প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

রাহমান চৌধুরীর প্রবন্ধ ‘নাটক যদি না হয় নাটক’

প্রকাশিত : অক্টোবর ০৯, ২০২৬

নাট্যকার অ্যারিস্টোফানিসের ভেক নাটক দিয়ে কথা আরম্ভ করা যাক। প্রাচীন যুগে জন্মেছেন তিনি আর প্রাচীন গ্রীসে বসে গ্রিক ভাষায় তিনি এ নাটকটি লিখেছিলেন। তিনি ইস্কাইলাস, সফোক্লিস ও ইউরিপিডিসের পরবর্তী সময়ের নাট্যকার। স্মরণ রাখতে হবে, তখন নাট্যকার বলতে কবি বোঝানো হতো। সেই কারণেই অ্যারিস্টটলের নাট্যতত্ত্ব গ্রন্থের নাম ছিল `পোয়েটিকস` বা কাব‌্যতত্ত্ব। নাট্যকার অ্যারিস্টোফানিসের ভেক নাটকটির গল্প হচ্ছে, নাট্যকলার পৃষ্ঠপোষক দেবতা দিউনিসাস এথেন্সের সাম্প্রতিক নাট্যকারদের সৃষ্টিকর্মে আনন্দ ও তৃপ্তি না পেয়ে ভৃত্য জানথিয়াসকে নিয়ে পাতালপুরীতে হেডিসের উদ্দেশে যাত্রা করেছেন। স্মর্তব্য যে, এরই মধ্যে ইস্কাইলাস, সফোক্লিস ও ইউরিপিডিস তিন শ্রেষ্ঠ ট্র্যাজিক নাট্যকারই মৃত্যুবরণ করেছেন। দিউনিসাসের ইচ্ছা ইউরিপিডিসকে নাট্য রচনার জন্য আবার তিনি মর্ত্যে ফিরিয়ে আনবেন। পাতালপুরী‌তে যে‌তে পথে দিউনিসাসের সাথে হেরাক্লিসের যে বাক্য বিনিময় হয় সেগুলো এখানে খুব উল্লেখযোগ্য।

দিউনিসাসের কাছে হেরাক্লিস জানতে চায়, এত কবি জীবিত থাকতে কী উদ্দেশ্যে দিউনিসাস সুদূর হেডিস পর্যন্ত কষ্ট করে যাবে। উত্তরে দিউনিসাস বলেন, আমার এমন একজন কবি চাই যিনি লিখতে পারেন। আজকাল দু’রকম কবি আছেন, কেতাদুরস্ত চতুর ও মসৃণ আর মৃত। হেরাক্লিস জানতে চান, সফোক্লিসের পুত্র তরুণ ইয়োফোনের কি হলো? দিউনিসাস উত্তরে বলেন, একমাত্র ওর মধ্যেই কিছু পদার্থ আছে, তাও আবার আমি খুব সুনিশ্চিত নই। হেরাক্লিস তখন বলেন, `কিন্তু কয়েকজন তরুণ কবি তো গিজগিজ করছে আর একটার পর একটা ট্র্যাজেডি লিখে যাচ্ছে। বাগাড়ম্বরের দিক থেকে সেইটিই যদি তুমি চাও ইউরিপিডিস তো তাদের কাছে তুচ্ছ।` দিউনিসাস তখন উত্তর দেয়, `ওরা সব চুনোপুটি। কোনো কাজের নয়। শুধু চড়ুই পাখির মতো কিচিরমিচির করতে জানে। নিজেদের শিল্পকলার ক্ষেত্রে কলংক স্বরূপ। দ্বিতীয়বার আর তাদের নাম শোনা যায় না। ওদের সারা দঙ্গলে খুঁজে তুমি একজন সত্যিকার শক্তিশালী মৌলিক কবি পাবে না যিনি একটি আকষর্ণীয় উদ্দীপক চরণ রচনা করতে পারেন।` দিউনিসাস আরও বলে, যে কবি প্রকৃত দুঃসাহসী কিছু সৃষ্টি করতে পারেন আমি এইরকম কবির কথা বলছি।

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, নাট্যকার মাত্রই যে নাট্যকার নয় তা নাট্যকার অ্যারিস্টোফানিস খুব শক্তভাবেই বলছেন। নাটক লেখার নামে কিচিরমিচির করা আর নাটক লেখা এক কাজ নয়। অ্যারিস্টোফানিস প্রকৃতই অত্যন্ত শক্তিশালী নাট্যকার ছিলেন। কমেডির ভুবনে যতরকম কলাকৌশল আছে তিনি তাঁর নাটকে প্রায় সবগুলোই দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করেছেন। সমকালীন অসাধু ও অযোগ্য বহু রাজনীতিবিদ এবং সরকারি কর্মচারীকে তিনি তাঁর নাটকে কাঠোর সমালোচনা করেছেন। এরজন্য তিনি বহু শক্তিশালী শত্রু সৃষ্টি করেন। বিশেষ করে ভেক নাটকে রাজনীতিবিদ ক্লিওনকে বিদ্রুপ ও সমালোচনা করার জন্য এথেনীয় পরিষদের বিচারে নাট্যকারকে মোটা অংকের অর্থ জরিমানা দিতে হয়েছিল। নাট্যকার উক্ত নাটকে সমকালীন এথেন্সের নৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তার গভীর উদ্বেগের কথাটা গোপন রাখেননি। এমনকি সঙ্কট উত্তরণের পথ নির্দেশের ইঙ্গিত দান থেকেও বিরত হননি। তিনি নাটকের বিভিন্ন সংলাপে ক্লিগোনিসের মতো ডিমাগগদের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। যারা একগুঁয়ে যুদ্ধোন্মাদ, শান্তির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে উদাসীন, অতি-গণতন্ত্রী, এথেন্সের বর্তমান অভ্যন্তরীণ সঙ্কটময় পরিস্থিতি অনুধাবনে যারা অনিচ্ছুক কিংবা অপারগ তাদের সমালোচনা করেছেন।

