করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৪০৬৩৬৪ ৩২২৭০৩ ৫৯০৫
বিশ্বব্যাপী ৪৫৯৫০৩৭২ ৩৩২৭৩৯২২ ১১৯৪৪২৩
ঢাকা থিয়েটারের ‘ধাবমান’ নাটকের একটি দৃশ্য

ঢাকা থিয়েটারের ‘ধাবমান’ নাটকের একটি দৃশ্য

নাট্য সমালোচনা এবং সমালোচনা গ্রহণ না করবার প্রবণতা

পর্ব ৩

রাহমান চৌধুরী

প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২০

বর্তমান শতকে নিশ্চয় আরো কিছু ভালো নাটক হয়েছে, সব দেখা হয়নি আমার। গত পর্বে বলা নাটকের বাইরে ভিন্ন কিছু নাটকও আমার ভালো লেগেছে বর্তমান শতকের। সেগুলির মধ্যে আছে রামেন্দু মজুমদারের নির্দেশনায় থিয়েটারের ‘মাধবী’, লাকি ইনামের নির্দেশনায় নাগরিক নাট্যাঙ্গনের ‘প্রাগৈতিহাসিক’, শিমুল ইউসুফের নির্দেশনায় ঢাকা থিয়েটারের ‘ধাবমান’, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় নির্দেশিত ঢাকা থিয়েটারের ‘নষ্টনীড়’, ইউসুফ হাসান অর্কের নির্দেশনায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের ‘কবি’, ‘দহন দয়িতা’; অনন্ত হীরার নির্দেশনায় প্রাঙ্গণে মোর প্রযোজিত ‘শ্যামা প্রেম’, দেশ নাটকের ‘প্রাকৃত পুরাঙ্গনা’,  উদীচীর ‘হাফ অখড়াই’, তৌফিকুল ইসলাম ইমন নির্দেশিত প্রাচ্যনাটের ‘কিনু কাহারের থেটার’, মাজার পিণ্টুর নির্দেশনায় ইউনিভার্সেল থিয়েটারের ‘মহাত্মা’, রশীদ হারুণ নির্দেশিত আনন জামানের ‘শিখণ্ডি কথা’, মীর বরকতের নির্দেশনায় কণ্ঠশীলনের ‘যা নেই ভারতে’, ইউসুফ হাসান অর্কের নির্দেশনায় বিবর্তন যশোরের ‘ব্রাত্য আমি মন্ত্রহীন’, আজাদ আবুল কালাম নির্দেশিত থিয়েটারওয়ালা রেপাটরির ‘শাইলক এন্ড সিকোফ্যান্টস’, মিজানুর রহমান নির্দেশিত থিয়েটার ৫২-র “ঋত্বিক’ ইত্যাদি। সুনির্দিষ্টভাবে বলে রাখা ভালো বর্তমান শতকের ঢাকার বহু প্রযোজনা আমার দেখা হয়নি। বহু নাটকের প্রশংসা শুনেছি কিন্তু সময় করে দেখতে যেতে পারিনি। কখনো পরিকল্পনা নিয়ে নাটক দেখতে গিয়ে শুনেছি, হয় নাটকটার প্রদর্শনীর তারিখ পাল্টে গেছে বা নাটকটা সেদিন হবে না। কখনো সময় মেলাতে পারিনি। ফলে সেসব প্রযোজনা সম্পর্কে কিছু বলতে পারিনি। করোনার সংক্রমণ আরম্ভ না হলে এতদিনে সেসব নাটক দেখে নিতে পারতাম।

হঠাৎ আমাকে একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গত পঞ্চাশ বছরের নাটক নিয়ে একটি বই লিখবার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানায় গত ফেব্রুয়ারি মাসে। ফলে বর্তমান শতকের বেশ কিছু নাটক দেখার পরিকল্পনা করি, যা নানা কারণে দেখে উঠতে পারিনি। কিন্তু সে-সুযোগ হলো না। সম্ভবত মেয়র নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শিল্পকলা একাডেমী কিছুদিন বন্ধ থাকায় নাটক দেখার সুযোগ ছিল না। পরে করোনার কারণে শিল্পকলা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বহু নাটক নিয়ে লেখা গেল না, যেসব নাটক নিয়ে কমবেশি প্রশংসা শুনেছি বিভিন্ন দলের। উপরের সবগুলি নাটক যে একই রকম ভালো লেগেছে তা নয়। কিন্তু নাটক করবার একটা ভিন্ন ধরনের প্রচেষ্টা ছিল বিভিন্ন ধরনের সস্তা শ্লোগান বাদ দিয়ে। বহু দলের সামর্থ্যের কথা মাথায় রেখে তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বা প্রচেষ্টাকে প্রাধান্য দিয়েছি, নাটকগুলি সম্পূর্ণ ত্রুটি মুক্ত না হলেও দেখে ভালো লেগেছে; বিরক্ত হইনি। বরং কিছু কিছু বড় নির্দেশকের খুব হৈ চৈ ফেলে দেয়া নাটক দেখে বিরক্ত হয়ে চলে এসেছি। দীনের অনুসারী হয়ে নাটক দেখি না, নাটক দেখি মুক্তমন নিয়ে। দলগুলির সামর্থকে মাথায় রাখি। বিষয়বস্তু বাছাইকে খুব গুরুত্ব দেই, সবকিছুর মধ্যে কারণে-অকারণে মুক্তিযুদ্ধ ঢুকিয়ে ফেলাতে বিরক্ত বোধ করি। কারণ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলতে গেলে গভীর ইতিহাসবোধ থাকা চাই। সবসময় মানতে চাই নাটককে প্রথম ‘নাটকই’ হয়ে উঠতে হবে। নাটকীয়তা নেই তেমন নাটক দেখাতে আমার আগ্রহ নেই। নাটক আর প্রবন্ধ এক নয়।

নাটক যদি নাটক হয়ে ওঠে, যদি হৃদয় মন ছুঁয়ে যায়, বিষয় যা খুশি হতে পারে। নাটক যদি মস্তিষ্ককে নাড়া দেয়, দুর্বল প্রযোজনা হলে কিংবা নাট্যাভিনয়ে কিছুটা দুর্বলতা থাকলেও সেটাকে গ্রহণযোগ্য নাটক বলে মনে করি। কারণ সব দল বড় বড় অভিনেতা-অভিনেত্রী চট করে কোথায় পাবে। নতুন দলে বা সামর্থ কম যে-সব দলের সেখানে বড় বড় অভিনেতারা আসতে চান না। সত্যি বলতে নাটকের মঞ্চে কাজ করে করে যাঁরা বড়মাপের অভিনেতা-অভিনেত্রী হয়েছিলেন, তাঁদের কজন আর মঞ্চে কাজ করছেন এখন? প্রায় অনেকেই মঞ্চ ছেড়েছেন বহু আগে, এখন তাদের অনুপস্থিতি আরো বেড়েছে। যাঁরা একসময়ে বড় মুখ করে বলতেন, নাটক তাঁদের জীবনে প্রধান বিবেচ্য, পরে দেখা গেছে অর্থ, তারকাখ্যাতি আর বিলাসিতাটাই প্রধান বিবেচ্য। মাঝে মধ্যে নিজেদের অস্তিত্ব প্রকাশ করার জন্য মঞ্চে এসে উপস্থিত হন তাঁদের কেউ কেউ। পুরানো দিনের অভিনেতাদের মধ্যে মামুনুর রশীদ, ফেরদৌসি মজুমদার, লাকি ইনাম, ইনামুল হক, শিমুল ইউসুফ, ঝুনা চৌধুরী এরকম কয়েকজনকে দেখতে পাই মঞ্চে। প্রথম যুগের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের কথা বাদ দেয়া গেল। পরের প্রজন্মে যাঁরা আরণ্যকে মামুনুর রশীদ ভাইর হাত ধরে, নাট্যকেন্দ্রে তারেক আনামের হাত ধরে বা দেশ নাটকে প্রথমে যাঁরা ছিলেন কিংবা বিভিন্ন দলে অভিনয় করে সুনাম অর্জন করেছিলেন, সেসব অভিনেতা-অভিনেত্রীদের কজনকে মঞ্চে পাওয়া যাচ্ছে? মঞ্চ অনেকের জন্যই সাফল্যের সিঁড়ি ছিল, নিশ্চয় সেটা দোষের কিছু নয়। মানুষ সাফল্য চাইবে এটা স্বাভাবিক, কিন্তু যে-মঞ্চ তাঁদের জন্য সাফল্য এনে দিয়েছিল তার প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে অসুবিধা কোথায় ছিল? কিছুই কারো জন্য আটকে থাকে না, নতুন যাঁরা এসেছেন যথেষ্ট ভালো করছেন তাঁদের মধ্যে  অনেকে।

