ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

মহাকালে রেখাপাত

পর্ব ১

স্বকৃত নোমান

প্রকাশিত : নভেম্বর ০৬, ২০১৯

কাল থেকে শুরু হচ্ছে ঢাকা লিটের‌্যারি ফেস্টিভ্যাল বা ঢাকা লিট ফেস্ট। ইতোমধ্যে ধোলাইপর্ব শেষ হয়েছে। ধোলাইপর্ব কী জিনিস বুঝলেন তো? প্রতিবছরই লিট ফেস্ট শুরু হওয়ার আগে এর সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠেন একদল লেখক। আগে বেশি ছিল, এখন কিছুটা কমেছে। সমালোচনার কিছু উদহারণ দেয়া যাক—

১. লিট ফেস্ট বড়লোকদের সাহিত্য উৎসব,
২. সাহিত্যের নামে এই বিপুল অপচয়, হায়!
৩. এই ফেস্ট একটি নব্য-উপনিবেশবাদী প্রচেষ্টা। ব্যক্তিস্বার্থ ও গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষা করতে জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে বাংলাদেশের বুকে তারা উত্তর-ঔপনিবেশিক প্রভাব বইয়ে দিতে চায়।
৪. শুরু হচ্ছে অলেখকদের সাহিত্য উৎসব।
৫. লিট ফেস্ট সাহিত্যের নামে একটি ধান্দাবাজির অনুষ্ঠান।
৬. লিট ফেস্টে ইভেন ম্যানেজমেন্টের নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

...এগুলো হচ্ছে মোটাদাগের অভিযোগ। আরো অভিযোগ আছে, সবগুলো এখন মনে পড়ছে না। এই যে লিট ফেস্টকে বড়লোকদের সাহিত্য উৎসব বলা হচ্ছে—এর মানেটা কী? বড়লোক-ছোটলোক ব্যাপারটা আসলে কী? ধরে নেওয়া যাক, যাদের টাকাপয়সা আছে তারা বড়লোক, আর যাদের নেই তারা ছোটলোক। বড়লোক কারা? এই যেমন ধরুন লিট ফেস্টের পরিচালক আহসান আকবর, কাজী আনিস আহমেদ, সাদাফ সায্ বা ডেইলি স্টারের মাহফুজ আনাম, বেঙ্গলের আবুল খায়ের লিটু প্রমুখ। আর ছোটলোক হচ্ছে করিমুদ্দি, রহিমুদ্দি, গণেশ, রাখাল, মফিজ মিয়া, ছলিম মিয়া, নারায়ণ দাস প্রমুখ।

প্রশ্ন হচ্ছে, সাহিত্য ব্যাপারটা কবে ছোটলোকদের ছিল? মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যে পদ্মানদীর মাঝি লিখলেন, তা কি কেতুপুরের জেলে-মালোরা পড়ে দেখেছে কোনোদিন? অদ্বৈত মল্লবর্মণ যে তিতাস একটি নদীর নাম লিখলেন, তা কি তিতাসপাড়ের জেলেরা পড়েছে? রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে সমকালীন কবি-লেখকরা যেসব সাহিত্য সৃষ্টি করছেন, তা প্রান্তের ‘ছোটলোক’ করিমুদ্দি, রহিমুদ্দি, গণেশ, রাখাল, মফিজ মিয়া, ছলিম মিয়া, নারায়ণ দাসরা কোনোদিন পড়েছে? এই কথিত ‘ছোটলোকরা’ কি সাহিত্য আদৌ পড়ে? পড়লে তো ১৬ কোটি মানুষের দেশে মানিকের পুতুলনাচের ইতিকথা, জীবনানন্দের শ্রেষ্ঠ কবিতা, ইলিয়াসের খোয়াবনামা, সৈয়দ হকের দ্বিতীয় দিনের কাহিনি, নির্মলেন্দু গুণের কবিতাসমগ্র, হাসান আজিজুল হকের গল্পসমগ্র, শহীদুল জহিরের জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা অন্তত ১৬ লাখ কপি বিক্রি হওয়ার কথা। তা কি হয়েছে, হচ্ছে? না হলে সাহিত্য কার জন্য? এর ভোক্তারা সমাজের কোন শ্রেণির মানুষ?

