ধর্ম, রাষ্ট্র ও শরীরের তর্ক ‘দুধ, রক্ত ও নির্বাণ’
অচিন্ত্য অর্কপ্রকাশিত : নভেম্বর ০১, ২০২৬
বইয়ের প্রথম কবিতাতেই একটা ধুয়া আছে, তিনবার ফিরে আসে— ‘নীলাভ ব্যথায় কাতরাতে থাকা জীর্ণ যিশুর মুখ’। এই ধুয়া মাত্রা মেপে চলে না। তার জোর ফিরে আসায়। প্রতিবার ফেরার মাঝে কবিতা এক ধাপ করে নামে: সীনাই পাহাড়, তাওরাত, জাবুর, কুরুক্ষেত্র, শেষে কাবা। আর কাবার জায়গায় এসে কবিতা একটা সুন্দর উল্টো ঘোরায়—
মানুষ সেখানে তাওয়াফ করে না
শুধু নিজেদের স্বার্থকে কেন্দ্র বানিয়ে
ঘুরতেই থাকে, ঘুরতেই থাকে।
পবিত্র প্রদক্ষিণের শব্দ এখানে স্বার্থের চক্করে খরচ হয়ে যায়। তাওহীদাহ্ রহমান নূভের ‘দুধ, রক্ত ও নির্বাণ’ পড়ার আগে এটুকু জেনে রাখা ভালো যে, এই কবির কাছে ধর্মগ্রন্থ অলংকার নয়, তর্কের মঞ্চ।
বইয়ে আমি মাত্রাবৃত্ত বা অন্ত্যমিলের কোনো কবিতা পাইনি। ছন্দ এখানে অন্য জিনিস—পুনরাবৃত্তি আর সমান্তরাল বাক্য। ‘দুধ, রক্ত ও নির্বাণ’য়ে ‘নির্বাণ দেখলে চলবে না’ বাক্যটি শুরুতে আর শেষে একই ভঙ্গিতে ফেরে, মাঝখানে ‘বুদ্ধ হও, নারী’ ধুয়ার মতো দোলে। ‘যোনিতল-অধিষ্ঠিত শস্যসভ্যতার অন্ধ-উপাখ্যান’য়ের শেষ দিকে পাশাপাশি তিনটা ঘোষণা—
সেখানে ধর্ম নেই—সেখানে জীবন আছে।
সেখানে শাস্ত্র নেই—সেখানে শ্বাস আছে।
‘ক্ষতজীবী’তে গদ্যের ভেতর হঠাৎ বাইবেলি টান—‘তারা এলো এবং গান ধরল। তারা এলো এবং ডানা ঝাপটাল। তারা এলো এবং ঘর বানালো।’ এই ছন্দ কানে নয়, নিঃশ্বাসে ধরা পড়ে। তবে কিছু জায়গায় পুনরাবৃত্তি ক্লান্তিও আনে। ‘যোনিতল…’ লেখাটা প্রায় একই কথা দু’বার বলে, একবার গদ্যে, একবার ছোট পদ্যে।
নূভ শিরোনামে নিজের হাত পাকা দেখান। সবচেয়ে ভালো লেগেছে ‘নির্বাসিত মুকুলের শেষ সঞ্চয়পত্র’। ব্যাংকের শব্দ ‘সঞ্চয়পত্র’ প্রেমের পাশে বসে একটা অদ্ভুত বিষণ্ণতা তৈরি করে, আর ভেতরে সেই প্রেমকে বলা হয় এমন মূল্য, ‘যা বাজার জানে না’। ‘অ্যাস্ট্রাল হার্বেরিয়ামের ধূসর-সুবাস তত্ত্ব’য়ে নক্ষত্র আর শুকনো ফুলের সংগ্রহশালা একসঙ্গে বসেছে, মনে হয় স্মৃতিকে চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে।
‘শিমুল-যোনীর লাল আগুনে কামের সন্ন্যাস-সূত্র’ এক নিঃশ্বাসে আগুন, শরীর আর বৈরাগ্য এনে হাজির করে। ‘অর্ঘ্য ও মরিচীকা’র দুটো শব্দই জলহীন প্রাপ্তির কথা বলে। উল্টো দিকে ‘শেকড়ছিন্ন পাতার মৃত্যুঞ্জয়-সিদ্ধান্ত’ আর ‘অ্যান্টিমেট্রিক শোকের অক্ষাংশহীন মহাদেশ’ একটু বেশি পাণ্ডিত্যের ভার বয়, শিরোনামের তুলনায় ভেতরের লেখা সহজ।
বইয়ের সবচেয়ে তাজা চিত্রকল্প আসে রাষ্ট্র আর প্রেম মিশলে। ‘চোখ-রাষ্ট্রের নিষিদ্ধ মদিরা’য় প্রেমিকার ঠোঁট ‘রাষ্ট্রের জরুরি অবস্থা—/চুমু খেতে গেলেই/ঘোষণা হয় নিষেধাজ্ঞা’। চোখ দুটো ‘কোনো কবিতার লাইন না—এগুলো মিছিলের পোস্টার’। এই কবিতা শেষ হয় ‘ভালোবাসাও এখন রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধ!’ বলে। এখানে রূপক ঘুরিয়ে বলার দরকার পড়েনি। কারণ, বিশেষ্যগুলো আমাদের চেনা: জরুরি অবস্থা, নিষেধাজ্ঞা, পোস্টার।
‘অবাস্তবতার নীল ইশতেহার’ আরেক রকম। কবিতাটির প্রতি লাইনে বিরহের কাছে একটা করে ইচ্ছা জানায়: ‘বিরহ সহজ হোক… বিরহ স্বাভাবিক হোক…’ চেনা শহুরে ছবি ঢুকে পড়ে: ‘বিরহকে বগলদাবা করে আমরা ট্রামে উঠব, বাজারে যা’, ‘লাগুক চেনা রোয়াফজার মতো’। শিশুর প্রশ্নটা বিরল সুন্দর: ‘আকাশের পিঠে কেন কোনো বোতাম নেই?’ আর এই লাইনটা আমার কাছে পুরো বইয়ের সেরা ছয়টা লাইনের একটা—‘আমরা মুক্ত থাকব—ঠিক যেভাবে একটা খাঁচা মুক্ত থাকে পাখির মৃত্যুর পর।’
কিন্তু এখানেও বাড়াবাড়ি আছে। ডাইনোসর, ব্ল্যাকহোল, নীল তিমি, তরল লোহা এসে উপমার ভিড় জমায়, কোনটা কেন, ঠিক বোঝা যায় না। ব্ল্যাকহোলকে নুভ আবার ‘অর্ঘ্য ও মরিচীকা’তেও ফিরিয়ে আনেন, একটু ক্লান্ত চেহারায়।
‘অ্যান্টিমেট্রিক শোকের অক্ষাংশহীন মহাদেশ’ কবিতায় দুঃখকে কবি জ্যামিতির বাইরে রাখেন, ত্রিভুজ বা বর্গ বা আয়তক্ষেত্র কোনোটাই না, বরং অক্টোপাস, তারা-মাছ, নীলতিমি। তারপর হঠাৎ নেমে আসেন চায়ের দোকানে—‘চিনি গলে গেলে মিষ্টি হয়, কিন্তু মানুষ গলে গেলে শুধু দাগ পড়ে।’ এই বাক্যটিই আসল কবিতা। শেষে শোকের মহাদেশের বর্ণনাটা মনে থাকে—‘সেখানে রাষ্ট্রভাষা নেই, শুধু দীর্ঘশ্বাসের উপভাষা।’
বইয়ে খ্রিস্টীয়, ইসলামি, হিন্দু ও বৌদ্ধ প্রতীক পাশাপাশি আসে, তবে প্রায় সবখানেই উল্টো করে। ‘দুধ, রক্ত ও নির্বাণ’য়ে নির্বাণ শান্তি নয়, ‘সভ্যতার সবচেয়ে নিখুঁত প্রতারণা’। বুদ্ধ হওয়া মানে নির্বিকার হওয়া নয়, ‘দগ্ধ হওয়া’, আর কবিতার শেষ ঘোষণা—‘শান্তির জন্য নয়, পরিবর্তনের জন্য।/মুক্তির জন্য নয়, সৃষ্টির জন্য।’ ‘শিমুল-যোনীর লাল আগুনে কামের সন্ন্যাস-সূত্র’ কবিতায় সন্ন্যাস পালানো নয়, ‘আরও গভীরে পুড়ে যাওয়া’, আর শরীরই হয় ‘মসজিদ-গির্জা-মন্দির’, প্রেমিকের নাম ‘শেষ তসবিহ’। ‘নির্বাসিত মুকুলের শেষ সঞ্চয়পত্র’ কবিতায় পতিত ফেরেশতা ব্যবহার হয় ক্ষয়ের ছবিতে—‘দারিদ্র্যে পতিত হই না, আমি পতিত হই নিজের ভেতরের স্বর্গ থেকে।’