নাটক দেখতে গিয়ে তাই বিরাট মাপের অভিনয় সবসময় আশা করি না, আবার দায়সারা গোছের প্রযোজনা দেখতে চাই না। নাটকের অভিনেতা-অভিনেত্রী বারবার মঞ্চে তার সংলাপ ভুলে যাবেন সেটা নিশ্চয় আশা করা যায় না। মানুষের পরিশ্রম আর সর্বময় আন্তরিক প্রচেষ্টার পর যদি কিছু ত্রুটি থেকে যায়, সেটা ক্ষমাসুন্দর চোখে বিবেচনা করা যায়। মঞ্চে নাট্যসৃষ্টির প্রয়াস বাদ দিয়ে টাকার বা অর্থের-গরম দেখতে যাই না, কারো উন্নাসিকতা ধর্তব্যের মধ্যে রাখি না। নাট্যকার বা নির্দেশকের কিংবা অভিনেতা-অভিনেত্রীর কী নাম ডাক, সেটা হিসেব করবার সময় থাকে না। ‘বৃক্ষ তোমার নাম কী ফলে পরিচয়’ মঞ্চে কী পাওয়া গেল আর আমার মস্তিষ্ক বা চিন্তার জগত কতোটা আলোড়িত হলো, মঞ্চের পাত্রপাত্রীদের প্রতি আমার মনে কতোটা ভালোলাগা জন্মালো, সেটাই তখন বিচারের মাপকাঠি। নাটকটাকে বিচার করবার জন্য পরদিন পত্রিকারপাতা খুলে দেখতে যাবো না সে নাটক নিয়ে কিছু লেখা হলো কি না, বা কতো বড় বড় প্রশংসাবাক্য লেখা হলো। নিজের চোখ আর কান, নাটক সম্পর্কে নিজের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা আর দলটির দায়বদ্ধতা দেখে বিচার করে থাকি নাটকটা কেমন। বহুজনের সঙ্গে সেব্যাপারে দ্বিমত হতেই পারে। ফরাসী বিপ্লবের সময় দার্শনিক ভলতেয়ারের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলা। ভলতেয়ারের সেই বাণীকে সামনে রেখে নাসির উদ্দীন বাচ্চু ভাই প্রায়ই এ কথাটা বলেন, ‘আমরা একমত হয়েছি দ্বিমত প্রকাশ করবো বলে’। নিশ্চয় নাটক রচনা, নাট্য নির্দেশনা, অভিনয় বা সামগ্রিকভাবে নাট্যচিন্তা নিয়ে কখনো একমত হবো, কখনো দ্বিমত প্রকাশ করবো। সকলেরই সে অধিকার আছে।

নাটক দেখবার নানা অভিজ্ঞতার বিচার থেকেই বারবার এ সত্যটি উপলব্ধি করেছি, নানারকম ত্রুটি সত্ত্বেও প্রথম তিন দশকের নাট্য প্রযোজনার মানকে সামগ্রিকভাবে ছাড়িয়ে গেছে পরের দুটি দশক। নাট্য নির্দেশনা আর নাট্য রচনার ক্ষেত্রে তো বটেই। পরের দুটি দশকে যে সব সময় উঁচুমানের নাটক লেখা হয়েছে তা হয়তো নয়, কিন্তু নাট্যচর্চার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টেছে। নিজের চিন্তাশক্তিকে সূত্রের বাইরে রেখে কাজে লাগাবার চেষ্টা করেছেন অনেকে। কথাটা এভাবে বললে আরো সঠিকভাবে বলা হয় যে, গত শতকের শেষপ্রান্ত থেকে যদি হিসেব করা যায়, বাংলাদেশের নাটকের ভাবজগতে একটা ভিন্নমাত্রার পরিবর্তন এসেছে। প্রথম তিন দশক নাট্যাঙ্গনের নানান শ্লোগানের দ্বারা যেসব সূত্রবদ্ধ নাটক রচনার বাহুল্য দেখা গিয়েছিল, স্বীকার করতে হবে সেটার যথেষ্ট অবসান ঘটেছে। নাট্যকাররা তাদের দৃষ্টি কমবেশি ভিন্ন দিকে প্রসারিত করেছেন। মামুনুর রশীদের ‘সংক্রান্তি’, ‘চের সাইকেল’, মাসুম রেজার ‘নিত্যপুরাণ’, ‘সুরগাঁও’; শাকুর মজিদের ‘মহাজনের নাও’, মলয় ভৌমিকের ‘হত্যার শিল্পকলা’, বুদেরামের ‘কুপে পড়া’; মিহির দত্তের ‘চারণ কবি মুকুন্দ দাস’  সেলিম আল দীনের ‘ধাবমান’, হাফিজ রেদুর ‘প্রাকৃত পুরাঙ্গনা’, আনন জামানের ‘শিখ-ী কথা’, রতন সিদ্দিকীর ‘হাফ অখড়াই’, মান্নান হীরার ‘বিদ্যাসাগর’, মাজার পিণ্টুর ’মহাত্মা’, মিজানুর রহমানের ‘ঋত্বিক’, সাধনা আহমেদের ‘ব্রাত্য আমি মন্ত্রহীন’, অপু শহীদের ‘আলোর অপেরা’ ইত্যাদি। বিভিন্ন দলের নাটক রচনা বা নাটক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তার প্রমাণ মেলে। নতুন নতুন নাট্যকারদের দেখা মিলছে।  