রাজনীতিবিদ ক্লিগোনিস সম্পর্কে তাঁর নাটকে বলা হচ্ছে, ‘লোকটা আকারে ক্ষুদ্র কিন্তু নির্বুদ্ধিতায় পাহাড়ের মতো বিশাল ও নিরেট। তার মুখে কখনও শান্তি ও শুভেচ্ছার ললিত বাণী শোনা যায় না। সে বিশ্বনিন্দুক, যুদ্ধবাজ, শান্তি-বিরোধী, যেখানেই কাজিয়াফাসাদ সেখানেই তার মারমূর্তি নিয়ে সে উপস্থিত। হ্যাঁ, এই হচ্ছে ক্লিগোনিস।’ কোরাস দলপতি এর উত্তরে বলছে, ‘নগরী তার সর্বোত্তম নাগরিকদের কী হাল করেছে সে কথা কি আমি আপনাদের বলবো? ঘটনাচক্রে সেটা খুশির কথা নয় বরং চরম দুঃখের।’ দলপতি আরো বলছে, ‘জাতির যখন সত্যিকার খাঁটি মানুষদের দরকার হলো তখনি দেখা গেল যে তাদের হটিয়ে দেয়া হয়েছে। সদ্বংশজাত সুশিক্ষিত ভদ্র নানাগুণে গুণান্বিত মানুষদের আজ তাচ্ছিল্য করা হচ্ছে, তাদের নিন্দায় লোকে মুখর, আর যতো চোর-বদমাস-গুণ্ডা, নবাগত বিদেশি, তামার পাত মোড়ানো ক্রীতদাসদের সমাদরেই এখন সবাই ব্যস্ত।’ আজ থেকে দু’হাজার বছর আগের নাটকের সংলাপ এগুলো, যার মধ্যে রয়েছে তীব্র রাজনীতি, রয়েছে রাজনৈতিক প্রচার। নাটকটির মূল কাঠামো সাহিত্যনীতি-বিষয়ক এক মহান বিতর্ককে কেন্দ্র করে গড়ে উঠলেও তার পরতে পরতে রয়েছে সেই সময়ের গ্রীক সমাজ-সভ্যতা-রাজনীতির প্রধান দ্বন্দ্বগুলির স্পষ্ট প্রতিভাস।

মূলত ভেক নাটকটা হচ্ছে, প্রাচীন গ্রীসের ধ্রুপদী নাটকগু‌লির একটা মূল্যায়ন। যার ভিতর দিয়ে ফুটে ওঠে তৎকালীন  দুজন সেরা নাট্যকার ইস্কাইলাস ও ইউরিপিডিসের নাটকগুলি কেমন ছিল। তিনি নাটকীয় হাস্যরসের ভিতর দিয়ে তা উপস্থাপন করেন। তিনি স্বর্গে প্লুটার্কের সভায় গিয়ে দেখতে পান ইস্কাইলাস আর ইউরিপিডিস নিজ নিজ নাটক নিয়ে বিতর্কে মগ্ন। মৃত দুজন নাট্যকারের স্বর্গে বসে বিবাদের মধ্য দিয়ে দুজনের সংলাপে তখনকার গ্রিক নাটক সম্পর্কে একটি চিত্র ফুটে ওঠে। স্বভাবতই এই মূল্যায়নটি নাট্যকার অ্যারিস্টোফানিসের নিজের, যা তি‌নি দুজন নাট‌্যকা‌রের মু‌খে ব‌সি‌য়ে দি‌য়ে‌ছেন। যা নাট্যকারদের প্রশংসা হবার কথা, ঠিক তাই চালাক অ্যারিস্টোফানিস এ নাটকে এনেছেন অভিযোগ হিসেবে। মূলত ইউরি‌পি‌ডি‌সের বিরুদ্ধে অভিযোগটা প্রতিপক্ষের বা রক্ষণশীল‌দের। নাট‌কে ইউরিপিডিস সম্পর্কে যে-সব অভিযোগ নাট‌্যকার তুলেছিলেন তা হলো, তিনি প্রচলিত দেবদেবী মানেন না। ইউরিপিডিস সম্পর্কে দীর্ঘ অভিযোগে এ্যারিস্টোফানিস বলেন, তিনি নিজের মতো করে সব দেবতা খাড়া করেছেন। তাঁর নাটক দেখে ছেলে-ছোকরারা বখে যাচ্ছে। ব্যায়াম, খেলাধূলা আর লড়াই ছেড়ে শুধু কে-কি-কেন এই সব প্রশ্ন করতে শিখেছে।