এই উল্টে দেওয়ার সাহস বইয়ের শক্তি, তবে ঝুঁকিও আছে। ‘জীর্ণ যিশুর মুখ’য়ে একসঙ্গে এত গ্রন্থের নাম আসে যে তালিকার মতো শোনাতে শুরু করে। আর ‘এভাবেও ঈশ্বর দেখা যায়’য়ের শেষ বাক্যে যে সমাপ্তি আনা হয়েছে , তা লেখার ভেতর থেকে অর্জিত নয়, যেন বাইরে থেকে বসানো। কবি লিখেছেন—‘অধিকারহীনতা সবচেয়ে বড় অধিকার’। এই কবিতার ছোট ছোট প্রশ্নহীন ছবি দারুণ লেগেছে: শিউলির গন্ধ, শার্টে লেগে থাকা ঘাম, আর প্রথম লাইনটি ‘কিছু আগুন আছে… হোক তা চোখের, ঠোঁটের কিংবা গোঁফের... বার বার পুড়তে ইচ্ছে করে।’
বইয়ের অনেকগুলো লেখা আসলে গদ্যকবিতা। সেগুলো পড়তে গিয়ে এক জায়গায় থমকে যেতে হয়। ‘মুড়ির দাঁত, শাদাটে ভূত!’য়ে শৈশবের ছবিটা সত্যিই জীবন্ত—ঠোঁটের দু’পাশে দুটো মুড়ি গুঁজে ভূত সাজা, যাতে ‘উঠোনের বাতাস পর্যন্ত যেন একটু কেঁপে উঠতো’। তারপর বাটির পানিতে মুখ নামিয়ে দেখা যায় সেখানে নিজের মুখ নেই, আছে ‘মুখের ভেতর জমে থাকা ছাই’। দুঃখ-ভূতেরা ‘চোখ নেই, তবু তাকিয়ে থাকে’। কিন্তু লেখাটা শেষ হয় একটা কাব্যতত্ত্বে: ‘কবিতা হলো সেই দাঁত, যা দুঃখকে কামড়ে ধরে।’ নিজেই ব্যাখ্যা করে ফেললে ছবির জোর কমে। তবে কবি হয়ে ওঠার যে জার্নি বা যে ঘটনার ভিতর দিয়ে নূভ কাব্যশ্রী হয়েছেন তারই যেন প্রতিচ্ছবি এ কবিতা।
‘আমি এবং আদিম কৃতদাস’ আর ‘চেতনার লবনাক্ত রস’ একই ভাবনার গদ্য ও পদ্য রূপ। গদ্যে কুমোরপাড়ার মাসীমার হাতের রেখা ‘ভাগ্যরেখা নয়—সেটা মাটির দাগ, আগুনের দাগ, ভোরের অন্ধকারে উঠে পড়ার দাগ’; তাঁর গতর পুড়ে রোজ তৈরি হয় ‘ফ্যানা ভাতের পাতিল’। পদ্যে লাইন ছোট হতে হতে এই সূক্ষ্মতা কমে এসে স্লোগান হয়ে যায়—‘শ্রমিকের দেহ পোড়ে, আর শহর উৎসব সাজায়!’ আমার কাছে গদ্যটাই বেশি জোরালো।
‘মুখ ঢাকার ইতিহাস’ আর ‘ক্ষতজীবী’ এই বইয়ের দুটো সবচেয়ে সরল লেখা, আর আমার মতে সবচেয়ে মনে থাকার মতোও। প্রথমটা শুরু হয় এভাবে—
বাবার মুখ বাঁচাতে গিয়ে
আমি আমার নিজের মুখটা
কোথায় রেখেছিলাম; মনে নেই।’
মুখ শব্দটা এখানে সম্মান, চেহারা আর কথা বলার অঙ্গ, তিনটা অর্থেই কাজ করে। ‘কাঁদলে মুখ দেখা যায়, আর সেদিন মুখ দেখানোর অনুমতি ছিল না আমার’, এই লাইন সেই তিন অর্থ এক করে দেয়। আদালত যখন বলে ‘বেকসুর খালাস’, কবিতা তার জবাবে বলে এই দুটো শব্দ দিয়ে জেলঘরের অন্ধকার মোছা যায় না। শেষে রাষ্ট্র কথককেও একটা জেল দিয়ে গেছে, ‘সেই জেলের কোনো গেট নেই, কোনো মুক্তির তারিখ নেই, শুধু দাগ আছে।’ এখানে কবি একটাও বড় শব্দ ব্যবহার করেননি, আর তাতেই কবিতা সবচেয়ে ভারী হয়েছে।
