করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ১৫৭৭৪৪৩ ১৫৪২২৭৪ ২৮০০১
বিশ্বব্যাপী ২৬৬১২৭৪৬৫ ২৩৯৭৫৭২২৫ ৫২৭০৯৪২

সমস্যার সমাধান ‘উদোর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে’ চাপিয়ে হবে না

পর্ব ৪

রাহমান চৌধুরী

প্রকাশিত : অক্টোবর ২৮, ২০২১

কথাটা হলো, হিন্দু কোনো ধর্ম নয়। ধর্মটার নাম বৈদিক ধর্ম। সেটা হিন্দুধর্ম হয়ে গেল কী করে? ভারত, ইন্ডিয়া এসব নাম প্রাচীন যুগে বা মধ্যযুগেও ছিল না। প্রাচীনকালে পাওয়া যায় আর্যাবর্ত বা জম্মুদ্বীপ। মুঘলরা তাদের শাসনে ভারতকে বলতো ‘হিন্দুস্থান’। কারণ ভারতের সকল ধর্মের জনগণই হিন্দু বলে পরিচিত ছিল গ্রীক আর পারস্যের কাছে। গ্রীক আর পারস্যরা ‘স’ কে ‘হ’ বলতো, সে কারণে সিন্ধু নদী হয়ে গেল হিন্দু। সিন্ধুনদীর অপর পারে যারা বসবাস করতো, যেসকল জনগোষ্ঠী ছিল সকলেই গ্রীক আর পারস্যদের কাছে হিন্দু জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত ছিল। ভিন্ন দিকে হিন্দু জনগোষ্ঠী গ্রীক আর পারস্যদের বলতো যবন, মানে বিদেশি।

ব্রিটিশ শাসনে বৈদিক ধর্ম হয়ে গেল হিন্দুধর্ম। পুরো একটা জনগোষ্ঠীর পরিচয় ধর্মের নামে কুক্ষিগত হয়ে গেল। জনগণের পরিচিতির হিন্দু শব্দটা দখল করে নিয়ে গেল বিশেষ একটা ধর্ম। ব্যাপারটার সেখানে শেষ নয়, কিছুদিন পর মুসলমানদের বাদ দিয়ে, ভারতে মুসলমানদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে আরম্ভ হলো হিন্দু জাতীয়তাবাদের আন্দোলন। প্রথম আরম্ভ হিন্দুমেলা নাম দিয়ে ১৮৬৭ সালে। কারা যুক্ত এর সঙ্গে? রবীন্দ্রনাথের পরিবার এর পৃষ্ঠপোষক। রবীন্দ্রনাথের পিতা, ভ্রাতা, বঙ্কিমচন্দ্র, রাজনারায়ণ বসু প্রমুখ। কিছু হিন্দুর দিক থেকে সমালোচনা হয়েছিল হিন্দুমেলার; তাঁরা বলেছিলেন, বাংলায় যখন মুসলমান আছে তখন ‘হিন্দুমেলা’ নাম কেন?

কয়েক বছর পর হিন্দুমেলার নাম পাল্টে রাখা হলো ‘চৈত্রসংক্রান্তি’। কিছুদিন পরে আরো জোরালোভাবে আরম্ভ হলো ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদ`। মুসলমানরা তখন ইংরেজি শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠী মাত্র। হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ তাহলে কোথা থেকে আরম্ভ হয়েছিল? কারা আরম্ভ করেছিল? হিন্দুমেলার পর বঙ্কিম আস্ত একটা উপন্যাস লিখে ফেললেন, ‘আনন্দমঠ’ নামে। সেই উপন্যাসের মূল কথা কী? সকল মুসলমানদের নিধন করতে হবে স্পষ্ট করে তিনি এই কথাটাই বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা করতে হবে? তিনি সেই সঙ্গে এটাও বলেন, কিন্তু ইংরেজদের সঙ্গে বিরোধ করা চলবে না। মুসলমানদের নিধন করার কথা বলে ব্রিটিশ শাসনের আশীর্বাদ চাইলেন বঙ্কিমচন্দ্র।

মুসলমানরা বঙ্কিমের মুসলিম নিধনের কথা জেনেও সে সময়ে দাঙ্গা বাধায়নি, বরং ধৈর্য ধারণ করেছে। মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল, চাইলে দাঙ্গা বাধাতে পারতো। কিন্তু তাদের মাথায় সেরকম চিন্তা এলো না। কিছু মুসলমান প্রতিবাদ হিসেবে বইটা পুড়িয়ে দিয়েছিল। কারা তাহলে ভারতবর্ষে হিন্দু মুসলমান বিরোধ আরম্ভ করেছিল? ইতিহাসগ্রন্থের পাতায় পাতায় তার প্রমাণ মিলবে। সাধারণ হিন্দুরা নয়, সাধারণ মুসলমানরা নয়। বর্ণহিন্দুরা, বর্ণহিন্দু রাজনীতিকরা বাংলা তথা ভারতে সাম্প্রদায়িক চিন্তা আমদানি করেছিল। মুসলমানরা তখন পশ্চাৎপদ, ইংরেজি শিক্ষা থেকে দূরে। বিদ্যালয়ের পাঠ্য বই লিখতেন হিন্দু শিক্ষিতরা। প্রায় সকল পাঠ্য বই ছিল সাম্প্রদায়িকতায় ভরা, মুসলিম বিদ্বেষ ছড়ানো।

মুসলমানদের হেয় করা হতো, আর হিন্দুত্বের অলৌকিক মহিমা প্রচার করা হতো। ঠাকুর পরিবারের অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভয়াবহ সাম্প্র্রদায়িক একটি বই লিখেছিলেন রাজকাহিনি নামে। মুসলমান শাসকদের বিরুদ্ধে নিন্দায় পরিপূর্ণ সেই গ্রন্থ। নানা আষাঢ়ে গল্পে ভরা সেই গ্রন্থে আছে হিন্দুত্বের মহিমা, পুরো গ্রন্থটাই অলৌকিক কাহিনীতে ভরা, অবৈজ্ঞানিক চিন্তায় ভরা। মুহাম্মদ শহীদুল্লাহসহ শিক্ষিত মুসলমানরা পত্রপত্রিকায় লিখিতভাবে এর প্রতিবাদ জানালেন। রবীন্দ্রনাথ তখন মুসলমানদের পক্ষে কলম ধরলেন। কিন্তু খুব বেশি সুবিধা করতে পারলেন না। মুসলমানদের সম্পর্কে পাঠ্যপুস্তকে এত নিন্দা আর মিথ্যাচার থাকতো যে, মুসলমানরা সেকারণে তাদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে না পাঠিয়ে, মাদ্রাসায় পাঠাতো।

মাদ্রাসাগুলি তখন আবার ক্ষয়িষ্ণু, ধর্মশিক্ষার প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কারণ ইংরেজরা মুঘলদের দেয়া লাখেরাজ জমি কেড়ে নিয়েছে। মাদ্রাসা আর পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে না। ভিন্ন দিকে হিন্দুত্বের বা হিন্দু জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে ওহাবিরা সোচ্চার হলো, সম্পূর্ণ জ্ঞানবিজ্ঞান বাদ দিয়ে ইসলাম ধর্ম প্রচারে মন দিয়েছিল তারা। ইসলামের নামে নানা ভুল তথ্য আর একপেশে ধারণা প্রচার হতে লাগল। মাদ্রাসা শিক্ষার সকল প্রগতিশীল ধারা বাদ পড়লো এদের হাতে। মাদ্রাসা শিক্ষা হয়ে দাঁড়ালো, কূপমণ্ডুক আর সস্তা ধর্মের বয়ান। মধ্যযুগের আলোচিত মাদ্রাসা শিক্ষা তার সমস্ত বিজ্ঞানমনস্কতা হারিয়ে ফেললো। মনে রাখতে হবে, একটা ঘটনা আর একটা ঘটনার জন্ম দেয়। পূর্ব পক্ষ যদি পরের পক্ষের উপর সব দায় চাপাতে চায়, সেটা হবে মিথ্যাচার আর অপরাধ। বিরোধের নিস্পত্তি তাতে হবে না।

মনে রাখতে হবে, পাঠ্যপুস্তক লেখা নিয়ে পরবর্তীতে বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলার সঙ্গে বর্ণহিন্দুদের বিরোধ হয়েছিল। তিনি শিক্ষাবোর্ড গঠন করতে চান। তিনি বলেন, পাঠ্যপুস্তক রচনা এবং তা অনুমোদনের জন্য হিন্দুদের সমান সংখ্যক মুসলমানরা সেখানে থাকবে। বর্ণহিন্দুরা বলেছিল, মুসলমানদের হাতে আমরা বাংলাভাষা ছেড়ে দিতে পারি না। মুসলমানদের হাতে পড়লে বাংলাভাষা ধ্বংস হয়ে যাবে। বর্ণহিন্দুরা তখন এই ভয়ও দেখান যে, দরকার হলে বাংলাকে ভাগ করে ফেলবেন, কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থায় মুসলমানদের অধিকার মানবেন না। বাংলাভাগ কারা করেছে? সত্যি বলতে সে ইতিহাস আর আজকে লুকানো যাচ্ছে না। বাংলাভাগের পক্ষে সংসদে কারা ভোট দিয়েছে তার দলিলপত্র রয়েছে। বাংলা ভাগের বহু আগে রবীন্দ্রনাথ মারা যান। কিন্তু তিনিই মুসলমানদের অধিকারের পক্ষে কলম ধরেন নানা সময়ে।

দু-চারবার তিনি ভুল করেছেন সেটাও ঠিক। তিনিই প্রথম হিন্দু জাতীয়তাবাদের ধারণা থেকে সম্পূর্ণরূপে বের হয়ে আসেন। পরবর্তীতে বর্ণহিন্দুদের অনেকেই ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদের’ বিরুদ্ধে কলম ধরেন। প্রগতিশীল মন নিয়ে তারা সব বিচার বিবেচনা করে ভারতের ইতিহাস লেখার চেষ্টা করেছিলেন। বর্ণহিন্দু বা শিক্ষিত হিন্দুদের মধ্য থেকেই অনেকে ভারতবর্ষের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরেন। ইতিপূর্বে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যেসব মিথ্যাচার বা নিন্দা করা হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে সরব হন তাঁরা। বাংলার মুসলমানরা বরং বলতে গেলে সে ইতিহাস তুলে ধরার ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। সেসব ক্ষেত্রে যাঁরা অবদান রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে আহমদ শরীফ, আহমদ ছফা প্রমুখের নাম উচ্চারিত হবে। চলবে