লেখার মাঠে রোনালদিনহো

লেখার মাঠে রোনালদিনহো

আমরা কবিতার জন্য ইম্ফল গিয়েছিলাম

পর্ব ১৬

হামিদ কায়সার

প্রকাশিত : আগস্ট ১৯, ২০১৯

হ্যাঁ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মণিপুর যাওয়ার অনুমতি পাননি, এটা সত্যি, এটাই বাস্তবতা। এল বীরমঙ্গল সিংহ দম নিলেন খানিকক্ষণ। তারপর আবারো সতেজে বলতে লাগলেন, কে দেয়নি অনুমতি জানেন?
কে?
মণিপুরের মহারাজা চূড়াচান্দ। চূড়াচান্দ কেন রবীন্দ্রনাথকে মণিপুর যাওয়ার অনুমতি দিলেন না? কারণটা হলো, বৃটিশ নিয়ন্ত্রণাধীন তৎকালীন দেশীয় রাজ্য মণিপুরের মহারাজার ক্ষমতা ছিল না এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার। তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হতো বৃটিশ পলিটিক্যাল এজেন্টের সভাপতিত্বে গঠিত দরবারের পরামর্শমতো। মণিপুর প্রবেশের জন্য তখন প্রয়োজন পড়তো বিশেষ অনুমতির। রবীন্দ্রনাথ সেজন্য চিঠি পাঠিয়েছিলেন যথোপযুক্ত স্থানে। কিন্তু দরবারের প্রেসিডেন্ট তথা বৃটিশের পলিটিক্যাল এজেন্ট রবীন্দ্রনাথকে কবি হিসেবে না দেখে দেখেছিলেন রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে। তাই দরবার সেদিন মণিপুরের রাজা চূড়াচান্দকে পরামর্শ দিয়েছিল রবীন্দ্রনাথকে যেন মণিপুর ভ্রমণের অনুমতি না দেওয়া হয়।

হয় তো স্পর্শকাতর কোনো বিষয় ছিল। বৃটিশবিরোধী আন্দোলন তো তখন প্রবলভাবে দানা বাঁধছে। তাছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই পরিস্থিতিতে মণিপুর জায়গাটা অনেক সেনসেটিভ ছিল। পাশেই বার্মা। জাপানিরা এগিয়ে আসছে! নিতাই সেন ঠা-া মাথায় তার অভিমত জানান। আমি সে-কথার পিঠে কথা ভাজি, কারণ যাই থাক। এই রবীন্দ্রনাথ মণিপুরের সংস্কৃতিকে কতো উচ্চ মর্যাদায় তুলে ধরেছেন। মণিপুরিরা তার প্রতিদান এভাবে দিল?

আমাকে শুধরে দিতে চাইলেন এল বীরমঙ্গল সিংহ, মণিপুরিরা রবীন্দ্রনাথের অবদানকে খুব ভালো করেই জানে। পরবর্তীকালে স্বয়ং মহারাজা চূড়াচান্দের কন্যা মণিপুরের বিশিষ্ট সাহিত্যিক মহারাজকুমারী বিনোদিনী দেবী এর জন্য নিজের লজ্জা বারংবার প্রকাশ করেছেন। তিনি শান্তিনিকেতনের আশ্রমে থেকে পড়তেন। রবীন্দ্রনাথের প্রচুর গান মণিপুরিতে অনুবাদ করে নিজে গেয়েছেন এবং অন্য শিল্পীকে দিয়েও গাইয়েছেন। তার অনুবাদ করা রবীন্দ্রনাথের বেশ কয়েকটি নাটক মণিপুরে বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়। এভাবেই তিনি হয়তো রবীন্দ্রনাথের প্রতি পিতার আচরণের প্রায়শ্চিত্ত করতে চেয়েছেন।