‘ক্ষতজীবী’ বইয়ের আলোর দিক। ডোবার ধারের তালগাছ কথকের আয়না, দুজনেই ভাঙা, তবু দাঁড়িয়ে আছে। ক্ষতের সংজ্ঞাটা ভালো: ‘সেই মুহূর্তগুলো যেগুলো তুমি ভুলতে চাও, অথচ ঘুমের ভেতর তারা জুতো পরে হেঁটে আসে।’ তারপর বাবুই এসে সেই ক্ষতের ওপর বাসা বাঁধে, আর কথক বোঝে: ‘যেখানে আমি দেখেছিলাম ধ্বংস—ওরা দেখেছিল ভিত।’ শেষ ছোট লাইনগুলো, ‘কেউ বাসা বেঁধেছে। কেউ গান গাইছে। কেউ বেঁচে আছে। —এবং সেই কেউটা আমি নিজেই’, কবিতার সবচেয়ে শান্ত ধাক্কা। তবে মাঝখানে ‘প্রতিটা ক্ষত একটা শিক্ষা, প্রতিটা ফাটল আলো ঢোকার পথ’ আর কিন্তসুগির উপমা আমাদের অনেক চেনা, বইয়ের বাকি অংশের তুলনায় নিরাপদ।
বইয়ের প্রায় কবিতায় নারী এসেছে বহুরূপে... কোথাও যুদ্ধংদেহী, কোথাও আবার ভরপুর মাধুর্য-এ।‘দুধ, রক্ত ও নির্বাণ’, ‘শিমুল-যোনীর…’ আর ‘যোনিতল-অধিষ্ঠিত…’ বারবার নারীর শরীরকে যুদ্ধক্ষেত্র, তীর্থ আর শস্যভাণ্ডারের মতো বিশাল চিত্রে তোলে। শেষ লেখাটার ঘোষণা—
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ খাদ্য হলো ভালোবাসার শরীর।
আর সেই শরীরের নাম নারী।
এতে কবির শ্রদ্ধা স্পষ্ট। কিন্তু একজন সতর্ক পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, নারী এখানে কি মানুষ, না আশ্রয় আর ক্ষুধা মেটানোর ভূমিকা? ‘দুধ, রক্ত ও নির্বাণ’ আমাকে এ ব্যাপারে খানিকটা আশ্বস্ত করে। কারণ, সেখানে নারী নিজেই বিদ্রোহের ডাক দেয় (বুদ্ধ হও, নারী)। বাকি দুটিতে নারী বেশি গর্ভ আর শরীর, কম কণ্ঠ।
সর্বোপরি বলতেই হয়, এই সময়ের কবি তাওহীদাহ্ রহমান নূভের প্রথম কবিতার বই হিসেবে পাঠকের হৃদয়ে স্থান করে নেবে। যিনি ঘন, চিত্রভারী, তর্কপ্রিয় কবিতা পড়তে চান, বিশেষ করে ধর্ম, রাষ্ট্র আর শরীরকে এক সুতোয় বাঁধা দেখতে চান, তার জন্য এখানে অনেক কিছু আছে। আমার কাছে নূভের সেরা কাজ ছোট সরল লেখাগুলো, যেখানে একটা মাত্র ছবি আর একটা মাত্র ব্যথা এসে দাঁড়ায়। ভারী শব্দের বর্ম ছাড়াই কবি সেখানে সবচেয়ে বেশি কাছে আসেন। বইটি পাঠকপ্রিয় হয়ে উঠুক।
দুধ রক্ত ও নির্বাণ
তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
প্রচ্ছদ: ধ্রুব চৌধুরী
কোটাল’স পাবলিকেশন
মূল্য: ২০০ টাকা
























