আশানুর রহমানের গদ্য ‘ক্ষমতা ও লেখক’

প্রকাশিত : জানুয়ারি ০৮, ২০২৬

ক্ষমতা এক উঁচু প্রাসাদ, যা পাথরের দেয়ালে মোড়া। সেই দেয়াল শুধু ইট-পাথরের নয়; তা গড়া ভয়, আইন, নানা বাহিনী আর সুবিধার মোহে। প্রাসাদ তার ছায়া ফেলে আলো ঢাকতে চায়, প্রশ্নকে অশান্তি বলে চিহ্নিত করে। ভিন্ন কণ্ঠকে রাষ্ট্রদ্রোহ বানায়। আর লেখক যেন সেই দেয়ালের ফাঁকে আটকে থাকা অগ্নিস্ফুলিঙ্গ— ক্ষুদ্র, উপেক্ষিত, প্রায় অদৃশ্য। তবু সেই স্ফুলিঙ্গেই লুকিয়ে থাকে আগুনের ভবিষ্যৎ।

ক্ষমতা চায় স্থিতি, লেখক চায় সত্য। ক্ষমতা বলে, ‘এভাবেই চলবে।’ লেখক জিজ্ঞেস করে, ‘কেন?’ এই ‘কেন’ প্রশ্নটিই ক্ষমতার ঘুম কেড়ে নেয়। কারণ, প্রশ্ন মানেই জবাবদিহিতা। আর জবাবদিহিতাই ক্ষমতার সবচেয়ে বড় আতঙ্ক।

বাংলার ইতিহাসে লেখক ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নতুন নয়। ঔপনিবেশিক শাসন বুঝেছিল যে, বন্দুক দিয়ে দেশ দখল করা যায়, কিন্তু মন দখল করা যায় না। তাই তারা ভয় পেয়েছিল লেখকদের। সংবাদপত্র আইন, বই বাজেয়াপ্ত, সম্পাদক গ্রেফতার— সবই ছিল কলমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।

বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ শুধু উপন্যাস ছিল না; ছিল এক জাতির আত্মসম্মান জাগানোর ভাষা। রবীন্দ্রনাথ কোনো বিদ্রোহী কবির বেশে লেখেননি, তবু তাঁর কলম ছিল ক্ষমতার জন্য অস্বস্তিকর। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের পর নাইটহুড উপাধি ফিরিয়ে দেওয়া ছিল নিঃশব্দ কিন্তু তীব্র এক চ্যালেঞ্জ। তাঁর সেই একটি চিঠি, কয়েকটি বাক্য, যা সাম্রাজ্যের নৈতিক মুখোশ খুলে দিয়েছিল।

নজরুল ইসলাম ছিলেন সরাসরি আগুন। তাঁর কবিতা ও গান রাষ্ট্রের চোখে ছিল অপরাধ। ‘বিদ্রোহী’ শুধু সাহিত্য নয়, ছিল ঘোষণাপত্র। তাঁকে কারাগারে বন্দি করা হয়েছিল, কিন্তু কণ্ঠ স্তব্ধ করা যায়নি। ইতিহাস তখনই দেখিয়েছে যে, ক্ষমতা লেখককে শেকল পরাতে পারে, কিন্তু ভাষাকে নয়।

বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসেই লেখক ও বুদ্ধিজীবীরা ছিল ক্ষমতার সবচেয়ে বড় শত্রু। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও তাদের এ দেশীয় সহযোগীরা জানত, এই মানুষগুলো বেঁচে থাকলে গল্প বদলে যাবে। তাই বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল। তারা ভেবেছিল, লেখক মরলে সত্য মরবে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্বই প্রমাণ করেছে, সত্য রক্ত দিয়েও থামানো যায় না।

স্বাধীনতার পরও এই দ্বন্দ্ব থামেনি। নতুন রাষ্ট্র, নতুন ক্ষমতা— কিন্তু প্রশ্ন একই রয়ে গেছে। লেখক কি প্রশ্ন করবে, নাকি সুবিধার কাছে নত করবে? লেখালেখির কারণে দাউদ হায়দারকে দেশত্যাগে বাধ্য হতে হয়েছে। তসলিমা নাসরিনকে যেতে হয়েছে নির্বাসনে। হুমায়ুন আজাদকে প্রকাশ্য রাস্তায় কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। অভিজিৎ রায়কে হত্যা করা হয়েছে বইমেলায় দিনের আলোয়। মুশতাক আহমেদকে হত্যা করা হয়েছে কারাগারের ভেতরে— লেখার অপরাধে।

