করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ১৫৬৬৯০৭ ১৫৩০০৮৩ ২৭৮০১
বিশ্বব্যাপী ২৪২৯৬৮৫৭৬ ২২০২১৪৯১৯ ৪৯৪০৭৪২

বিনয় মজুমদার: কবিতার বোধিবৃক্ষ

পর্ব ৪

মলয় রায়চৌধুরী

প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৯

দুই.
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে ব্রিটিশ সরকার, নিজেদের নিয়ন্ত্রণ তদানীন্তন বর্মায়, বর্তমানে মিয়ানমারে, প্রসারণ ঘটালে, নিজেদের সঙ্গে বহু বঙ্গভাষীকে টেনে নিয়ে যায়। প্রধানত সরকারি চাকরিতে ইংরেজির ব্যবহারে দক্ষ ঔপনিবেশিক শিক্ষায় সড়গড় কেরানি এবং জঙ্গলগুলো থেকে সেগুন ও অন্যান্য কাঠ কেটে সেগুলো রপ্তানির কাজে লাগাবার জন্য, স্বাস্থবান চাষিদের তুলে নিয়ে যায়, যারা কালক্রমে বন্দরশহর রেঙ্গুন বা য়াঙ্গন, এবং প্রাকৃতিক জঙ্গলে ঘেরা মান্দালয়ে বসতি স্থাপন করে। সেসময়ে নিম্নবর্ণের চাষিদের নমঃশুদ্র বলা হতো না, বলা হতো চণ্ডাল, উচ্চবর্ণের বাঙালিরা যাদের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকতো, তারা ছিলেন চতুর্বর্ণের বাইরে একটি অস্পৃশ্য বর্ণ। তখনকার পূর্ববঙ্গে চণ্ডাল বিদ্রোহের চাপে ১৯০১ এর আদমশুমারিতে ব্রিটিশ সরকার চণ্ডাল বর্গের পরিবারদের নমঃশুদ্র হিসাবে চিহ্ণিত করার হুকুম জারি করেছিল। বিনয় মজুমদারের বাবা ব্রিটিশ ভারতের পি ডাবলিউ ডিতে চাকরি করতেন এবং সেই সূত্রে মিয়ানমারে পোস্টেড ছিলেন। বিনয় মজুমদারের বয়স যখন সাড়ে সাত বছর তখন তারা মিয়ানমার ত্যাগ করে স্বদেশে ফিরতে বাধ্য হন।

পাঠক নিশ্চয়ই ভাবছেন যে, বিনয় মজুমদারের জীবন ও সাহিত্যে অবদান আলোচনা করতে বসে চণ্ডাল ও নমঃশুদ্রের প্রসঙ্গ কেন তুলছি। তার কারণ দুটি। প্রথম হলো এই যে, ইরেজরা মিয়ানমারের জঙ্গলের গাছকাটার জন্য এবং ধান চাষের জন্য প্রধানত বাঙালি নমঃশুদ্রদের ও অবাঙালি অন্ত্যজদের তুলে নিয়ে গিয়েছিল, ঠিক যেভাবে তারা ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ফিজি, মরিশাস ও লাতিন আমেরিকায় ভারতীয়দের জোর করে বা ফুসলিয়ে কায়িক শ্রমের জন্য তুলে নিয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয় কারণ হলো, বিনয় মজুমদারের কবিতায় তার চণ্ডাল বা নমঃশুদ্র হবার কথা বেশ কয়েকবার এসেছে। সম্ভবত তিনি আঁচ করেছিলেন যে, তার চেয়ে কম প্রতিভাবান উচ্চবর্ণের কবিদের ওপর প্রতিষ্ঠান আলো ফেললেও তাকে রেখে দিয়েছে অন্ধকারে। তার অসুস্থতার সংবাদ প্রচারের পরও তার কবিতায় এই প্রসঙ্গটি এনেছেন তিনি, এবং রামায়ণ রচয়িতা বাল্মীকি সম্পর্কে দুর্বলতার উৎসও হয়তো তার জন্মসূত্রের এই বোধ, আমার মনে হয়, কেননা সাধনা করার পর নারদ বাল্মীকিকে ঋষি ও ব্রাহ্মণ হিসাবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন, যদিও বিনয় বলেছেন যে ‘বাল্মীকি’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল বলে তার একটি বিতর্কিত বইয়ের নাম ‘বাল্মীকির কবিতা’।

সেই সময়ের মিয়ানমারে নিম্নবর্গের ভারতীয়দের বলা হতো ‘কা-লা’ অথবা ‘কা-লার’, তাদের ত্বক কৃষ্ণবর্ণের বলে। নিজের দেহত্বক সম্পর্কে সেনসিটিভ ছিলেন বিনয়। তিনি লিখেছেন, ‘সত্যব্রতর বাবাকে আমি দেখেছি/সত্যব্রতর বাবা-ই তখন রাজা/রাজা বলে যে দুধের মতন সাদা গায়ের রঙ, তা নয়/প্রায় আমার মতনই গায়ের রঙ।’ উল্লেখ্য যে, বিনয় মজুমদার সম্পর্কে পশ্চিমবাংলায় যারা কাজ করেছেন, তাদের বেশির ভাগই নিম্নবর্গের। বাংলাদেশের একটি পত্রিকার জন্য শামীমুল হক শামীম, অমলেন্দু বিশ্বাস, মানসী কীর্তনীয়া এবং মানসী সরকারকে ২০০১ সালে দেয়া সাক্ষাৎকারে বিনয় মজুমদারের সঙ্গে এই ধরণের প্রশ্নোত্তর হয়েছিল:

প্রশ্ন: আপনার পাণ্ডুলিপিখানা এখানে ছাপানোর ব্যবস্থা না করে ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের মিউজিয়ামে পাঠানোর উদ্দেশ্য কী? এখানে কি কোনও রহস্য আছে? কোনও গোপন ব্যাপার না থাকলে খুলে বলুন।
বিনয়: মূল উদ্দেশ্য— নমঃশূদ্র । আসল কথা হচ্ছে এটা। নমঃশূদ্র সমাজে তখন কবি বলে কেউ ছিল না। আমি প্রথম নমঃশূদ্র কবি। আমার কবিতা লিখতে বহু কষ্ট করতে হয়েছে। বহু অবহেলা সইতে হয়েছে। আমার বই কেউ ছাপতো না। প্রথম ছাপল মীনাক্ষী দত্ত, তার মানে জ্যোতির্ময় দত্তর বউ অর্থাৎ বুদ্ধদেব বসুর মেয়ে— ১৯৬৮ সালে। টাকা দিয়েছে মীনাক্ষী দত্ত নিজে। অথচ ‘ফিরে এসো, চাকা’ প্রথম ছাপা হয় ১৯৬২ সালে। তারপর, সেই নমঃশূদ্র বলে তো এখনও অবহেলা সইতে হচ্ছে।

প্রশ্ন: সেটা কি কবি-সাহিত্যিকদের কাছ থেকেও?
বিনয়: কবিদের কাছ থেকে, খবরের কাগজের কাছ থেকে, পত্রিকার কাছ থেকে, প্রকাশকের কাছ থেকে, অনুবাদকের কাছ থেকে, সমস্ত। দেখলাম ভেবে ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’টাকে বাঁচাতে হয়। আমার নিজের টাকায় তো ছাপা সম্ভব না। এত বড় বই, টাকা পাব কোথায়? আমার চাকরি তো নেই। সুতরাং পাঠিয়ে দিলাম ব্রিটিশ মিউজিয়ামে। থাকুক ওদের কাছে। ওদের কাছে থাকলে তবু একটা সান্ত্বনা থাকবে যে— আছে।

বিনয় মজুমদারের দুটি রচনা আমার চোখে পড়েছে। হয়তো আরও কয়েক জায়গায় লিখে থাকবেন মনের কথা, অভিমানের কথা, প্রথম কবিতাটিতে উচ্চবর্ণের কবিরা, যারা তাকে সাংস্কৃতিক রাজনীতির মাধ্যমে কোণঠাশা করে দিয়েছিল। তাদের তিনি বলছেন নাপিত, যে কবিরা শরীরের চুল কামিয়ে দ্যায় এবং চুগলি করে বেড়ায়। দ্বিতীয় কবিতাটি লেখার সময়ে তার মনে যে মাইকেলের উক্তি বিঁধেছিল, তা প্রকাশ হয়ে পড়ে, নয়তো সাধারণ পাঠকরা মধুসূদনের লাইন তিনটি মনে রাখবে না।

নাপিত বনাম নমঃশুদ্র

নাপিত উপরে নাকি নমঃশুদ্র সম্প্রদায় উপরে— এ কথা
যখন আলোচ্য হলো তখন কেবলমাত্র এই বললাম
সাহিত্য দিয়েও নয়, গোপাল ভাঁড়ের গল্প দিয়ে
নয়, রাজনীতি দিয়ে ভাবো। কতজন মন্ত্রী হয়েছে এ
নমঃশুদ্র সম্প্রদায়ে— তাই দিয়ে ভাবো।
নাপিতদের কেউ মন্ত্রী হতে পারেনি তো আর
বহু নমঃশুদ্র মন্ত্রী হয়েছে তো এ যাবৎ গুনে গুনে দ্যাখো।
এই রাজনীতি দিয়ে বোঝা যায় নমঃশুদ্র সম্প্রদায় নাপিতের উপরেই ঠিক।
                                ছোটো ছোটো গদ্য ও পদ্য (২০০৭) বই থেকে

সত্যব্রত ও আমি

কবি মধুসূদন দত্তের কবিতা:
চণ্ডালে বসাও আনি রাজার আলয়ে।
কিন্তু নহি গঞ্জি তেমা, গুরুজন তুমি
পিতৃতুল্য, ছাড় দ্বার, যাব অস্ত্রাগারে…’

মধুসূদন দত্ত এই কবিতা লেখার শ-খানেক বছর পরে:

মৈমনসিংহের রাজা সত্যব্রত চৌধুরী এবং চণ্ডাল আমি
এক ঘরের ভিতরে দুই বছর ছিলাম— ইডেন হিন্দু হোস্টেলে।
এইসব আমি ভাবি এবং অবাক হয়ে যাই।
সত্যব্রত ব্রেকফাস্ট খায় FIRPO হোটেলে।
এবং বর্তমানে ৭২ বছর বয়সে চা খাই তা সিনেমায়
তুলে নিয়ে গেছে ঢাকার মুসলমানরা। আমি
FIRPO রেস্তোঁরায় একবারই ব্রেকফাস্ট খেয়েছিলাম
সত্যব্রতর সঙ্গে।
          ছোটো ছোটো গদ্য ও পদ্য (২০০৭) বই থেকে চলবে