নাকি ছোটলোক বলতে আমার মতো গৌণ লেখকদের বোঝানো হয়, যারা শাহবাগের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াই, বাসে ঝুলে ঝুলে ঘেমে-নেয়ে বাসায় ফিরি, একটা বডি স্প্রের অভাবে প্রেমিকারা সহজে কাছে ঘেঁষতে চায় না, একটা চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরি, কবিতা-গল্প ছাপার জন্য সাহিত্য সম্পাদকদের টেবিলে টেবিলে ধর্ণা দেই, বেনসন খেতে না পেয়ে স্টার সিগারেট খাই, স্কচ হুইস্কি খেতে না পেয়ে কেরু খাই, সোনারগাঁও-ইন্টার কন্টিনেন্টালে যেতে পারি না বলে সাকুরা-পিককে যাই, একটুখানি সুযোগ-সুবিধা বাগানোর জন্য সিনিয়র লেখকদের তোয়াজ করি, দেশি মুরগির বদলে ব্রয়লার খাই, স্যু পরতে পারি না বলে বাটা-এপেক্সের স্যান্ডেল পরি—আমরা হচ্ছি ছোটলোক। সাহিত্যের কাৎলাহার বিল কেবল আমাদেরই ইজারা নেওয়া, এই বিলে আর কারো নামা বারণ। নামলে মুনশি বয়তুল্লাহ পান্টি দিয়ে পিটিয়ে মারবেন। তিনি না মারলে আমরাই ঠ্যাং ভেঙে দেব। ছবির হাটে, পাবলিক লাইব্রেবি চত্বরে, জাতীয় জাদুঘর বা বাংলা একাডেমির হলে, আজিজ মার্কেটের কোনায়, কনকর্ড মার্কেটের চিপায়, পাঠক সমাবেশ, দীপনপুর বা কবিতা ক্যাফের কর্নারে আমরা সাহিত্য উৎসব করতে পারব, এর বাইরে আর কেউ করতে পারবে না, করলে সেটা অপচয় হবে, অনৈতিক হবে, ধান্দাবাজি হবে, ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থ রক্ষা হবে, কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ব্যাপার হবে। ব্যাপারটা কি তাই? কে সাহিত্য করতে পারবে, আর কে পারবে না, তা কি আমি ঠিক করে দিতে পারি? এই অধিকার কি আমার আছে?

এবার আসা যাক সাহিত্যের নামে ‘বিপুল অপচয়’ প্রসঙ্গে। আচ্ছা, আপনার পকেট থেকে টাকা ছিনিয়ে এনে কি লিট ফেস্টে অপচয় করা হচ্ছে? আহসান আকবর, কাজী আনিস আহমেদ, সাদাফ সায্-এর টাকা আছে, তারা লিট ফেস্ট করছেন। এই ধরনের আয়োজনে বহির্বিশ্বে দেশের সুনাম হয় বলে সরকারও কিছু অর্থসাহায্য দিচ্ছে (সম্ভবতি এক কোটি টাকা। সঠিক অংকটি জানি না)। এখানে এসে আপনি প্রশ্ন তুলতে পারেন, জনগণের এক কোটি টাকাই-বা সরকার এভাবে অপচয় করবে কেন?

আপনার প্রশ্নের পিঠে আমার একটি প্রশ্ন আছে। সেটি হচ্ছে, দেশে কত অপচয়ই তো হচ্ছে। কোথায় অপচয় নেই? রাষ্ট্র নিজেই তো অপচয়কারী একটি প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্র পরিচালনার নামে কোটি কোটি টাকা অপচয় হয়ে যাচ্ছে। মানুষ মারার অস্ত্র কেনার জন্য যে পরিমাণ অর্থের অপচয় হচ্ছে তার সিকিভাগের একভাগও তো সারা জীবনে আমি উপার্জন করতে পারিনি, বাকি জীবনেও পারব না। শুধু চিত্তবিনোদনের জন্য মানুষের অপচয় কি কম? ধর্মের নামে অপচয়ের কথা না হয় থাক। গুলশান, বনানী, বারিধারা ও ধানমণ্ডিতে প্রতিদিন যে পরিমাণ অপচয় হচ্ছে, তা দিয়ে একটা বিশাল জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক মুক্তি আনা সম্ভব। শহরের রাস্তায় এই যে শত শত প্রাইভেট কার চলছে, তার মধ্যেও কি অপচয় কম? একটা মানুষকে, শুধু একটা মানুষকে বহন করার জন্য হাজার হাজার টাকার তেল পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। টেলিভিশনগুলোও কি অপচয় করছে না? দেশে এত এত টেলিভিশন, ক’টা দেখে মানুষ? প্রতিদিন এত এত পত্রিকা বেরুচ্ছে, ক’টা পড়ে মানুষ? এত এত রেডিও, ক’টা শোনে মানুষ? একটা পুকুর একবার কেটে আবার ভরাট হচ্ছে, আবার কাটা হচ্ছে আবার ভরাট হচ্ছে—অপচয়ের এই কাহিনি তো আমরা জানি। বালিশ কেনার নামে, পর্দা কেনার নামে কোটি কোটি টাকা যে হাওয়া করে দেয়া হচ্ছে, সেই খবরও তো খবরের কাগজের সুবাদে কমবেশি জানি। সেক্ষেত্রে ‘বড়লোকদের সাহিত্য উৎসবে’ যদি সরকার এক কোটি টাকা অনুদান দেয়, তাতে অসুবিধাটা কোথায়? কী এমন ক্ষতি হয়ে যায়? এই টাকা দিয়ে কি উৎসবপ্রাঙ্গণে জুয়া খেলা হয়? ইয়াবা খাওয়া হয়? রেন্ডিবাজি করা হয়? যদি তা না হয়, তাহলে সমস্যাটা কোথায়?

