বিনয় মজুমদার: কবিতার বোধিবৃক্ষ

পর্ব ১২

মলয় রায়চৌধুরী

প্রকাশিত : অক্টোবর ০১, ২০১৯

সাত.
‘ফিরে এসো, চাকা’, বইটির অসাধারণ কবিতাগুলো সত্ত্বেও বিনয় মজুমদারকে সেই ধরণের গুরুত্ব দেয়া হচ্ছিল না, যেমন শক্তি-সুনীল শক্তি-সুনীল ধুয়ো তুলে একটা প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্মে তাঁদের দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়েছিল। স্বাভাবিক যে নিজের মধ্যে পুষে রাখা অপরত্ববোধ বা আদারনেস, বিনয় মজুমদারের মানসিকতায় প্রগাঢ় প্রভাব ফেলে থাকবে। আশ্চর্য যে, ওই সময়ের কবিদের তরুণ বয়সের অজস্র ফোটো পাওয়া যায়, অথচ বিনয়ের তরুণ বয়সের ফোটো দুষ্প্রাপ্য। বিনয় মজুমদারের প্রায় সমস্ত ফোটোই এমন যে, যারা ফোটোগুলো তুলেছেন তারাও প্রমাণ করতে চাইছেন যে, বিনয় একজন ‘অপর’, উস্কোখুস্কো চুলের বিনয়, লণ্ঠন হাতে চলেছেন বিনয়, মাথায় মাফলার জড়িয়ে বিনয়, হাতে বালতি ঝোলানো বিনয়, খালি গায়ে বেঞ্চে বসে বিনয়, ইত্যাদি। আর্যনীল মুখোপাধ্যায় এমনকি লিখেছেন যে, বিনয় ছিলেন ‘একসেনট্রিক’; আমি বলব বিনয় ছিলেন ‘একলেকটিক’। বিনয় তো সাহিত্য সভায় কবিতা পাঠও করতেন, অথচ সেই সময়ের বিনয়ের ফোটো পাওয়া যায় না কেন? শক্তি-সুনীল-শরৎ এমনকি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ফোটোও পাওয়া যায়, কিন্তু গায়ত্রীর প্রেমিক যুবক বিনয়ের ফোটো বিরল। অপর করে দেয়া বা ‘আদারিং’ শব্দটি গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের সৃষ্ট।

সবচেয়ে বিস্ময়কর, বিনয় মজুমদারের সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠা নিয়ে কোনো লোভ ছিল না। যেমনটা ছিল তাঁর দশকের অধিকাংশ কবি-লেখকের, এবং পরের প্রতিটি দশকের কবি-লেখকদের মধ্যে। পুরস্কার, সম্বর্ধনা, রেডিও-টেভিতে রঙিন জামা পরে হাত-পা নাড়াতে দেখা যায়নি তাঁকে। আনন্দবাজার আর দেশ পত্রিকার করিডরে কোনোকালেই ঘুরঘুর করতে যাননি। কিন্তু তিনি বুঝতে পারছিলেন যে, তাঁকে কোণঠাসা করে দেবার প্রয়াস চলছে। তিনি অনুমান করেছিলেন, তাঁর পাণ্ডুলিপি সেইভাবে সংরক্ষিত হবে না যেভাবে খ্যাতনামা কবিদের পাণ্ডলিপি সংরক্ষণ করা হয়। ‘অঘ্রানের অনুভূতিমালা’ কাব্যগ্রন্থের পাণ্ডুলিপি যাতে সংরক্ষণ করা হয় তাই বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ ও ওয়েস্ট বেঙ্গল আর্কাইভকে অনুরোধ করেছিলেন। তারা প্রত্যাখ্যান করলে পাঠিয়ে দেন ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে। পঁচিশ বছর পর একটা চিঠি লিখে বিনয় মজুমদার জানতে পারেন যে, পাণ্ডুলিপিটি সেখানে সযত্নে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