কিছুদিন আগেই কবি সোহেল হাসান গালিবকে যেতে হয়েছে জেলে। আরও অসংখ্য নাম আছে, যাদের ভয় দেখানো হয়েছে/হচ্ছে চুপ করানো হয়েছে/হচ্ছে, ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে এবং হচ্ছে। এই তালিকা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি ধারাবাহিক ইতিহাস; যেখানে প্রশ্নকারী কলম বরাবরই শাসকের চোখে অপরাধী। কখনো মামলা, কখনো নিষেধাজ্ঞা, কখনো সামাজিক চরিত্রহনন। প্রাসাদের অস্ত্র বদলায়, কিন্তু উদ্দেশ্য বদলায় না।

এখানেই আসে এক অস্বস্তিকর সত্য। সব লেখকই যে ক্ষমতার বিরুদ্ধে, তা নয়। ইতিহাসে এমন লেখকও আছেন, যারা ক্ষমতার দাসানুদাস হয়েছেন। তারা প্রাসাদের প্রশংসা লিখেছেন, শাসকের বীরত্ব গেয়েছেন, অন্যায়ের জন্য যুক্তি বানিয়েছেন। কখনো ভয়ে, কখনো সুবিধায়, কখনো খ্যাতির লোভে। তাদের কলমও ইতিহাসে আছে, কিন্তু ভিন্ন রঙে।

ক্ষমতা লেখককে কিনতে চায়— পদ, পুরস্কার ও প্ল্যাটফর্ম দিয়ে। কিছু লেখক সেই লেনদেনে রাজি হন। তখন কলম আর প্রশ্ন করে না, যুক্তি সাজায়। লেখক প্রাসাদের দেয়ালের অংশ হয়ে যায়। ইতিহাস তাদেরও নথিভুক্ত করে, কিন্তু করুণ এক নীরবতায়। কারণ তারা সময়ের সঙ্গে থাকে, সত্যের সঙ্গে নয়।

তবু এখানেই লেখকের প্রকৃত পরিচয় স্পষ্ট হয়। লেখক হওয়া মানে শুধু লেখা নয়; লেখক হওয়া মানে অবস্থান নেওয়া। ইতিহাসে যারা লেখক হিসেবে টিকে আছেন, তারা সবাই কোনো-না-কোনো সময় ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন— কখনো সরাসরি, কখনো রূপকে, কখনো নীরব প্রতিবাদে।

লেখক জানে যে, ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করা বিলাসিতা নয়, দায়িত্ব। কারণ লেখক যদি প্রশ্ন না তোলে, সমাজ অন্ধ হয়ে যায়। ক্ষমতা তখন নিজেকেই সত্য মনে করতে শুরু করে। লেখকের কলম সেই ভুল ভাঙার হাতুড়ি।

আজকের বাংলাদেশে লেখকের চ্যালেঞ্জ আরও জটিল। নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি আছে ডিজিটাল নজরদারি, ট্রোল বাহিনী, সামাজিক চাপ। তবু মূল প্রশ্ন বদলায়নি। লেখক কি সত্যের পাশে দাঁড়াবে, নাকি ক্ষমতার আরামকেদারায় বসবে? শেষ পর্যন্ত প্রাসাদ দাঁড়িয়ে থাকে ভারে ও অহংকারে। আর সেই অগ্নিস্ফুলিঙ্গ— লেখক, সময়ের বাতাস পেয়ে রূপ নেয় দাবানলে।

ক্ষমতা বদলায়, শাসক বদলায়, পতাকা বদলায়। কিন্তু ইতিহাসের ভস্মের ওপর শাসকের নাম লেখা থাকে না। লেখা থাকে সেই লেখকের নাম, যে প্রশ্ন করতে ভয় পায়নি।

লেখক কোনো সাধু নয়, কোনো দেবদূত নয়। সে ভুল করে, ভাঙে, কখনো নতও হয়। কিন্তু ইতিহাস তাকে বিচার করে একটাই প্রশ্নে— সে কি ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করেছিল? যে লেখক সেই চ্যালেঞ্জ নেয়, সেই-ই শেষ পর্যন্ত সত্যের কাণ্ডারি হয়ে ওঠে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক