রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলন, প্রথম শহিদ মিনার
ছাড়পত্র ডেস্কপ্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬
পৃথিবীর ইতিহাসে জাতিসত্তার পরিচয় প্রতিষ্ঠার যত লড়াই আছে, সেসবের মধ্যে আমাদের ভাষা আন্দোলন অনন্য। মাতৃভাষার জন্য জীবন উৎসর্গের এ রকম অদ্বিতীয় ঘটনা বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধজুড়ে শুধুমাত্র বাংলাদেশের ইতিহাসে উজ্জ্বল। আজ আমাদের এই গৌরবময় অমর একুশের ৭৫ বছর পূর্ণ হলো। আজকের দিনে রাজশাহীতে উদ্বোধন করা হলো কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার। নগরীর পুরাতন সার্ভে ইন্সটিটিউটের জায়গায় পূর্ব নির্ধারিত প্রায় ১ একর এলাকাজুড়ে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারটি নির্মাণ করা হয়েছে।
ভাষা আন্দোলনের প্লাটিনাম জয়ন্তীতে কেন্দ্রীয় শহহিদ মিনারে প্রথম আলো জ্বলে উঠলেও, ভাষা আন্দোলনের শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দেশে প্রথম শহিদ মিনার নির্মিত হয় এই রাজশাহী শহরে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাতেই লণ্ঠন, মশাল আর হারিকেন জ্বালিয়ে রাজশাহী কলেজের ছাত্ররা সারা রাত জেগে রাজশাহী কলেজ হোস্টেলের মাঠে ইট ও কাদা দিয়ে বানিয়েছিল স্মৃতিস্তম্ভ। নির্মাণ শেষে শহিদ মিনারের নামকরণ করা হয় ‘শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ’। শহিদ মিনারের গায়ে সেঁটে দেয়া হয় রবীন্দ্রনাথের ‘সুপ্রভাত’ কবিতার দুটি পঙক্তি।
১৯৪৮-১৯৫২ বাংলা ভাষার অস্তিত্ব রক্ষার এই সংগ্রামে সারা দেশে ঢাকার পরে রাজশাহীতেই সবচেয়ে জোরদার আন্দোলন অনুষ্ঠিত হয়। আর এই আন্দোলনের সূতিকাগার ছিল রাজশাহী কলেজ, লীলাভূমি ছিল ভুবনমোহন পার্ক। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উত্থাপিত পরিষদের ব্যবহারিক ভাষা হিসেবে বাংলাকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি নাকচ হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় রাজশাহীতে প্রতিবাদ সংঘটিত করে ছাত্রসমাজ। সে বছরই ১১ মার্চ বাংলা ভাষার দাবিতে পালিত হয় হরতাল।
‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান নিয়ে রাজশাহী কলেজ থেকে আন্দোলনকারী ছাত্ররা একটা বিক্ষোভ মিছিল বের করে। সে মিছিল বরেন্দ্র জাদুঘরের সামনে গেলে পুলিশ ছাত্রদের ওপরে গুলি চালায়, এতে বহু ছাত্র গুরুতর আহত হয়। আমাদের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস এটিই প্রথম রক্তঝরার ঘটনা। তবে ছাত্রদের ওপরে গুলি চালিয়েও পাকিস্তানি শাসক আর তাদের দোসরা আন্দোলন দমাতে ব্যর্থ হয়। ১৯৪৮-১৯৫২ সালে রাজশাহীতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করার দাবিতে নিয়মিতভাবেই চলছিল সংগ্রাম।
১৯৫২ সালের শুরু থেকেই যখন ভাষা আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে, রাজশাহীর ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং সাধারণ জনগণ রাজপথে নেমে আসে। প্রতিদিনই চলতে থাকে মিছিল-মিটিং আর দাবি আদায়ের সমাবেশ। এই মিছিলগুলো সাধারণত বের করা হতো রাজশাহী কলেজ থেকে, সেসব শহর প্রদক্ষিণ করে বিক্ষোভ সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হতো ভুবনমোহন পার্কে। ১৯৫২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ভুবন মোহন পার্কে আন্দোলনের প্রথম জনসভা অনুষ্ঠিত হয়।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীর আন্দোলনকারীরা আগেই আশংকা করেছিল, দাবি আদায়ে ঢাকায় বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভেঙে পথে বের হবে আর পুলিশ তাদের ওপরে গুলি চালাবেই। বিকেলের দিকেই রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে খবর আসে ঢাকায় ছাত্রদের মিছিলে পুলিশ গুলি চালিয়ে বহু ছাত্রকে হত্যা করে। সেদিন কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাজশাহীতে ছিল দিনব্যাপী হরতাল। যখন ছাত্রদের শহিদ হবার খবর আসে, তখনও ভুবনমোহন পার্কে চলছিল জনসভা।