গণিত নিয়ে তাঁর গবেষণা সম্পর্কে ১৯৭২ সালে দেবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে দেয়া সাক্ষাৎকালে বিনয় মজুমদার জানিয়েছিলেন, “১৯৬৩ সালের কিছু চিন্তাকে আমি ভাবলাম মৌলিক আবিষ্কার এবং সেগুলোকে আমি লিখে ফেললাম। লিখে ফেলে প্রথমে আমি ম্যাকমিলান কোম্পানিকে দিয়ে বললাম যে, ভাই দ্যাখ তো তোমরা ছেপে দিতে পারো কিনা পুস্তকাকারে। তবে শেষ পর্যন্ত ছাপা হয়নি। তার কারণ আমি যা শুনেছিলাম, তা হলো, ওদের অধিকাংশই পাঠ্যপুস্তক ছাপার দিকে নজর। একদম একেবারে যা কিনা মৌলিক আবিষ্কার, যা কোথাও পাঠ্য নেই, সেটা ছাপতে ওদের অসুবিধা হয়, বিক্রির ব্যাপার রয়েছে, বিক্রি হয় না। যাই হোক, পরে সেই ম্যানাসক্রিপ্ট, ১৯৬৩ সালের ব্যাপার বলছি, ১৯৬৪ সালের শেষ দিকে ব্রিটিশ মিউজিয়াম আমার কাছ থেকে অ্যাকসেপ্ট করল। আমি পাঠিয়েছিলাম, ওরা বলল, হ্যাঁ, আমরা আপনার পাণ্ডুলিপিখানাকে যত্নের সঙ্গে প্রিজার্ভ করছি, আমাদের মিউজিয়ামে রেখে দিচ্ছি। আমি নিশ্চিন্ত হলাম। সেই পাণ্ডুলিপিখানাকে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে প্রিজার্ভ করে রেখেছে। এর মাস কয়েক পর আমি লিখলাম যে, আমার কাছে তো কোনও কপি নেই ভাই, আমার একটা কপি দরকার। ওরা তখন পুরো ম্যানাসক্রিপ্টকে, ধরো একশো পৃষ্ঠা হবে, সেটাকে ওরা পুরো ফোটোকপি করে, ওই একশো পৃষ্ঠা আমাকে পাঠিয়ে দিলো। আমি সেই ফোটোকপিগুলোকে ভালো করে ভাঁজ করে বাঁধালাম, সুন্দর চামড়া দিয়ে বাঁধিয়ে আমাদের ন্যাশানাল লাইব্রেরি, ভারত সরকারের লাইব্রেরি, ওখানে জমা দিয়ে দিলাম। সে হচ্ছে তোমার ধরো ১৯৬৫ সালের গোড়ার দিকের কথা। আমার পাণ্ডুলিপি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে যে কপি রয়েছে, সেই কপির ভেতরে বারংবার ব্রিটিশ মিউজিয়ামের স্ট্যাম্প মারা রয়েছে। ওই স্ট্যাম্প দেখে ন্যাশানাল লাইব্রেরি ওটা অ্যাকসেপ্ট করল। আমার ধারণা ওই পাণ্ডুলিপিখানা এক মৌলিক আবিষ্কার, গণিতের মৌলিক আবিষ্কার। Interpolation Series and Geometrical Analysis and United Analysis Roots of Calculus.”

তবে? যিনি এইভাবে নিজের রচনাবলি নিয়ে চিন্তা করতে পারেন তাঁকে কলকাতার সাহিত্যিকরা ‘পাগল’ হিসেবে দেগে দিল কেন? ১৯৭২ সালে ‘গল্পকবিতা’ পত্রিকায় গণিত ও কবিতা নিয়ে দেবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেয়া বিনয়ের সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল। বিনয় তখন কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছেন, এবং তার কারণ তিনি জানিয়েছিলেন যে গণিত তাঁর মস্তিষ্ক দখল করে আছে। প্রশ্নোত্তরের প্রাসঙ্গিক অংশটুকু পড়লে বিনয়ের সেই সময়কার ভাবনাচিন্তা কোন পথে প্রবাহিত হচ্ছিল তা স্পষ্ট হবে।

