মমেক হাসপাতালে আগুন, নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি
ছাড়পত্র ডেস্কপ্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের বহির্বিভাগের নতুন ভবনে আগুন লেগে ও আতঙ্কে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে এক শিশুসহ ৬ জন নিহত ও ২০ জন আহত হয়েছে। তবে নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
সোমবার সন্ধ্যা আনুমানিক ৫টা ৫৫ মিনিট থেকে ৬টা ২০ মিনিটের মধ্যে বহুতল ভবনটির বহির্বিভাগে আগুন লাগে। প্রাথমিকভাবে ফায়ার সার্ভিস ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হতাহতের বিষয়টি এড়িয়ে গেলেও আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর জরুরি বিভাগে খোঁজ নিয়ে পদদলিত হয়ে ছয়জন নিহতের খবর জানা যায়।
নিহতরা হলেন: নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার বসী গ্রামের হাজেরা বেগম (৫০), ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া গ্রামের শাহজাহান (৪০), একই উপজেলার আহমদ আলীর ছেলে রমজান (৩৮), হোসেন আলীর ছেলে জাহানারা (৫০), তারাকান্দা উপজেলার বালিখা গ্রামের কুলসুমা (৩৫) এবং এক অজ্ঞাতপরিচয় শিশু।
প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিক তানভীর হোসাইন বলেন, “শুরুতে আগুনের উৎস নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং শিশু ওয়ার্ডে আগুন লেগেছে বলে তীব্র গুজব ছড়িয়ে পড়ে। পরে নিশ্চিত হওয়া যায়, ভবনের অষ্টম তলার ছাদে অবস্থিত ১১ নম্বর লিফটের কন্ট্রোল রুম থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে পুরো ভবনজুড়ে বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়লে চরম আতঙ্ক তৈরি হয়। প্রাণভয়ে মুমূর্ষু রোগীরাও শয্যা ছেড়ে স্বজনদের আঁকড়ে ধরে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করে।”
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, অগ্নিকাণ্ডের সময় ভবনটি থেকে দ্রুত বের হওয়ার পর্যাপ্ত পথ ছিল না। বিকল্প হিসেবে ৪টি সিঁড়ি থাকলেও সেগুলো সব সময় তালাবদ্ধ রাখা হতো। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার সিঁড়িগুলো খুলে রাখার অনুরোধ জানানো হলেও কোনো কাজ হয়নি। ফলে অগ্নিকাণ্ডের সময় হাজারো রোগী ও স্বজনেরা একটিমাত্র সরু সিঁড়ি দিয়ে একসাথে নামতে বাধ্য হয়। এতে ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা ও ধাক্কাধাক্কিতে নিচে পড়ে অনেকেই পদদলিত হয়।
ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মী, স্টাফ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ সহায়তায় প্রায় ১ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন ও ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে আনে।
ময়মনসিংহ সদর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার জুলহাজ উদ্দিন ও হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন খান জানান, লিফটের মেশিন অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে কিংবা শর্টসার্কিট থেকে আগুন লেগেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. জাকিউল ইসলাম বলেন, “পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর রোগীদের পুনরায় নিজ নিজ শয্যায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে।”
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য, বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি, ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, জেলা প্রশাসক, র্যাব ও জেলা পুলিশসহ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
পরিদর্শনকালে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক রুকুনোজ্জামান হাসপাতালের অচল লিফট ব্যবস্থা ও সিঁড়ি তালাবদ্ধ রাখার বিষয় নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “অবহেলা বা দায়িত্বহীনতা প্রমাণিত হলে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ময়মনসিংহের উপমহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান বলেন, “ঘটনাটি এখনও নিবিড়ভাবে তদন্ত করা হচ্ছে।”
ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর ময়মনসিংহের বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির সরকার বলেন, “হাসপাতালে ছয়জন নিহত হওয়ার তথ্যটি এখনও প্রমাণসহ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। জরুরি বিভাগ ও মর্গের তথ্যে কিছুটা গরমিল থাকায় যাচাই-বাছাই ছাড়া বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার না করার আহ্বান জানাচ্ছি।”
আগুন লাগার সঠিক কারণ ও ক্ষয়ক্ষতি খতিয়ে দেখতে মমেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক গোলাম রহমান ভূঁইয়াকে প্রধান করে গণপূর্ত অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের প্রতিনিধিসহ ৫ সদস্যের একটি প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে ৩ কার্যদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
























