জি এম ফুরুক

জি এম ফুরুক

স্বাধীন খসরুর গদ্য ‘যদি আরও একটু সময় পেতাম’

প্রকাশিত : মার্চ ১৯, ২০২৪

সম্ভবত ২০১৪ সাল। শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আগারগাঁও ঢাকা ক্যাম্পাসে মাসুম রেজার লেখা ও গোলাম সোহরাব দোদুলের পরিচালনায় ‘সবুজ নক্ষত্র’ ধারাবাহিক নাটকের শুটিং চলছে। যতদূর মনে পড়ে, ঐদিন শুটিং সেটে আমি, মীর সাব্বির, চঞ্চল, নিশো, মাজনুন মিজান, ফজলুর রহমান বাবু, শতাব্দি ওয়াদুদ ও তিশাসহ কয়েকজন ছিলাম।

দুপুরে লাঞ্চ ব্রেকের পর শুটিং শুরু হবে। প্রথম সিকুয়েন্স আমি আর মীর সাব্বিরের। সেট রেডি। আমি বসে আছি। মীর সাব্বিরকে ডাকা হচ্ছে। মীর সাব্বির একটু দূরে একজনের সাথে কথা বলছে। দোদুল ভাই আমাকে বলল, স্বাধীনদা আপনি একটু সাব্বিরকে ডাক দেন, আসার জন্য বলেন। সাব্বিরকে ডাকলাম, সে আসলো একজনকে সাথে নিয়ে। আমাকে বলল, স্বাধীন ভাই আপনার সাথে পরিচয় করিয়ে দেই, এ হচ্ছে জি এম ফুরুক, আপনার দেশের মানুষ। সে নাটক লেখে, পরিচালনা করে। তার আমন্ত্রণে লন্ডনে গিয়ে আমি চুমকি নাটকের শুটিং করেছি।

প্রোডাকশনের ছেলেকে চা দিতে বলে ফুরুককে বসতে বললাম। সিকুয়েন্স শেষে ফুরুকের সাথে কথা হলো। জানতে পারলাম, তার দেশের বাড়ি সিলেট, ফেঞ্চুগঞ্জ। লন্ডনেও ছিল বেশ কয়েক বছর। এখন সে দেশে আছে। জানালো, সে আমাকে অনেকদিন থেকে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে, পাচ্ছে না। আজকে সে সাব্বিরের কাছ থেকে জেনেই এসেছে, আমি এই সেটে শুটিংয়ে থাকব। তার আসার প্রধান কারণ হচ্ছে, আমার সাথে দেখা করা, আর সাব্বিরকে নাটকের স্ক্রিপ দেয়া।

ঐদিন আর বেশি কথা হয়নি। কারণ আমরা শুটিং নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। তার যোগাযোগ নাম্বার দিয়ে গেল, বলল রাতেই ফোন দেবে। রাতে ফোনে কথা হলো। জানালো, সে ইমিডিয়েটলি আমার সাথে বসতে চায়। কয়েকদিনের মধ্যেই আমরা বসলাম। তার কাজকর্ম সম্পর্কে জানলাম। তার নতুন প্রজেক্টের কথা বলল, গল্প শোনালো, যেটাতে সে আমাকে খুব করে চাচ্ছে।

আমি কিন্তু ঢালাওভাবে সবার সাথে কাজ করিনি বা করি না। তার সাথে কথা বলে কোনো কিছু না ভেবেই আমি সম্মতি জানালাম। প্রথমত সে আমার একজন অন্ধ ভক্ত, আমাকে তার ভীষণ ভালো লাগে, আমাকে নিয়ে সে গর্ব করে আমি সিলেট অঞ্চলের বলে। প্রথম দিন বসাতেই তাকে আমার ইন্টারেস্টিং মনে হলা। আগ্রহ জন্মালো তার প্রতি। এত দেখি আমার মতোই নাটক পাগল একটা ছেলে! সবকিছু ছেড়েছুড়ে দিয়ে সে নাটক লিখছে, নাটক পরিচালনা করছে, ভবিষ্যতে সিনেমা নির্মাণ করবে। সে আমার মতো কয়েক বছর ইংল্যান্ডেও ছিল। আবার দেশে ফিরে আসছে নাটক-সিনেমা বানাবে বলে।

