আমার হাতে ছিল। প্রথম দিককার গল্পগুলো বাতিল করেও ৩১টি গল্প আমার হাতে ছিল। সেগুলো থেকে ১১টি গল্প বেছে নিয়ে ‘ব্যক্তিগত বসন্তদিন’ করি। বাকি গল্পগুলো ফেলে দেইনি। কোথাও না কোথাও রয়ে গেছে।

আমি সচেতনভাবে কবিতার থেকে ফিকশনকে গুরুত্ব দিলেও কবিতা আমাকে ছেড়ে যায়নি। এটা একটা রহস্য। জীবনের নানা সময়ে কবিতা আমাকে সংক্রামিত করে। ফলে গোপনে আমি কবিতাও লিখে চলেছি। সে হিসেবে কবিতার বইও প্রথম বই হতে পারতো আমার। কিন্তু লোকে যাতে আমাকে কবি না বলে সেটা আমি সচেতনভাবে চাইতাম। কেননা, কবি বলার মধ্যে একটা তীব্র পরিহাস ও তীক্ষ্ণ ঠাট্টা শুনতে পেতাম।

এত বছর পর আমি প্রথম কবিতার বই করছি। প্রথম গল্পের বইটা নতুন করে প্রকাশিত হচ্ছে। আর একটা রহস্যোপন্যাসও প্রকাশিত হবার উপক্রম হয়েছে। সব মিলিয়ে ২০২০ সালকে একটা পুরনো দিনের বছর বলে মনে হচ্ছে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও গণমাধ্যমকর্মী