তারা শুধুই তর্ক করে, ভালোমন্দ বিচার করে কিন্তু নিয়ম-কানুন মানতে চায় না। সাধারণ মানুষের জীবন থেকে তিনি তাঁর নাটকের মালমশলা এমনকি গানের সুর জোগাড় করেছেন। অভাব অনটন ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে লোককে সজাগ করাই তার লক্ষ্য। ইউরিপিডিসের নাটক দেখে লোকের মন অধর্মের পথে গেছে। নাট‌্যকার আস‌লে এসব সংলা‌পের ভিতর দি‌য়ে ইউরি‌পি‌ডি‌সের প্রশংসাই কর‌ছেন। মৃত ইউরি‌পি‌ডিস‌কে তি‌নি তাই আবার ফি‌রি‌য়ে আন‌তে চান নাটক লেখার জন‌্য। নারী স্বাধীনতার পক্ষে মিডিয়া নাটক লেখার জন্য এই ইউরিপিডিসকে দেশ ছাড়া করা হয়েছিল। নাট‌্যকার ইউরিপিডিসের ছিল যুক্তিবাদী মন। অভিযোগের ভঙ্গিতে নাট্যকার তা তুলে ধরেন তাঁর নাটকে। নাট্যকার এ্যারিস্টোফানিস সম্পর্কে বলা হয় যে, তিনি মানুষের কেমন হওয়া উচিৎ নয় তাই চিত্রিত করেছেন তাঁর নাটকে। তার নাটকের বিষয়বস্তু তিনি নিয়েছেন সমসাময়িক রাজনৈতিক, সামাজিক ঘটনা ও সমস্যা থেকে, তারপর তাকে গড়ে তুলেছেন কল্পনা দিয়ে। মানুষের ভণ্ডামি, মিথ্যাচার, লোভ ও দুর্বলতা নিয়ে নির্মম ব্যঙ্গ ও পরিহাসই তার নাটকের প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল।

ফলে তাঁর নাটকে মৃত ইস্কাইলাস স্বর্গের ভিতরে বসে বিতর্কে নেমে বলছেন, ‘দেখুন না, একেবারে সেই আদি যুগ থেকে সত্যিকার বড় কবি মাত্রই মানুষকে উপকারী ও উপযোগী কিছু একটা শিক্ষা দিতে চেয়েছেন। ইস্কাইলাস সেখানে হোমার সম্পর্কে বলছেন, হোমারের রচনায় রয়েছে মূল্যবান সামরিক শিক্ষার উপকরণ। সংগঠন, প্রশিক্ষণ, সাজ সরঞ্জাম সব রয়েছে সেখানে। নিজের নাটক `থিবীর বিরুদ্ধে সপ্তসুর` সম্পর্কে ইস্কাইলাসের বক্তব্য, ‘ওই নাটক দেখার পর সোজা সেখান থেকে উঠে শত্রুকে নিধন করতে যাওয়া ছাড়া কারো কোন গত্যন্তর নেই।’ নিজের পারসিক নাটক সম্পর্কে বলছেন, ‘বিজয়ের অদম্য ইচ্ছাশক্তি সম্পর্কে চমৎকার বক্তব্য আছে সেখানে। আমার সর্বশ্রেষ্ঠ নাটক।’ নাট‌কের বিষয়বস্তু সম্প‌র্কে এবং লক্ষ‌্য সম্প‌র্কে স্পষ্ট বার্তা দি‌চ্ছেন নাট‌্যকার। ইস্কাইলাস আরও বলছেন, ‘আমি পেট্রোক্লাস ও টিউসারের মতো সিংহহৃদয়  বীর সৃষ্টি করেছি, যেন সংগ্রামের ডাক এলে দর্শকবৃন্দ তাদের সঙ্গে একাত্ম হবার অনুপ্রেরণা লাভ করতে পারেন।’ তারপরই ইউরিপিডিসের নাটকের সমালোচনা করে বলছেন, ‘ফ্রেইডা কিংবা স্থেনেবিয়ার মতো কুলটা দিয়ে আমি কখনো আমার মঞ্চ আকীর্ণ করে তুলিনি।...

এ রকম ঘটনা সত্যিই ঘটে কিন্তু কবির উচিত সে সম্পর্কে নীরব থাকা, সবার সামনে অনুকরণের জন্য মঞ্চে উপস্থিত করা নয়। বিদ‌্যাল‌য়ের বালকদের শেখাবার জন্য রয়েছে শিক্ষক, প্রাপ্তবয়স্কদের শেখাবেন কবি-সাহিত্যক। আমরা যা শেখাই তা যেন যথার্থ এবং সঠিক হয় তা দেখা আমাদের কর্তব্য।’ ইউরিপিডিস নিজের নাটক সম্পর্কে এই নাটকে মন্তব্য করছেন, ‘আমার নাটকে প্রথম চরিত্রটি মঞ্চে প্রবেশ করে একেবারে শুরুতেই নাটকের পটভূমি ও উৎস পরিস্কার করে ব্যখ্যা করে দেয়।...নাটক শুরু হয়ে গেলে আমি কাউকে খামোখা আলসেমি করতে দেইনি, সবাইকে খাটিয়ে নিয়েছি। মহিলা আর দাসদাসী, প্রভু, অল্পবয়সী অবিবাহিতা মেয়ে আর ধুপসী বুড়ি, সবাই সংলাপ উচ্চারণ করেছে।’ নিজের নাটক সম্পর্কে ইউরিপিডিস আরো বলছেন, ‘আমি তাদের শিখিয়েছি কীভাবে দেখতে হয়, পর্যবেক্ষণ করতে হয়, ব্যাখ্যা দান করতে হয়। আমি তাদের শিখিয়েছি যেন কখনো হুট করে বাইরেরটা দেখে কোনো স্থির ধারণা না করে বসে, যেন প্রথম সবচাইতে খারাপটাই সন্দেহ করে।

নিজের নাটক সম্পর্কে ইউরিপিডিস আরো বলছেন, ‘দশর্ক শ্রোতাদের মাথা খাটাতে শিখিয়েছি, নাটকের মধ্যে খানিকটা যুক্তি ঢুকিয়েছি। জনসাধারণ আমার কাছ থেকেই শিখেছে কেমন করে চিন্তা করতে হয়, কেমন করে তাদের ঘর সংসার চালাতে হয়, কেমন করে প্রশ্ন করতে হয়...? কিন্তু ইস্কাইলাস ইউরিপিডিসের নাটকের বিরুদ্ধে অভিযাগ তুলছেন এই বলে, ‘তোমার রঙ্গমঞ্চ শুধু কানা-খোঁড়া আর ভিক্ষুকের মতো সাধারণ চরিত্রে পরিপূর্ণ।’ ‘দেবতাদের দু’চোখে দেখতে পারো না তুমি’। ‘তারপর তুমি মানুষকে শিখিয়েছো সারাদিন শুধু বকুনি আর কথার কচকচিতে ডুবে থাকতে। কুস্তির আখড়াগুলি এখন খালি পড়ে থাকে। জোয়ান ছেলেপেলেরা এখন যতসব উঁচু জায়গায় জড়ো হয়ে বিতর্ক করা শিখছে এবং শুধু যে সেটাই শিখছে তা নয়, শুনছি সাধারণ নাবিকরা পর্যন্ত নাকি এখন অফিসারদের সঙ্গে তর্ক করে। আমার সময় তো মুখ বুজে হুকুম তামিল করা ছাড়া তারা টুঁ শব্দটি করতো না।’ কী দেখতে পাওয়া যাচ্ছে? বাস্তব জীবন ব্যবস্থা থেকেই নিয়েছে তাদের নাটকের ঘটনা ও উপাদানসমূহকে। সফোক্লিস তাঁর যুগে ঈশ্বর ও মানুষকে সমান গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করলেও তাঁর `আন্তিগোনে` নাটকে মানুষের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারের কথা বেশ জোর দিয়েই বলেছেন। শেষ মুহূর্তে আন্তি‌গো‌নে মৃত্যুবরণ করলেও পরবর্তী মানুষদের কাছে এই সত্য রেখে যায় যে, প্রয়োজনে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়তে হলে মৃত্যুকেও তুচ্ছ জ্ঞান করতে হবে।

প্রাচীন যুগের গ্রিক নাটক মানুষের মনে চিন্তার উদ্রেক করেছিল, রাষ্ট্রকে-সমাজকে নানাভাবে পথ দেখিয়েছিল। বলতে গেলে পরবর্তী যুগের বহু রোমান মনীষী গ্রিক নাটকগুলিকে কন্ঠস্থ করে রাখতেন। সিসেরো, জুলিয়াস সীজার, ক্লিওপেট্রা প্রমুখ শাসক বা সিনেটরদের মুখস্থ ছিল সেই সব ধ্রুপদী নাটক। ক্লিওপেট্রা আর জুলিয়াস সীজার মাঝে মধ্যে সফোক্লিসের `আন্তিগোনে’ নাটক থেকে অভিনয় করতেন। ঠিক একইভাবে প্রাচীন গ্রীসে যাঁদেরকে মনে করা হতো বিদ্বান মানুষ, প্রায় সকলের কণ্ঠস্থ ছিল হোমারের রচনা। গ্রিক নাটক, হোমারের রচনা ছিল তখন বিদ্যালয়ের বা আকা‌দেমীগু‌লির পাঠ্য, যেখানে সব অভিজাত-সন্তানরা লেখাপড়া করতেন। ঠিক একইভাবে পরবর্তী তিন-চারশো বছর ধরে তাই ঘটেছিল, খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করার আগে পর্যন্ত রোম সাম্রা‌জ্যে সবাই ধ্রুপদী সা‌হিত‌্যকে তা‌দের শিক্ষার ভিত হি‌সে‌বে বি‌বেচনা কর‌তেন।  ইলিয়ড ওডিসির প্রভাবে মহাকবি ভার্জিল লিখেছিলেন ‘ঈনিড’, সেই ঈনিডের প্রভাবে রেনেসাঁর পূর্বক্ষণে দান্তে রচনা করেছিলেন ‘ডিভাইন কমেডি’। বিশ্বে সম্ভবত ডিভাইন কমেডি সবচেয়ে পঠিত গ্রন্থ। ভিন্ন দিকে নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়রের বহু নাটকের সংলাপ পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা মুখস্থ ছিল কার্ল মার্কস এবং তাঁর সন্তানদের। কার্ল মার্কস শুধুমাত্র প্রাচীন গ্রিক নাটক পড়ার জন্য গ্রিক ভাষা শিখেছিলেন, যদিও তখন সেসব নাটকের বহু ভাষায় অনুবাদ পাওয়া যেত। নাটক তাহলে আসলে কী? কিচিরমিচির করা কিংবা কিছু সস্তা সংলাপ লিখে মঞ্চে আনলেই কি তা নাটক হয়?

