সাঈফ ইবনে রফিক

সাঈফ ইবনে রফিক

বাংলা ভাষায় আন্তর্জাতিকতার আগমনী বিউগল

কামরুল হাসান

প্রকাশিত : অক্টোবর ২১, ২০২৬

সাঈফ ইবনে রফিকের জন্ম বাংলাদেশে। কিন্তু তার কল্পনার জন্ম বহু ভূগোলে। তার কবিতা পড়তে গিয়ে এই অনুভূতিই বারবার ফিরে আসে। বাংলার নদী ও চর, ভূমধ্যসাগরের উপকূল, আরবের ইতিহাস, ইউরোপীয় দর্শন, ধর্মগ্রন্থের প্রতীক এবং প্রযুক্তির সমকাল তার কবিতায় প্রায়ই একই সঙ্গে হাজির। কোথাও এই সহাবস্থান তৈরি করে ব্যঙ্গ, কোথাও অস্তিত্বের প্রশ্ন, কোথাও যুদ্ধাহত মানুষের আর্তি। ফলে সাঈফকে শুধু প্রতিবাদী, শুধু দার্শনিক কিংবা শুধু ধর্মভাবনার কবি বললে তার লেখালেখির বৃহত্তর অভিমুখ আড়াল থেকে যায়।

বাংলা কবিতায় বিশ্বসাহিত্যের সংযোগ তার হাত ধরে শুরু হয়নি। রবীন্দ্রনাথের বিশ্বমানবতা, নজরুলের আরব-পারস্যের অনুষঙ্গ, জীবনানন্দের ইতিহাসচেতনা এবং পরবর্তী আধুনিকদের বহির্বিশ্বপাঠ সেই পথ তৈরি করেছে। সাঈফের বিশেষত্ব অন্যত্র। বিশ্বায়ন ও তথ্যপ্রযুক্তির যুগে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অভিবাসন, পুঁজিবাজার, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও ধর্মীয় পরিচয়ের সংঘাতকে তিনি বাংলা কবিতার নিত্যব্যবহার্য ভাষার সঙ্গে মেলাতে চেয়েছেন। বিদেশি নাম বা তত্ত্ব তার কবিতায় শুধু পাণ্ডিত্যের চিহ্ন নয়; প্রায়ই তা স্থানীয় বাস্তবতাকে নতুন আলোয় দেখার উপায়।

তার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় ১৯৯৯ সালে হেনরী স্বপন সম্পাদিত ‘জীবনানন্দ’ কবিতাপত্রে। লেখালেখির সূচনা বরিশাল ক্যাডেট কলেজে পড়ার সময়; সেখানে তার শিক্ষক ছিলেন কবি রফিক নওশাদ। ক্যাডেটজীবনের শৃঙ্খলা এবং তরুণ কবির নিয়মভাঙা ভাষা পাশাপাশি রাখলে এক আকর্ষণীয় দ্বন্দ্ব চোখে পড়ে। প্রতিষ্ঠানের ভেতর বেড়ে উঠেও তিনি কাব্যে প্রতিষ্ঠিত শব্দবিন্যাসের অনুগত হননি। তবে শিক্ষকের সান্নিধ্য থেকে তার কোন নির্দিষ্ট কবিতারীতি এসেছে, তার সরল সমীকরণ টানা ঠিক হবে না।

এই লেখকসত্তা গঠনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ পরিসর লিবিয়ার শৈশব। গাদ্দাফির আমলের মিসরাতায় তিনি দেখেছেন কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের সুযোগ এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের বিপরীত দুই মুখ। পরে স্মৃতিকথায় ফিরে এসেছে উন্নয়ন ও স্বাধীনতার এই টানাপোড়েন। প্রবাসেই তার মা নিজ হাতে বাংলা শেখাতেন, বাবা সন্তানদের বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত রাখতে চাইতেন। অর্থাৎ মাতৃভাষা ও দেশ তার কাছে প্রথমে দৈনন্দিন ভূগোল নয়, স্মৃতি ও পারিবারিক অনুশীলনের বিষয়। ফিলিস্তিনি এক উদ্বাস্তু মানুষকে সহায়তা করার পারিবারিক স্মৃতিও তার লিবিয়া-অভিজ্ঞতায় রয়েছে। পরবর্তীকালের রাষ্ট্রসচেতনতা ও ফিলিস্তিনবিষয়ক লেখার সঙ্গে এসব স্মৃতির চিন্তাগত যোগ খুঁজে পাওয়া যায়, যদিও জীবনঘটনা থেকেই সরাসরি কবিতার অর্থ নির্ধারণ করা যায় না।

