প্রতীকী ছবি
মারিয়া সালামের গদ্য ‘মাতৃধারার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে’
প্রকাশিত : আগস্ট ০৪, ২০২৬
মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভ বা আমাদের আদিমাতা, তার কথা নিশ্চয়ই জানেন। না, তিনি কিন্তু ধর্মগ্রন্থের মা হাওয়া নন বা পৃথিবীর প্রথম নারীও নন। তিনি বাস্তব আর বিজ্ঞানের ব্যাখ্যার নিরেখে এক অদ্ভুত, অমোঘ চরিত্র। তার কথা গতরাতে খাবার টেবিলে বসে হঠাৎ করেই মাথায় চলে আসল।
ভাবনার শুরু কীভাবে, সেটা বলি। আমার ছেলে ইদানীং খুব পাকাপাকা কথা বলে। আজ খেতে বসে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, মা, আমাদের কোনো বোন নাই কেন?
একটা ছোট্ট শিশুর একেবারে সরল প্রশ্ন। আমিও খুব সহজভাবে বললাম, এমনিই।
কিন্তু কথাটা বলার পরই বুকের ভেতর দিয়ে যেন ঠাণ্ডা একটা স্রোত বয়ে গেল। হঠাৎ এমন একটা ভাবনা এসে মাথায় আঘাত করল, যা এতদিন কোথাও নীরবে লুকিয়ে ছিল। ভাবলাম, আমার মা, তার মা, তারও মা—অসংখ্য প্রজন্ম ধরে মাতৃসূত্রে যে অদৃশ্য ধারা বয়ে এসেছে, সেটা আমার কাছেই এসে থেমে যাবে।
এই উপলব্ধিটা অদ্ভুত রকমের। যেন কোনো বিশাল নদীর শেষ মোহনায় দাঁড়িয়ে আছি আমি। নদীটি হাজার হাজার বছর ধরে বয়ে এসেছে, আর আমার পর তার আর কোনো স্রোত থাকবে না। ভাবনাটা আমাকে এক ধরনের নিঃশব্দ শূন্যতায় ডুবিয়ে দিল।
পৃথিবীর ইতিহাসে এমন অসংখ্য নারী ছিলেন, যাদের মাতৃবংশ কোনো এক সময়ে কন্যাসন্তানের ধারাবাহিকতা হারিয়ে ফেলেছে। তাদের ব্যক্তিগত জীবন শেষ হয়েছে বহু আগেই, কিন্তু তাদের সঙ্গে শেষ হয়ে গেছে হাজার বছরের এক জৈবিক উত্তরাধিকারও। সেই বিলীন হয়ে যাওয়ার দোরগোড়ায় আজ আমিও দাঁড়িয়ে আছি।
আমি যখন জন্মেছিলাম, তখন আমার মাতৃবংশের ইতিহাস চলমান হয়েছে আরও সামনে। আমি আমার মায়ের, নানুর, তারও আগের নারীদের সেই ধারাটুকু বহন করে এনেছিলাম। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমার নানুর মতোই আমি লড়াকু, জেদি, রাগী; আবার সংকটের মুহূর্তে আশ্চর্য ঠাণ্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিতে পারি।
এসব হয়তো শুধু পরিবেশের প্রভাব নয়, উত্তরাধিকারেরও এক অদৃশ্য প্রতিধ্বনি। কিন্তু আমার মৃত্যুর সঙ্গে এই মাতৃধারা শেষ হয়ে যাবে, আমার পর আর কোনো কন্যা, নাতনি বা প্রপৌত্রী সেই উত্তরাধিকার বহন করবে না। আমার ভেতরে এসে হাজার বছরের যে স্রোত মিলিত হয়েছে, সেটা এখানেই থেমে যাবে।
বিষয়টা একটু সহজ করে বলি। আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে আছে ক্ষুদ্র এক অঙ্গাণু—মাইটোকন্ড্রিয়া। জীববিজ্ঞানের ভাষায় এটা কোষের শক্তিকেন্দ্র। কিন্তু মাইটোকন্ড্রিয়া শুধু শক্তি উৎপাদনই করে না; এর ভেতরে লুকিয়ে আছে মানবজাতির সবচেয়ে প্রাচীন ও দীর্ঘস্থায়ী পারিবারিক ইতিহাসও। মাইটোকন্ড্রিয়ার নিজস্ব একটা ছোট ডিএনএ রয়েছে, যাকে বলা হয় মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ mtDNA।
এই ডিএনএ ছেলেমেয়ে উভয়েই মায়ের কাছ থেকে পায়। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মে সেটা বহন করে নিয়ে যেতে পারে কেবল কন্যাসন্তান। কারণ সন্তানের শরীরের মাইটোকন্ড্রিয়া আসে মায়ের ডিম্বাণু থেকে; বাবার শুক্রাণুর মাইটোকন্ড্রিয়া কার্যত পরবর্তী প্রজন্মে অংশ নেয় না। ফলে একটা অদ্ভুত ধারাবাহিকতা তৈরি হয়—মা থেকে মেয়ে, মেয়ে থেকে নাতনি, নাতনি থেকে প্রপৌত্রী। হাজার হাজার বছর ধরে প্রায় অপরিবর্তিতভাবে এই জৈবিক স্বাক্ষর এক নারী থেকে আরেক নারীর শরীরে পৌঁছে যায়।
সমাজ যেখানে বংশপরিচয় লেখে পিতার নাম, পদবি কিংবা গোত্র দিয়ে, সেখানে প্রকৃতি নীরবে আরেকটি বংশলতিকা লিখে রেখেছে—মায়েদের হাত ধরে। মানবসভ্যতার সবচেয়ে দীর্ঘ, সবচেয়ে নীরব এবং সবচেয়ে অবিচ্ছিন্ন বংশলতিকা কোনো পাথরের ফলকে নয়; লেখা আছে আমাদের প্রতিটি কোষের মাইটোকন্ড্রিয়ার ভেতরে।
একবার ভেবে দেখেন—হাজার হাজার বছর আগে কোনো এক মা তার কন্যার হাতে অদৃশ্য এক জৈবিক প্রদীপ তুলে দিয়েছিলেন। সেই আলো কখনো নিভে যায়নি। যুগের পর যুগ, সভ্যতার উত্থান-পতন, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, অভিবাসন—সবকিছু পেরিয়ে সেই একই আলো আজও জ্বলছে অসংখ্য নারীর শরীরে। আমাদের প্রত্যেকের শরীরে শুধু নিজের নয়, অগণিত মায়ের পদচিহ্নও বহমান।
এই গল্পের শুরু আরও অনেক দূরে। বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন, বর্তমানে জীবিত সব মানুষের মাতৃসূত্র শেষ পর্যন্ত এক প্রাচীন নারীর কাছে গিয়ে মিলিত হয়েছে। তাকে বলা হয় মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভ। এই নাম শুনে অনেকেই ভুল বোঝেন। তিনি ধর্মগ্রন্থের মা হাওয়া নন, কিংবা মানবজাতির প্রথম নারীও নন। তার সময়ে আরও বহু নারী বেঁচে ছিলেন। কিন্তু সময়ের প্রবাহে তাদের অধিকাংশের মাতৃধারা কোনো না কোনো প্রজন্মে কন্যাসন্তানের অভাবে থেমে গেছে। শুধু একজন নারীর মাতৃসূত্র কখনো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়নি। সেই ধারাবাহিকতাই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়ে আজ পৃথিবীর সব জীবিত মানুষের শরীরে পৌঁছেছে।
এবার কল্পনা করুন, আপনি সময়ের স্রোত উল্টো দিকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। শত বছর… হাজার বছর… দশ হাজার বছর… সভ্যতা মিলিয়ে গেল। রাজ্য হারিয়ে গেল। ভাষা বদলে গেল। ধর্মেরও জন্ম হয়নি তখন। আরও পেছনে গেলে মানুষ কৃষক নয়, নগরবাসী নয়—তারা শিকারি ও সংগ্রাহক। অবশেষে প্রায় দুই লক্ষ বছর আগে আফ্রিকার বিস্তীর্ণ প্রান্তরে আপনি দেখতে পেলেন এক সাধারণ নারীকে।
তিনি কোনো রানি নন, কোনো কিংবদন্তির চরিত্র নন। তার নামে কোনো শিলালিপি নাই, কোনো মুকুট নাই। হয়তো তিনি নদী থেকে পানি আনছেন, আগুনের পাশে সন্তানকে কোলে নিয়ে বসে আছেন, কিংবা দূরের দিগন্তে পশুর পাল দেখছেন। তিনি জানতেন না, একদিন পৃথিবীর আটশো কোটিরও বেশি মানুষের শরীরে তার এক ক্ষুদ্র জৈবিক স্বাক্ষর বেঁচে থাকবে। আজ বিজ্ঞান তাঁকেই মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভ নামে চেনে।
এ যেন এক বিশাল বৃক্ষের গল্প। কোটি কোটি শাখা পৃথিবীর চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে, কিন্তু তাদের গভীরে কোথাও একটি মাত্র মূল রয়ে গেছে। মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভ সেই মূলের প্রতীক। তার কুঁড়েঘর বহু আগেই মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। তার ভাষা হারিয়ে গেছে, তার জাতিগোষ্ঠীর নামও কেউ জানে না। কিন্তু তার শরীরের সেই ক্ষুদ্র মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ সময়ের সব ঝড় অতিক্রম করে আজও বেঁচে আছে আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে।
এ কোনো কল্পকাহিনি নয়, কোনো ধর্মীয় দাবিও নয়। এটা জনসংখ্যাগত জিনতত্ত্বের প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক ধারণা। ঠিক সেই কারণেই ছেলের নিরীহ প্রশ্ন এত গভীরভাবে নাড়া দিয়ে গেল। হাজার হাজার বছর ধরে যে মাতৃধারা আমার শরীর পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে, সেটা আমার কাছেই থেমে যাবে। এই ভাবনায় এক ধরনের বিষণ্ণতা আছে, আবার এক ধরনের বিস্ময়ও আছে।
যুক্তিবাদী আর আশাবাদী মানুষ হিসেবে আমি বুঝি, ভালোবাসা, শিক্ষা, স্মৃতি, মূল্যবোধ, ভাষা, সাহস—এসব কোনো জিনের সীমায় আটকে থাকে না। এগুলো ছড়িয়ে পড়ে সন্তানদের মধ্যে, মানুষে মানুষে, প্রজন্মের পর প্রজন্মে। সেভাবে মৃত্যুর পর অনেকদিন হয়তো আমার ধারা চলমান থাকবে। তারপরেও, পৃথিবীতে আসবে না এমন একজন নারীর অনুপস্থিতি সেই সন্ধ্যা থেকেই মাথা ভার করে রেখেছে।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সংবাদকর্মী