আমরা হাসি বীরমঙ্গল সিংহের কথা শোনে। কিসের হাসি বলতে পারবো না। অনেক সময় তো মানুষ আক্ষেপেও হাসে। হতাশায়ও হাসে। কিছু না করতে পারার ব্যর্থতায়ও হাসে। রোনালদিনহোর সেই মুখচ্ছবিটা ভেসে ওঠলো চোখের সামনে। ২০০২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল। ব্রাজিল-ইংল্যা-ের খেলা চলছে। চরম উত্তেজনাকর একটি মুহূর্তে হঠাৎ বৃটিশ এক খেলোয়াড়ের সঙ্গে বল কেড়ে নেওয়ার লড়াইয়ের সময় পায়ে-পা সংঘর্ষের পর, রোনালদিনহোর ডান পা-টা উঠে গিয়েছিল সেই প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের বাম পায়ে। মনের অজান্তেই নাকি চকিত মেজাজ হারানোর দুর্বলতায় রোনালদিনহোর ডান পায়ে কি ছিল লাথির জোর? রেফারি সঙ্গে সঙ্গেই পকেট থেকে লাল কার্ড বের করে দেখিয়ে দিলেন তা ফুটবলের কৃষ্ণ যুবরাজকে। বেচারির যে কী অবস্থা তখন! অসহায়ভাবে বাবরিচুল দোলাতে দোলাতে আর মাথা চাপড়াতে চাপড়াতে শুধু হেসেই যাচ্ছেন মূলত হেসেই চলেছেন ক্রমাগত হেসে হেসে ত্যাগ করছেন মাঠ। অথচ তার একটু আগেই প্রায় মাঝ মাঠ থেকে কী এক দুর্দান্ত আচমকা শটে পরাজিত করলেন গোলপোস্ট থেকে বেশ এগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তখনকার বিশ্বের এক নাম্বার গোলরক্ষক পিটার শিলটনকে! মনে আছে সে-দৃশ্য?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্যও ওটা ছিল লাল কার্ড ওই যে মণিপুর যাওয়ার অনুমতি না-পাওয়াটা। রবীন্দ্রনাথও সেই লাল কার্ড খেয়ে— না, মাঠ ছাড়েননি, এতো আর ফুটবল মাঠ নয় যে মাঠ ছাড়াটাই অনিবার্য; এখানে রেফারি নিজের বিবেক; রবীন্দ্রনাথ এ-ঘটনার পরও ত্রিপুরা রাজ-পরিবারে এবং আরো পরে সিলেটে এসে মণিপুরি নৃত্য এবং হস্তশিল্পের কাজ দেখে এতোটাই বিমুগ্ধ হন যে, ত্রিপুরা, কাছাড় ও মণিপুর থেকে মণিপুরি নৃত্যগুরুদের শান্তিনিকেতনে ডেকে নিয়ে মণিপুরী নৃত্যশিক্ষা চালুর ব্যবস্থা করলেন।

কথা বলার এই ফাঁকফোকড়ে বীরমঙ্গল সিংহ তার ‘প্রসঙ্গ মণিপুর’ বইটি আমাকে উপহার দিলেন। একটি পৃষ্ঠা খুলে পড়ার তাগিদ দিয়ে বললেন, অথচ দেখেন রবীন্দ্রনাথের কতো আগ্রহ ছিল মণিপুরকে ঘিরে। তিনি বাংলা ১২৯৮ সনে সাধনা পত্রিকায় মণিপুর সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘স্থানটি রমণীয়। চারদিকে পর্বত, মাঝখানে একটি উপত্যাকা, বাহিরের পৃথিবীর সহিত কোনো সম্পর্ক নাই। ভূমি অত্যন্ত উর্বরা। মানুষগুলি সরল এবং উদ্যোগী। রাজকর নাই বলিলেই হয়, রাজাকে কেবল বরাদ্দকৃত পরিশ্রম দিতে হয়। যে শস্য উৎপন্ন হয় আপনারই সম্বৎসর খায় এবং সঞ্চয় করে। বাহিরে পাঠায় না বাহির হইতেও আমদানি করে না...’ ধারণা করা হয় যে, মণিপুরের তৎকালীন এজেন্ট স্যার জেমস জনস্টন নাইনটিনথ সেঞ্চুরি পত্রিকায় মণিপুরের যে বর্ণনা লিখেছিলেন তা পড়ে হয়তো বা কবির মানসপটে মণিপুরের এই প্রতিচ্ছবিটি ভেসে উঠেছিল।