নাট্যকার শেক্সপিয়রের দু-দুটো নাটকের ‌বি‌ভিন্ন সংলাপে রয়েছে, ‘নাটকের-চরিত্র বা অভিনয় কী’ বা কেমন হওয়া দরকার তার ব‌্যাখ‌্যা। ‘হ্যামলেট’ নাটকের মতো ‘এ মিডসামার নাইটস ড্রিম’ নাটকের অভ্যন্তরে ঘটনার সাযুজ্য দুটো নাট্যদৃশ্য আছে এবং সেখানে নাটক ও অভিনয় সম্পর্কে নানা মন্তব্য আছে। তিনি নাটক লিখেছেন বিশ্বের নানা দেশের ইতিহাসের ঘটনাবলি নিয়ে, এটাই তাঁদের বিশ্ব-দৃষ্টিভঙ্গি। জাতীয়তাবাদের নামে তাঁরা সংকীর্ণ গণ্ডিতে বাঁধা পড়েননি। সারা বিশ্ব থে‌কে নি‌র্দ্বিধায় গ্রহণ ক‌রে‌ছেন, বি‌শ্বের জন‌্য নি‌জেরা বহু কিছু রে‌খে গে‌ছেন।

কনস্টানটিনোপলের পতনের পর রেনেসাঁকে ঘিরে ভাষার ভিত্তিতে প্রথম জাতিরাষ্ট্র গড়ে ওঠে ইউরোপে, কিন্তু তাদের কোনো রাষ্ট্রের জাতির পিতা নেই। কিন্তু জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চা করেছে তারা মাতৃভাষায়। সৃ‌ষ্টি ক‌রে রে‌খে গে‌ছে এমন কিছু, যা বাদ দি‌য়ে বিশ্ব চল‌তে পা‌রে না। রাষ্ট্রচিন্তা, জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা হয়েছে একদিকে; ভিন্ন দিকে শিল্পকলা বা নাটক-সাহিত্যের চর্চা চলেছে। নাট্যচর্চার ক্ষেত্রে ধ্রুপদী, ভাববিলাসী ধারা, স্বাভাবিকবাদ, বাস্তববাদ, অভিব্যক্তিবাদ বা রাজনৈতিক নাটক; এসব শব্দ বা ধারণা ইউরোপ থেকেই এসেছে। সারবিশ্বের নাট্যতত্ত্বের বড় বড় সব চিন্তা, নাট্যনির্দেশনা কিংবা অভিনয়ের বিভিন্ন ধারা বা বিবর্তন ইউরোপের দান। কারণ বিজ্ঞানের অগ্রগতি বা জ্ঞানচর্চা ছাড়া এই সব ব্যাপারে অবদান রাখা কঠিন। যারা সৃ‌ষ্টিশীল নয়, বি‌শ্বে তারা কিছু‌দি‌নের জন‌্য বড় জোর রেখে যে‌তে পা‌রে তা‌দের মিথ‌্যা দম্ভ। নির্লজ্জ মানুষ মিথ‌্যা দম্ভ প্রকাশ কর‌তে লজ্জা পায় না। যারা স‌ত্যিকা‌রের সৃ‌ষ্টিশীল তা‌দের না‌মের আগে প‌রে উপা‌ধি লাগা‌নোর দরকার হয় না। তাই পাশ্চা‌ত্যের বৃহৎ মা‌পের নাট‌্যকার, অভিনেতা, রাজনী‌তিক, রাষ্ট্রনায়ক, মনীষী, রাষ্ট্রচিন্তা‌বিদ, বিজ্ঞানী কা‌রও না‌মের আগে পিছ‌নে সামান‌্য উপা‌ধির চিহ্ন নেই। যারা দা‌ম্ভিক, যারা চালবাজ, হঠাৎ শেকড় বাকরের সন্ধানের নামে তারা চালবাজী করে, কিন্তু দিনের শেষে পরে থাকতে হয় প্রসেনিয়ামের দ্বারস্থ হয়ে; বড় বড় কথা বললেও তারা সৃষ্টিশীল কিছু করতে ব্যর্থ। বিশ্বনাট‌কের ইতিহা‌সে তা‌দের নাম নেই। এটাই তাদের নিয়তি। শঠতা-ভন্ডামির ভিতর দিয়ে বৃহৎ কিছু সৃষ্টি করা যায় না। ফলে যা সৃষ্টি করে দশ বছর পর তা হারিয়ে যায়। কিছু‌দিন টি‌কে থাক‌তে পা‌রে তা‌দের নি‌জে‌দে‌কে দেওয়া নি‌জে‌দের ওজনদার উপা‌ধিগু‌লো, তাও আবার নি‌জের অন্ধ ভক্তকূ‌লের ম‌ধ্যে।

