আসমা অধরা

আসমা অধরা

আসমা অধরার ৫ কবিতা

প্রকাশিত : অক্টোবর ২৮, ২০২৬

অলক-১

ভাবছিলাম হয়তো জুঁইফুলের নুপুর
বা হিজল ফুলের গায়ে ভেঙে পড়া
বৃষ্টির এক-একটি ফোঁটা, বাজছে শ্রবণে
ভৈরবী অথবা না জানা কোনো সিম্ফোনি

ঘুমের ভেতর, ইথারে পাথারে হাসি
খুব রিনরিনে অথবা অনাচারী নয়
যথেষ্ট পুরুষ আবেশ, কাণ্ডে বা বৃত্তে
অথচ তার করতলের মতো নরম।

এদিকে আকাশ ভেঙে পড়ছে বর্ষায়
মানবী নয়, প্রেয়সী নয়; তবু বাঁধভাঙা
তার লহর জুড়ে বেজে যাচ্ছে সে
যথেষ্টই পুরুষ; তবু অনাচারী নয়।

অলক-২

সে; এক ভ্রমণ, প্রাচীন শহরের মতন
অথবা আলতো পায়ে হেঁটে বেড়ানো
একটা আস্ত পোড়োবাড়ি, মাটির পথ
তার গা জুড়ে সেদ্ধ ধানের মৌফুল সুবাস।

দুজনেরই প্রয়োজন ছিল, হয়তো-বা নয়
কিছুটা স্পর্শ কোমল অথবা দৃঢ় সন্নিবেশ
ত্বকের সাথে ত্বক যেমন মেশে আড়ালহীন
চুলের ভেতর আঙুল বা লাগামহীন হাওয়া

হয়তো সে কোনো একজন্মের ইউটোপিয়া
খাবি খেতে খেতে আটকে যাওয়া সময়
বা হয়তো তাও নয়—ইউফোরিয়া সদৃশ
স্পর্শের বেদনা বা তীব্র আনন্দের মতন।

ভেসে গ্যাছে এই বর্ষা, অনন্য প্লাবনে।

অলক-৩

আমি তাকে খুব ভাবছি, তা নয়
সেও ভেবে উল্টেপাল্টে যাচ্ছে, তাও নয়
তবু দিন শেষে খানিক অবসরে
নেয়ে-ধুয়ে নিলে ক্লান্তির পরত
পায়ের পাতায় হাত বুলিয়ে নিলে
বসবাস বোঝা যায় বরং মগজে
আলপটকা ঘুণের মতন কে কাটে।

বেহিসেবি নয় কিছুই, নিয়মের মতন
মানিপ্ল্যান্টের তেল চুঁয়োনো পাতায়
গড়িয়ে গেছে সন্ধ্যা, রাত, অতঃপর
মধ্য প্রহরে, বারান্দায়, ধোঁয়ার ভেতর
গলে গলে আকাশ চুঁইয়ে পড়েছে।

রেলিং জুড়ে ওম ছেড়ে গেছে কেউ
সে হয়তো ঘুম বিভোর, স্বপ্নমধ্যে
এতসব সমাবর্তনের পাশে একটি হাত
হাতড়ে বেড়াচ্ছে করতল ফেঁসে যাওয়া
ঘড়ির কাঁটার মতন…

কাঁপছে কিন্তু গড়াচ্ছে না
ঘামছে, তবু ছড়াচ্ছে না।

প্রেম ও মহামারি

পল্লবের ভারে ন্যুব্জ হয়ে থাকা জানে
ঠিকঠাক ও স্থির তাকাতে হলে
অত ডাগর বা প্রশস্থ হবার দরকার ছিল না
চোখের…

নীরবতার ভঙ্গিমা ব্যখ্যা করতে
ভাষার প্রয়োজন নেই
রোদ ঝলমল আকাশ—
বিসম্বাদী মেঘ, গুঁড়ো বৃষ্টি
উৎসবের কোলাহল পেরিয়ে অন্ধকার
অথবা মোটা ফ্রেম পেরিয়ে যে দৃষ্টি
তীক্ষ্ণ কিন্তু নির্বাক!

নিস্পৃহতা তোমাকে দ্যাখে
শোর নেই বলে গল্পটা বোঝা যায় না
হাতছানি দেখতে বারণ, বানান ভুল
অসুখের কারণ অথবা অন্যান্য যা কিছু।

ঋজু হয়ে লিখে যাওয়া হাত
আঙুল বা বিজ্ঞাপনের মাইক
সহসা ফুঁস করে ওঠা দীর্ঘশ্বাস
বুকপকেটে লুকিয়ে রাখা ছেঁড়া লেবেল;
সকলই বলছে—এ কোনো সুখের সময় নয়।

উজান পাড়ায় তবে প্রত্ন হয়ে থাকো
বিষবৃক্ষের বাগানে জল দাও
হামের পর ধেয়ে আসা জলাতঙ্ক নিয়ে ভেবো না
ভাঙা সাঁকোর পাশে দুর্মূল্যের নোটিশ ঝোলাও—

শেষমেষ বলে দিও
অমন যে চোখ, তার তারার ঝিলিক থেকে
একঝাঁক জোনাকি ঘুরে বেড়ায় ঘরে, চৌকাঠে।
এক ফার্লং স্বর্গ নয়, বা নরকও নয়
মানুষ মরে গেলেও প্রেমের কথা বলে বলে
জীবনভর উপঢৌকনের পাহারাদারের মতন
শীত, বর্ষা বা তাপে দাঁড়িয়ে থাকব।

কনফিউশন

একরোখা দাঁড়িয়ে আছে সে
না গাছ, না মানুষ, না ভ্রম
খুব ছোট্ট একটা নদী একদিন
বয়ে গেছিলো যার বুকের ভেতর
সাঁকো নেই, খলবল—নেই!

উচ্ছিষ্টের মতন বিলায় প্রথাগত হলদে রোদ…

শরীরের ঠিক কোথাও হৃদয়
খুঁজে পাওয়া যায়নি। জবুথবু মূর্তি।
দারুণ লাস্যে ঘূর্ণিপাক খায় না
এখন অব্দি জলে যা ভেসে যায়
কলজে গলে বেরিয়ে আসা রেসিডিও
কিঞ্চিৎ কালো, হৃদয় নয়। তন্তু নেই।

তার পাশে ঠিক কী হলে মানাতো…

এক ঘণ্টি বাজানো ভাঙা স্টেশন
হ্যারিকেনের সলতে পোড়া ঘোলাটে আলো
পদচিহ্ন মুছে যাওয়া রাস্তা
বা দূর থেকে দেখা নীলাভ ঝাউবন
অথবা, এক মুমূর্ষু কাতর গোঙানি।

যদিও সে এক অত্যাশ্চর্য বধির তবু…

ধরো, তার দুটো হাত আছে
একটি বদলে গেছে বালিঘড়িতে
আরেকটি দিয়ে উপড়ে আনছে নিজের জড়
ঠিক মাঝখানে মিইয়ে যাচ্ছে স্পন্দন
যেখানে হৃদয় কিংবা সময় কিছুই নেই…