আন্দোলনকারী ছাত্ররা এই হত্যার খবর পাওয়ামাত্র বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। সবাই সমস্বরে স্লোগান তোলে, ‘শহিদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। এই জনসভা থেকেই ছাত্রদের রাজশাহী কলেজ নিউ হোস্টেলের মাঠে উপস্থিত থাকার জন্য বলা হয়। নগরীর সমস্ত মেস ও বাড়িঘর থেকে ছাত্ররা বেরিয়ে আসে। শত শত ছাত্র জমা হয় রাজশাহী কলেজের নিউ হোস্টেলের সামনের মাঠে।
তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে দুটি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়: ১. ভাষা আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হবে। ২. শহিদদের স্মরণে শহিদ মিনার নির্মাণ করা হবে। এরপর সেই রাতেই লণ্ঠন, মশাল আর হারিকেন জ্বালিয়ে সবার সহায়তায় রাজশাহী কলেজের ছাত্ররা সারা রাত জেগে রাজশাহী কলেজ হোস্টেলের মাঠে ইট ও কাদা দিয়ে বানায় ‘শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ’। এটিই বাংলাদেশের প্রথম শহিদ মিনার।
মাতৃভাষার সম্মান আর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে রাজশাহীর সাধারণ জনগণ আর ছাত্রসমাজ অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হয়েছে। জেল-জুলুম ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। আন্দোলনকারীদের একবার গ্রেফতার করার পর পাকিস্তান সরকার তাদের দীর্ঘদিন জেলে রাখত, জামিন হলেও আবার জেলগেট থেকেই করা হতো গ্রেফতার।
এই আন্দোলনে পিছিয়ে ছিলেন না নারীরাও। ডক্টর বেগম জাহান আরা, বেগম মনোয়ারা রহমান, ডা. মোহসেনা বেগম, হাফিজা বেগম টুকু, ফিরোজা বেগম, হাসিনা বেগম, রওশন আরা, খুরশীদা বেগম, আখতার বানু প্রমুখ এই আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন। এদের মধ্যে ডা. মোহসেনা বেগম মিছিলের নেতৃত্ব দিতেন আর জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়ে আন্দোলনকারীদের উজ্জীবিত করতেন।
এই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে সমাজসেবক মাদার বখশ, ক্যাপ্টেন শামসুল হক, জননেতা আতাউর রহমান, শহিদ বীরেন্দ্রনাথ সরকার, মোহম্মদ সুলতান, অধ্যাপক মুহাম্মদ একরামুল হক, ডক্টর কাজী আব্দুল মান্নান, ডক্টর আবুল কশেম চৌধুরী, বিচারপতি হাবিবুর রহমান শেলী, ডা. এম. লতিফ, বিচারপতি মোহাম্মদ আনসার আলী, অ্যাডভোকেট মহসীন প্রামাণিক, নাট্যকার মমতাজ উদ্দীন আহমদ, অ্যাডভোকেট আবুল কালাম চৌধুরী, লুৎফর রহমান মল্লিক ডলার, ডা. এসএম আব্দুল গাফফার, ডা. মেসবাউল হক, অ্যাডভোকেট মো. আব্বস আলী, এমএ সাঈদ, অ্যাডভোকেট আহমদ উল্লাহ চৌধুরী, আব্দুল মালেক খান, সাংবাদিক সাইদ উদ্দিন আহমদ, মজিবুর রহমান, ডাক্তার আজিজুল বারী চৌধুরী, অ্যাডভোকেট সৈয়দ আমীর হোসেন স্পেন, জামাল উদ্দিন আহমদ, লেখক মুহম্মদ শুকুর উদ্দিন ইবনে খৈয়াম, আশরাফুল আবেদিন, মহিদউদ্দন আহমদ, প্রফেসর মোহাম্মদ আবুল হোসেন, অ্যাডভোকেট মো. সমসের উদ্দিন, অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জিয়ারত উল্লাহ, আব্দুস সাত্তার মাস্টার, মোশাররফ হোসেন আখুঞ্জী নীলূ, গোলাম আরিফ টিপু, আনোয়ারুল আজিম, ইয়াসিন আলী, ড. গোলাম মকসুদ হিলালী, তসিকুল ইসলাম অন্যতম।
সূত্র: ১. আন্দোলন ও নির্যাতনের পঞ্চাশ দশক
২. রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলন ১৯৪৮-১৯৫২
৩. রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলন





