নতুন উপহার-পাওয়া বইটি দেখতে দেখতেই আমি আরেকবার কবি এ কে শেরামের দিকে গভীর কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে তাকাই, খোদ রবীন্দ্রনাথের মতো মহাকবি বিশাল মহীরূহ মানুষ যে-মণিপুর যাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, সেই দুর্গম এবং পলিটিক্যাল ঝঞ্জাটপূর্ণ জায়গাটায় আমি কত অনায়াসেই না যেতে পারছি! আমার স্বপ্ন-পুরণ হতে আর খুব বেশি দেরি নেই। মাত্র একরাতের অপেক্ষা। তারপরই কাল দুপুরের মধ্যে আমার পা আর মাটিতে থাকবে না। ইন্ডিগোর বদৌলতে ছোঁবে মণিপুরের আকাশ।

কবি বীরমঙ্গল সিংহের কাছ থেকে আরো জানতে পারলাম, ত্রিপুরাতে বেশ কয়েকজন মণিপুরি কবি নিয়মিত কাব্যচর্চা করে আসছেন। তবে তিনি জানালেন, ত্রিপুরাতে মণিপুরি নৃত্যগীত যেভাবে শুরু থেকেই ঝাঁকিয়ে বসেছিল, সাহিত্যচর্চা ততোটা বেগবান ছিল না। বেগবান কি, প্রথমদিকে চর্চাই ছিল না বলতে গেলে। সবাই মণিপুরি নৃত্যগীত নিয়ে মজে থাকতো। ১৯১৬ সালে ব্রজগোপাল সিংহ প্রথমবারের মতো লেখেন ‘মণিপুরি ও কুকি ভাষা শিক্ষার সহজ উপায়’ নামের একটি ভাষা শেখার বই। ১৯৩৯ সালে কৈথেল্লাকপম চন্দ্রকুমার সিংহ লিখলেন আরেকটি ভাষা শেখার বই ‘মৈতৈলোন’। ১৯৫৫ সালে তিনি লেখেন নাটকের বই ‘মর্ত্যগী পারিজাত লৈরাং’। এভাবেই শুরু, তারপর ১৯৭৭ সালে এসে ত্রিপুরায় প্রথমবারের মতো প্রকাশ পায় মণিপুরি কবিতার বই। তাও আবার একসঙ্গে দুটো, লৈরাংগী নাচোম অমা এবং হঙোই নিঙোল লৌনম্বী। কবি হলেন কৈথেল্লাকপম-এরই সুযোগ্য ছাত্র গুরুময়াম রাজেশ্বর শর্মা। গুরুময়াম রাজেশ্বর শর্মা কবিতার বই-দুটি কীভাবে বের করেছিলেন সেও এক ইতিহাস। খরচ জোটাতে তাকে নিজের জমি বিক্রি করতে হয়েছে।

১৯১৬ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত এই ৬৪ বছরে ত্রিপুরা থেকে মাত্র পাঁচটি মণিপুরি ভাষার বই প্রকাশ পেয়েছে। আশির দশকের গোড়ার দিক থেকে এই বন্ধ্যাত্মকাল কাটতে শুরু করলো। আগরতলা বইমেলাকে কেন্দ্র করে এখন প্রতি বছরই বেশ-কিছু মণিপুরি ভাষার বই প্রকাশিত হয়। ১৯৮২ থেকে এ-পর্যন্ত প্রায় ৫০টি বই বেরিয়েছে। এসব বইয়ের অধিকাংশই অবশ্য কবিতার বই। কবিতা ছাড়াও রয়েছে ৩টি নাটকের বই, ৪টি গল্পের বই, ১টি ভ্রমণ-কাহিনি ও ৭টি প্রবন্ধের বই। এখন পর্যন্ত ত্রিপুরা থেকে কোনো মণিপুরি ভাষায় উপন্যাস বেরোয়নি। তবে ত্রিপুরায় মণিপুরি সাহিত্যের পথিকৃৎ কৈথেল্লাকপম চন্দ্রকুমার সিংহ দুটো উপন্যাস লিখে গেছেন বলে শুনেছি— যা এখনো বই আকারে প্রকাশ পায়নি।

একের পর এক তথ্য জানিয়েই চলেন বীরমঙ্গল সিংহ। তিনি আরো জানালেন, প্রকাশিত বইয়ের অনেকগুলো মণিপুরি সাহিত্যবোদ্ধাদের কাছে বেশ প্রশংসিত হয়েছে। কয়েকজন কবি-লেখক আবার নিজের ভাষার পাশাপাশি বাংলায়ও লিখতে পারেন, তারা মণিপুরি সাহিত্যকে বাংলা ভাষাভাষী পাঠকের কাছে তুলে ধরছেন সযত্নে।

তাহলে দেখছি এখানেও কবিতারই জয়জয়কার, আমাদের বাংলাদেশের মতো, অনেক কবি! আমি স্বতস্ফূর্তভাবে বলে উঠতেই বীরমঙ্গল সিংহ সে-কথায় সায় জানিয়ে বললেন, কবি আছে অনেক, মনের সুখে লিখে কবিতা। কিন্তু পাঠক কোথায়? কবিতার পাঠক নেই। একটু যেন আক্ষেপ ফুটে ওঠলো তার কণ্ঠে! যে-যার নিজের পয়সায় বই বের করে।

আমি মনে মনে বলি, আক্ষেপের আর কি আছে বীরমঙ্গলদা! এককালে যে ফরাসি দেশ ছিল কবিদের তীর্থস্থান, সেখানেই তো এখন খুঁজে পাওয়া যায় না কবিতার পাঠক। তরুণ কবিরা কবিতার বই প্রকাশ করে নিজের পয়সায়, প্রকাশকরা কবিদের ঠকায়, তাদের সব স্বস্তি তছনছ করে। তবুও কবিরা বই প্রকাশে মরীয়া। তারা কবিতা লিখছে নিয়মিত, কবিতার বইও প্রকাশ করছে অব্যাহতভাবে।

কেন করবে না কবিতার বই প্রকাশ? যতোদিন পৃথিবী থাকবে, কবিতা লেখাও নদীর স্রোতের মতো বইবে সমান্তরাল— তা নইলে যে মানুষের ভাব-অনুভাব নিঃশেষিত হয়ে যাবে। গোটা পৃথিবীটা পরিণত হবে কসাইনগরে।

হ্যাঁ, সত্যি তাই। যে-দেশে কবি থাকবে না, সে-দেশে রোদ উঠবে না, গোধুলি রঙের ফুটবে না আলো, ফুল তার সমস্ত সৌরভ হারাবে, পাখি গাল ফুলিয়ে গাইবে না গান, পুরুষ হারিয়ে ফেলবে প্রেমিক সত্তা, নারী শুধু কুলটা হবে, শিশু মাতৃজঠরের অন্ধকারকেই মনে করবে শ্রেয়তর।

কথার ভেলায় ভাসতে ভাসতে সময় যে কীভাবে গড়িয়ে যাচ্ছিল, টেরই পাচ্ছিলাম না, দিনের আলো ক্রমশ ফিকে হয়ে আসতেই কবি এ কে শেরাম হঠাৎ শশব্যস্ত হয়ে ওঠলেন, এই আমরা তো বেড়াতে বেড়াতেও গল্প করতে পারি। চলেন বাইরে যাই। একটু হাঁটাহাঁটি করি। আগরতলায় এসে ঘরে বসে থাকলে হবে? চলবে

লেখক: কথাসাহিত্যিক

ধারাবাহিক