শাহেদ কায়েস

শাহেদ কায়েস

শাহেদ কায়েসের গদ্য ‘অদৃশ্য শিকলে আধুনিক মানুষ’

প্রকাশিত : আগস্ট ১০, ২০২৬

কিছুদিন আগে এক বন্ধুকে বলেছিলাম, ‘চাকরিটা যখন তোমাকে এতটাই অসুখী করে তুলেছে, ছেড়ে দিচ্ছ না কেন?’ সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘চাকরি ছাড়লে আমি বাঁচব কীভাবে?’ আমি তার জীবন সম্পর্কে কিছুটা জানি। ভালো বেতন, নিজের ফ্ল্যাট, গাড়ি, সন্তান নামি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ে, বছরে অন্তত একবার দেশের বাইরে বেড়াতে যায় পরিবার নিয়ে। শহরের প্রতিষ্ঠিত একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করায়। জীবন মোটামুটি স্বচ্ছন্দ। তারপরও তার কথাটি আমাকে ভাবিয়েছিল। সত্যিই কি চাকরি ছাড়লে সে বাঁচতে পারবে না? নাকি এতদিনে বেঁচে থাকার জন্য যে ব্যয়বহুল জীবনযাত্রায় নিজেকে অভ্যস্ত করেছে, তার বাইরে যাওয়ার সাহস হারিয়ে ফেলেছে?

এই বন্ধুটি একা একজন মানুষ নন। আমাদের দেশে এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা ভালো বেতন পান, ভালো পোশাক পরেন, সুন্দর রেস্তোরাঁয় খান, ছুটিতে বিদেশে যান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের জীবন দেখে ঈর্ষাও হতে পারে কারো কারো। অথচ গভীর রাতে তাদের অনেকেই ঘুমাতে পারেন না। রোববারের কথা মনে পড়লে শুক্রবারের রাত থেকেই মন খারাপ হয়ে আসে। কর্মক্ষেত্র ভালো লাগে না, বসকে সহ্য হয় না, কাজের মধ্যে আনন্দ নেই, পরিবারকে সময় দেওয়া হয় না। তবু পরদিন সকালে অ্যালার্ম বাজলে উঠে পড়েন। কারণ মাস শেষে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা চাই। আর সেই টাকার প্রয়োজন এতটাই বেড়ে গেছে যে, চাকরির প্রতি বিরক্তি থাকলেও চাকরি ছাড়ার স্বাধীনতা আর নেই।

মানুষের দাসত্ব সম্ভবত কখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। তার রূপ বদলেছে। একসময় দাসের শরীরে শিকল থাকত। তাকে বাজারে বিক্রি করা হতো। মনিব ঠিক করত সে কোথায় থাকবে, কতক্ষণ শ্রম দেবে, কোথায় যাবে। নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তার হাতে ছিল না। মুক্তির পথও প্রায় বন্ধ ছিল। এক মনিবের হাত থেকে আরেক মনিবের হাতে বিক্রি হওয়াই অনেক ক্ষেত্রে ছিল জীবনের পরিবর্তন। আজকের কর্পোরেট অফিসে দৃশ্যটি সম্পূর্ণ আলাদা— শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ, ল্যাপটপ, স্মার্টফোন, ভালো বেতন, স্বাস্থ্যবিমা, পদোন্নতি, উৎসব বোনাস। কর্মীর হাতে নিয়োগপত্র আছে, পদত্যাগের অধিকারও আছে। তারপরও অনেকের জীবনে এমন এক নির্ভরতার বৃত্ত তৈরি হয়েছে, যার বাইরে পা রাখার কথা ভাবলেই ভয় লাগে।

এই ভয় শুধু চাকরি হারানোর ভয় থেকে জন্মায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি জীবনযাত্রা হারানোর আশঙ্কা। ফ্ল্যাটের কিস্তি দিতে হবে, গাড়ির খরচ আছে, সন্তানের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের বেতন আছে। নামি হাসপাতালে চিকিৎসার সামর্থ্য ধরে রাখতে হবে। বছরে বিদেশ ভ্রমণ এখন পারিবারিক অভ্যাস। নতুন ফোন, নতুন পোশাক, রেস্তোরাঁ, ক্লাব, সামাজিক অনুষ্ঠান, উৎসবের কেনাকাটা, সব মিলিয়ে জীবনযাত্রার একটি নির্দিষ্ট মান তৈরি হয়ে গেছে। সেই মান একবার তৈরি হলে সেখান থেকে নিচে নামাকে আমরা অনেক সময় জীবনের অবনতি হিসেবে দেখতে শুরু করি। এখানেই আধুনিক দাসত্ব পুরোনো দাসত্বের চেয়ে সূক্ষ্ম।