শিল্পকলা সব সময়ই মানুষের চেতনার ওপর ভয়াবহ প্রভাব রাখে। যদি তা হয় উচ্চমান সম্পন্ন শিল্পকলা তাহলে তা মানুষের মধ্যে উচ্চ মূল্যবোধ গড়ে দেয়; যদি তা হয় নিম্নমানের শিল্পকলা, তাহলে মানুষকে অধ্বঃপতনের পথে নিয়ে যায়। সেই কারণে বিশ্বের বড় বড় রাজনীতিক বা বিপ্লবী নেতারা রাষ্ট্রবিপ্লবের পর সাংস্কৃতিক বিপ্লব বা শিল্পকলা চর্চার উপরে জোর দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকু‌রের `রাশিয়ার চিঠি`তে এ সম্পর্কে চমৎকার বিবরণ পাওয়া যায়। সমাজের সব ধরনের সাধারণ মানুষরা কীভাবে তখন সকল ধরনের শিল্পকলার স্বাদ গ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছিল তার উদাহরণ আছে রবীন্দ্রনাথের লেখায়। সাধারণ মানুষরা যেমন সেইসময়ে বিশ্বসাহিত্যের বই পাঠ করার সুযোগ পেয়েছিলেন, তেমনি ধ্রুপদী সঙ্গীত আর শিল্পকলার সঙ্গে পরিচিত হন। রবীন্দ্রনাথকে বিপ্লব পরবর্তী রুশদেশের এই বিপুল কর্মযজ্ঞ বিস্মিত করেছিল। রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন এর ভিতর দিয়ে সাধারণ মানুষের প্রাণে নতুন স্পন্দন লেগেছিল। বিপ্লবের প্রধান নেতা লেনিন তখন বলেছিলেন, `আজকে চাই সিনেমা সিনেমা আর সিনেমা`। কথার কথা ছিল না সেটা। রুশ দেশেই তখন ইতিহাসের সেরা চলচ্চিত্র পরিচালকরা জন্ম নেন। রুশ চলচ্চিত্র তখন যুক্তরাষ্ট্র সহ সারাবিশ্বকে বিমোহিত করেছিল। ফলে চলচ্চিত্র সৃষ্টির নামে শুধু বাক্ওয়াজ করেননি তাঁরা।

সস্তা কিছু রচনা করলে তা টিকে থাকে না। সেই সব রচনার জন্য কারো অহঙ্কার করতে নেই, কারণ সময়ের অতল গহ্বরে তা হারিয়ে যাবে আবর্জনার মতন। সমালোচকরা বা তাদের ভক্তকূলরা তাঁদের পক্ষে যতই শক্তভাবে কলম ধরুক তা টিকিয়ে রাখা যাবে না। নাট্যকার শেক্সপিয়ারের নাটকে রয়েছে ইতিহাসের নানা ঘটনা, নানা বিশ্লেষণ। সেই জন্য সারাবিশ্বে তিনি এখনো সবচেয়ে জনপ্রিয় নাট্যকার। জার্মান নাট্যকার ব্রেশট ঠিক একইভাবে সারাবিশ্বে জনপ্রিয়, কারণ তিনি ইতিহাস নিয়ে নাটক লিখেছেন, পাশাপাশি ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করেছেন। নাটক থেকে কীভাবে শিক্ষা গ্রহণ করা যায় সে ব্যাপারে নিজের নাটক সম্প‌র্কে ব্রেশট লিখছেন, ‘ধরুন, আপনারা একটা খুনের দৃশ্য দেখালেন কিন্তু আমার ঝোঁক থাকবে খুনটাকে ঘিরে আবেগ সৃষ্টি করা নয় বরং তার পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যায়।’ খুনের পেছনের কারণটাকে আসলে তিনি স্পষ্ট করতে চান। তিনি দেখাতে চান খুনটা একটা ঘটনা, কিন্তু এই একটা খুনের পেছনেই আছে আরও বহু ঘটনা। খুনটা শুধু খুনের মধ্যে আটকে নেই, তার পেছনে মানবসভ্যতার বহুকালের দ্বন্দ্ব, বিরাট সব ইতিহাস লুকিয়ে রয়েছে। খুনটাকে নিয়ে দর্শককে আবেগ আপ্লুত করার চেয়ে খুনের পেছনের ইতিহাস সম্পর্কে মানুষকে ভাবাতে চান নাট্যকার ব্রেশট।
মানুষের মাথায় একটা চিন্তার জগৎ তৈরি করে দিতে চান। মহৎ নাটকের প্রধান দায়িত্ব তাই, মানুষকে আবেগ প্রবণ না করে তার চিন্তার জগৎকে গড়ে তোলা। কজন নাট‌্যকার তেমন নাটক লিখ‌তে পা‌রেন? অন্তত দা‌ম্ভিক আর মূর্খরা তা পা‌রেন না। কারণ নি‌জে‌দের শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার কর‌তেই তাঁরা ব‌্যস্ত।

সস্তা নাটক লিখে শ্রেণিসংগ্রামের নাটক বললে যেমন তা শ্রেণীসংগ্রামের নাটক হয় না, কখনো কখনো আদৌ তা নাটকই হয় না। ঠিক একইভাবে কাব্যনাটক বললেই তা কাব্য নাটক হয় না, নাটকের ভিতরে নাট্যগুণ থাকতে হয়; তাহলেই তা চিরকাল টিকে থাকে। নিজের ভক্ত সাংবাদিক বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পত্রিকা তার পক্ষে যতই চেষ্টা করুক, যতই প্রশংসা বাক্য লিখুক, লাভ নেই। সবকিছু প্রমাণ করবে সময়। নাটকের কিছু চরিত্র দিয়ে ধনীকে গালাগাল করলে তা বিপ্লবী নাটক হয় না। বরং তা মানুষকে বিভ্রান্ত করে, বিপথে নিয়ে যায়। মাও সে তুং তাঁর বিখ্যাত ইয়েনানের ভাষণে এই ধরনের শিল্পকলা আর সাহিত্যের সমালোচনা করেছিলেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, এসব বিপ্লবী শিল্প-সাহিত্য নয়; মানুষের চিন্তাকে তা নাড়া দিতে পারে না। মার্কস, লেনিন, মাও সেতুংয়ের মতন ব্যক্তিরা পর্যন্ত শেক্সপিয়ারসহ সকল ধ্রুপদী সাহিত্য আর শিল্পকলার ভক্ত ছিলেন। বারবার তাঁরা বলেছেন, মানুষের চিন্তাকে উন্নত করতে হলে সারা বিশ্বের সকল উন্নত মানের শিল্পকলা মানুষের নাগালের ভিতরে এনে দিতে হবে। সকলেই তাঁরা একবাক্যে বলেছেন উন্নত চিন্তা, উন্নত দর্শন, উন্নত শিল্প-সাহিত্য বিশেষ কোনো দেশের হয় না; তা সারাবিশ্বের জনগণের সম্পদ। সকলেই তাঁরা শিল্প-সাহিত্যে অতিবিপ্লবী বুলি কপচানো অপছন্দ করতেন।

বিশ্বের সকল মহৎ চিন্তকরাই মনে করতেন, চলচ্চিত্র বা নাটকের কাজ সরাসরি সমাজ পাল্টানো নয়; বরং সমাজের বৃহত্তর মানুষের মনকে উদ্দীপ্ত করা, সতেজ আর প্রাণবন্ত করা। সত্যিকারভাবে সমাজের পরিবর্তন চাইলে, সমাজ পাল্টাবার মানুষগুলোর মানসিকতা উন্নত করা সবার আগে জরুরি। কারণ মানুষের মানসিকতা উন্নত না হলে, অনুভূতিপ্রবণ না হলে বিপ্লব ব্যর্থ হবে। বিশ্বে সেকারণেই অধিক সংখ্যক বিপ্লব ব্যর্থ হয়েছে। কারণ মানুষকে যতটা মারমুখী চিন্তায় বা ক্রোধে উদ্দীপ্ত করা হয়েছিল, তাদের চিন্তাকে বা অনুভূতিকে সেভাবে শানিত করা হয়নি। চলচ্চিত্র বা নাটকের ক্ষেত্রে মানুষকে সচেতন করা বা সমাজ পাল্টানোর কথা বলা মানে এ নয় যে, সবসময় ধনীর প্রতি ঘৃণার প্রকাশ বা ধনীকে আক্রমণ করতে উদ্দীপ্ত করা। চিরায়ত শিল্পকলা বা নাটক-চলচ্চিত্র কখনো তা করেনি। বরং শিল্পকলার দায় সমাজের নানা ঘটনা, উত্থান-পতন আর বিভিন্নরকম আবেগের সঙ্গে মানুষকে পরিচিত করে তোলা। `রাজনৈতিক নাটক` তত্ত্বের পথিকৃত ব্রেশট কখনো এইরকম সস্তা নাটক করেননি। মান ইস্ট মান, গ্যাালিলিও গ্যালিলাই, মাস্টার অ্যান্ড পুন্টিলা, মাদার কারেজ, থ্রি পেনি অপেরা ইত্যাদি কোনোটাই কি মঞ্চে কিছু লু‌ম্পেন বা ছিন্নমূল মানুষ দি‌য়ে বিপ্লব ঘটানোর নাটক? বরং তাঁর র‌চিত `সমাধান` নাটকটি অতিবিপ্লবীর কঠোর সমালোচনার নাটক।

বাংলা নাটকে প্রথম শ্রমিকের চরিত্র নিয়ে আসেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ নাটকেই দেখতে পাওয়া যায়, শ্রমিকরা কাজ করে করে তার মানবিক সত্তা হারিয়ে ফেলে কতগুলো সংখ্যায় পরিণত হচ্ছে। শ্রমিক‌দের সম্প‌র্কে এটা এক চমৎকার  বি‌শ্লেষণ। রবীন্দ্রনাথ তাঁর রক্তকরবী নাটককে কেবল শ্রমিকদের পক্ষে কতগুলো বুলিতে পরিণত করেননি। রাজনীতির-শাসনব্যবস্থার গভীর দিকগুলি তার মধ্য থেকেই ফুটিয়ে তুলেছিলেন। এই নাটকে তিনি সৃষ্টি করেছেন রাজা এবং নন্দিনীর মতন বিশ্বমাপের ধ্রুপদী চরিত্র। নাটক এবং চলচ্চিত্রের আখ্যান তেমন হওয়াই দরকার, সেখানে থাকবে বিরাট মাপের চরিত্র এবং মানবজীবনের নানান মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্ন, ফুটে উঠবে মানবসভ্যতার চিরায়ত ইতিহাস; যা দর্শকের চেতনাকে গভীরভাবে নাড়া দেবে। সত্যিকারের উচ্চমান সম্পন্ন চলচ্চিত্র এবং নাটক কোনগুলি? যার আখ্যানভাগ গভীরতর দ্বন্দ্বে পূর্ণ এবং সংলাপগুলি কাব্যময় আর অর্থবোধক; নানান বৈপরীত্য নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে বিষয়বস্তুর ভিতরে বিশাল সব চরিত্ররা। রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী নাটকের সংলাপ তীক্ষ্ণ;সেই সঙ্গে নাটকের দুটি চরিত্র রাজা এবং নন্দিনী কাল-উত্তীর্ণ এবং বিশ্বনন্দিত। রবীন্দ্রনা‌থের `ডাকঘর` সেই যু‌গে ইয়েট‌সের দ্বারা মঞ্চস্থ হ‌য়ে‌ছিল পাশ্চা‌ত্যে। বাংলামঞ্চের সকল বিরাট মাপের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের আকাঙ্ক্ষা রক্তকরবীর রাজা এবং নন্দিনী চরিত্রে অভিনয় করার।