পূর্বের তিন দশকের সমাজ পরিবর্তন বা শ্রেণী সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, শেকড়ের সন্ধান; এই ধরনের শ্লোগানের প্রভাব বর্তমান শতকের নাট্যরচনায় বা নাটক বাছাইয়ে পাওয়া যাবে না। কিছু ব্যতিক্রম আছে মাত্র। বরং দেখা যায় ব্যক্তি চরিত্রকে নিয়ে অনেকগুলি নাটক লেখা হয়েছে এই সময়কালে। বিভিন্ন প্রসঙ্গ আছে, কিন্তু নাই সেই তথাকথিত শ্রেণীসংগ্রাম, নাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়ে মাতামাতি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কালজয়ী নাটক একটা নয়, স্বাভাবিক নিয়মেই কয়েকটা লেখা হবার কথা ছিল। কিন্তু দুভার্গ্যজনক নেই  একটাও। কালজয়ী বা মন জয় করার মতো গ্রন্থ আছে কিন্তু নাটক বা চলচ্চিত্র নৈব নৈব চ। জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’, মাহবুবুল আলমের ‘গেরিলা থেকে সম্মুখ যুদ্ধ’, হায়দার আনোয়ার খান জুনোর ‘একাত্তরের রণাঙ্গন: শিবপুর’, খোন্দকার মোঃ নূরন্নবীর ‘ঢাকা স্টেডিয়াম থেকে সেক্টর আট’, কৃষ্ণা চটোপাধ্যায়ের ‘মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা: এক কিশোরীর যুদ্ধযাত্রা’; এরকম আরো কয়েকটি বই আছে যা ভিন্নস্বাদের যা থেকে মুক্তিযুদ্ধের নানাদিক সম্পর্কে জানা যায়। ভিন্নধরনের স্বাদ পাওয়া যায়।  কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকে বুঝবার মতো নাটক কোথায় যা মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক বা বিশাল সব অনুভূতিকে জাগিয়ে তুলবে। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের নাটক নামে যা কিছু লেখা হয়েছে তার মধ্যে ঘুরেফিরে এসেছে স্বাধীনতা বিরোধীদের ভূমিকা। প্রায় সব নাটকের বিষয় একটা। কিন্তু সামগ্রিক মুক্তিযুদ্ধের বিচারে স্বাধীনতা বিরোধীরা হচ্ছে খুবই একটি খণ্ডিত অংশ।

ধরা যাক শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তর ‘সিরাজদ্দৌলা’ নাটকটি, মীরজাফর একটি চরিত্র নাটকের। নাটকের ঘৃণিত একটি চরিত্র মীরজাফর সন্দেহ নেই কিন্তু সিরাজদ্দৌলা নাটকে মীরজাফর কি কখনো প্রধান চরিত্র হয়ে এসেছে? নাটকের মূল বিরোধ কি মীরজাফরের সঙ্গে সিরাজদ্দৌলার নাকি ইংরেজ বণিকদের সঙ্গে সিরাজদ্দৌলার? সিরাজদ্দৌলা নাটকের ঘটনায় মীরজাফর প্রসঙ্গটি খণ্ডিত একটি অংশ; বড় বড় আরো চাইরা রয়েছে সেখানে। নবাব সিরাজদ্দৌলা তাদের স্বার্থে আঘাত হেনেছে। সিকান্দার আবুজাফরের লেখা সিরাজ-উ-দ্দৌলা নাটকেও মীরজাফর খুব আলোচিত চরিত্র নয়, নাটকের দ্বন্দ্ব বেড়ে উঠেছে ভিন্নসব ঘটনার দ্বারা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নাটকের ঘটনার দিকে তাকালে মনে হয় সকল সঙ্কটের কারণ রাজাকাররা।

মীরজাফরকে প্রধান চরিত্র করে অবশ্য নাটক লেখা যায়, তাতেও সমস্যা নেই। মূল কথা হলো তার মধ্যে সমাজ-দ্বন্দ্ব ধরা পড়লো কি না। সমাজ-বিচ্ছিন্নভাবে বা ইতিহাসের মূল সত্যকে এড়িয়ে গিয়ে নাট্যকারের ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দ প্রশ্রয় দেয়া বা ভ্রান্তিজনিত পথে দর্শককের ক্ষোভ জাগিয়ে তোলা সমাজসচেতন নাটক নয়। শিল্প-সৃষ্টির ক্ষেত্রে লাগামহীন একপেশে আবেগ খুবই ক্ষতিকর। যুক্তিবর্জিত আবেগ মানুষকে বিপথে চালিত করে। ব্যক্তির দিকে শুধু আঙ্গুল নির্দেশ করা সমাজবিচ্ছিন্নভাবে ভ্রান্ত পথ। চারদিকের ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ ছাড়া কখনো একজন নাৎসী হিটলার জন্মকে ব্যাখ্যা করা যায় না। সমাজের রক্তচক্ষুর কথা না বলে গ্যালিলিও ক্ষমা প্রার্থনাকে মূল্যায়ন করা চলে না। মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে ‘মহাকাব্য’ লিখতে হলে শুধু রাজাকারদের প্রসঙ্গ টেনে এনে সেটা সম্ভব নয়, কয়েক যুগের ইতিহাসকে তার সঙ্গে সকল বৈপরীত্য সহ সম্পৃক্ত করে ফেলতে হয়। মামুনুর রশীদের ‘জয়জয়ন্তী’ সেখানে ভিন্ন পথ বেছে নিলেও, আবেগের বাড়াবাড়িতে যুক্তি হারিয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের নাটক রচনায় যুক্তির এবং ঘটনা পরম্পরার খুব অভাব লক্ষ্য করা যায়। কল্পনা ছাড়া শিল্প হয় না সত্যি। শিল্পের লক্ষণই এই যে, তাতে কল্পনা থাকবে এবং নানা আকাঙক্ষার কথা থাকবে। কিন্তু তা যাতে নিছক অলীক কল্পনায় পরিণত না হয় সেদিকেও স্রষ্টার নজর রাখার দরকার।

নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক রচিত ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ নাটকের পটভূমি কি? মুক্তিবাহিনীর আগমনের আশঙ্কায় ভীত গ্রামের মানুষ মাতব্বরের বাড়িতে ভীড় করেছে। কারণ মাতব্বর এতদিন পাকবাহিনীর হাত থেকে মানুষদের রক্ষা করেছে মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে একত্র করে। মাতব্বর স্বাধীনতা বিরোধী, সেজন্য লোকদের মাতব্বরের কাছে আসা; মুক্তিবাহিনী আক্রমণ করলে শেষপর্যন্ত পাকবাহিনী তাদের রক্ষা করতে পারবে কি না তা জানার জন্য। প্রশ্ন হলো এই ব্যাখ্যা বা পটভূমি কি গ্রহণযোগ্য? বাংলাদেশের কোন্ গ্রামের পুরো সাধারণ মানুষ মুক্তিবাহিনীর ভয়ে মাতব্বরের বাড়িতে আশ্রয় নেয়? বাংলাদেশের এমন কোন গ্রাম আছে যেখানে সাধারণ মানুষ মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরোধ গড়ে তোলে মাতব্বরের কথায়। কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদের আগমনের আশঙ্কায় গ্রামবাসী ভীত হয়ে পড়ে? নাকি সাধারণ মানুষ বা গ্রামবাসীরা সর্বত্র অপেক্ষা করছিল মুক্তিযোদ্ধারা কবে এসে পাকবাহিনী বা স্থানীয় স্বাধীনতা বিরোধীদের হাত থেকে তাদের রক্ষা করবে? নাটকের চরিত্রদের হতে হবে ঘটনার প্রতিনিধিত্বকারী। বাংলাদেশের গ্রামের মানুষরা মুক্তিযোদ্ধাদের আগমনের ভয়ে ভীত এটা কি ইতিহাসের সত্য? পায়ের আওয়াজ পাওয়া নাটকের পটভূমিটাই ইতিহাস বিরুদ্ধ। সৈয়দ হকের অনেক বড় মাপের সৃষ্টি আছে কিন্তু এ নাটকের  পটভূমি কি বাস্তবতার বিরুদ্ধে নয়? নাটকটির অন্য অনেক গুণ রয়েছে, বিশেষ করে সংলাপ রচনায়।

বাংলাদেশের নাটকে বারবার মুক্তিযুদ্ধের নামে স্বাধীনতা বিরোধীদের প্রধান খলনায়ক বানানো হয়েছে, যার ভিতর দিয়ে সমাজের অপরাপর সত্য আর মূল শ্রেণীদ্বন্দ্বটা হারিয়ে যায়। স্বাধীনতা বিরোধীরা অবশ্যই ঘৃণ্য কিন্তু তাকে নাটকে আনতে হবে সমাজের ভিতরের সকল শ্রেণীদ্বন্দ্বের নিয়ামক হিসেবে, নাহলে সে খণ্ডিত এক দুশ্চরিত্র ব্যক্তি হিসেবে পরিগণিত হবে। স্বাধীনতা বিরোধীরা মানুষ হত্যায় ইন্ধন যুগিয়েছে, মানুষের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে, নারীর সম্ভ্রম হরণ করেছে; সবটাই সত্যি। নানারকম নিষ্ঠুরতার অভিযোগ আছে তাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু খণ্ডিতভাবে তাদের খলনায়ক বানিয়ে, বারবার শুধু তাদের অত্যাচারের বর্ণনা দিয়ে কি মুক্তিযুদ্ধের উপর কালজয়ী নাটক সৃষ্টি করা কি সম্ভব? বহু মানুষের কাছে আলোচিত জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলিতে কতটুকু রাজাকারদের প্রসঙ্গ আছে? বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কালজয়ী লেখা ‘গেরিলা থেকে সম্মুখ যুদ্ধে’র মতো বিরাট গ্রন্থে কতটুকু আছে স্বাধীনতা বিরোধীদের প্রসঙ্গ? কিন্তু গ্রন্থটি পাঠ করতে করতে পাঠককে কল্পনায় যুদ্ধের মাঠে নিয়ে যান লেখক, মুক্তিযুদ্ধের নানা প্রসঙ্গ, নানা ঘটনা, নানা বৈপরীত্য আর নানা দ্বন্দ্ব ধরা পড়ে রচনার ভিতরে। পুরো মুক্তিযুদ্ধের নানা বিচিত্র চেহারা পাওয়া যায় সে রচনায়। কৃষ্ণার বইটিতে আছে পালিয়ে বাংলাদেশ থেকে ভারত যাত্রা, বইটি টানটান উত্তেজনায় পাঠকদের আটকে রাখবে, কিন্তু তার মধ্যে কয়পাতা আছে স্বাধীনতা বিরোধীদের প্রসঙ্গ? নাট্যরচনায় এমনটা ঘটলো না কেন, খণ্ডিত একটা চিত্রই বারবার ফুটে উঠলো কেন? সকলরকম রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সহ মুক্তিযুদ্ধের এক সামগ্রিক চেহারা যার ভিতর দিয়ে ফুটে উঠবে, তেমন অনুভূতিপ্রবণ নাটক পাওয়া গেল না কেন? নিঃসন্দেহে এটা নাট্যরচনার ব্যর্থতা।

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত নাটকে সবসময় সূত্রবদ্ধ গল্প বা সূত্রবদ্ধ কিছু চরিত্র পাওয়া গেল, ঠিক তার বাইরে গিয়ে আরো বৃহৎ সত্য বলার মানসিকতা কারো মধ্যে ধরা পড়লো না। কেন? সত্যি বলতে, মুক্তিযুদ্ধ বা ইতিহাসের ঘটনা নিয়ে নাটক লেখা চারটিখানি কথা নয়। কলম ধরলাম আর সূত্রবদ্ধভাবে কিছু লিখে ফেললাম, সেভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিশালত্বকে ফুটিয়ে তোলা যায় না। মুক্তিযুদ্ধকে বুঝতে হলে বিশ্বের নানান দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসগুলি সম্পর্কে ধারণা থাকতে হয়। নিদেন পক্ষে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর পুরো ইতিহাসটাকে বিশ্লেষণ করবার সামর্থ থাকা দরকার। সেলিম আল দীনের ‘বনপাংশুল’ নাটকের দিকে তাকালে ভিন্ন এক সত্য ধরা পড়ে। যে বাঙালী নিজের মুক্তির জন্য একাত্তরে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে, সে বাঙালীর মধ্যে কতিপয় স্বাধীন বাংলাদেশে মান্দাইয়ের বনাঞ্চল লুট করছে। নানাভাবে ঠকাচ্ছে তাদের। পাহাড়ীদের উপর অত্যাচার চলেছে স্বাধীন দেশে, সেটা বাঙালীরাই করেছে। ফলে মন্দাই সমাজের ঘৃণা সেখানে সকল বাঙালী জাতির বিরুদ্ধে। ইতিহাসের রাস্তা বা গতিপথ এত সহজ-সরল নয়। কলম ধরলেই মুক্তিযুদ্ধকে কালজয়ী করা যাবে না, স্রষ্টার থাকতে হবে ইতিহাসের চোখ। মানুষের শোষণ বঞ্চনাকে ব্যাখ্যা করার জন্য চাই ভিন্ন এক দৃষ্টি।  

থিয়েটার পত্রিকায় উনিশশো পঁচাত্তর সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মুক্তিযুদ্ধের নাটক নিয়ে মমতাজউদদীন আহমদের একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। তিনি সেখানে লিখেছিলেন, ‘বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধভিত্তিক ছত্রিশজন নাট্যকারের ঊনপঞ্চাশটি নাটকের সন্ধান পেয়েছি। অধিক তৎপর হলে সংখ্যা বৃদ্ধি হওয়ার সম্ভাবনা। এসব নাটক বাহাত্তর-তেহাত্তরে রচিত।’ যুদ্ধ শেষ হবার মাত্র দু বছরে রচিত হলো উনপঞ্চাশটি নাটক। মনে হবে বিরাট কর্ম। কিন্তু মমতাজউদদীন নাটকগুলি সম্পর্কে কী উপসংহার টানছেন? তিনি লিখেছেন, ‘এসকল প্রকাশ-উন্মাদন নাটকের মূল্যও কালের বিচারে অক্ষয় থাকবে না। এমন চিহ্নিত, উন্মত্ত এবং উদ্বৃত্ত বাণী যোজনাকারী নাটকের কাছে শিল্পকুশলতা দাবী করা নিরর্থক। এ সকল নাটকে যুদ্ধের সংবাদ আছে, নারী ধর্ষণের চিত্র অঙ্কনের জন্যে। প্রমত্ত উন্মাদনা আছে, মাঠের করতালি নিনাদিত জনপ্রিয়তার জন্যে ব্যাকুল সর্বস্ব সংলাপ আছে। নাট্যকারদের উষ্ণ ধিক্কারে শত্রুপক্ষ মর্মান্তিকভাবে বিধ্বস্ত। জাতীয়তাবাদী প্রবল অনুরাগের উচ্ছ্বাসে বাঙালী মাত্রই দুর্দমনীয় দেশপ্রেমিক হিসাবে রূপায়িত। ইতিমধ্যেই উচ্ছ্বাসের জোয়ার নেমে যাওয়ার সাথে সাথে নাটক ভাঁটার টানে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাচ্ছে।’ খুব নির্মমভাবে এক সত্য উচ্চারণ করেছেন মমতাজউদদীন আহমদ, বলেছেন যুদ্ধের সংবাদ আনা হয়েছে ধর্ষণের চিত্র অঙ্কনের জন্য। মুক্তিযুদ্ধের কথা বলার চেয়ে ধর্ষণের দৃশ্য দেখিয়ে দর্শককে আকর্ষণ করার চেষ্টা, কী রকম স্থূল চিন্তা নাট্যকারদের। মমতাজউদদীন আহমদ তাঁর সময়কালেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নাটককে বিস্মৃত হতে দেখেছেন চার-পাঁচ বছর সময়কালের মধ্যেই। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মানুষের ভিতর যতোই আবেগ থাক, নাটক যদি নাটক না হয়ে ওঠে মানুষ তা ভুলে যাবেই। ভিতরে সত্যের নির্যাস না থাকলে শুধু আবেগ বেশিক্ষণ বিক্রি করা যায় না। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মনের খেয়ালে যা কিছু একটা লিখলেই মুক্তিযুদ্ধের নাটক হয় না।

মমতাজউদদীন আহমদ যা পঁচাত্তর সালে লিখেছিলেন তা পরবর্তী নাটকগুলির ক্ষেত্রেও সত্যি। সামান্যতম কালজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা নেই নাটকগুলির। বহুজন যখন বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ফল চলে গেছে অন্যদের হাতে। যদি সেটাই সত্যি হয়, তাহলে বহু মানুষের রক্ত দেয়া, বহু নারীর সম্ভ্রম চলে যাওয়ার পর; মুক্তিযুদ্ধ কেন তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারলো না, তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা জানা দরকার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সার্থক নাটক লিখতে হলে। ইতিহাসটা খুব গভীরভাবে জানার পাশাপাশি নাটক লিখবার ক্ষমতাটাও থাকতে হবে। নাটক লিখবার ক্ষমতা আছে অথচ ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করবার ক্ষমতা নেই কিংবা ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করবার ক্ষমতা আছে অথচ নাটক লিখবার দক্ষতা নেই; দুপক্ষই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কালজয়ী নাটক লিখতে ব্যর্থ হবেন। যিনি দুটোতে পারদর্শী এবং আন্তরিক, তিনিই লিখতে পারবেন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সকলের মনকে নাড়া দেয়ার মতো নাটক। সূত্রবদ্ধ নিয়ম দিয়ে না লেখা যায় মুক্তিযুদ্ধের নাটক, না শ্রেণীসংগ্রামের নাটক; এমনকি একটা মনকাড়া প্রেমের নাটক পর্যন্ত নয়। নিত্যপুরাণে পঞ্চপাণ্ডবের প্রতি একলব্যের সকল ঘৃণা সত্ত্বেও, পাঞ্চালীর প্রতি একলব্যের গভীর মমত্ববোধ সেখানে ধরা পড়ে প্রেমের ছদ্মবেশে। সূত্রবদ্ধ নাটকে এরকম গভীর অনুভূতি থাকে না।

সূত্রবদ্ধ নাটকের ধারা থেকে বের হয়ে বর্তমান শতকে অনেকগুলি অনুভূতিপ্রবণ নাটকের মঞ্চায়ন হয়েছে। সেখানে সমাজের নানা দ্বন্দ্ব ফুটে রউঠেছে, নাটকে টানটান উত্তেজনা আছে। ‘মহাজনের নাও’ নাটকটি খুব সাধারণ গল্প নিয়ে গড়ে ওঠা নাটক, সেখানে বিপ্লব নেই বিদ্রোহ নেই; কিন্তু একজন মানুষের জীবনকে ঘিরে নানারকম অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছে। সেইখানে রাষ্ট্র্রের সঙ্গে শাহ আবদুল করিমের দ্বন্দ্বের চিত্রটি পর্যন্ত আছে সংক্ষিপ্ত কয়েকটি বাক্যে, শাহ আবদুল করিমের জীবনের নানা ঘটনাপ্রবাহ মানুষকে নানাভাবে সচকিত করে। দর্শকের হৃদয়কে নাড়া দেয়। কতোগুলি গান আর কিছু কিছু সংলাপ আবার কখনো কিছুটা বণর্না, সব মিলিয়ে সেটা নাটকই হয়ে ওঠে। নাটক দেখার পর মনটা ভরে যায়, কানের ভিতরে গানের সুরগুলি আনাগোণা করে। কখনো এ প্রশ্ন মাথায় আসে না, এটা কি দেশজরীতিতে লেখা নাকি পাশ্চাত্যের ঢংয়ে; এটা কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নাটক, নাকি সমাজ পরিবর্তনের নাটক? নাট্যকারের নাটক দর্শকের মন জয় করতে পেরেছে সেটাই প্রধান বিবেচ্য, অবশ্যই প্রযোজনার গুণে। রবীন্দ্রনাথের বিসর্জন, রক্তকরবী দেখার পর কেউ কি প্রশ্ন তোলে সেটা দেশজরীতি নাকি পাশ্চাত্যরীতি? রবীন্দ্রনাথের নিজস্বরীতি, নিজস্ব ঢংয়ে তিনি লিখেছেন।

বর্তমান শতকে বাংলাদেশের মঞ্চের কার্যক্রমের একটি পর্যবেক্ষণ হলো এই যে, সূত্রবদ্ধ নাটকের হাত থেকে মুক্তির শতক হিসেবে দেখা দিয়েছে অন্তত প্রথম দুই দশক। কিন্তু পুরোটা নয়, ভিন্ন একসূত্রবদ্ধতা আবার অনেকের নাটকে বারবার লক্ষ্য করা গেছে, সেইসঙ্গে অনেকের কথায় বা নাট্যদর্শনে। বর্ণনাত্বক রীতির মহিমা প্রচারিত হচ্ছে খুব নাটক রচনার নতুন সূত্র হিসেবে। কথাটা হেলো, নাটক কে কীভাবে লিখবে বা কে কীভাবে লিখে স্বচ্ছন্দ্য বোধ করবে সেটা নাট্যকারের নিজস্ব ব্যাপার। বিশেষ কারো ফতোয়া মানলেই সেটা দেশজ নাটক হয়ে যাবে, এটা বিভ্রান্তিকর প্রচার। কারা ভোট দিয়ে ঠিক করেছে, কোনটা দেশজ আর কোনটা দেশজ নয়? সেরকম ভোটাভুটি হয়েছে কি এপার বাংলা আর ওপার বাংলা মিলিয়ে। না হলে নাট্যাঙ্গনের কারা সেই পুরোহিত যাদের কথা শেষ সিদ্ধান্ত বলে গৃহীত হবে? বহুবার আলোচনায় শুনেছি, রবীন্দ্রনাথ তার পর সেলিম আল দীন। সেলিম আল দীনের প্রতি পুরো সম্মান রেখে বলছি, যাঁরা এ কথা বলেন কীসের ভিত্তিতে বলেন? নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় সেলিম ভাইর বিরাট ভূমিকা আছে। মৃত্যুর আগের দশ বছর তাঁর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগতভাবে সুন্দর সময় কেটেছে। তিনি ছিলেন চিন্তাশীল একজন মানুষ, নিজের চিন্তাকে নানাভাবে প্রকাশ করেছেন। চিন্তার সেই প্রকাশটাই অনেক বড়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ আর সেলিম আল দীনের মাঝখানের পুরো বাংলা নাটকের ইতিহাসটা কি মুছে ফেলবো আমরা? বাংলাদেশে কিছু মানুষ চীৎকার করলেই কি পশ্চিমবঙ্গের নাট্যজগত তা মুখ বুজে মেনে নেবে? রবীন্দ্রনাথের পর সেলিম আল দীন, মাঝখানে কেউ নেই! রবীন্দ্রনাথ কি বর্ণনাত্বক নাটক লিখেছেন নাকি কখনো? নাকি তিনি নিজেকে অন্যের চেয়ে সেরা দাবি করেছেন? খুব ছোটবেলায় পাড়াপরশি সবার মুখে শুনতাম, ‘নিজে যাকে বড় বলে বড় সে নয়’। ইতিহাসের দীর্ঘসময় কাল পার করে আসতে হয় সেকথা বলার জন্য।

রবীন্দ্রনাথের নাটকে, সঙ্গীতে, চিত্রকলায় পাশ্চাত্যের বহু মিশ্রণ আছে; তারপরেও রবীন্দ্রনাথ হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের আর যাই হোক ব্যক্তি-পরিচিতির সঙ্কট ছিল না। নিজেকে অন্যের চেয়ে আলাদা করে, বড় করে প্রচার করার প্রবণতা ছিল না। তিনি নতুন কোনো ধারা প্রচলন করেছেন বলে কখনো গলাবাজি করেননি। তিনি জানতেন দেয়া-নেয়ার ভিতর দিয়েই বিশ্বের সৃষ্টিশীলতা এগিয়ে যাবে, বিশেষ একজনের বিশেষ ধারা নির্মাণের মিথ্যা অহঙ্কারে নয়। রবীন্দ্রনাথের নাটকে গানের ব্যবহার আছে, তার আগের বহু নাট্যকারের নাটকেই গানের ব্যবহার আছে। নাটকে গান যোগ করার জন্য রবীন্দ্রনাথ অন্যদের থেকে আলাদা হননি, হয়েছেন সামগ্রিকভাবে নাট্য রচনার গুণে। তিনি যে অন্যদের থেকে আলাদা তা কখনো জোর করে বলতে যাননি। বরং তৎকালীন নাট্যধারার মানুষদের সঙ্গে সুযোগ পেলেই মেলামেশা করেছেন, যাঁদের পরামর্শ নেয়া দরকার মনে করেছেন, তাঁদের পরামর্শ নিয়েছেন। নিজের নাটককে অন্যের সমালোচনা শুনে পাল্টে ফেলেছেন পর্যন্ত। কারণ যাঁদের ভিতরে সম্পদের অভাব নেই, তাঁরা কিছু সৃষ্টি বাদ দিয়ে আবার নতুন করে সৃষ্টি করতে পারেন। যাঁদের সৃষ্টি করবার ক্ষমতা কম, তাঁরা নিজের সৃষ্টির কিছুই বাদ দিতে চান না। যদি শূন্য স্থান পূরণ করতে না পারেন! বড় বড় স্রষ্টরা তাই নিজেরই সমালোচনার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজের সৃষ্টিকে যে কতোবার পাল্টেছেন। সৃষ্টিকে পরিপূর্ণ করার তাড়না শেষ হতে চায় না তাঁদের।

নিজের মধ্যম মানের সৃষ্টিকে আমরা বরং শ্রেষ্ঠ বলে সীলমোহর মেরে দিতে চাই। নিজের পক্ষে চেলা জুটিয়ে নিতে সময় লাগে না। বাংলাদেশের নাট্যজগতে তাই, কতোজনকে নাট্যরথী, নাট্য-মহারথী, নাট্যপণ্ডিত এরকম কতো উপাধি বা বিশেষণে ডাকা হয়, বিশ্বে বা বাংলাদেশের বাইরে কোথাও এটা পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশের খুব কাছের মানুষ; শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, মনোজ মিত্র, তৃপ্তি মিত্র, শোভা সেন এরকম কতো নাম আছে, কিন্তু তাঁদের নামে কোনো বিশেষণ দরকার হয় না। বাংলাদেশের কিছু মহাপ্রতিভাবান পণ্ডিতদের এসব দরকার হয়। বাংলাদেশের আহমদ শরীফ, আহমদ ছফা প্রমুখের এসব দরকার হতো না। কিছু মানুষ নাট্যচর্চা বা নাট্য আন্দোলনকে যতো এগিয়ে নিতে যেতে চান, তার চেয়ে বেশি আকাঙ্ক্ষিত হলো নানান বিশেষণ, উপাধি আর নানান পদক। কথাটা নাট্য জগতের সবার ক্ষেত্রে সত্য নয়। ঠিক মতো খেয়ে না খেয়ে প্রাণপাত করে নাট্যচর্চায় লড়াই করে চলেছে সারাদেশের বহু মানুষ, বিশেষ করে তরুণ-তরুণীরা। কিন্তু সমস্যা হলো, গুরুজনদের এসব দেখে তাদের মধ্যে লোভ জেগে ওঠা অস্বাভাবিক নয়। বহুকাল আগে সামন্ত সমাজ ছিল, যখন নামের আগে কতো বড় বড় উপাধি যোগ করবে তার প্রতিযোগিতা চলতো। বর্তমানে কি আমরা সামন্ত সমাজে বাস করছি? নাট্য জগতের কাজ নয় কি সামন্ত সংস্কৃতিকে ভেঙে দিয়ে মুক্তচিন্তার সমাজ সৃষ্টি করা? নাকি তাঁদের কাজ সামন্ত-সংস্কৃতির অবশেষ নিয়ে বেঁচে থাকা!  সত্যিকার মুক্তচিন্তা কারা করেন, এসব থেকে ধারণা পাওয়া যায়।

সকল কিছুর পর, নানা প্রতিকুলতার মধ্যে প্রতিভার দেখা পাওয়া যাচ্ছে মাঝে মধ্যে নাট্যাঙ্গনে। দরকার তাঁদের সংখ্যা বাড়িয়ে তোলা। স্মরণ রাখতে হবে দরকার শুধুমাত্র প্রতিভাবান মানুষ নয়, দরকার প্রতিভাবান মানুষ কিন্তু একই সঙ্গে বৃহত্তর মানুষের পক্ষে থাকবার মতো প্রতিভা। বাংলাদেশের নাটকের ইতিবাচক নতুন একটি ধারা লক্ষ্য করা গেলেও, কিন্তু সেখানে আবার সমাজসত্য থেকে নানাসময়ে পলায়নের মনোভাব পর্যন্ত আছে। সুস্পষ্টভাবে রাষ্ট্রীয় অত্যাচরের বিরুদ্ধে বহু নাট্যকর্র্মীদের চোখ বন্ধ করে থাকতে দেখা যায়। বাকার বকুল নির্দেশিত ‘লেট মি আউট’ সেখানে একটি সাহসী প্রযোজনা। বারবার বলে রাখছি সব নাটক আমার দেখা হয়নি। নাটক দেখতে গিয়ে আমার নানা চিন্তা আর অনুভূতির কথা বলছি। সাইফ সুমনের নির্দেশিত না মানুষি জমিন নাটকের ভিতর বিভিন্ন রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রনীতির আর এক জটিল চেহারা ধরা পড়ে, যেখানে মানুষের চেয়ে রাষ্ট্র বড়। নাটকগুলি নিয়ে দীর্ঘ মন্তব্য করার সুযোগ নেই এখানে। রতন দেব নির্দেশিত ‘রাজনৈতিক হত্যা’র মধ্যে নাগরিকদের রাজনৈতিক অধিকার, মানুষের বাক-স্বাধীনতা হরণের চিত্রটি ধরা পড়ে। ঠিক একই সঙ্গে মানুষের মুক্তির জন্য বিভিন্ন মানুষের ত্যাগ-তিতিক্ষার কথা চলে আসে। সূত্রবদ্ধতার ভিতর দিয়ে বেরিয়ে আসার নানা উদাহরণ ফুটে ওঠে এই শতকের নাট্যচর্চায়। ‘রাহু চণ্ডালের হাড়’ নাটকে মূল বক্তব্য ফুটিয়ে তোলার চেয়ে নির্দেশনায় নানা দক্ষতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন নির্দেশক, রাহু চণ্ডালের হাড় নাটকের গভীর বিষয়বস্তু তাতে মার খেয়েছে। কিন্তু সূত্রবদ্ধ নাটক করবার প্রবণতা থেকে বের হয়ে এসেছে দলটি, সেই প্রযোজনায় সেটি স্পষ্ট, পাশাপাশি নির্দেশকের কাজে পরিশ্রম আর সম্ভাবনা ধরা পড়েছে। কিন্তু দরকার বিষয়বস্তুর মূল জায়গাটা থেকে সরে না দাঁড়ানো।

নতুন সম্ভাবনার জায়গা তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের নাট্যমঞ্চে বর্তমান শতকে। কিন্তু রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিটি বহু ক্ষেত্রেই স্পষ্ট নয়, বহু ক্ষেত্রে নাট্যকর্মীরা কথা বলছেন রাষ্ট্রের পক্ষে। রাষ্ট্রের পক্ষে কখনো কখনো কথা বলা যেতে পারে বিশেষ কারণে। কিন্তু সর্বদা রাষ্ট্রের নানা অত্যাচারে মুখ বুজে থেকে জনগণের জন্য নাটক করা যায় না। নাটক যদি জনগণের পক্ষে না দাঁড়ায় দরকার কী তেমন নাটক মঞ্চায়নের? নিশ্চয় সরকার পক্ষের তেমন নাটক দরকার হলে হতে পারে, জনগণের লাভ কী তাতে? মঞ্চায়িত সবনাটক যে সরকারের পক্ষে গেছে সেটা কিন্তু নয়, কিন্তু সরকারের নানা অত্যাচারে, বাক-স্বাধীনতা হরণে নাট্যকর্মীদের বড় অংশের ভূমিকা সামান্য প্রতিবাদ-মুখর ছিল না। সত্যিকারভাবে সরকারের পক্ষে দাঁড়াতে চাইলে, নাটকে সরকারের কাজের সমালোচনা থাকতে হয়। সরকারের ভুলত্রুটি দেখিয়ে দেয়াটা নাট্যকার বা সাংস্কৃতিক কর্মীদের দায়িত্ব। নাট্যান্দোলনের দিকে তাকালে মনে হয়, গত বারো বছরে জনগণে খুব সুখের মধ্যে বাস করছে। সরকারিভাবে হত্যা, গুম, বাক-স্বাধীনতা হরণ কিছুই হয়নি। বর্তমান সরকার বলে কথা নয়, গত উনপঞ্চাশ বছর ধরে এসব চলছে। রক্ত দিয়ে লড়াই করা স্বাধীন দেশে এরকম পরিস্থিতি থাকবে কেন সেটা নিয়ে নাটকে বারবার সত্য উচ্চারিত হতে হবে মঞ্চ থেকে। নাটকে এসব সত্য উচ্চারণ মানে, সবসময় সরকারের বিরুদ্ধতা বা মুখোমুখি দাঁড়ানো নয়; নাট্যজগতের দায়িত্ব সরকার আর জনগণকে একসঙ্গে পথ দেখানো; জনগণের মুক্তি কোথায় সেটা সোচ্চারে বলে ফেলা।

নাট্যজগতের মানুষরা যদি সবাই সনমাজসচেতন হতেন, নিশ্চয় এই সত্যটি উপলব্ধি করতেন সরকারকে নানা সঙ্কটের ভিতর দিয়ে যেতে হয়। পুরানো রাজনৈতিক ধ্যানধারণা, পুরানো আমলাতন্ত্র, সরকারের অন্যান্য নানা প্রতিষ্ঠান যে সরকারের কাজে বিরাট বাধা সেই সত্যটা উন্মোচন করাও নাট্যকার আর নাট্যকর্মঢীদের দায়িত্ব। কালকে বিপ্লব করার জন্য ডাক দেয়া বা সরকার উৎখাত করার ব্যাপার এটা নয়, বরং নাট্যকার এ কথাটাই সঠিকভাবে বলতে পারে সরকার উৎখাত সঙ্কটের একমাত্র সমাধান নয়। গত উনপঞ্চাশ বছরে বারবার সরকার পাল্টে কী লাভ হয়েছে? সামান্য বাক-স্বাধীনতাটা কি কেউ জনগণকে দিয়েছে? সরকারের সঙ্গে রাষ্ট্রের, সরকারের নানা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জনগণের যে দ্বন্দ্ব, সেটা নাটকে স্পষ্ট করে তোলা নাট্যকারের বা নাট্যদলগুলির প্রযোজনার কাজ। পাশাপাশি নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে রাষ্ট্রের আমলাতন্ত্র এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারের যে দ্বন্দ্ব, সেটাও পরিষ্কার করে তোলা দরকার। রাষ্ট্রযন্ত্র আর সরকার যে এক নয় সেটা বুঝতে হবে, রবীন্দ্রনাথ ‘রক্তকরবী’ লিখতে গিয়ে সেটা বুঝেছিলেন। শ্রমজীবীরা সেখানে ‘সংখ্যা মাত্র’, রাজা রাষ্ট্রযন্ত্রের নানা বিধানে বাঁধা, সর্দারের খবরদারি আসলে রাজার উপরে।

সরকার আর বণিকতন্ত্র যে বিরাট সময় ধরে পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়ায় সেটাও বলা দরকার নাটকে। রাষ্ট্রযন্ত্রকে আড়াল করে সরকারের বিরুদ্ধে আক্রোশ প্রকাশটা প্রগতিশীলতার লক্ষণ নয়। বরং বিভ্রান্তিকর। সবার আগে আক্রমণ করতে হবে রাষ্ট্রযন্ত্রকে, পুঁজির দাসত্বে বাঁধা রাজনীতিকে। সরকার সামগ্রিকভাবে জনবিচ্ছিন্ন হলে, প্রতিক্রিয়াশীল সব সরকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আঁতাত করতে যে বাধ্য হয় সেই প্রশ্নটি নাটকে আসা দরকার। সরকারের পতনের ডাক দিতে হলে সেটা দেবে রাজনৈতিক দলগুলি, নাট্যকার আর নাট্যকর্মীদের প্রধান কাজ দর্শককে সমাজ ব্যবস্থার নানা অলিগলি চিনতে শেখানো। মানব প্রকৃতিকে নানাভাবে বিশ্লেষণ করা। রাজনৈতিক এই দ্বন্দ্বে জনগণের বহুমুখী চরিত্রের খবর দেয়া। নাটক বা মঞ্চের পক্ষে কখন এটা করা সম্ভব? যখন নাট্যকার, নাট্যনির্দেশক এবং নাট্যকর্মীরা ইতিহাস আর সমাজবিজ্ঞান সম্পর্কে সচেতন; যখন রাজনীতির প্রতিটি খুঁটিনাটি তার দখলে এবং একই সঙ্গে শাসক আর জনগণের মনস্তত্ত্ব তার নখদর্পণে। নাটকে যেমন রাজনৈতিক প্রসঙ্গ আসবে, মানবচরিত্রের নানাদিকগুলির বিশ্লেষণও আসতে হবে।

ঠিক একই মানুষ, একজন জনগণকে পেটায়, হত্যা করে, গুম করে; আবার আর একজন মানুষ জনগণকে রক্ষা করতে অকাতরে প্রাণ দেয়। দুটো মানুষের মধ্যে কেন এ পার্থক্য ঘটে এই প্রশ্নের জবাবটা নাট্যকারকে পরিষ্কারভাবে জানতেই হবে। সমাজবিজ্ঞানের চোখ দিয়ে সেটা দেখতে শিখতে হবে। না হলে তাঁর কলম সঠিক পথে আগাবে না। উইলিয়াম শেক্সপিয়রের নাটক ‘কোরিওলেনাস’-এ কোরিওলেনাস দেশপ্রেমিক সাহসী যোদ্ধা থেকে হঠাৎ কেন নিজের দেশের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়, আবার মার্চেন্ট অব ভেনিস নাটকে শাইলককে প্রথম খলনায়ক বানিয়ে পরে নাট্যকার কেন শাইলকের পক্ষ নিয়েই খ্রিষ্টানজগতকে সমালোচনা করে; এই সত্য বারবার বর্তমানকালের নাট্যকার এবং নাট্যকর্মীকে  উপলব্ধি করতে হবে। মহাভারতে পাণ্ডব বা কৌরব দুপক্ষের কারো পক্ষেই এককভাবে প্রশংসা বাক্য উচ্চারিত হয়নি। সকলেই তারা নিন্দা আর প্রশংসার বানে জর্জরিত। প্রতিটা চরিত্র। ব্রাহ্মণ শ্রীকৃষ্ণকে মহৎ করবার লক্ষ্য নিয়ে যে মহাভারত রচিত হয়, সেই শ্রীকৃষ্ণই মহাভারতে সবচেয়ে বেশি শঠাতর পরিচয় দিয়েছে মহাভারতের নানা পৃষ্ঠায় নিজের কার্যো-উদ্ধারে। মহাভারত সে-কারণেই এতবছর ধরে একই রকম জনপ্রিয়তা আর গৌরব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু মহাভারতের মূল উদ্দেশ্য ছিল বর্ণবাদকে প্রতিষ্ঠা দেয়া বৌদ্ধ আর জৈন ধর্মের প্রচারের বিরুদ্ধে। কিন্তু মানব-প্রকৃতি আর সমাজসত্য প্রকাশ করতে গিয়ে নানা বৈপরীত্য প্রকাশ হয়ে পড়ে সেখানে। কথাটা ইলিয়ড আর অডিসির ক্ষেত্রে সমানভাবে সত্য।

ফলে ব্রেশট আর পিসকাটর নিজেরা মহাকাব্যিক থিয়েটার বলে পরিচয় দিয়েছেন নিজেদের সৃষ্টিকে, কারণ মহাকাব্যের দ্বান্দ্বিক চরিত্র আর ঘটনার বিশালত্ব ধারণ করতে চেয়েছেন তাদের নাটকে। নাট্যকার যদি নিজের আন্তরিকতা নিয়ে সত্য উচ্চারণ করতে চান, দেখা যাবে সরকারের পক্ষ নিলেও নানাভাবে তা আবার সরকারের বিরুদ্ধে চলে যাবে। নাট্যকারের দৃঢ়তা, নাটক লিখবার দক্ষতা আর সমাজকে দেখার চোখ থাকলে সেটা ঘটবেই। সাধারণত মানুষ বলে, ধর্ম সবসময় শোষণের পক্ষে কথা বলে। কথাটা একপেশে, ধর্মকে সঠিক দৃষ্টি দিয়ে বিচার করতে পারা চাই। ধর্ম প্রথম দিকে মানুষের ‘পরিচয়’ আর সঠিক ‘অবস্থাটা’ জানতে চেয়েছিল নানা প্রশ্ন উত্থাপন করে। মানুষের এই প্রশ্ন উত্থাপন করার ভিতর দিয়েই বিজ্ঞানের আবিষ্কার আরম্ভ হয়। প্রথম দিকের ধমানুষ্ঠান থেকে জন্ম নেয় নাট্যকলা আর বিভিন্ন অনুষ্ঠান; সঙ্গীত ও নৃত্য। দেবতার মহিমা প্রচার দিয়ে যা আরম্ভ হয়েছিল, পরে তা হয়ে দাঁড়ালো মানুষের লড়বার অস্ত্র। শাসনকদের পক্ষেও বহু সময় দাঁড়াচ্ছে তা। বর্তমান সময়ে নিঃসন্দেহে ধর্ম শাসকদের রাষ্ট্র পরিচালনার হাতিয়ার। কিন্তু সেটা অর্ধসত্য। যিশুখ্রিষ্টকে নিয়ে ধর্মীয় প্রথম রচনাগুলি সব গিয়েছিল জনগণের পক্ষে, বিদ্রোহের আমন্ত্রণ ছিল তাতে। ফলে ক্রীতদাস বিদ্রোহ ঘটে যায়, সাধারণ মানুষ আর ক্রীতদাসরা গ্রহণ করে সেই ধর্ম। যখন রোমান শাসক সেই খ্রিষ্টধর্মকে সরকারি ধর্ম বানালো, পুরোপুরি পাল্টে গেল ধর্মটার চেহারা।

ভারতবর্ষের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ আরম্ভ হয়েছিল ধর্মকে ঘিরে। সারা উত্তর ভারতের হিন্দু মুসলমানরা একযোগে বিদ্রোহ আরম্ভ করেছিল, নিজ নিজ ধর্মের সম্মান রক্ষার জন্য। সেখানে সামান্য সাম্প্রদায়িক প্রশ্ন ছিল না, ভারতের মানুষ হিসেবে হিন্দু-মুসলমানরা মিলিতভাবে লড়েছিল সকলে ব্রিটিশ শাসনকে উৎখাত করতে। সে বিদ্রোহ আজও সকলের সম্মান লাভ করে। কারণ বিদ্রোহের আলখাল্লাটা ধর্মের, ভিতরের অন্তরটা সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে ভারতীয় সকল মানুষের মুক্তির। জার্মানীতে কৃষক বিদ্রোহ ঘটেছিল একইভাবে ধর্মকে কেন্দ্র করে। ফলে ইতিহাসকে বিচার করা বিশ্লেষণ করার রাস্তাটা খুব সরল নয়। সবসময়ই সেটা দ্বান্দ্বিক, ফলে হঠাৎ যা কিছু লিখে ফেললে হয় না। শিল্প-সাহিত্য বিচারে, শিল্প-সাহিত্য সৃষ্টিতে তাই সূত্রবদ্ধ কথাবার্তা বা শ্লোগানের প্রভাব হয়ে দাঁড়ায় মারাত্মক। বিশেষ করে সেই সমাজে যেখানে মানুষের চেতনার স্তর রয়ে গেছে প্রাথমিক স্তরে। ফলে বাংলাদেশের নাটক বিগত তিন দশকের সকল সূত্র ছিঁড়ে যে নতুন পথ ধরতে পেরেছে সেটা আশার আলো। কিন্তু চিন্তাভাবনা করবার, জানবার বহু কিছু এখনো বাকি। নানা বিষয়ে গভীর অধ্যয়ন ছাড়া সেই অভাবটা পূরণ করা সম্ভব নয়। মনে রাখতে হবে নাট্যকার যদি সাহসী আর কৌশলী হন, ‘টিনের তলোয়ার’ নাটকের মতো শাসকদের রক্তচক্ষুর সামনে দাঁড়িয়ে মঞ্চে শাসকদের বিরুদ্ধে সত্য উচ্চারণ করে বসবে। শাসকরা বিভ্রান্ত হবে আর দর্শকরা পাবে নতুন দিশা। পরের পর্বে নাট্যচর্চার সে সব বিষয় নিয়ে কথা বলা যাবে। চলবে