জীবনপথে ছড়িয়ে থাকা অনুভূতির মায়াময় সংকলন ‘কুড়াই নুড়ি’
ছাড়পত্র ডেস্কপ্রকাশিত : আগস্ট ২০, ২০২৬
কিছু বই পড়া শেষ হয়ে যায়, কিন্তু তার রেশ শেষ হয় না। কিছু লেখা চোখের সামনে থেকে সরে গেলেও মনের ভেতরে থেকে যায়—কখনো কোনো স্মৃতি হয়ে, কখনো কোনো প্রশ্ন হয়ে, আবার কখনো নিঃশব্দ এক দীর্ঘশ্বাস হয়ে।
‘কুড়াই নুড়ি’ তেমনই একটি বই। নামটির মধ্যেই যেন বইটির অন্তর্নিহিত দর্শনটি ধরা আছে—জীবনের দীর্ঘ পথ চলতে চলতে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট মুহূর্ত, অনুভূতি, উপলব্ধি ও স্মৃতিকে কুড়িয়ে নেওয়া এবং সেগুলোকে শব্দের মালায় গেঁথে রাখা।
জীবন আসলে বড় বড় ঘটনার সমষ্টি নয়; বরং অসংখ্য ছোট ঘটনার ভেতর দিয়েই মানুষের জীবন তার অর্থ খুঁজে নেয়। একটি বিকেলের আলো, পুরোনো কোনো মুখ, হারিয়ে যাওয়া কোনো সম্পর্ক, এক টুকরো অভিমান, অপ্রকাশিত ভালোবাসা কিংবা হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়া কোনো স্মৃতি—এসব আপাততুচ্ছ বিষয়ই কখনো কখনো মানুষের মনে সবচেয়ে গভীর রেখাপাত করে।
‘কুড়াই নুড়ি’ সেই ছোট ছোট অনুভূতিগুলোকেই গুরুত্ব দিয়ে দেখার চেষ্টা করে। বইটির লেখার ভঙ্গিতে আছে ব্যক্তিগত অনুভবের সঙ্গে জীবন ও সমাজকে দেখার একটি আন্তরিক দৃষ্টিভঙ্গি। লেখক খুব বেশি অলংকারের ভারে ভাষাকে ভারী করেননি; বরং সহজ, সাবলীল ও অনুভূতিনির্ভর ভাষায় পাঠকের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন।
ফলে অনেক জায়গাতেই মনে হতে পারে, লেখক যেন দূরে বসে কোনো গল্প বলছেন না—বরং পাঠকের পাশে বসে নিজের দেখা, অনুভব করা কিংবা উপলব্ধির কথাই বলছেন। ‘কুড়াই নুড়ি’র একটি বড় শক্তি হলো এর জীবনঘনিষ্ঠতা। এখানে অনুভূতিগুলো খুব দূরের কোনো বিমূর্ত জগতের নয়। বরং আমাদের চারপাশের মানুষ, সম্পর্ক, স্মৃতি, বিচ্ছেদ, ভালোবাসা, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যেই সেগুলোর শিকড়।
পাঠক তাই বইটির অনেক কথার সঙ্গে নিজের জীবনের কোনো না কোনো মুহূর্তকে মিলিয়ে নিতে পারেন। কোনো লেখা হয়তো মনে করিয়ে দেবে শৈশবের কোনো দুপুরকে, কোনোটি হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মানুষকে, আবার কোনোটি নিজেরই বলা হয়নি এমন কোনো কথাকে।
নামটির প্রতীকী অর্থও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। নুড়ি বড় কোনো মূল্যবান রত্ন নয়, কিন্তু নদীর স্রোত, সময় ও প্রকৃতির স্পর্শে প্রতিটি নুড়ির আলাদা আকৃতি ও গল্প তৈরি হয়। মানুষের জীবনও অনেকটা তেমন। প্রতিটি অভিজ্ঞতা আমাদের ভেতরে কোনো না কোনো দাগ রেখে যায়। সময়ের স্রোতে বড় ঘটনাগুলো হয়তো বিস্মৃত হয়, কিন্তু ছোট ছোট স্মৃতি থেকে যায়। ‘কুড়াই নুড়ি’ যেন সেই বিস্মৃতির হাত থেকে ছোট ছোট স্মৃতিকে তুলে আনার প্রয়াস।
বইটি পড়তে গিয়ে আরেকটি বিষয় অনুভব করা যায়—মানুষকে বোঝার জন্য সবসময় বড় কোনো দর্শনের প্রয়োজন হয় না; কখনো কখনো একটি ছোট্ট ঘটনা, একটি সম্পর্ক কিংবা একটি নীরব মুহূর্তই যথেষ্ট। সেই জায়গা থেকেই বইটির লেখাগুলো পাঠককে আত্মজিজ্ঞাসার দিকে নিয়ে যায়। আমরা কী হারিয়েছি, কী পেয়েছি, কাকে মনে রেখেছি, কাকে ভুলে গেছি এবং জীবনের ব্যস্ততায় কোন অনুভূতিগুলোকে অযত্নে ফেলে এসেছি—এসব প্রশ্নও বইটির পাঠের সঙ্গে সঙ্গে সামনে এসে দাঁড়ায়।
সব মিলিয়ে, ‘কুড়াই নুড়ি’কে শুধু কিছু লেখা বা অনুভূতির সংকলন হিসেবে দেখলে হয়তো বইটির পুরো সৌন্দর্য ধরা পড়বে না। এটি বরং জীবন থেকে কুড়িয়ে নেওয়া ছোট ছোট অনুভূতির একটি ব্যক্তিগত ভাণ্ডার। এখানে বড় কোনো দাবির চেয়ে অনুভবের জায়গাটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পাঠক যদি ধীর হয়ে পড়েন, প্রতিটি লেখার ভেতরের নীরবতাটুকু শুনতে চেষ্টা করেন, তাহলে নিজের জীবনেরও কিছু হারিয়ে যাওয়া নুড়ি হয়তো তিনি খুঁজে পাবেন।
‘কুড়াই নুড়ি’ তাই শেষ পর্যন্ত লেখকের একার কুড়িয়ে নেওয়া নুড়ি থাকে না; পাঠকের হাতেও তুলে দেয় নিজের স্মৃতি, অনুভূতি ও জীবন থেকে কুড়িয়ে নেওয়া কিছু নুড়ি। আর সেখানেই বইটির সবচেয়ে বড় সার্থকতা।
