পুরোনো মনিব দাসকে বলত, তোমাকে আমার জন্য কাজ করতে হবে। আধুনিক ভোগব্যবস্থা মানুষের কানে অন্য কথা বলে— তোমার আরও চাই, আরও বড় ফ্ল্যাট, আরও দামি গাড়ি, আরও ভালো স্কুল,আরও দূরের ভ্রমণ, আরও নতুন প্রযুক্তি, আরও আকর্ষণীয় জীবন। ‘আরও’ শব্দটির শেষ নেই। মানুষ যত বেশি চায়, তত বেশি অর্থ দরকার হয়। যত বেশি অর্থ দরকার হয়, তত বেশি তাকে নিজের শ্রম ও সময় বিক্রি করতে হয়। এক সময় এমন অবস্থায় পৌঁছায়, যে জীবনকে আরামদায়ক করার জন্য এত অর্থ উপার্জন করা হচ্ছে, সেই জীবন উপভোগ করার সময়ই আর হাতে থাকে না।

কার্ল মার্ক্স শিল্প পুঁজিবাদের শ্রমব্যবস্থা নিয়ে লিখতে গিয়ে মানুষের বিচ্ছিন্নতার কথা বলেছিলেন। তাঁর মতে, শ্রমিক একসময় নিজের কাজের ফল থেকে দূরে সরে যায়। কীভাবে কাজ করবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও তার হাতে থাকে না। ধীরে ধীরে কাজের মধ্যে নিজের সৃজনশীলতা ও ব্যক্তিসত্তার প্রকাশও কমে আসে। উনিশ শতকের কারখানা আর আজকের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের অফিস অবশ্য এক রকম না। কর্ম পরিবেশ বদলেছে, শ্রমিকের অধিকার বেড়েছে, অনেকের জীবনযাত্রার মানও উন্নত হয়েছে। তবু প্রশ্নটি আজও অমীমাংসিত—নিজের জীবনের সময়টুকুর ওপর মানুষের কর্তৃত্ব কতখানি?

সকালের নাশতার টেবিলে অফিসের ফোন, গাড়িতে বসে মেইলের উত্তর, রাতের খাবারের মধ্যেও মেসেজ, ছুটির দিনে ল্যাপটপ খুলতে হচ্ছে। প্রযুক্তি কর্মক্ষেত্রকে মানুষের শোবার ঘরের দরজা পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। আগে অফিস থেকে বের হলে অন্তত অফিসটি পেছনে পড়ে থাকত। এখন অফিস পকেটের ভেতর ঘোরে। এরিখ ফ্রম আরও গভীর একটি জায়গায় হাত রেখেছিলেন। To Have or to Be? গ্রন্থে তিনি মানুষের জীবনকে having ও being এর দুই প্রবণতার আলোকে দেখেছিলেন। একদিকে অধিকার করা, সঞ্চয় করা, নিজের সম্পদের তালিকা দীর্ঘ করা। অন্যদিকে অনুভব করা, সৃষ্টি করা, ভালোবাসা, সম্পর্ক গড়া, মন ও চিন্তার বিস্তার ঘটানো। ভোগনির্ভর সমাজ প্রথম দিকটিকে প্রবল করে তোলে।