নব্বইয়ের দশকের বাংলা কবিতা ছিল বহু স্বরের সমাবেশ। নাগরিক বিচ্ছিন্নতা, লোকজ উপাদানের পুনর্ব্যবহার, উত্তরাধুনিক নিরীক্ষা, ইতিহাস ও মিথের নতুন পাঠ তার গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা। কাজেই নব্বই মানেই অলংকারের ভার, আর শূন্য দশক মানেই সরল ভাষা, এমন বিভাজন সাহিত্য-ইতিহাসকে ছোট করে। কিন্তু শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে একদল কবি যে দ্রুত বদলে যাওয়া বিশ্ব ও কথ্যজীবনকে নতুন ভাষায় ধরতে চেয়েছিলেন, তা অস্বীকার করা যায় না। সাঈফ এই পরিবর্তনধারার একটি স্বতন্ত্র স্বর। তার কবিতার আগমনী বিউগল পূর্বসূরিদের অস্বীকারে নয়, তাদের ভাষার ভেতরে নতুন উপাদানের চাপ সৃষ্টি করায়।

২০০৭ সালে সামহোয়্যারইন ব্লগে ‘ঘোর’ নামে প্রকাশিত ‘দুধভাই ও আমার কবিতা ভাবনা’ এই আত্মসচেতনতার দলিল। কবি ইমরান মাঝির জীবনঘনিষ্ঠ, স্থানীয় অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজের দার্শনিক ও তথ্যনির্ভর কবিতার পার্থক্য তিনি সেখানে চিহ্নিত করেন। একই সঙ্গে বুঝতে চান, বিশ্বায়নের অভিঘাতে গ্রাম ও মানুষের পরিচয় কীভাবে বদলাচ্ছে। অর্থাৎ স্থানীয়তা ও আন্তর্জাতিকতা তার কাছে বিপরীত মেরু নয়। গ্রামের বাজারেও বিশ্ব অর্থনীতির ছাপ দেখা যায়; স্থানীয় অভিজ্ঞতাকে সেই বৃহত্তর ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করাই তাঁর কাব্যিক আগ্রহের অংশ।

প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রঙঅন্ধ আয়াতসমূহ’ (২০০৮) নামেই তা শব্দব্যবহারের লক্ষণ দেখা যায়। ‘রঙঅন্ধ’ দৃশ্য ও বিজ্ঞানের শব্দ, ‘আয়াত’ ধর্মীয় অর্থবাহী। পরস্পর অপরিচিত দুই জগৎকে পাশাপাশি এনে তিনি পাঠের নতুন রাস্তা খুলতে চান। প্রাথমিক কবিতা ‘চেরাগের ঘঁষায় পেয়ে যাবে তোমার রিয়েল এস্টেট’-এ আরব্য রজনীর অলৌকিক উপাদান মেশে সম্পত্তি ও ভূমির বাস্তবতায়। অন্য কবিতায় ঘড়ি, সময়, আগুন ও শ্বাসকষ্টের চিত্রকল্প হয়ে ওঠে দার্শনিক বৈপরীত্যের বাহন।

এমনকি তার প্রেমের কবিতাও প্রচলিত রোমান্টিকতার নিরাপদ পরিসরে আবদ্ধ নয়। ২০১০ সালের ‘পরকীয়া’ কবিতাগুচ্ছে শাড়ি, চুড়ি, ই-মেইল, পলিথিন ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিচিত্র অনুষঙ্গ ব্যক্তিগত সম্পর্কের সঙ্গে মিশেছে। প্রেম সেখানে বিচ্ছিন্ন কোনো আবেগ নয়, পরিবর্তনশীল সময়ের মধ্যেই তার অবস্থান। এই আকস্মিক সংযোগ তার শক্তি, আবার সীমাও। কখনো চিত্রকল্পের প্রতিযোগিতায় অনুভূতির মূল সুর ঢাকা পড়ে। তবু অপ্রত্যাশিত শব্দসংযোগের মধ্য দিয়ে কবিতার অর্থগত সীমানা সম্প্রসারণের চেষ্টাটি তাঁর কাব্যভাষাকে স্বতন্ত্র করেছে।

তার কবিতার দার্শনিক অন্বেষণ সবচেয়ে উজ্জ্বল হয় যখন তত্ত্ব কাব্যিক ঘটনায় রূপ নেয়। ‘কুফুরি কালাম’য়ে মানুষ প্রভুর কাছে মুক্তি চায়, মুক্ত হয়ে আবার আশ্রয়ে ফিরতে চায়। একপর্যায়ে স্বাধীনতার দাবিই অনিবার্য বিধানের সামনে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এখানে বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের সহজ দ্বন্দ্ব নেই; রয়েছে স্বাধীন ইচ্ছা, নিয়তি, অঙ্গীকার ও আত্মসমর্পণের জটিল সংলাপ। ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহারের মধ্যেও প্রশ্নের জায়গাটি অক্ষুণ্ণ থাকে। নীৎশে, ফুকো, দেরিদা কিংবা বিজ্ঞানের পরিভাষা নিয়ে তাঁর অন্য কবিতাগুলোকে বুঝতেও এই পার্থক্য জরুরি। দার্শনিকের নাম উচ্চারণে নয়, চিন্তাকে শিল্পিত পরিস্থিতিতে রূপ দিতে পারাতেই কবিতার সাফল্য।

এই জায়গায় আবু তাহের সরফরাজের মূল্যায়ন উল্লেখযোগ্য। ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর ‘বাংলা রিভিউ’য়ে প্রকাশিত ‘রাজনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে হাতিয়ার সাঈফ ইবনে রফিকের কবিতা’ প্রবন্ধে তিনি সাঈফকে শূন্য দশকের পরিবর্তিত কাব্যভাষার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি হিসেবে দেখেছেন। তার পর্যবেক্ষণ, কবিতাগুলো প্রাঞ্জল ও গল্প বলার ভঙ্গিতে নির্মিত; সরল বাক্যের ভেতরে প্রতীকের কাজ চলে। তিনি মানবিক মূল্যবোধ, ইসলামি দর্শন এবং সামাজিক-রাষ্ট্রীয় অন্তঃসারশূন্যতার সমালোচনাকে প্রধান বৈশিষ্ট্য বলেছেন। ‘কুফুরি কালাম’য়ের আলোচনায় স্বাধীনতার সীমা নিয়ে তাঁর পাঠ বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে।

তবে সরফরাজের ধর্মতাত্ত্বিক পাঠই শেষ কথা নয়। ‘মগজের আরাম’, ‘জান্নাত ও জাহান্নাম’ কিংবা ‘প্রিয় মুহাম্মদ’য়ে ধর্মীয় অনুষঙ্গ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে ভণ্ডামি, আত্মপ্রবঞ্চনা, ভোগবাদ ও ধর্মের সামাজিক ব্যবহারের ব্যঙ্গ। বিশ্বাসের ভাষাকে প্রশ্ন করার ভাষাতেও রূপ দেওয়া সাঈফের একটি বৈশিষ্ট্য। তাই তাকে নিছক প্রচারধর্মী কিংবা কেবল প্রতিবাদী কবি হিসেবে পড়লে তার কবিতার দ্বিধা, কৌতুক ও অন্তর্লীন সংশয় হারিয়ে যায়।

তার সামাজিক ব্যঙ্গের লক্ষ্য শুধু রাষ্ট্র নয়, সাহিত্য ও সংবাদমাধ্যমও। ‘কবিসংঘ’য়ে কবিতার জগতে গোষ্ঠীপ্রীতি ও সুবিধাবাদ, ‘নিউজ’য়ে সংবাদকে গসিপে নামিয়ে আনার প্রবণতা তিরস্কৃত হয়েছে। ‘ঢাকায় ডোরেমন’য়ের মতো ব্লগগদ্যে কল্পিত চরিত্রের সাহায্যে নগরজীবন ও ক্ষমতার অসংগতি ধরা পড়ে। এই রচনাগুলো দেখায়, কবি ও সাংবাদিক তার ভেতর আলাদা কক্ষে বাস করেন না। কবির রূপক সামাজিক সমালোচনায় কাজে লাগে, সাংবাদিকের বাস্তবজ্ঞান কবিতার উপাদান হয়। তবে রাজনৈতিক বক্তব্য বেশি সরাসরি হয়ে উঠলে কবিতা কখনো শিল্পের বদলে ঘোষণাপত্রের কাছাকাছি পৌঁছে যায়।

সাঈফের আন্তর্জাতিকতার আরেকটি ভিত্তি অনুবাদ। ২০১৯ সালে প্রকাশিত ‘ফিলিস্তিনের সমকালীন কবিতা’ অনুবাদগুচ্ছে মুনির মাজেদ, রেমি কানাজি, রোস শোমালি ও নাথালি হান্দালের কবিতা তিনি বাংলায় এনেছেন। এখানে ফিলিস্তিন মানে শুধু সংঘাতের সংবাদ নয়; উদ্বাস্তু পরিবারে সংরক্ষিত বাড়ির চাবি, প্রজন্মান্তরে বহন করা স্মৃতি, হারানো আত্মীয় ও ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। শৈশবে দেখা উদ্বাস্তু মানুষের বেদনা যেন অনুবাদের মাধ্যমে বৃহত্তর মানবিক ভাষা পায়। তবে অনুবাদের নান্দনিক সাফল্য বিচার করতে মূল ভাষার কবিতার সঙ্গে বাংলা পাঠ মিলিয়ে দেখা জরুরি।

২০২৩ সালে তাঁর ফিলিস্তিনবিষয়ক মৌলিক ও অনূদিত কবিতার আয়োজনে ফিলিস্তিনি কণ্ঠের পাশাপাশি আইরিশ ও ইজরায়েলি কবিদের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য। এটি জাতীয় পরিচয়ের সীমানা অতিক্রম করে মানবিক অভিজ্ঞতার সংলাপ তৈরির প্রয়াস। ‘বাপের নাম ভুলে গেছে ডায়াসপোরা পাখি’ কবিতায় পরিচয়, অভিবাসন, আরব ইতিহাস ও ইউরোপীয় বর্তমান একই প্রশ্নমালায় যুক্ত হয়। আবার ‘বার্মিজ কফিতে মুখ পুড়লো আলাওলের’ কবিতায় মধ্যযুগের কবি আলাওলকে সমকালীন আরাকান ও রোহিঙ্গা সংকটের সামনে দাঁড় করানো হয়েছে। এভাবেই বাংলা সাহিত্যিক স্মৃতি বৈশ্বিক রাজনীতির সঙ্গে কথা বলে।

অনুবাদক সাঈফ ও মৌলিক কবি সাঈফের মধ্যে এখানে একটি লক্ষণীয় সম্পর্ক রয়েছে। মৌলিক কবিতায় তিনি ভিন্ন ভূগোলকে নিজের ভাষায় পুনর্নির্মাণ করেন, অনুবাদে অন্যের ভাষাগত অভিজ্ঞতাকে বাংলায় আশ্রয় দেন। প্রথমটি আত্মপ্রকাশের, দ্বিতীয়টি অন্যের কণ্ঠস্বর শোনার শিল্প। উভয় ক্ষেত্রেই তার আগ্রহ মানুষের পরিচয়, বিচ্ছিন্নতা, অধিকার ও স্মৃতির প্রশ্নে। বাংলা ভাষায় আন্তর্জাতিকতার প্রকৃত তাৎপর্যও এখানে। বিশ্বকে শুধু নিজের চোখে দেখা নয়, অন্যের চোখ দিয়ে দেখার সুযোগ তৈরি করা।

‘রঙঅন্ধ আয়াতসমূহ’ থেকে ‘এখনও লকডাউন হয়নি কবিতা’ (২০২০), তারপর ‘সাঈফিজম’ (২০২৪), এই গ্রন্থপরিক্রমায় নিরীক্ষা ও সামাজিক বক্তব্য পাশাপাশি চলেছে। ‘সাঈফিজম’ নামটি একদিকে নিজস্ব ভাবজগতের ঘোষণা, অন্যদিকে মতবাদের অহংকারকে নিয়ে আত্মব্যঙ্গ হিসেবেও পড়া যায়। গ্রন্থের প্রেক্ষিতে ধর্ম, দর্শন ও সাংস্কৃতিক বহুত্বের প্রসঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ হলেও কেবল নাম কিংবা প্রচারণার বিবরণ দিয়ে তার সামগ্রিক শিল্পমান স্থির করা চলে না। নির্বাচিত কবিতার নিবিড় পাঠই এ বিষয়ে সিদ্ধান্তের ভিত্তি হতে পারে।

পরে কলামিস্ট হিসেবে রোহিঙ্গা সংকট, আরাকান, সীমান্ত, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও সাংবাদিকতার নীতি নিয়ে তাঁর লেখায় কবিতার বহু পুরোনো প্রশ্ন নতুন কাঠামো পেয়েছে। ‘সীমান্তে এ এক নীরব আত্মত্যাগ’য়ে সীমান্তরক্ষীর পরিবারের অনুপস্থিতি ও অপেক্ষাকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। অন্যদিকে ফেলানীকে নিয়ে লেখায় সীমান্তে ন্যায়বিচারের দাবি সামনে এসেছে। এই দুই মুখ পাশাপাশি রাখা জরুরি। দেশপ্রেম যদি মানুষের প্রতি দায় হয়, তবে নিরাপত্তায় নিয়োজিত মানুষের মর্যাদা এবং ক্ষমতার মুখে অসহায় মানুষের অধিকার, উভয়ই তার অংশ। কলামের তথ্যভিত্তিক যুক্তি যেন কবির স্বাধীন প্রশ্নকে আড়াল না করে, এটাই তাঁর পরিণত লেখকসত্তার পরীক্ষা।

সাঈফ ইবনে রফিকের অর্জন তাই কেবল কবিতায় বিদেশি দর্শন বা আন্তর্জাতিক ঘটনাবলির সমাবেশ নয়। তার উল্লেখযোগ্য কাজ হলো বাংলা ভাষার আটপৌরে ভঙ্গিতে বহুদূরের ইতিহাস, ধর্মীয় সংকট ও সমকালীন ক্ষমতাসম্পর্ককে আলাপের মধ্যে আনা। এই প্রয়াস সব কবিতায় সমান সফল হয়নি। কোথাও তত্ত্ব ও তথ্যের ভারে শিল্প ঢেকে গেছে, কোথাও বক্তব্যের তাড়নায় প্রতীক হারিয়েছে স্বাভাবিক দীপ্তি। কিন্তু সার্থক মুহূর্তে তিনি দেখিয়েছেন, বাংলা কবিতা একসঙ্গে স্থানীয় ও বৈশ্বিক, সরল ও দার্শনিক, বিশ্বাসী ও প্রশ্নমুখর হতে পারে।

১৯৯৯ সালে ‘জীবনানন্দ’ কবিতাপত্রে শুরু হওয়া যাত্রা থেকে শূন্য দশকের ‘ঘোর’, ফিলিস্তিনি-আরব কবিতার অনুবাদ ও ‘সাঈফিজম’ পর্যন্ত তার লেখালেখিতে একটি সূত্র অটুট: পরিচিত পৃথিবীকে অপরিচিত প্রশ্নের সামনে দাঁড় করানো। নব্বইয়ের দশকের কাব্যঐতিহ্যকে অস্বীকার না করেই শূন্য দশকে তিনি নতুন স্বরের দাবি তুলেছেন। সেই স্বরের গুরুত্ব কোনো একক বিপ্লবের দাবিতে নয়; বাংলা ভাষায় বিশ্বের জটিল অভিজ্ঞতাকে কবিতার আলোচনায় আনার অধ্যবসায়ে। তার কবিসত্তার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিচয় সম্ভবত এখানেই: বিশ্বকে বাংলায় পড়া এবং বাংলাকে বিশ্বের সঙ্গে কথা বলানো।

লেখক: অধ্যাপক, টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়