প্রশ্ন: কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে যে, জীবিত খুব কম জনই আপনার মতো কবিতার এত ভেতরে যেতে পেরেছেন। আপনি খুব সার্থক এবং সাবলীলভাবে, বলা যেতে পারে, কবিতার অত ভিতরে গিয়েও কেন কবিতা ছেড়ে দিলেন এটা হচ্ছে প্রশ্ন। আর কবিতা লেখা ছেড়ে দেয়ার আগে পর্যন্ত আপনি নিশ্চয়ই ভেবেছেন যে, এই এই কারণে, এই এই অসুবিধে হচ্ছে আমার কবিতা লেখার জন্য— যার ফলে আমি কবিতা লেখা ছেড়ে দেব। আমরা সেই ভেতরের কারণটা জানতে চাইছি।
বিনয়: ভেতরের?

প্রশ্ন: ভেতরের কারণ বলতে আপনার মনের ভেতরে যে কারণটা ছিল, যেটা আপনাকে কবিতা লেখা ছেড়ে দিতে প্রণোদিত করেছে। এই আর কি!
বিনয়: কিছুদিন আগে তুমি আমাকে লিখেছিলে যে ‘আমার ঈশ্বরীকে’ বইয়ের পিছনে গণিত গ্রন্থের বিজ্ঞাপন দেখেছ তুমি। শুধু ‘আমার ঈশ্বরীকে’ কেন, অনেকগুলো বইয়ের ভিতরে বিজ্ঞাপন আছে। ‘আমার ঈশ্বরী’ বইয়ের বিজ্ঞাপনও আছে। ‘ঈশ্বরীর’ বলে আমার একটা বই আছে, তার ভিতরেও বিজ্ঞাপন আছে। ‘ঈশ্বরীর কবিতাবলী’ বলে আরেকখানা বই আছে, তার ভিতরেও গণিতগ্রন্থের বিজ্ঞাপন রয়েছে। এমনকি এক ফর্মার একটি ছোটো পুস্তিকা বেরিয়েছিল ‘অধিকন্তু’, সেই ‘অধিকন্তু’র ভিতরেও আমার লেখা গণিত গ্রন্থের বিজ্ঞাপন রয়েছে। এই গণিতের জন্য আমি কবিতা লেখা ছেড়ে দিতে বাধ্য হলাম।

প্রশ্ন: কিন্তু গণিত এবং কবিতা কি পাশাপাশি চালানো যেত না? আপনি চেষ্টা করলে পারতেন। সকলের পক্ষে সম্ভব না হলেও। এবং গণিত ও কবিতার মধ্যে কোথাও মিলও তো আছে। হায়ার ম্যাথমেটিকসের কথা আমি বলছি, আমি যতদূর শুনেছি অবশ্য।
বিনয়: কথাটা অবশ্য সত্য। গণিত জিনিসটা ইচ্ছা করলে আত্মস্থ করা যায় না, আবার ইচ্ছা করলে এড়ানোও যায় না। মাথার ভিতরে যখন চিন্তা আসে, গণিত বিষয়ক চিন্তা, তখন তাকে ফেলবার উপায় থাকে না। চিন্তাগুলো বারবার আসতে থাকে। গণিতের নানা সূত্র, গণিতের নানা দর্শন, গণিতের নানা প্রকৃতি মাথার ভিতরে আসতে থাকে, সেটাকে ইচ্ছা করলে বন্ধ করা যায় না। কত সময় মাসের পর মাস মাঝে-মাঝেই আসতে থাকে। এইভাবে গণিত একজনের চিন্তাকে, এবং আমার চিন্তাকে আত্মসাৎ করে নিয়ে বসে আছে। আমি এই যে বাড়িতে বসে থাকি, কখনও ঘুরে বেড়াই, যখনই একটু-একটু একা থাকি, অন্য মনে, তখনই দেখা যায় মাথায় গণিতের বিষয়ে চিন্তা আসছে। এই ভাবে আসা শুরু করেছে এমন নয়, বহু-বহু অনেক বছর আগে থেকেই, ১৯৫৬-৫৭ সাল থেকেই বলা যেতে পারে। তারপর প্রায়ই আসে মাঝে-মাঝে, আর আসতে-আসতে যখন কোনও চিন্তাকে মনে হয়, গণিত বিষয়ক চিন্তাকে মনে হয়, যে এটা লিখে রাখা উচিত, কাজে লাগতে পারে, আমার কিংবা অপরের যদি কাজে লাগে, তখন তাকে লিখেও রাখতে হয়। এইভাবে গণিতের চিন্তা আমার সমস্ত চিন্তার ভিতরে একটা প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করে আছে দীর্ঘকাল থেকে।

