শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে ফ্রান্সে বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তেজনা

ছাড়পত্র ডেস্ক

প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬

ফ্রান্সে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মঙ্গলবার আরও ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষক সংকট, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন ও অতিরিক্ত ক্লাসের চাপের প্রতিবাদে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটেছে।

সোমবার পর্যন্ত প্রায় ১৮০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ ছড়ায় এবং ১৬৪ জনকে আটক করা হয়। আন্দোলনকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লকুরনু ও কট্টর-বামপন্থি নেতা জঁ-লুক মেলেনশোর মধ্যে রাজনৈতিক বাকযুদ্ধও তীব্র হয়েছে।

২১ সেপ্টেম্বর প্যারিসের উপকণ্ঠ ক্রেতেইয়ের একটি উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকটের প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে তা প্যারিস অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত শিক্ষক ও কর্মী নেই, অনেক ভবনের অবস্থা জরাজীর্ণ এবং অতিরিক্ত ক্লাসের চাপ তাদের ওপর মানসিক ও শারীরিক চাপ তৈরি করছে। এসব সমস্যা সমাধানে শিক্ষা খাতে আরও অর্থ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছে তারা।

মঙ্গলবার দেশজুড়ে উচ্চবিদ্যালয় অবরোধের কর্মসূচি পালন করা হয়। বিভিন্ন স্থানে বিদ্যালয়ের প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। কোথাও কোথাও অগ্নিসংযোগ, বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। সোমবার পর্যন্ত ১৫টি বিদ্যালয়ে ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।

আলপ-মারিতিম অঞ্চলে ১০ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অগ্নিসংযোগ ও বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপসহ সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। আন্দোলন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনাও বাড়ছে।

প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লকুরনু বলেন, “কট্টর-বামপন্থি দল ল্য ফ্রঁস ইনসুমিজের কয়েকজন নেতা শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উৎসাহ দিচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন, তবে সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”

জঁ-লুক মেলেনশো সরকারের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত কঠোরতা দেখানোর অভিযোগ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, “আমাদের তরুণদের স্পর্শ করবেন না। আমার দলের সমর্থকদের আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার আহ্বান রইল। শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে সরকারের পদক্ষেপে স্পষ্ট বর্ণবাদী প্রবণতা রয়েছে।”

মেলেনশোর এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে লকুরনু বলেন, “বর্ণবাদের অভিযোগ একটি অপমান। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার অধিকার রয়েছে। শিক্ষক-কর্মচারী এবং দায়িত্ব পালনরত পুলিশ কর্মকর্তাদেরও নিরাপত্তা ও সম্মান পাওয়ার অধিকার রয়েছে।”

শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন এমন সময়ে বিস্তৃত হচ্ছে, যখন ফ্রান্স সরকার ২০২৭ সালের বাজেট নিয়ে কঠিন রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে। সরকারি ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা নিয়ে বিরোধীদের সঙ্গে সরকারের মতবিরোধ তীব্র। একই সময়ে জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ওপরও চাপ বাড়াচ্ছে।

ফ্রান্সের সরকারি ঋণও রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। জুন পর্যন্ত ফ্রান্সের সরকারি ঋণ প্রায় ৩ দশমিক ৫৯৬ ট্রিলিয়ন ইউরোতে দাঁড়িয়েছে, যা মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১১৯ শতাংশ। ফলে বাজেট ঘাটতি কমানো ও সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

এর মধ্যেই সামনে আসছে ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। প্রথম দফার ভোট হবে ১৮ এপ্রিল এবং দ্বিতীয় দফা ২ মে। সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার কারণে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ তৃতীয় মেয়াদে প্রার্থী হতে পারবেন না। ২০২২ সালের নির্বাচনে তৃতীয় অবস্থানে থাকা মেলেনশো এবারও নির্বাচনী মাঠে সক্রিয়।

ফলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এখন শুধু শিক্ষা খাতের সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ফ্রান্সের অর্থনীতি, সরকারি ব্যয়, আইনশৃঙ্খলা এবং আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে।