রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে প্রধানমন্ত্রীর ৫ দফা প্রস্তাব

ছাড়পত্র ডেস্ক

প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬

রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার স্থানীয় সময় বেলা ১১টায় জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ১১ নম্বর কক্ষে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব-অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব প্রস্তাব দেন।

বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর ৫ দফা প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে: রোহিঙ্গাদের নিজভূমিতে মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সহিংসতা বন্ধ করা, পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা বৈষম্য, নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে। ১৯৭৮ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। ১৯৮০-এর দশকেও কয়েক দফায় বড় আকারে রোহিঙ্গাদের আগমন ঘটে। বিভিন্ন সময়ে কিছু রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হলেও ২০১৭ সালে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হয়।”

তিনি আরও বলেন, “৯ বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে মানবিক দায়িত্ব পালন করছে। বর্তমানে দেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। মিয়ানমারে চলমান সহিংসতার কারণে এখনো সেখান থেকে মানুষ পালিয়ে আসছে। প্রতিবছর শিবিরগুলোতে হাজার হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন প্রজন্ম।”

তারেক রহমান বলেন, “রোহিঙ্গা মায়েরা সন্তানদের নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছেন, তরুণরা অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে উঠছে এবং প্রবীণরা নিজেদের ফেলে আসা ঘরবাড়ি ও গ্রামের স্মৃতি নিয়ে নিজভূমিতে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন। মানবিকতার তাগিদে বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দিয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। শিবিরগুলোতে খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “প্রায় ৬ হাজার লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে রোহিঙ্গা শিশুদের মিয়ানমারের পাঠ্যক্রম অনুযায়ী শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে রাখাইন রাজ্যে পুনঃএকীভূত হওয়ার জন্যও প্রস্তুত করা হচ্ছে। শিবিরগুলোর পরিবেশ উন্নত করতে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে গেলেও এসব স্থান দীর্ঘমেয়াদে বসবাসের জন্য আদর্শ নয়।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির কারণে বাংলাদেশের ওপর সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও এর বড় প্রভাব পড়ছে। দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও হতাশা থেকে মানবপাচার, অবৈধ অভিবাসী পাচার ও মাদকপাচারসহ বিভিন্ন আন্তঃদেশীয় অপরাধ বাড়ছে। অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় করে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে পাড়ি দিচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “একটি দেশে অমীমাংসিত থাকা এই সংকট পুরো অঞ্চলের জন্য নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। প্রয়োজন বাড়লেও মানবিক সহায়তার পরিমাণ কমছে। ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় (জেআরপি) ৯৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সহায়তার আবেদন করা হয়েছিল। ২০২৬ সালের জন্য তা কমিয়ে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলার করা হয়েছে, যা দিয়ে কেবল ন্যূনতম জীবনরক্ষাকারী প্রয়োজন মেটানো সম্ভব।”

তারেক রহমান বলেন, “এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে না। আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন। মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার বিষয়টি রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না। অনির্দিষ্টকাল বাংলাদেশ একাই রোহিঙ্গাদের দায়ভার বহন করবে, সেটিও প্রত্যাশিত নয়। রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর টেকসই সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত।”

তিনি আরও বলেন, “রোহিঙ্গারা এখনো নির্বিচারে আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক শ্রম ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার হচ্ছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও ‘আরাকান আর্মি’—উভয়ের বিরুদ্ধেই গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। ফলে সেখানে এখনো নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়নি।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এখন শুধু সহমর্মিতা দেখানোর সময় নয়; সংকটের মূল কারণ চিহ্নিত করে সমাধানের পথে এগিয়ে যেতে হবে। প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপ এবং বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা থেকে এই বাস্তুচ্যুতির স্থায়ী অবসানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।”