ধীরে ধীরে মানুষের পরিচয়ও সম্পদের সঙ্গে জুড়ে যায়। আমি কী পড়ি, কী ভাবি, মানুষের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কেমন, এসবের চেয়ে আমার বাড়ি কোথায়, গাড়ি কী, সন্তান কোন স্কুলে পড়ে, কোথায় চিকিৎসা নিই, ছুটিতে কোন দেশে যাই, কোন ফোন ব্যবহার করি, এসব দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। আমাদের সামাজিক আড্ডাগুলো লক্ষ্য করলেই ব্যাপারটি বোঝা যায়। সন্তানের স্কুল এখন শুধু পড়াশোনার জায়গা হিসেবে আলোচনায় আসে না, সামাজিক অবস্থানের চিহ্ন হিসেবেও আসে। চিকিৎসার আলোচনায় রোগের পাশাপাশি হাসপাতালের নাম উঠে আসে। ভ্রমণের আনন্দের সঙ্গে গন্তব্যের সামাজিক মূল্যও যুক্ত হয়। ইউরোপের ছবি, মালদ্বীপের সমুদ্র, পাঁচ তারকা হোটেলের সকালের নাশতা, নতুন গাড়ির পাশে দাঁড়ানো পরিবার, সবকিছু মিলিয়ে সুখের একটি প্রদর্শনী তৈরি হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সেই প্রদর্শনীকে প্রতিদিনের জীবনে ঢুকিয়ে দিয়েছে।

মানুষ নিজের সাধারণ জীবনকে তুলনা করছে অন্য মানুষের সাজানো কয়েকটি মুহূর্তের সঙ্গে। কারও নতুন বাড়ি দেখে নিজের বাড়ি ছোট মনে হচ্ছে। কারও বিদেশ ভ্রমণের ছবি দেখে নিজের ছুটি নিষ্প্রভ লাগছে। পরিচিত কারও সন্তান দামি স্কুলে ভর্তি হলে নিজের সন্তানের স্কুল নিয়ে অস্বস্তি তৈরি হচ্ছে। এই অস্বস্তিই বাজারের জন্য ঊর্বর জমি। পুঁজিবাদের আধুনিক শক্তি শুধু মানুষের প্রয়োজন মেটানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। নতুন প্রয়োজন তৈরিও তার ব্যবসার অংশ। গত বছরের ফোনটি ভালোভাবে চলছে, তবু নতুন মডেলের বিজ্ঞাপন মনে একটি অভাব তৈরি করে। আলমারিতে পোশাক আছে, তবু নতুন মৌসুমের পোশাক চাই। থাকার জন্য যথেষ্ট জায়গা আছে, তবু আরও বড় ফ্ল্যাটের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়।

বাজার মানুষকে প্রতিদিন বোঝায়, বর্তমান অবস্থাটি যথেষ্ট নয়। সুখ একটু সামনে আছে। সেটি কিনতে হবে। ভাববাদী দার্শনিক ও লেখক হেনরি ডেভিড থোরো ঠিক এই জায়গাতেই অন্য পথের কথা ভেবেছিলেন। ১৮৪৫ সালে তিনি ম্যাসাচুসেটসের ওয়ালডেন পন্ডের পাশে ছোট একটি ঘর তৈরি করে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে থোরো `ওয়াল্ডেন` নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। প্রকৃতির কাছাকাছি সরল জীবন, আত্মনির্ভরতা, ভোগের সীমা এবং মানুষের স্বাধীন চিন্তা এই বইয়ের প্রধান বিষয়। ওয়াল্ডেন পুকুরের পাশে প্রায় দুই বছর একাকী বসবাসের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বইটি লিখেছিলেন। তাঁর Walden আধুনিক সভ্যতা থেকে পালিয়ে যাওয়ার গল্পের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। তিনি দেখতে চেয়েছিলেন, জীবনকে কতটা সরল করা সম্ভব। মানুষের প্রয়োজন কমিয়ে আনলে তার হাতে কতটা জীবন ফিরে আসে। এই ভাবনার মধ্যে স্বাধীনতার এক গভীর সূত্র রয়েছে। যার প্রয়োজন কম, তাকে অর্থের জন্য তুলনামূলক কম সময় বিক্রি করতে হয়। আর যে নিজের সময়ের বড় অংশ নিজের কাছে রাখতে পারে, তার স্বাধীনতার পরিসরও বিস্তৃত হয়।

টলস্টয়ের জীবনের শেষভাগেও সম্পদ ও প্রাচুর্য সম্পর্কে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছিল। অভিজাত পরিবারের সন্তান, বিশ্বখ্যাত লেখক, জমিজমা ও সামাজিক মর্যাদা, সবকিছু থাকার পরও তিনি সাধারণ মানুষের শ্রম ও সরল জীবনের দিকে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। গান্ধীর জীবনেও প্রয়োজন কমিয়ে আনার চেষ্টা ছিল প্রবল। পোশাক থেকে খাদ্যাভ্যাস, ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে দৈনন্দিন জীবন, সর্বত্র তিনি সংযমের চর্চা করেছেন। রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনের কথাও এখানে মনে আসে। গাছের নিচে পাঠ, খোলা আকাশ, প্রকৃতির কাছাকাছি জীবন, শিক্ষা ও সৃজনশীলতার সম্পর্ক সেখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। আজকের একটি শিশু বিপুল অর্থ ব্যয় করে নামী স্কুলে পড়েও যদি দিনের বেশির ভাগ সময় কংক্রিটের ঘরে কাটায়, স্কুল শেষে কোচিং আর বাড়ি ফিরে স্ক্রিনে ডুবে থাকে, তাহলে তার শিক্ষার মান কি শুধু স্কুলের মাসিক বেতনের অঙ্ক দিয়ে মাপা সম্ভব?

এখানে একটি পার্থক্য স্পষ্ট করা জরুরি। বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিক, দিনমজুর, স্বল্প বেতনের কর্মচারী, ঋণের বোঝা বহন করা পরিবার কিংবা সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী মানুষকে এই আলোচনার মধ্যে এনে ‘স্বেচ্ছাদাস’ বলা যাবে না। তাদের অনেকের সামনে চাকরি ছাড়ার বাস্তব সুযোগ নেই। মাসের বেতন বন্ধ হলে খাবার, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা থেমে যেতে পারে। আমার আলোচনা মূলত সেই মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত জীবন নিয়ে, যেখানে আয় বাড়ার সঙ্গে চাহিদা এত দ্রুত বাড়ছে যে, মানুষ নিজের স্বাধীনতার জায়গাটুকু নিজেই ছোট করে ফেলছে।

একসময় Simple living, high thinking কথাটি আমাদের সমাজে বেশ পরিচিত ছিল। এখন যেন তার জায়গা নিয়েছে high living। চিন্তার উচ্চতা কতটা, তার চেয়ে জীবনযাত্রার উচ্চতা কতটা, সেটিই বেশি দৃশ্যমান। অল্পে সন্তুষ্টির কথাও আজ অনেকের কাছে পশ্চাৎপদ শোনায়। অথচ অল্পে সন্তুষ্ট হওয়া মানে দারিদ্র্যকে গ্রহণ করা না। উন্নত চিকিৎসা, ভালো শিক্ষা, আরামদায়ক বাড়ি, সুন্দর পোশাক, ভ্রমণ, প্রযুক্তির সুবিধা, সবই মানুষের জীবনকে সমৃদ্ধ করতে পারে। বিপদ তৈরি হয় তখন, যখন এসব অর্জন করতে গিয়ে মানুষ নিজের সময়, শান্তি, সম্পর্ক, সৃজনশীলতা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলে। ভোগ তখন আর মানুষের অধীনে থাকে না। মানুষই ভোগের অধীনে চলে যায়।

পুঁজিবাদী কর্পোরেট ব্যবস্থা এমন একজন মানুষকেই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে, যার চাহিদার শেষ নেই। কারণ তার বেশি অর্থ চাই, তাই বেশি কাজ চাই। চাকরি হারানোর ভয়ও তার বেশি। ফলে সে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা মেনে নেয়, ছুটির দিনে কাজ করে, রাতের মেইলের উত্তর দেয়, অপছন্দের পরিবেশ সহ্য করে। নিজের জীবনের অসন্তোষকে মাস শেষে বেতনের অঙ্ক দিয়ে সান্ত্বনা দেয়। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, তাকে কেউ শিকল পরায়নি। নিজের অজান্তেই সে ধীরে ধীরে সেই শিকল তৈরি করেছে— কখনো ঋণের কিস্তিতে, কখনো সামাজিক মর্যাদা ধরে রাখার চাপে, কখনো অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটার অভ্যাসে। অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবন মেলাতে গিয়ে, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে এবং শেষ পর্যন্ত নিজের সুখের মাপকাঠিও বাজারের হাতে তুলে দিয়ে সে ক্রমেই নিজের স্বাধীনতার পরিসর ছোট করেছে।

আমার সেই বন্ধুর কথাটি আবার মনে পড়ে। ‘চাকরি ছাড়লে আমি বাঁচব কীভাবে?’ কথাটি শুনে প্রথমে মনে হয়েছিল, তার ভয় বেঁচে থাকা নিয়ে। পরে বুঝলাম, ভয়টা অন্যখানে। সে হয়তো বেঁচে থাকতে পারবে, কিন্তু এখন যেভাবে বাঁচে, সেভাবে থাকতে পারবে না। ফ্ল্যাটের কিস্তি, গাড়ি, সন্তানের ব্যয়বহুল স্কুল, নিয়মিত বিদেশ ভ্রমণ, নামি হাসপাতাল, রেস্তোরাঁ, নতুন প্রযুক্তি, সামাজিক অবস্থান, পরিচিত মহলে নিজের সাফল্যের যে ছবি এত দিনে তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে নিচে নামার কথা সে ভাবতে পারে না। আমাদের অনেকের গল্পও কি এমন হয়ে উঠছে না?

আমরা আয় বাড়াই, তারপর সেই আয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চাহিদা বাড়াই। কিছুদিন পর আগের বিলাসিতা প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়। যে জিনিস ছাড়াও একসময় দিব্যি চলত, সেটি ছাড়া জীবন অসম্ভব মনে হয়। তারপর সেই জীবন ধরে রাখতে আরও অর্থ চাই, অর্থের জন্য আরও শ্রম দিতে হয়, শ্রমের জন্য আরও সময় চলে যায়। ধীরে ধীরে নিজের তৈরি জীবনযাত্রার কাছেই আমরা বন্দি হয়ে পড়ি। পুঁজিবাদী ভোগব্যবস্থার বড় সাফল্য এখানেই। মানুষকে শিকলে বাঁধতে হয় না। শুধু তার আকাঙ্ক্ষাকে সীমাহীন করে তুলতে হয়। তাকে বিশ্বাস করাতে হয়, যা আছে তা যথেষ্ট কম, যা নেই তা পেলেই সুখ আসবে। সেই সুখের পেছনে ছুটতে ছুটতে মানুষ নিজের সময় বিক্রি করে, ঘুম কমায়, পরিবার থেকে দূরে সরে যায়, অপছন্দের কর্মক্ষেত্র সহ্য করে, নিজের সৃজনশীল ইচ্ছাগুলো স্থগিত রাখে। তারপর একদিন আবিষ্কার করে, বহু কিছু কেনার সামর্থ্য তার হয়েছে, শুধু নিজের জন্য একটি বিকেল কেনার সামর্থ্য হারিয়ে গেছে।

আমরা সাধারণত স্বাধীনতাকে দেখি কিছু করার সামর্থ্য হিসেবে। কোথায় যাব, কী কিনব, কোথায় থাকব, কোন পেশা বেছে নেব। অথচ স্বাধীনতার আরেকটি গভীর দিক আছে— প্রত্যাখ্যান করার সামর্থ্য। সবাই যখন ছুটছে, তখন বলতে পারা, আমি এত দ্রুত ছুটতে চাই না। বাজার যখন বলছে আরও কিনুন, তখন বলতে পারা, আমার যথেষ্ট আছে। সমাজ যখন সাফল্যের একটি নির্দিষ্ট ছবি সামনে ধরছে, তখন বলতে পারা, আমার সাফল্যের সংজ্ঞা আলাদা। পরিচিত মানুষ যখন জিজ্ঞেস করছে, এবার কোথায় বেড়াতে গেলেন, তখন কোথাও না যাওয়ার মধ্যেও অস্বস্তি অনুভব না করা। সন্তানের ভবিষ্যৎকে সামাজিক মর্যাদার প্রতিযোগিতা থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখার সাহস করা।

এই প্রত্যাখ্যানের ক্ষমতা অর্জন সহজ না। কারণ আমাদের আকাঙ্ক্ষার অনেকটাই এখন আর একান্ত নিজের থাকে না। বিজ্ঞাপন সেখানে কথা বলে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কথা বলে, প্রতিবেশীর জীবন কথা বলে, সহকর্মীর গাড়ি কথা বলে, বন্ধুর বিদেশ ভ্রমণের ছবি কথা বলে। চারপাশ থেকে প্রতিদিন অসংখ্য বার্তা আসে— আরও চাই, আরও পাও, আরও দেখাও। ফলে সংযম এখন শুধু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয় থাকে না। নিজের জীবনের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার একটি উপায় হয়ে ওঠে। অল্পে সন্তুষ্ট হওয়ার অর্থ স্বপ্ন ছোট করা না। তার অর্থ নিজের স্বপ্নটি নিজে নির্বাচন করা। ভালো বাড়ি, উন্নত চিকিৎসা, সন্তানের সুন্দর শিক্ষা, ভ্রমণ, আরাম, প্রযুক্তি, এসব জীবনের আনন্দ বাড়াতে পারে। কিন্তু সেই আনন্দের মূল্য যদি দিতে হয় নিজের সমস্ত সময় দিয়ে, তবে হিসাবটি আরেকবার করা দরকার।

জীবনের সবচেয়ে দামি সম্পদ টাকা নয়, সময়। টাকা হারালে আবার উপার্জন করা যায়। চলে যাওয়া একটি বিকেল আর ফিরে আসে না। সন্তানের শৈশব দ্বিতীয়বার আসে না। বৃদ্ধ মা-বাবার অপেক্ষার দিনগুলো ফিরে পাওয়া যায় না। যে বইটি পড়া হলো না, যে গানটি শোনা হলো না, যে বন্ধুর সঙ্গে বসা হলো না, যে নদীর পাশে এক বিকেল কাটানোর ইচ্ছা বছরের পর বছর পিছিয়ে গেল, সেসব দিয়েই ধীরে ধীরে একটি জীবন ফুরিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত মানুষকে তাই নিজের কাছেই হিসাব দিতে হয়— আমি যে জীবনটি ধরে রাখার জন্য এত শ্রম দিচ্ছি, সেই জীবনটি বেঁচে ওঠার সময় আমার আছে তো?

পুরোনো দাসের শিকল দেখা যেত। সে জানত কে তার মনিব। আধুনিক মানুষের দুর্ভাগ্য আরও সূক্ষ্ম। তার শিকল অনেক সময় অদৃশ্য, মনিবও অচেনা। কখনো মনিবের নাম সামাজিক মর্যাদা, কখনো ভোগ, কখনো ঋণ, কখনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা, কখনো অন্যের চোখে সফল দেখানোর তাড়না। আর সবচেয়ে কঠিন সত্যটি হলো, সেই শিকলের কিছু অংশ আমরা নিজের হাতেই তৈরি করি। তাই মুক্তির শুরু চাকরি ছেড়ে দেওয়া দিয়ে ঘটবে, এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর দরকার নেই। শুরুটা আরও গভীরে। নিজের চাহিদার দিকে তাকানো দিয়ে। কোনটি সত্যিই দরকার, কোনটি অভ্যাস, কোনটি আনন্দ, কোনটি প্রদর্শন, সেই হিসাব নিজের কাছে পরিষ্কার করা দিয়ে। জীবনযাত্রার খরচ এমন জায়গায় না নিয়ে যাওয়া, যেখানে একটি অপছন্দের চাকরি হারানোর ভয়ে নিজের সমস্ত স্বাধীনতা বন্ধক রাখতে হয়।

মানুষের সত্যিকারের সম্পদ সম্ভবত তার সঞ্চয়ের অঙ্কে পুরোটা ধরা পড়ে না। নিজের সময়ের কতটা সে নিজের ইচ্ছায় ব্যয় করতে পারে, তার মধ্যেও সম্পদের একটি পরিমাপ আছে। যে মানুষ বলতে পারে, ‘আমার যথেষ্ট আছে’, বাজারের পক্ষে তাকে প্রতিদিন নতুন অভাবের ভয় দেখানো কঠিন। যে মানুষ বলতে পারে, ‘আমার এত কিছু দরকার নেই’, অর্থের কাছে তার আত্মসমর্পণ কিছুটা কমে আসে। আর যে মানুষ নিজের জীবনের সাফল্য অন্যের চোখ দিয়ে মাপা বন্ধ করতে পারে, তার সামনে খুলে যায় অন্য রকম স্বাধীনতার পথ। আমরা হয়তো পৃথিবী থেকে দাসপ্রথার দৃশ্যমান শিকল সরিয়েছি। এখন লড়াইটা নিজের ভেতরে জন্ম নেওয়া অদৃশ্য শিকলের সঙ্গে। কারণ আধুনিক মানুষের সবচেয়ে শক্ত শিকলটি অনেক সময় তার পায়ে থাকে না, থাকে তার মনে, চাহিদার ভেতরে।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক