এখন পরিমল: অভিনব ভঙ্গিতে ঊষর সময়ের বয়ান

মাজেদা মুজিব

প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ০৩, ২০১৮

`এখন পরিমল` বিশ্বাস ভেঙে যাওয়া এক অবক্ষয়িত সমাজের প্রতিচ্ছবি। `এখন পরিমল’ হতে পারতো ছাত্রীধর্ষক শিক্ষকের জীবনের চালচিত্র, হতে পারতো ছাত্রীকে ধর্ষণের পরে তার মনোবৃত্তির প্রকাশ, হতে পারতো আত্নানুশোচনা থেকে তার মানুষ হওয়ার গল্প। কিন্ত তা হয়নি। কথাসাহিত্যিক মঈনুল আহসান সাবের `এখন পরিমল` উপন্যাসে পরিমলকে শুধু একজন ধর্ষক চরিত্র হিসেবে দেখাননি বরং পরিমল হয়ে উঠছে সেই চরিত্র, যার কাছে মানুষ গচ্ছিত রাখছে তার সম্পদ, ইচ্ছা, মূল্যবোধ এবং তা ব্যবহার করে পরিমল নিজেকে রাষ্ট্রের ক্ষমতালিপ্সু, ভোগবাদী, পুরুষতান্ত্রিকতার প্রতিভূ  হিসেবে দাঁড় করাচ্ছে। পরিমল একটি চরিত্রে সীমাবদ্ধ থাকেনি; পরিমল সমাজের এক সর্বগ্রাসী বিকলাঙ্গ ব্যবস্থার প্রতীক হিসেবে চলমান হয়ে উঠছে, যেখানে পরিমল তৈরি করছে এক পরিমলীয় আবহ, একাধিক পরিমলকে।

ঔপন্যাসিকের সমাজবীক্ষণ বর্তমান সময়ের নৈরাজ্য, সামাজিক অব্যবস্থা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, মানুষের সাথে মানুষের শিথিল সম্পর্ক বা সম্পর্কহীনতা তুলে ধরার ক্ষেত্রে এ যাবতকালের কথাসাহিত্যে এক অনন্য উদাহরণ। ছোট, সূক্ষ্ম বিষয় অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে জীবনের অনুষঙ্গ হিসেবে উপস্থাপনের মাধ্যমে লেখকের ঋদ্ধ মানসিকতার পরিচয় মেলে এ উপন্যাসে। এতে একক কোনও ঘটনার পারম্পর্য নাই। একাধিক বিষয় ও ঘটনার আতিশয্যে একইসাথে বৈষয়িক ও গঠন-প্রকরণের দিক থেকে `এখন পরিমল` উপন্যাসটি বাংলা কথাসাহিত্যে এক অভিনব সংযোজন। ‘এখন পরিমল’ এ লেখক, লেখা, সময়, স্থান; সময়ে ও স্থানে চরিত্র কিংবা ