আহমেদ নাজিবের গদ্য ‘একটা গভীর দার্শনিক উপলব্ধি’
প্রকাশিত : জানুয়ারি ১৬, ২০২৬
‘আচার্য ও তার অলীক পাণ্ডুলিপি’ কিনেছিলাম ২০২৫ সালের বইমেলায়, অন্যপ্রকাশের স্টল থেকে। উপন্যাসটির লেখক স্বকৃত নোমান। প্রায় ১ বছর আগে কিনলেও এর মাঝে বইটি পড়া হয়নি। সময় করে পড়ব পড়ব করেও সেটি হাতে নেয়া হয়নি ব্যক্তিগত নানা কারণে। অবশেষে কয়েক দিন আগে পুরোটুকু পড়ে শেষ করা গেল।
ভালো উপন্যাসের একটি গুণের কথা ‘আচার্য ও তার অলীক পাণ্ডুলিপি’র এক জায়গায় লেখা আছে এইভাবে— গুরু বলেছেন, মহৎ উপন্যাসের মূল গল্পটি এক লাইনে বলে দেওয়া যায়। ওয়ার অ্যান্ড পীসের মূল গল্প নেপোলিয়নের রুশ অভিযান, যুদ্ধের ভয়াবহতা ও শান্তির জন্য মানুষের সংগ্রাম। আদর্শহীন চরিত্র কীভাবে সমাজ ও ব্যক্তিজীবনে পতন নিয়ে আসে, এটাই হচ্ছে আনা কারেনিনার গল্প। ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সীর গল্প মাছ ও মানুষের হার-জিতের লড়াই। দ্য প্লেগ উপন্যাসের গল্প সংকটকালে মানুষের সংহতি। সূর্যদীঘল বাড়ির গল্প দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ, মানুষের আশাভঙ্গ, সমাজের কুসংস্কার, মোড়লদের ষড়যন্ত্র এবং নারীর জীবন সংগ্রাম। লালসালুর গল্প যুগ যুগ ধরে প্রচলিত কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও ধর্মভীতি।
এই সূত্র ধরে দেখা যাক স্বকৃত নোমানের এই উপন্যাসটিকে এক লাইনে বলে দেওয়া যায় কি না। এক লাইনে যদি বলতে হয় তাহলে ‘আচার্য ও তার অলীক পাণ্ডুলিপি’ মূলত একজন গুরু ও তার অনুগত শিষ্যের মধ্যকার নিবিড় এক সম্পর্কের গল্প। অবশ্য যারা উপন্যাসটি এরই মধ্যে পড়েছেন তাদের এমনটা মনে নাও হতে পারে। কিন্তু আমার পুরো বইটিকে গুরু-শিষ্যের সম্পর্কের আখ্যান বলেই মনে হয়েছে।
উপন্যাসে গুরু হলেন আচার্য মীর আসরার জামান। পেশায় তিনি সুরম্যনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হলেও দেশজুড়ে পরিচিত কিংবদন্তি সাহিত্যিক হিসেবে। সাহিত্যমহল থেকে তাকে ভূষিত করা হয়েছে আচার্য উপাধিতে। আর আচার্যের শিষ্য হলো অনন্ত আতিক। আচার্যের অতি অনুগত শিষ্য হবার পাশাপাশি অনন্ত আতিক আচার্যের একান্ত সচিব বা পিএস, সারা দিন থাকে আচার্যের সাথে। আবার সন্তানহীন আচার্য অনন্তকে ডাকেন পুত্র। উপন্যাসটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভালো করে খেয়াল করলে দেখব, এটি আসলেই মূলত এই দুজনের সম্পর্কেরই গল্প। কীভাবে আতিককে তিনি গ্রাম থেকে নিয়ে আসেন নিজের কাছে (বা কীভাবে আতিক এক প্রকার জাদুগ্রস্ত হয়ে চলে আসে আচার্যের কাছে), এরপর সাহিত্যের দীক্ষা দেন, দর্শনের দীক্ষা দেন, জীবনবোধের দীক্ষা দেন, কীভাবে গুরুর নিবিড় সহচার্যে অনন্ত আতিক উপন্যাস লেখার কাজ শুরু করে, কীভাবে আচার্যের মহাপ্রয়াণের পরেও অনন্ত আতিকের লেখক জীবনে, তার লেখালেখিতে ও জীবনের অন্যান্য চরম সংকটেও অনুপ্রেরণা ও সাহস দিয়ে যান তিনি, পথপ্রদর্শন করে যান, সেটারই আখ্যান ‘আচার্য ও তার অলীক পাণ্ডুলিপি’।
হ্যাঁ, অবশ্যই এই উপন্যাসটি কেবলমাত্র এই রকম একরৈখিক কাহিনি নয়। এরও সাব-প্লট রয়েছে এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু সাব-প্লট রয়েছে, যা অনেকেই ভাবলেও ভাবতে পারেন উপন্যাসের মূল কাহিনি হিসেবে। এমনকি উপন্যাসের নাম দেখেও পাঠক বিভ্রান্ত হতে পারেন। কিন্তু উপন্যাসটি আদতে তা না। ইন্টারেস্টিং সেইসব সাব-প্লটগুলো নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। মীর আসরার জামান ও তার স্ত্রী রাফিদা জাহানের মধ্যকার সম্পর্ক এই উপন্যাসের প্রধান সাব-প্লটগুলোর একটি। আর এই সাব-প্লটই সামনে গিয়ে আরেক সাব-প্লটের জন্ম দেবে, উপন্যাসটি পড়ার সময় যেটা আমরা দেখব। আপাতত মীর আসরার জামান ও তার স্ত্রী রাফিদা জাহানের সম্পর্কটা নিয়ে কথা বলা যাক একটু।
উপন্যাসের শুরুতেই এক জায়গায় লেখক এই দুজনের সম্পর্ক নিয়ে মোটামুটি মূল কথাটা লিখেছেন এভাবে— কিছু বলতে যাওয়া মানে অশান্তির যজ্ঞকুণ্ডে ঘৃতাহুতি দেওয়া। শান্তি তো এমনিতেই নেই বহুবছর। যা আছে তাকে শান্তি বলা যায় না, অশান্তিও বলা যায় না। শান্তি অশান্তি মাঝামাঝি এক দশা, যাকে বলা যেতে পারে একটা সমঝোতা চুক্তি। আমরা একই সাঁকোতে হাঁটব। তুমি আমাকে নাড়বে না, আমিও তোমাকে নাড়বো না। তোমার হাঁটা তোমার, আমার হাঁটা আমার।
এর নানান কারণ আছে, এবং উপন্যাসের প্রায় অর্ধেকটা জুড়ে কমবেশি এর কারণ আমরা জানতে পারি। দুই পক্ষেরই দোষ আছে, কারও কম, কারও বেশি। উপন্যাসটিতে কাউকেই খুব একটা সাদা কালো রঙ্গে আঁকেননি ঔপন্যাসিক, বরং এঁকেছেন ধূসর ছাই রঙের বিভিন্ন শেডে, যেমনটা করাই বড় লেখকের কাজ। পড়ার আগে মনে হতে পারে উপন্যাসটিতে মীর আসরার জামানকে একদম পূত-পবিত্র নবি-রাসুল পর্যায়ের মানুষ বানানো হয়েছে আর তার স্ত্রীকে বানানো হয়েছে ভিলেন। আদতে মোটেও তা নয়। মীর আসরার জামান মহান একজন হলেও ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বের কোনো ফেরেস্তা নন। তিনিও মানুষ, দিনশেষে আমাদের মতোই রক্ত-মাংসের মানুষ। যেমন এক জায়গায় আচার্যের ব্যাপারে লেখা হচ্ছে— সেদিন অনন্ত জেনেছে বড় মানুষদেরও যে খর্বতা থাকে, অকারণ ভান আর ভণিতা থাকে।
উপন্যাসের আরেক সাব-প্লট হলো অনন্ত আতিকের ওপর আরোপ করা আচার্য মীর আসরার জামানের লেখা চুরির অভিযোগ। অভিযোগটা করেছেন অনন্তের গুরুপত্নী এও আচার্যের স্ত্রী রাফিদা জাহান, তাও আচার্যের দেহত্যাগের পর; আর একবার নয় একাধিকবার ও একাধিক জায়গায়। তিনি বলেছেন যে, অনন্ত আতিক নাকি আচার্যের মৃত্যুর পর কম্পিউটারে কম্পোজ করা লেখকের সব লেখা পেন্ড্রাইভে চুরি করে নিয়ে গেছে। কিন্তু আতিক কোনো কিছুই চুরি করেনি, আর করার প্রশ্নই আসে না, কারণ আচার্য আর অনন্তের সাহিত্যকর্ম পুরোপুরি দুই রকমের।
কিন্তু এত কিছু দেখার সময় কি আমজনতার আছে? এর ওপর অনন্তের কপালে জুটেছে বেশ কিছু শত্রু, হিংসার বশবর্তী হয়ে। বলে রাখা ভালো, গুরুর মহাপ্রয়াণের পর ধীরে ধীরে অনন্ত আতিক পরিণত হয় দেশের সব থেকে বড়, সব থেক প্রভাবশালী লেখক হিসেবে, এতটাই যে, শেষে গিয়ে তার উপন্যাস ম্যান বুকার প্রাইজ পর্যন্ত জিতে যায়। কিন্তু এত কিছুর পরেও লাভের লাভ হয় না কিছু। সময়ে সময়ে চুরির এই অমূলক অভিযোগটিকে সামনে এনে চরম হেনস্তা করা হয় অনন্তকে, এমনকি বুকার প্রাইজের জন্য মনোনীত হবার পরেও। অনন্ত আতিকের সাথে আমরা পাঠকেরাও বুঝতে পারি, এই জিনিস থামবে না, চলবে।
ওই মুহূর্তে আচার্যের সব থেকে কাছের বন্ধু, দেশের প্রখ্যাত নাট্যকার ফতেহ উদ্দিন রাশা, যার ব্যাপারে আচার্য বলেছিলেন যে তার মৃত্যুর পর অনন্তকে তিনিই দেখে রাখবেন, সেই জনাব রাশা অনন্তকে একটি টেক্সট মেসেজ পাঠান— স্নেহের অনন্ত, আমি জানি তুমি এখন তোমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন ইন্টারন্যাশনাল ম্যান বুকার গ্রহণের উদ্দেশ্যে লন্ডন যাত্রা করেছ। তোমার যাত্রা শুভ হোক। তুমি তো জানো একলব্যের আঙুল কেটে রেখেছিলেন তার গুরু দ্রোণাচার্য। তোমার আঙুল কেটে রেখেছে তোমার গুরুপত্নী। আমি তোমার যন্ত্রণা বুঝতে পারছি, তোমার বেদনা অনুভব করতে পারছি। জানি কতটা অসহনীয় অবস্থার মধ্যে তুমিন রয়েছ। শান্ত হও পুত্র। শোনো, লেখকেরা হচ্ছেন সেসব মহাপ্রাণের উত্তরাধিকারী, যারা মানুষের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন এই মর্ত্যধামে। প্রত্যেক লেখককে কোনো না কোনো অসহনীয় যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যেতে হয় আজীবন। ক্রুশবিদ্ধ যীশুর মতো। একেকজনের ক্রুশের ভার একেক রকম। আচার্য মীর আসরার জামানের পাণ্ডুলিপি চুরির অভিযোগ তোমার জন্য সেই রকমই এক যন্ত্রণা। এ নিয়ে তুমি ভেবো না। ক্রুশ বহন করা কঠিন। কিন্তু বহন করে নিয়ে যেতে পারলে অমরত্ব নিশ্চিত। আরো বিখ্যাত হও। তোমার যাত্রা হোক অনিঃশেষ।
উপন্যাসের একদম শেষ, জনাব রাশার এই টেক্সট দেখে অনন্তের দুই গাল বেয়ে শ্রাবণধারার মতো গড়িয়ে পড়ে অশ্রু আর এর একটু পরেই আমরা পড়ি— অনন্ত, হে আমার শিল্প-উত্তরাধিকারী আজ আমি তোমার প্রতি অতিশয় প্রসন্ন। তোমার জন্য গর্বে আমার বুক মহাসমুদ্রের মতো স্ফীত। আমি ঠিক চয়ন করেছিলাম। শিষ্য চয়নে আমি কোনো ভুল করিনি। আরো যশস্বী হও পুত্র। শিল্পের শীর্ষবিন্দুকে স্পর্শ করো। সতত আমার এই হাত থাকবে তোমার মাথার ওপর।
ফলে, আমরা উপন্যাসটি শেষ করি একটা গভীর এক দার্শনিক উপলব্ধির ভেতর দিয়ে। কি সেই দার্শনিক উপলব্ধি? সেটা হলো, আমরা সকলেই কমবেশি একেকজন ক্রুশবিদ্ধ যীশু। আমাদের সকলেরই আছে ব্যক্তিগত কিছু ক্রুশ যা আমরা বহন করে যাই অনিঃশেষ। যতই ভালো কাজ করি না কেন, যতই আমরা উঁচুতে উঠি না কেন, কোনো লাভ নেই। রবীন্দ্রনাথের কথাই ধরা যাক। তার মতো মহীরুহকে তার জীবদ্দশায় কি কম নিন্দা শুনতে হয়েছে? এমনকি এই আজকের দিনেও তো তিনি কম গালি হজম করেন না। একই দশা লালন ফকিরেরও। একই দশা অনন্ত আতিকেরও। আর একই দশা আমাদেরও। হ্যাঁ, আমরা হয়তো সাধারণ মানুষ, আমাদের হয়তো অত মহৎ কোনো কাজ নেই পুরো জীবনে। কিন্তু তবুও আমরা ধোঁকা খেয়েছি, ভালো কাজের প্রতিদানে নিন্দা পেয়েছি, গালি খেয়েছি, আমাদের পরিশ্রমকেও তুড়ি মেরে কতবার ধূলিসাৎ করা হয়েছে। সেই কষ্ট, সেই বেদনা, সেই রক্তক্ষরণ আমরাও বুকে পুষে রাখি। আমাদের সকলকেই নিরন্তর এক যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। এইক্ষেত্রে জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিস’ উপন্যাসটির কথা না বললেই নয়।
জেমস জয়েস তাঁর ‘ইউলেসিস’ উপন্যাসে মূল চরিত্র লিওপল্ড ব্লুমকে ইউলেসিসের সাথে তুলনা করছেন। ইউলেসিস হলো হোমারের ‘অডিসি’র মূল নায়ক। বলা হয়ে থাকে, জেমস জয়েসের ‘ইউলেসিস’ হলো হোমারের ‘অডিসি’র মডার্ন ভার্শন। ‘অডিসি’র ইউলেসিস একজন হিরো, একজন যোদ্ধা। অথচ উপন্যাসে লিওপল্ড ব্লুমকে আমরা দেখব বোকাসোকা আর দশজন সাধারণ মানুষ হিসেবে। তার সকল কর্মকাণ্ডও একেবারে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের। কোনো এক্সট্রিম স্টাগলের কথা নেই। লিওপল্ড ব্লুম আর দশজন মানুষের মতো খায়দায়, রাস্তায় হেঁটে বেড়ায়, মেয়েদের দিকে তাকায়, ছোট একটা চাকরী করে, চাকরি হারালে চাকরি খুঁজে বেড়ায়, বউয়ের পরকীয়ায় কষ্ট পায়, নিজের মেয়ে নিয়ে চিন্তিত হয়। খুব যে হিরোয়িক কিছু এমন না কিন্তু। তাহলে কেন জেমস জয়েস উপন্যাসের কেন্দ্রিয় চরিত্রকে একজন মহান যোদ্ধার সাথে তুলনা করেছেন? কারণ জয়েস বলতে চান, আমাদের প্রতিদিনের এই অতি সাধারণ জীবন কিন্তু যুদ্ধের চেয়ে কম কিছু নয়। আর সেই যুদ্ধের যোদ্ধা কিংবা হিরো হলো লিওপল্ড ব্লুম, অর্থাৎ আমরা।
জয়েস বলছেন, জীবনের এই জিনিসগুলো আদতে ছোট হলেও যদি আমরা সঠিক লেন্স দিয়ে দেখতে পারি তবে দেখবো এগুলো মোটেও ছোট নয়। আমরা, জয়েসের মতে, একেকজন ইউলেসিস। আবার আরেক দিক থেকে দেখলে, আমরা সকলেই যীশু, ক্রুশবিদ্ধ যীশু।
আলোচনা শেষ করা যাক। উপন্যাস বা যে কোনো সাহিত্যকর্ম একেকজন একেকভাবে পড়ে। অর্থাৎ, কারো পড়ার সাথে, কারো উপলব্ধির সাথে অন্য কারো পাঠ, উপলব্ধি আংশিক মিলে গেলেও পুরোপুরিভাবে মিলে যাওয়ার সুযোগ তেমন একটি নেই। অথচ ‘আচার্য ও তার অলীক পাণ্ডুলিপি’র ব্যাপারে এমনটা পুরোপুরি বলা যাবে না। কেননা, মোটা দাগে এই উপন্যাসটির পাঠক হবেন দুই রকম। যে সকল পাঠকেরা স্বকৃত নোমানকে চেনেন এবং তার ‘উপন্যাসের পথে’ বইটি পড়েছেন তারা একভাবে বইটি পড়বেন আর বাকিরা অন্যভাবে। কারও যদি আগ্রহ থাকে তবে ‘উপন্যাসের পথে’ বইটি পড়ে এরপর উপন্যাসে হাত দিতে পারেন। কিন্তু হ্যাঁ, সেটা না পড়েও উপন্যাসের রস আস্বাদনে কোনো সমস্যা হবার কথা নয়।
