প্রশ্ন: গণিতের বিষয় নিয়ে নতুন করে আপনি ভাবতে শুরু করেছেন আবার তাহলে!
বিনয়: না, কবিতা আমি লিখতাম, এটা ঠিক, কিন্তু সেটা আমার গণিত চিন্তার ফাঁকে-ফাঁকে, এবং তুমি আমার কবিতাগুলো পড়লে দেখতে পাবে যে অধিকাংশই গাণিতিক কবিতা।

প্রশ্ন: হ্যাঁ, সেটা আমি লক্ষ্য করেছি।
বিনয়: এটা তুমি লক্ষ্য করেছ, ভালো করেছ। বইগুলি এখনও সব পাণ্ডুলিপি আকারে পড়ে আছে। গণিতের কোনও গ্রন্থ আমার ছাপা হয়নি, সমস্ত গ্রন্থই পাণ্ডুলিপি আকারে পড়ে আছে। এখন এই বর্তমানে আমায় তো সারাক্ষণ গণিত ভেবেই কাটাতে হয়। না ভেবে উপায় থাকে না, মাথায় এসে উদিত হয়, যাকে বলে আবির্ভূত হয়। সারাক্ষণ। অন্য কোনও চিন্তা করতেই পারি না। এই চিন্তার উপরে, এই চিন্তার আসা যাওয়ার উপরে, আমার নিজের কোনও হাত নেই। নিজের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। মাথায় আসতে থাকে সারাবেলা, ফলে কবিতা লেখার কথা ভাবতেই পারি না, কবিতা আর মাথায় এখন আসেই না। তুমি নিজে কবি, কবিতার আবির্ভাব কী করে হয় নিজের মনে বুঝতেই পারো। নিশ্চয়ই টের পাও কবিতা কী করে আবির্ভূত হয়। সে ইচ্ছে করলে যে কবিতা আবির্ভূত হল সেরকমও নয়, আবার ইচ্ছে করে কবিতা এড়িয়ে গেলে সেরকমও নয়। কবিতার যখন আসার সময় তখন এসে যায়। গণিতও সেরকম, যখন আসার সময় তখন এসে যায়। আমার মাথায় এখন শুধু গণিতই আসছে, অন্য কিছু চিন্তা করার অবকাশ থাকছে না।

গ্রন্থি’ পত্রিকার জন্য ১৪১২ বঙ্গাব্দের সাক্ষাৎকারে চন্দন ভট্টাচার্যের সঙ্গে বিনয় মজুমদারের বিজ্ঞানভাবনা নিয়ে যে কথাবার্তা হয়েছিল, তা পড়লে বিনয়ের একটি সামগ্রিক ছবি তৈরি হয়:

প্রশ্ন: একজন কবিতা পাঠক হিসেবে যখন কবি বিনয় মজুমদারের মহত্ব বা uniqueness এর কারণ খুঁজতে বসি, তখন মনে হয় বৈজ্ঞানিক মনন, বৈজ্ঞানিক যুক্তিপদ্ধতি আর বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাকে কাব্যরসে আগাগোড়া ডুবিয়ে হাজির করার অভূতপূর্ব গুণটিই আপনার কাব্য-সার্থকতার জন্য এক নম্বর কৃতিত্ব দাবি করতে পারে। ‘ফিরে এসো, চাকা’র খুব জনপ্রিয় কয়েকটি লাইন তুলে নিচ্ছি উদাহরণ হিসেবে। ‘মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়’– এই লাইনের শিরদাঁড়া একটি বৈজ্ঞানিক সাধারণ জ্ঞান বা যুক্তিসিদ্ধ পর্যবেক্ষণ ছাড়া আর কিছু তো নয়। অথচ লাইনটি একটি শ্রেষ্ঠ পঙক্তি হয়ে উঠল কীভাবে? ‘প্রকৃত’ শব্দের প্রয়োগের জন্য। ‘প্রকৃত’ শব্দটি কাব্যগুণের দ্যোতক হিসেবে কাজ করছে এখানে। একই ভাবে, ‘একটি উজ্বল মাছ… পুনরায় ডুবে গেল’, এই দীর্ঘ বিখ্যাত কবিতার লাইন মূলত বিধৃত করেছে ক্লাস নাইনের ফিজিক্স জ্ঞানকে, একটি নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মিশিয়ে। আমরা সবাই পড়েছি জলের রঙ নেই। গভীর জলের মধ্যে যখন আলোকরশ্মি প্রবেশ করে, তখন রশ্মিগুচ্ছ বর্ণালিতে বিশ্লিষ্ট হয়। বর্ণালির সাতটি রঙের সাতটি বিভিন্ন চ্যুতিকোণ আছে। জলের গভীরতার ওপর নির্ভর করে কোনও নির্দিষ্ট রঙের চ্যুতি আমাদের চোখের অবস্থানের সঙ্গে মিলে-মিশে যায়। ফলে জলকে আমরা সেই রঙেই রঙিন দেখি। আপনি দৃশ্যত সুনীল না লিখে দৃশ্যত সবুজ বা দৃশ্যত তমস— যেখানে সব রঙ শোষিত— লিখতে পারতেন। কিন্তু লাইনটায় কবিতা সৃষ্টি হলো ‘প্রকৃত প্রস্তাবে’ শব্দবন্ধের আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে। বিজ্ঞানভাবনার হাড়কাঠামোর ওপর সৌন্দর্যের মাংসত্বক বসিয়ে দিলো সে। এইরকম নানা উদাহরণ আছে। যেমন মশা উড়ে গেলে তার এই উড়ে যাওয়া ‘ঈষৎ সঙ্গীতময় হয়ে থাকে’ সেই বিষয়টা। এখন কথা হচ্ছে, বৈজ্ঞানিক মননকে এভাবে বাংলা কবিতায় তো কেউ আনেননি?
বিনয়: তোমাদের এই কথাটা ভুল। প্রাচীনকালেও কবিরা বিজ্ঞানভাবনা থেকে কাব্যের আঙ্গিক সৃষ্টি করে নিয়েছেন। আমি যে খুব নতুন কিছু করছি, তা নয়। যেমন ধরো কালিদাসের ‘কুমারসম্ভব কাব্য’। একটি দৃশ্যে যখন হরপার্বতীর বিয়ে হচ্ছে, সেখানে কালিদাস লিখলেন, পৃথিবীর চারদিকে যেমন আলো আর অন্ধকার ক্রমাগত ফিরে-ফিরে আসে, তেমনি শিব আর উমা আগুনের চারপাশে প্রদক্ষিণ করছেন। এটা তো বিজ্ঞানই। অথবা, এই সংস্কৃত শ্লোকটি লক্ষ্য করো— ‘হংসের্যথা ক্ষীরম অম্বু মধ্যাত’। মানে হলো, হাঁস যেমন অম্বু অর্থাৎ জলের ভেতর থেকে ক্ষীর বেছে নেয়। তো, এটাও তো সেই তোমার ভাষায় যুক্তিসিদ্ধ বা বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণকে কাব্যে প্রকাশ করা। তাই নয় কি? আমিও লিখেছি ‘ব্রোঞ্জের জাহাজ আছে যেগুলি চুম্বক দ্বারা আকৃষ্ট হয় না। এরূপ জাহাজে বৈজ্ঞানিক সামুদ্রিক গবেষণা করে।’ এই কবিতাটি ‘গায়ত্রী’ কাব্যগ্রন্থে আছে। ‘ফিরে এসো, চাকা’তে নেয়া হয়নি।

প্রশ্ন: বেশ। কিন্তু পরের দিকের কাব্যগ্রন্থে আর একটা জিনিস লক্ষ্য করা গেল। বিজ্ঞান বা অঙ্কের কোনো কনসেপ্টকে আপনি মানবজীবনের কোনও ঘটনার মতো উল্লেখ করেছেন কবিতায়। বা বহু জায়গায় অঙ্কের সূত্র দিয়ে মানুষের জীবনকে ব্যাখ্যা করতে চাইছেন। বিজ্ঞান ও অঙ্কের সূত্রেরা এভাবে রক্তমাংসে জীবিত হয়ে উঠছে।
বিনয়: মনুষ্যীকরণ। মনুষ্যীকরণ। আর কিছুই না। সেই সময়ে বিজ্ঞানের বেশ কিছু বই অনুবাদ করতে হয়েছিল আমাকে। বইগুলো মন দিয়ে পড়ে দেখলাম, বৈজ্ঞানিক সত্যদের মানুষের জীবনের সঙ্গে মেলানো যায়। এবং এটা কবিতা লেখার এক নতুন পদ্ধতি হতে পারে।

প্রশ্ন: সীমা, অসীম, কল্পনা, ব্যোম, রেখা ইত্যাদি জ্যামিতিক ধারণাগুলিকে আপনি মানব বা মানবীচরিত্র দিতে লাগলেন কবিতায়। জ্যামিতির ওপরও আপনার অসম্ভব টান লক্ষ্য করি।
বিনয়: ঠিক তাই। আচ্ছা, আমি হচ্ছি ইঞ্জিনিয়ারিঙের ছাত্র। একটা কথা আছে, ড্রইং ইজ দি ল্যাঙ্গুয়েজ অফ ইঞ্জিনিয়ার্স। আমি যদি একটি ড্রইং এঁকে পাঠিয়ে দিই তবে পৃথিবীর যে-কোনো প্রান্তেই একজন ইঞ্জিনিয়ার সেটি দেখে বুঝতে পারবে আমি কী বলতে চেয়েছি। নানা রকম ভাবনা মনে আসে। ধরো, ম্যাক্সিমা-মিনিমা বিষয়টা। একটা কার্ভড লাইনের পয়েন্ট অফ ইনফ্লেকশানে কার্ভটাকে ডিফারেনশিয়েট করলে পাচ্ছ একটা পজিটিভ ম্যাক্সিমা, তাকে আবার ডিফারেনশিয়েট করলে আসবে নেগেটিভ স্ট্রেট লাইন, তাকে ফের ডিফারেনশিয়েশানের ফল হলো নেগেটিভ মিনিমা বা ইনফিনিটি… অর্থাৎ অসীম। সুতরাং কার্ভটির পয়েন্ট অফ ইনফ্লেকশানে কী ঘটছে, তার একটা ডায়াগ্রাম এঁকে আমি একখানা জেরক্স করে রেখেছি।