নাটকে একপাল শ্রমিককে হাজির করে দু-চারটা সস্তা সংলাপ সাজিয়ে, শেষ দৃশ্যে মালিককে আক্রমণ করলে তা শ্রকিশ্রেণীর নাটক হয় না। নাটকের নামে হয় পাগলামী। পশ্চিমবঙ্গে এই ধরনের কিছু নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল এক সময়ে। নাটকগুলির কোনো নান্দনিক মান ছিল না, বিষয়বস্তু আর অভিনয় ছিল খুবই দুর্বল। নাটকের পরতে পরতে অভিনেতা-অভিনেত্রীরা কণ্ঠ উচ্চগ্রামে তুলে মঞ্চে জোতদার বা ধনীদের নিধন করে বিপ্লবী দায়িত্ব পালন করতেন। নাট্যকার উৎপল দত্ত তা নিয়ে খুব রসিকতা করেছিলেন। সস্তা এই ধরনের রাজনৈতিক নাট্য প্রচেষ্টাকে সমালোচনা করতে গিয়ে উৎপল দত্ত কলম ধরেছিলেন। সেখানে তিনি গণনাট্য সংঘের রাজনীতির গৎবাঁধা সূত্রবদ্ধ নাটকগুলোকে ব্যঙ্গ করে লিখছেন, ‘প্রথমে এক সাহেব বা এক জমিদার চাবুক নিয়ে বেধড়ক প্যাঁদায় একদল চাষীকে।...তারপর আসে কমিউনিস্ট; সকল গুণের আধার, সে সুশীল বালক, সকল পাঠ মন দিয়া পড়ে। তার না আছে কোনো দ্বিধা, না কোনো দুর্বলতা, না কোনো দ্বন্দ্ব। এহেন এক নিষ্পাপ সন্ন্যাসী এসে চাষীদের বোঝায়, আর বুঝেই তারা গিয়ে জমিদারকে পেটায়, যবনিকা, ইতি গণনাট্য সংঘস্য নবনাটকম্।’ তিনি বলেন, নাটক দিয়ে এইভাবে বিপ্লব বা গণ-অভ্যুত্থান ঘটানো অতটা সহজ নয়।

নাটকে একদিকে তাই থাকতে হবে সমাজ দর্শন, যা দুর্বোধ্য এবং বিরক্তিকর হবে না। ভিন্ন দিকে তার ভিতর থাকবে উত্থান পতন আর নাটকীয় ঘটনা। পৃথিবীর যে সকল নাট্যকাররা একই সাথে জনপ্রিয় ও মহৎ নাট্যকার হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছেন, তাঁরা সকলেই গল্প ফেঁদেছেন, নাটকের মধ্যে নাটকীয়তা সৃষ্টি করেছেন, মুহুর্মুহু চমকপ্রদ সব ঘটনা ঘটিয়েছেন, দর্শককে নাটক ভালো লাগাবার যতো পেশাদারী বাণ আছে সব ছুঁড়েছেন, একইসঙ্গে দর্শককে নতুন চিন্তার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। জনপ্রিয় নাটক রচনার পাশাপাশি জনতার চিন্তাশক্তিকেও নাড়া দিয়ে গেছেন। শুধু ঘটনার বর্ণনা করেই তারা ক্ষান্ত হননি, পাশাপাশি ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন। জগত সম্পর্কে, মানুষ সম্পর্কে নতুন সব ধারণার সাথে মানুষকে পরিচিত করে তুলেছেন। যাঁরা নাট্যচর্চার নামে কিচিরমিচির করেছেন, বহু রকম দলভারী করেও তাঁরা কালের গর্ভে হারিয়ে গেছেন। নাটক যদি নাটকই না হয়ে উঠতে পারে তা টিকবে না।

নাটক যদি না হয় নাটক, তাহলে শত শত নাটক লিখেই বা কি লাভ? নাটক যদি না হয় নাটক, তাহলে নাট্য আন্দোলন শব্দটার মানেই বা কী দাঁড়ায়? প্লাটো সেই যুগে বলেছিলেন, নাটক যেমন সুশিক্ষা দিতে পারে, ঠিক একইভাবে কুশিক্ষাও দিতে পারে। শিক্ষাটা সু ছিল না কি কু, তা বোঝা যাবে সমাজের দিকে তাকিয়ে। মূর্খদের দাম্ভিকতা দিয়ে নয়, মূর্খরা সব সময় নিজেদের নিয়ে দম্ভ প্রকাশ করতেই পারে।

লেখক: শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক