মারিয়া সালামের গদ্য ‘কান্নাপ্পা’
প্রকাশিত : অক্টোবর ১৬, ২০২৬
দক্ষিণ ভারতের থিন্নন বা কান্নাপ্পা নায়নার ছিলেন শিকারি সম্প্রদায়ের মানুষ। বেদ-পুরাণের শাস্ত্রজ্ঞান, মন্ত্রোচ্চারণ কিংবা পূজার বিধিবিধান সম্পর্কে তাঁর বিশেষ ধারণা ছিল না। কিন্তু শিবের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও ভক্তি ছিল অপ্রতিরোধ্য।
লোকপ্রচলিত কাহিনি অনুসারে, একদিন শিকারে বেরিয়ে থিন্নন বনের মধ্যে একটি শিবলিঙ্গের সন্ধান পান। শিবলিঙ্গটি দেখে তার মনে গভীর ভক্তি জন্মায়। থিন্নন জানতেন না, প্রচলিত নিয়মে কীভাবে শিবের পূজা করতে হয়। কিন্তু মহেশ্বরের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা থেকে থিন্নন নিজের মতো করে শিবলিঙ্গটির আরাধনা করতে লাগলেন।
শিকারি হিসেবে তাঁর কাছে সবচেয়ে সহজলভ্য ছিল মাংস, তা দিয়েই তিনি শিবের সেবা শুরু করলেন। শিকার করে আনা পশুর মাংস তিনি শিবলিঙ্গের সামনে নিবেদন করা শুরু করলেন। থিন্ননের কাছে এটিই ছিল ঈশ্বরের জন্য তার সর্বোত্তম উপহার।
মাংস নিবেদনের আগে থিন্নন শিবলিঙ্গটি পানি দিয়ে পরিস্কার করতেন, কিন্তু পানি আনার জন্য তার কোনো পাত্র ছিল না। কোনো পাত্র না পেয়ে থিন্নন নিজের মুখে করে পানি এনে তা শিবলিঙ্গের ওপর ঢেলে দিতেন।
এদিকে, শিবলিঙ্গটির নিয়মিত পূজা করতেন এক ব্রাহ্মণ পুরোহিতও। তিনি শাস্ত্র মেনে ফুল নিবেদন করতেন। থিন্নন এসে মাংস নিবেদন করার সময় সেই ফুল পা দিয়ে সরিয়ে দিতেন। কারণ, তার কাছে সেটিই ছিল স্বাভাবিক উপায়।
যে আচরণ একজন আচারনিষ্ঠ পুরোহিতের চোখে অসম্মানজনক মনে হতে পারত, থিন্ননের কাছে তা ছিল নিখাদ ভালোবাসার প্রকাশ। তিনি শাস্ত্রের ভাষা জানতেন না, তিনি জানতেন শুধু কীভাবে নিজের সর্বস্ব দিয়ে প্রিয়জনের সেবা করতে হয়।
একদিন থিন্নন দেখতে পেলেন, শিবলিঙ্গের একটি চোখ থেকে রক্ত ঝরছে। ঈশ্বরের এই অবস্থা দেখে তিনি বিচলিত হয়ে উঠলেন। কীভাবে রক্ত বন্ধ করা যায়, তা বুঝতে না পেরে নিজের চোখ উপড়ে শিবলিঙ্গের সেই স্থানে স্থাপন করলেন। এই চোখের নিবেদনে রক্তপাত বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর শিবলিঙ্গের অন্য চোখ থেকেও রক্ত ঝরতে শুরু করল।
থিন্নন এবার তার অন্য চোখটিও নিবেদন করার সিদ্ধান্ত নিলেন। প্রথম চোখটি উপড়ে দেওয়ার পর তিনি দ্বিতীয় চোখের অবস্থান হারিয়ে ফেলতে পারেন—এই আশঙ্কায় তিনি নিজের পা দিয়ে শিবলিঙ্গের সেই স্থান চিহ্নিত করে রাখেন, যাতে চোখটি সঠিক জায়গায় স্থাপন করতে পারেন। তিনি যখন দ্বিতীয় চোখটিও উৎসর্গ করতে উদ্যত হলেন, তখন শিব স্বয়ং আবির্ভূত হয়ে তাকে থামিয়ে দিলেন।
শিব এবার ভক্তের এই আত্মত্যাগে সন্তুষ্ট হয়ে থিন্ননকে আশীর্বাদ করলেন। এই অসাধারণ ভক্তির কারণেই থিন্নন পরে ‘কান্নাপ্পা’(যিনি চোখ দিয়ে পুজো করেছেন) নামে পরিচিত হন। প্রমাণিত হয়, ঈশ্বরের কাছে শাস্ত্রনির্ধারিত আচারের চেয়ে ভক্তের অকৃত্রিম ভালোবাসা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তীকালে কান্নাপ্পা শৈব ধর্মের ৬৩ জন নায়নার বা বিশিষ্ট শিবভক্তের অন্যতম হিসেবে সম্মানিত হন।
কান্নাপ্পার কাহিনি প্রমাণ করে, ঈশ্বরের কাছে নিবেদনের বাহ্যিক উপকরণের চেয়ে নিবেদকের মন ও উদ্দেশ্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে, কী উৎসর্গ করা হলো, তা মুখ্য নয়; মুখ্য হলো, কেন করা হলো।
আন্তরিক ভক্তি, বিশ্বাস বা নিবেদনের মনোভাব থেকে কেউ যদি ঈশ্বরকে মাংস নিবেদন করেন, হয়তো ঈশ্বর খুশি হয়ে সেটা গ্রহণ করেন। কিন্তু, অন্য ধর্মের অনুসারীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা কিংবা উসকানি সৃষ্টি করার জন্য কেউ যদি ফুল নিয়েও দাঁড়িয়ে থাকে তাও সেটা একটা ঘৃণিত বিষয়।
মনে ভক্তি থাকলে মাংস দিয়েও মহেশ্বরের মন জয় করা সম্ভব, কিন্তু মনে অসম্মান আর বিদ্বেষ থাকলে হাতে ফুল নিয়ে দাঁড়ালেও ঈশ্বরের অভিশাপ খণ্ডানো যায় না। চোখে দেখা না গেলেও সেই প্রকোপ এড়িয়ে যাওয়া কারো পক্ষেই সম্ভব না।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সংবাদকর্মী