প্রশ্ন: আপনার আরেকটি চূড়ান্ত রহস্যময় কবিতা হলো ‘সমান সমগ্র সীমাহীন’-এর ছয় নম্বর লেখাটি: ‘একটি বিড়ি ধরিয়ে সেই পোড়া দেশলাই/কাঠি দিয়ে আমি/টেবিলে লিখেছিলাম অসীম এক নং যোগ অসীম দুই নং যোগ অসীম তিন নং যোগ ফোঁটা ফোঁটা ফোঁটা…’ এবং তারপর লেখা যখন সমাপ্তিকে ছুঁতে চাইছে সেই সময়ে ‘পেলাম অসীম সিংহ/পেলাম অসীম বালা, অসীম মজুমদার/পেলাম অসীম রায় ভাইরে/অসীম’। আমরা জানি ইনফিনিটি অবিভাজ্য। তো এই অসীমকে ভাগ করা বা বিভিন্ন অসীমের ধারণা করা কীভাবে সম্ভব?
বিনয়: কতকগুলো চিন্তা আমার মাথায় অনেকদিন ধরেই ঘুরপাক খায়, এটি তার অন্যতম। ধরা যাক, আমাদের এই ঠাকুরনগরে এক বিঘে বর্গ ক্ষেত্রাকার জমি আছে, অর্থাৎ দৈর্ঘ্যে এক বিঘে, প্রস্থেও এক বিঘে। এবার যদি মাটির ওপর ওই জমির অংশটুকু কল্পনা করি, তবে তা আকাশ ছাড়িয়ে অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে যাবে। একইভাবে জমিটির মাটির নিচেও নেমে যেতে অসীম পর্যন্ত ছড়িয়েছে। কাজেই এক বিঘে বর্গক্ষেত্রের এক টুকরো অসীম পাওয়া গেল।

প্রশ্ন: কিন্তু বর্গক্ষেত্র তো দৈর্ঘ্য আর প্রন্থের গুণফল। তার অস্তিত্বের ধারণা শুধুমাত্র টু-ডাইমেনশানাল। সেটি আকাশে বা পাতালে প্রসারিত হওয়ার উপায় কোথায়?
বিনয়: বেশ, তাতে না হয় আমি আরেকটি মাত্রা জুড়ে দিলাম। সুতরাং তাকে ত্রিমাত্রিক কল্পনা করতে আর অসুবিধা নেই। এইভাবে, ধরো, ওই এক বিঘে বর্গক্ষেত্রের পাশে আর এক টুকরো এক বিঘের বর্গক্ষেত্র, তার পাশে আরও একটা, এইভাবে টুকরো টুকরো অসীমকে পেয়ে যাচ্ছি। এই অংশগুলির কোনোটির নাম দেয়া যায় অসীম বালা, কেউ অসীম রায়, কেউ অসীম মজুমদার ইত্যাদি। আবার এইসব আলাদা অসীমের যোগফল এক পূর্ণ অসীমও কিন্তু রয়েছে। সে যেন এক ঈশ্বর, এই ব্রহ্মাণ্ডের রাজা। সম্পূর্ণ অসীম যেন এই ছোট-ছোট অসীমের সাহায্যে আমাদের বিশ্বকে শাসন করে চলেছে।

২০০০ সালে ভালোবাসা নিয়ে রোমন্থন করেছিলেন বিনয় মজুমদার, এবং আরেকবার ভেবেছিলেন মানসিক শান্তির কথা এই কবিতাটিতে:

একমাত্র ভালোবাসা

ভালোবাসা একমাত্র ভালোবাসা ভরে দিতে পারে মনে
                                            শান্তি এনে দিতে
কেবল নারীর প্রতি পুরুষের কিংবা কোনো পুরুষের প্রতি
                            কোনো নারীর প্রণয় ভালোবাসা।
এ তো আছে থাকবেই, তদুপরি প্রতিটি বিশেষ্য পদকেই
ভালোবাসা হলো সেই ভালোবাসা যাতে মনে
                                              শান্তি এনে দেয়
আর এই শান্তি কী বা আমাদের প্রয়োজন?

মনে যদি শান্তি থাকে তবে আর কোনো কিছু
                              চাওয়ার থাকে না।
যদি বা চাওয়ার থাকে তা এরূপ যাতে মনে
               শান্তি ঠিক আগের মতন থেকে যায়
আমাদের চাওয়া আর পাওয়ার তালিকাগুলি এইভাবে
                         আমরাই তৈরি করে থাকি।
                  (কবিতা বুঝিনি আমি, জানুয়ারি ২০০১) চলবে

ধারাবাহিক