আর, নব্য-উপনিবেশবাদী প্রচেষ্টা জিনিসটা কী? লিট ফেস্টের মাধ্যমে নব্য-উপনিবেশবাদ এসে আমার কী জিনিসটা হাইজ্যাক করে নিয়ে যাচ্ছে? নব্য উপনিবেশবাদ আমার উপর কী কী প্রভাব বিস্তার করছে? গত ক’বছর ধরে বিস্তর খুঁজেটুজেও এই প্রশ্নের সঠিক উত্তরটি পেলাম না। বরং আমার কাছে পুরো ব্যাপারটা ইতিবাচক মনে হয়। সারা বছর তো দেশের লেখকদের সঙ্গে চলি। বড়জোর পাশের দেশের ভারতের লেখকদের সঙ্গে মাঝেমধ্যে দেখাটেখা হয়। লিট ফেস্ট উপলক্ষ্যে পৃথিবীর নানা দেশের লেখকরা আসেন। এবার দেশ-বিদেশের দুই শতাধিক সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংবাদিক, সমাজ বিশ্লেষক আসছেন। গত বছর ১৫ দেশের দুই শতাধিক সাহিত্যিক, অভিনেতা, রাজনীতিক, গবেষক এবং বাংলাদেশের প্রায় দেড় শ লেখক, অনুবাদক, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ যোগ দিয়েছিলেন। লিট ফেস্ট উপলক্ষ্যে এই গুণীজনরা না এলে জীবনে হয়ত তাদের সঙ্গে দেখাই হতো না, তাদের কথা শোনা হতো না। তারা আসেন, সাহিত্য নিয়ে কথা বলেন, আমাদের দেশের লেখকরাও আসেন, সাহিত্য নিয়ে কথা বলেন। আর আসে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী। এই আসা-যাওয়া, দেওয়া-নেওয়ার মধ্য দিয়ে নব্য-উপনিবেশবাদ আমাদের কী ক্ষতিটা করছে? কী প্রভাবটা রেখে যাচ্ছে? আমি খুঁজে পাচ্ছি না। আপনারা কেউ পেলে জানাবেন। কৃতজ্ঞ থাকব।

যতি জানাতে না পারেন, তাহলে প্রশ্ন, লিট ফেস্টের বিরোধিতা কেন? এর কয়েকটি কারণ হতে পারে—
১. আমি একজন হীনম্মন্য মানুষ। আমার মস্তিষ্কজুড়ে নেতিবাচক চিন্তা। কোথাও ভালো কিছু দেখলেই আমার গা জ্বলে, চুলকায়। চুলকাতে চুলকাতে চামড়া তুলে ফেলি, তবু আমার শান্তি হয় না, তাই আমি লিট ফেস্টের বিরোধিতা করি।
২. আমি একজন কবি-লেখক, আমার বই-বিক্রি হয় দেড়-দু শ, বড়জোর পাঁচ শ, ফেসবুকে লাইক-কমেন্ট পড়ে পাঁচ-সাত শ, অথচ লিট ফেস্টে আমাকে আলোচক হিসেবে বা কবিতা পাঠের জন্য ডাকা হয় না, তাই আমি এই আয়োজনের বিরোধিতা করি।
৩. বিরোধিতা করে আমি আসলে আলোচনায় থাকতে চাই, নিজেকে ব্যতিক্রম চিন্তক, ‘প্রথাবিরোধী’ হিসেবে জাহির করতে চাই।
৪. আমি আসলে সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতি জ্ঞানহীন গবেট।
৫. আমি আসলে কী চাই, তা আমি নিজেই জানি না।

পরিশেষে, সাহিত্য-সংস্কৃতির যে কোনো উৎসব আয়োজনই সুন্দর, ইতিবাচক। সেই আয়োজন এলিটদের হোক বা হরিজনদের হোক, আশরাফদের হোক বা আতরাফদের হোক। আমি এলিটদের লিট ফেস্টে যেমন যাই, তেমনি যাই ছবির হাট-পাবলিক লাইব্রেরি-জাদুঘর-আজিজ-পাঠক সমাবেশ-দীপনপুর-কবিতা ক্যাফে-সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্র বা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ভবন কেন্দ্রিক সাহিত্যের অনুষ্ঠানগুলোতেও। যাই গ্রামবাংলার কবিয়ালদের কবিগানের আসরেও। আমি যেমন এলিটদের রবীন্দ্রসংগীত শুনি, তেমনি বাউলদের লালনগীতিও শুনি। শুনি হাছন-রাধারমণ-আরকুম-শাহ আবদুল করিমের গানও। সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক সকল উৎসব সমাজের জন্য ইতিবাচক। এসব উৎসব আরো বেশি বেশি হওয়া দরকার। তাতে আমাদের মগজে চেপে বসে থাকা হাজার বছরের অন্ধকারের ভূতটা পালালেও পালাতে পারে। আন্ধেলা কূয়া থেকে আমরা মুক্তি পেলেও পেতে পারি।

৬.১১.২০১৯

ধারাবাহিক