ভূঁইয়া সফিকুল ইসলামের গদ্য ‘১৫ আগস্ট: নীরব স্মরণ’
প্রকাশিত : আগস্ট ১৬, ২০২৬
বঙ্গবন্ধু, আজ তোমার নাম নেওয়া, একাত্তর শব্দটি মুখে আনা, কথা বলা—এ দেশে অপরাধ। নাম নিলে হাতে পড়ে দড়ি, পিঠে পড়ে কিল, জীবনও যায়। কেউ বুঝতে চায় না, তোমার নামে, কী গহন ত্যাগে আমরা দেশটা এনেছি। যুদ্ধে তুমি ছিলে না, কিন্তু ছিলে আমাদের চেতনার রণাঙ্গনে। তাই সামান্য ট্রেনিং নিয়ে আমরা নিষ্ঠুর পৈশাচিক শত্রুর সাথে লড়তে পেরেছি। তুমিই আমাদের বাহুতে শক্তি জুগিয়েছ।
বাহাত্তরের জানুয়ারিতে তুমি এলে। আমরা তখন বিজয়ী। কিন্তু সে অনেক মূল্যে। তুমি পেলে এক ধ্বস্ত-পীড়িত আগ্নিগ্রাসিত শ্মশান ভূমি—তখনকার বাংলাদেশ, দিকে দিকে শোকের মাতম। এই শ্যামল বদ্বীপের দিকে দিকে তখন শহিদের কবর, ছিহ্নবস্ত্র স্বজনের কান্না, লুট হওয়া অর্থনীতি—শূন্য ট্রেজারি। ভেঙে-পড়া সেতু কালভার্ট, বিদ্যুৎ গ্রিড, রাস্তাঘাট। দরিদ্র দেশের কোনো সর্বনাশ সেদিন বাকি ছিল না।
মাত্র সাড়ে তিন বছর, এর মধ্য তুমি, বিশ্বমানবতার মুকুটসম সংবিধান দিলে। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ যে মুকুটের প্রধান পালক। এর কোনটি ছাড়া জগৎ এগিয়েছে, মানব প্রগতি, মানবের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হয়েছে? হয়েছে কোথাও? দু-দুটি বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে বেরিয়ে এলো গণতন্ত্র। সাম্য, শান্তি, প্রগতি ও মানবতার বাণী।
পাকিস্তানে তুমি সেই গণতন্ত্র নামক নতুন রাজনৈতিক জীবনাদর্শ এনেছিলে। সামরিক বুটের তলে যারা দেশ ও জনগণের গলা পাড়িয়ে ধরেছিল, এই গণতন্ত্র দিয়ে তুমি তাদের করেছিলে ধরাশায়ী। এজন্য জীবনের অধিকাংশ বেলা কটিয়ে দিলে পাক হায়ানাদের কারাগারে। তুমিই তো দেখিয়েছিলে, পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় আয় পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে বেশি। এমনকি ১৯৬০ সালে তা পশ্চিম পাকিস্তান ও ভারতের চেয়েও বেশি ছিল। কিন্তু আমার অংশে বাজেট বরাদ্দ কেন এত কম? আমার জনগণের চাকরিতে কেন এই হীন সংখ্যা? কেন ব্যবসা-বাণিজ্যে সর্বক্ষেত্রে বাঙালি পিছিয়ে?
তুমি চেয়েছিলে স্বায়ত্ত্বশাসন। চেয়েছিলে পূর্ববাংলার জণগনের ভাগ্য ফিরাতে, তার জাতীয় আয় নিজ ভূমিতে ব্যয় করতে। ফেড়ারেল সরকারের কাছে থাকবে শুধু দেশরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি। এ খাতে এদেশ তার শেয়ার জোগাবে। তোমার ৬ দফার দাবি মেনেই সত্তরের নির্বাচন হলো। বিপুল ব্যবধানে জিতলে, প্রধানমন্ত্রিত্ব তখন তোমার ন্যায্য পাওনা। কিন্তু পাকিস্তান দিল না। তারা সুপার রেস, সুপার মুসলিম। এই না খাওয়া হতভাগ্য ভীরু বাঙালিদের হাতে দেবে তারা পাকিস্তানের শাসন? তাদের শত শত জেনারেল, শত শত জমিদার, শিল্পপতি নাচিজ নালায়েক বাঙালির নেতৃত্ব মেনে নেবে? কী করবে তুমি? তোমার তো একজন জেনালেও নেই। তোমার রেস থেকে সর্বোচ্চ পদে আছে জনা দুয়েক কর্নে, হাতেগোনা কিছু মেজর।
দিল না। টালবাহানায় সময় কাটালো। তোমার চেয়ে অনেক কম ভোট পাওয়া ভুট্টোকে তারা প্রধানমন্ত্রী বানাবে। চলল ষড়যন্ত্র। বিভাজন রেখা স্পষ্ট হলো। বাঙালির ওপর জুলুম গুলি চলল। তুমি বুঝে গেলে, ক্ষমতা দেবে না। তাই স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে। জগৎ শুনল ৭ মার্চে তোমার দুনিয়া কাঁপানো স্বাধীনতার ঘোষণা— ‘এরপর আমার লোকের ওপর যদি একটি গুলিও চলে, তোমরা যা কিছু আছে, তাই নিয়ে, ঝাঁপিয়ে পড়বা। আমার এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম…মুক্তির সংগ্রাম।’
এত বড় জনসমাগমে এমন স্বাধীনতার ঘোষণা এর আগে আর কোনো নেতা দেন নাই। ইতালির গেরি বড্ডিও নন, জার্মানের বিসমার্কও নন, বা আমেরিকার ওয়াশিংটনও নন। তবুও তুমি রক্তপাত চাওনি। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তুমি গণতন্ত্রে আস্থা রেখেছো। পাকিস্তান আলোচনার খেলা খেলেছে। ভিতরে ভিতরে সৈন্য এনেছে। আর ২৫ মার্চ রাতে তোমাকে আটকে পাকিস্তানে নিয়ে যাবার আগে বাঙালির রক্তে লাল করেছে ঢাকার রাজপথ। পুলিশ ব্যারাক, ইউনিভার্সিটি, কিছুই বাদ যায়নি। বর্বরতার সীমা ছাড়ানো পাকিস্তানের সেই রক্তখেকো অগণতান্ত্রিক বীভৎস রূপ জগৎ দেখেছে। সেই শুরু। এরপর শহর গ্রাম বন্দর জনপদ, পোকা-মাকড়ের মতো মানুষ মেরেছে ওরা।
অজস্র মৃত্যরে লঙ্ঘি, পোড়া শ্মশানের মতো ভূমিতে তুমি ফিরে এলে, বাহাত্তরে, জানুয়ারিতে। সেই থেকে সরাতে চেয়েছ শ্মশানের ছাই, মেরামত করতে চেয়েছ স্বদেশ—ভাঙা রাস্তা, পোড়া সেতু। আহার জোগাতে চেয়েছ নিরন্ন মানুষের। পুঁজিহীন ট্রেজারি, বিধ্বস্ত দেশ। তাতে বন্যায় ফসলহানি। আরব-ইজরাযেল যুদ্ধ, তেলের দাম ৩ গুণ বৃদ্ধি। পশ্চিমা দেশেই মুদ্রাস্ফীতির ধকল সামলাতে পারছে না, তুমি কেমনে চালাবে দীনহীনের অর্থনীতি?
কী নিষ্ঠুর খেলা খেলল আমেরিকা! খাদ্য বোঝাই জাহাজও ফেরত নিয়ে গেল, তোমার দেশে অনাহার সৃষ্টি করতে, তোমাকে ব্যর্থ করে দিতে। আরব থেকে আমেরিকা—সর্বত্র চলছে পাকিস্তান আর রাজাকারের লবি, মুজিবকে শেষ করো, কোনো সহায়তা নয়, স্বীকৃতি নয়, তেল নয়। দুঃসহ সীমাবদ্ধতার মধ্যও তুমি ভেঙে পড়োনি, বরং স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলেছ। বুঝতে পারলে শোষক পুঁজিবাদের কাছে তোমার জায়গা নেই। ওদের দাস হও, মাধা নত করো, তবেই জায়গা।
কিন্তু তুমি তো ঘোষণা দিলে— ‘বিশ্ব আজ দুই ভাগে বিভক্ত—শোষক ও শোষিত; আমি শোষিতের পক্ষে।’ তোমার জনগণকে তুমি মাথা নত করাতে চাওনি। কিন্তু তোমার এই শোষিতের পক্ষে অবস্থান তোমার ঘনিষ্ট নেতারা মেনে নিতে পারেনি। বিশেষ করে জমিদারি শোষক মনোবৃত্তির মুৎসুদ্দি টাইপের মোশতাকের মতো খল যারা ছিল। তোমার জমির শিলিং বেঁধে দেওয়া, উৎপাদনে কৃষকের নির্দিষ্ট হিস্যা, সমবায় কৃষিব্যবস্থা, সমাজতান্ত্রিকতার পথে যাত্রা, তাদের ঘোর হিংস্র করে তোলে। আর বিশ্বমানবতার মুক্তিসনদ, জ্ঞান-বিজ্ঞানের গর্বগৃহ সেকুলারিজম নিয়ে তোমার বিরুদ্ধে বিশাল ক্ষেভ এদেশের গোলাম অজম থেকে আরব আজমের রাজা-বাদশা পর্যন্ত।
কিন্তু তুমি অনড় থাকলে মানুষের মুক্তির দর্শনে—‘আমাদের সাধারণ মানুষ যদি আশ্রয় না পায়, যদি দেশবাসী খাবার না পায়, যুবারা কাজ না পায় তাহলে আমাদের এই স্বাধীনতা ব্যর্থ হবে।’ তুমি তো ছিলে কবি নজরুলের সাম্যবাদী, যাঁকে তুমি ভারত থেকে এনে জাতীয় কবি করলে। বিশ্বাস করতে তাঁর কথা—
কারো আঁখি জলে কারো ঝাড়ে নাহি জ্বলবে দীপ।
দুজনের হবে বুলুন্দ নসিব, লাখে লাখে হবে বদ নসিব।
এ নহে বিধান ইসলামের।
তোমার ক্লার্জিম্যান, গোলাম আজম থেকে ক্ষুদে মোল্লা, তারা তোমার সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করত না। আল্লা মানুষের তকদির নির্ধারণ করে দিয়েছে, তুমি কেন গরিব নিয়ে এত মাতামাতি করতে চাও? কিসের সমাজতন্ত্র, বাকশাল?—এসব যে আল্লাবিরোধী সেকুলার আদর্শ, শয়য়তানের ধোঁকা! তুমি বললে, ‘জনগণ প্রজাতন্ত্রের মালিক।’ কিন্তু তারা বলল, আল্লা সব কিছুর মালিক। আরবের বাদশা তোমাকে দেশের নামটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র করতে বলল, তুমি করলে না! তুমি থাকলে মেহনতি মানুষ নিয়ে—‘আমাদের সরকার আভ্যন্তরীণ সমাজবিপ্লবে বিশ্বাস করে। এটা কোনো অগণতান্ত্রিক কথা নয়। আমার সরকার ও পার্টি বৈজ্ঞানিক সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একটি নতুন ব্যবস্থার ভিত রচনার জন্য পুরাতন সমাজব্যবস্থা উপড়ে ফেলতে হবে। আমরা শোষণমুক্ত সমাজ গড়ব।…ধনীকে আর আমি ধনী হতে দেব না। কৃষক শ্রমিক এবং জ্ঞানীরা হবে এই সমাজতন্ত্রের সুবিধাভোগী।’
তাই তো তুমি অর্থনৈতিক দর্শন দিলে—‘বাংলাদেশের সম্পদের মালিকানার ধরন হবে রাষ্ট্রীয়, ব্যক্তিগত ও সমবায়ভিত্তিক। সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।’ (সংবিধানের ১৩ অনুচ্ছেদ) তুমি সাংবিধানিকভাবেই দিলে ৫টি মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি। তুমি পরিকল্পনা কমিশন গড়ে তুললে। পাঁচশালা পরিকল্পনা প্রণয়ন হলো। ৮০ ভাগ দরিদ্র ও ক্ষুধার্তের দেশে পৌনঃপৌনিক দুর্যোগে ধ্বস্ত অর্থনীতিতে তুমি এগিয়ে চললে অনাপোস ব্যক্তিত্ব নিয়ে। উন্নয়নের আশা ঝিলিক দিয়ে উঠল, চলল দেশ পুনর্গঠনের কাজ। বৈরি বিশ্বের একমাত্র সোভিয়েত আর দরিদ্র ভারত তোমার পাশে। এদিকে মাওয়ের সৈন্যরা তোমাকে শেষ করতে চায়। সাম্রাজ্যবাদের টাকা খেয়ে তোমার কাছের নেতারা শুরু করল জাসদীয় উৎপাত। শফিকুরের মতো সব রাজাকার তনয়রা তখন জাসদে—সমাজতন্ত্রী! হেন নাশকতা নেই, তারা করে নাই।
তবুও থেমে থাকেনি তোমার উল্কাযাত্রা। পরিকল্পনা কমিশনের কথা তো বলেছি, আরো গঠিত হলো বাংলাদেশ ব্যাংক, শিক্ষা কমিশন, আরডিবি (পল্লি উন্নয়ন বোর্ড), ইনস্টিটিউট অব চার্ডার্ড অ্যাকাউউনটেন্ট, মুক্তিযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণ কাঠামো, নারীর ক্ষমতায়নের কর্মসূচি, প্রথম পঞ্চবার্ষিকীতে ৪০ লক্ষ কর্ম সৃষ্টির উদ্যোগ, পরিবার পরিকল্পনা, প্রতি ইঞ্চি ভূমির ব্যবহারসহ শিল্পসমস্যার সাধানের পথ, ইত্যাদি। এই সামান্য সময়ে, এত দুর্যোগের মধ্যেও, সে সময়ের বিশ্বব্যাংকের সূত্র বলছে পার ক্যাপিটাল জাতীয় ইনকাম ১৯৭৪ এ পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু সোভিয়েত রাশিয়ার মতো পঞ্চশালা পরিকল্পনা নিয়ে শত্রুরা আর তোমকে এগোতে দিল না। আমেরিকার খাদ্যসশ্য পাঠানোর বিশ্বাসঘাতকতা, বন্যায় শস্যহানি, অভাব ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সুযোগ কাজে লাগায় শত্রুরা। রটানো হলো, দেশের মানুষ না খেয়ে মরছে আর মুজিবপুত্ররা ব্যাংক ডাকাতি করছে। মুজিব ও তাঁর পরিবার সব বিদেশি সাহায্য লুটেপুটে খাচ্ছে, ইত্যাদি।
আমেরিকা জানত কী ঘটতে যাচ্ছে। সে শুধু গোপনে হেসেছে, সে তো চাইত বঙ্গবন্ধুর পতন, যাতে সোভিয়েত প্রভাব শেষ হয়, বঙ্গোপসাগরে তার প্রভাব তৈরি হয়। সে জানত এমন মহান নেতাকে সরাসরি মেরে আমেরিকা কেন চিরস্থায়ী একটি কলঙ্ককে কাঁধে তুলে নেবে। তাঁকে মারার জন্য আছে তো তাদের ইসলাম—শান্তির ধর্ম, যা কমিউনিজমকে খোদ আমেরিকার চেয়েও ঘৃণা করে। আর যারা ক্ষমতায় আসবে, তারা তো আমেরিকান ব্লকের লোক।
এই ১৫ আগস্টে, ৭৫ সেই নৃশংস কাজটি সম্পন্ন হয়। মুজিবের পরিবার ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ বলে, সেকুলার আদর্শ লালনকারী ‘কাফের’ বলে শিশুসহ সকলকেই হত্যা করা হয়। কিন্তু তাঁর সন্তানেরা অমানুষ ছিল, ডাকাত ছিল, ব্যাংকের টাকার পাহাড় গড়ছে—এসব ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়। মুজিব সাধারণ মানুষের মতোই সাদাসিদা জীবন যাপন করতেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বা তাঁর সন্তানদের কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্টে একটি অতিরিক্ত টাকাও পাওয়া যায়নি।
মুজিবের পতনের পর ইসলামি দেশ খুশি, চীন খুশি আমেরিকা খুশি। সব চেয়ে বেশি খুশি ইসলামের যারা সোল এজেন্ট, সেই জামায়াতে ইসলাম, যারা ছিল যুদ্ধাপোরাধী, আর এজন্য বঙ্গবন্ধু তাদের রাজনৈতিক অধিকার হরণ করেছিলেন। তখন রাজনীতিতে তারা হয়ে উঠল মূলত প্রধান শক্তি। চীন স্বীকৃতি দেওয়ায় চীনাপন্থি কমিউনিস্টরা হাত মিলাল নতুন সরকারের সাথে, কেউ কেউ মন্ত্রীও হলো। ক্ষমতা চলে গেল সেনাসমর্থিত দক্ষিণপন্থী সরকারের হাতে। জনগণ গণতন্ত্রের মোড়কে পেল সামরিকতনন্ত্র, মোল্লাতন্ত্র। অজস্র মৃত্যুকে পার হয়ে দেশ ফিরল সেই পুরোনো পাকিস্তানে।
দক্ষিণপন্থা ধর্ম দেয়, কিন্তু মানুষের সামগ্রিক মুক্তি সে দেয় না, সে তো বিশ্বাস করে সবার ভাগ্য সমান নয়। সবাই অর্থনৈতিক মুক্তি পাবে, সবার সন্তান লেখাপড়ার সুযোগ পাবে, সাম্যের অধিকার পাবে, ধনী আরো ধনী হতে পারবে না—এ কেমন কথা? আল্লা নিজেই তো হাতের পাঁচ আঙুল সমান করেনি। একটি জাতির স্বাধীনতা আনার অবিসংবাদিত নায়কের নাম আজ বাংলাদেশে দুরুচ্চার্য। তার স্মৃতিতে এবারও কেউ ফুল দিতে পারল না, ৩২ নম্বরের যে গৃহ ছিল বাঙালির স্বাধীনতার ঠিকানা, যেখানে বসে দু’লক্ষাধিক ধর্ষিতা শিশুর বীরঙ্গনা মায়েদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছিলেন, ‘তোদের কেউ গৃহে ফিরিয়ে নেয় না, তোদের ঠিকানা নেই, আজ থেকে ৩২ নম্বর তোদের ঠিকানা। আমি তোদের সন্তানদের পিতৃপরিচয়!’ সেই হৃদয়বান জনক চরিত্রকে এ জাতি কতটা অপমান করতে পারে, তা দেখে বিশ্ব আজ বিস্মিত।
চরম অপমানিত আজ মুক্তিযেদ্ধারাও, যারা বঙ্গবন্ধুর ডাকে, তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর নামে যুদ্ধ করেছিল। অসম্ভবকে সম্ভব করেছিল। আজ মুক্তিযোদ্ধারা আত্মপরিচয় লুকিয়ে নতমস্তকে পথ চলেন, যুদ্ধ-করা, দেশ স্বাধীন করাটা যেন ছিল মহা পাপের কাজ। তবুও পঁচাত্তুর, ১৫ আগস্ট, সেই শোকাবহ নিধনযজ্ঞ, প্রতি পলে পলে আমাদের ব্যথিত করে যায়। বঙ্গবন্ধু, আমাদের নীরব অশ্রু গ্রহণ করো, তোমার নামেই আমরা এ দেশ মুক্ত করেছিলাম। তোমার ৭ মার্চের ভাষণ আমাদের মর্মে বাজে, মৃত্যুর আগেও যেন সে ধ্বনি আমাদের মর্মে ঝংকার তোলে। কারণ ওই ভাষণই ছিল আমাদের মুক্তির পথরেখা।
সময়ের অমোঘ নিয়মে ঘড়ির কাঁটায় মিলে এবারের ১৫ আগস্ট সুকান্তের জন্মদিন। এই ক্ষণজন্মা কবির জন্মও হয় বঙ্গবন্ধুর পাশের উপজেলায়, কোটালিপাড়ায়। বয়সেও সমসাময়িক। যেদিন আমার গৃহে আগুন দেওয়া হয়, আমার প্রিমতমা মাতা-বধূ-প্রেয়সীকে ধরে নেওয়া হয়, সংবাদ পাই সেই বর্বরতার, রণাঙ্গনে বসে। সেদিন আমরা তোমারও কবিতা বলেছি—
প্রিয়ারে আমার কেড়েছিস তুই ভেঙেছিস ঘরবাড়ি
সে-কথা কি আমি জীবনে মরণে কখনো ভুলিতে পারি?
আদিম হিংস্র মানবিকতার যদি আমি কেউ হই
স্বজনহারা এ শ্মশানে তোদের চিতা আমি তুলবই!
তোমরা আজ উপেক্ষিত হতে পারো। ভেঙে ফেলতে পারি তোমারের সকল স্মৃতিচিহ্ন। কিন্তু তোমরাই শ্বাশত বাংলা। বঙ্গবন্ধু তো সবাইকে ছাপিয়ে, কারণ তিনিই উপহার দিয়েছেন একটি স্বাধীন মানচিত্র, আমাদের নিজস্ব পাসপোর্ট। আর আমাদে চেতনার যারা আলোকবর্তিকা, সেই সুকান্ত, নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, সেই জীবনানন্দ, আমাদের চেতনা। হিংস্র দানব থাবা মেলতে পারে, কিন্তু দানবের থাবা চিরস্থায়ী নয়। তোমাদের কারণেই এ জাতির চেতনা অবার সূর্য হয়ে জ্বলবে। তিমিরবিদারী আলোয় হাসবে বাংলাদেশ।
