শুরু হলো তার সাথে আমার কাজ নাটক দিয়ে। পরে জানতে পারলাম, এটা এক ঘণ্টার নাটক নয়, সে এটাকে টেলিফিল্ম করবে। ফুটেজ দেখে তার মাথায় এই আইডিয়া আসছে, সে খুবই এক্সাইটেড। সে তার সিদ্ধান্তে অটল। তারপর কয়েকদিন পর আবার ফোন। বসতে চায়, জরুরি কথা আছে আমার সাথে। আমাকে জানালো সে আবার তার সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেছে। এখন ঐ টেলিফিল্মকে পূর্ণ দৈর্ঘ্য সিনেমা বানাবে। স্ক্রিপ্ট আবার রি রাইট করছে, সবার সিডিউল নেবে আবার শুটিং শুরু করবে।

আবার তার সাথে বসলাম। বললাম, এটা নাটক বা টেলিফিল্মই থাক। অন্য গল্প ভাবো, স্ক্রিপ লেখো সিনেমার জন্য। নাছোড়বান্দা সে এটাকে সিনেমা করবে। প্রায় আরো এক মাস আমরা শুটিং করলাম সব মিলিয়ে। ওটাতে আমি, মীর সাব্বির, আরমান পারভেজ মুরাদ, দীপা খন্দকার, চুমকি, সাজু খাদেম ও ফারুক আহমেদসহ আরও অনেকে।

সিনেমাটির পোস্ট প্রোডাকশন শেষে সে সেন্সর বোর্ডে সেন্সরের জন্য জমা দেবে। সমস্যা হলো, সে বাংলাদেশ ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন বিএএফডিসিতে পরিচালক সমিতি বা প্রযোজক সমিতির সদস্য নয়। যেহেতু এই সিনেমাটির প্রযোজক পরিচালক সে নিজেই, সেন্সরে জমা দিতে হলে অবশ্যই তার পরিচালক সমিতি, প্রয়োজক সমিতির সদস্যপদ থাকতে হবে।

জরুরি ভিত্তিতে আমাকে ফোন। দেখা করতে আসলো। বসলাম। কথা বললাম। জানলাম বিষয়টি। আমি ফারুক ভাই (ফারুক আহমেদ) তাকে অনেক করে বুঝালাম। এটা টেলিফিল্ম বা ধারাবাহিক করে ফেলতে। বললাম সেন্সর না করাতে। সিনেমা প্রযোজনা করা একটা ব্যয়বহুল ব্যাপার, এরই মধ্যে অনেক টাকা লগ্নি হয়ে গেছে। এখন প্রযোজক সমিতি পরিচালক সমিতির সদস্য হতে হলে সদস্য পদের জন্য ফি বাবদ আরও কয়েক লাখ টাকা প্রয়োজন। সেন্সর বোর্ডে জমা দিতেও ফি বাবদ টাকা লাগবে।

কে শোনে কার কথা! তার সিদ্ধান্তেই সে অটল। কী আর করা! তার কথামতোই সাধ্যমতো সাহায্য করলাম সদস্য পদ পাওয়ার জন্য। সদস্য পদ পাওয়ার পর সিনেমা সেন্সরে জমা দেয়া হলো। সেন্সর সনদ পেয়ে গেল। দুঃখজনক হলেও সত্যি, সেই সিনেমাটি আজও মুক্তি পায়নি! সিনেমা হলের মুখ দেখেনি! চলবে...

বিশেষ দ্রষ্টব্য: ফুরুকের লাশ রাখা আছে রয়েল লন্ডন হাসপাতাল হিমঘরে। পুলিশ ইনভেস্টিগেশন সম্পন্ন হলে নেয়া হবে লাশকাটা ঘরে ময়না তদন্তের জন্য।

 

লেখক: অভিনেতা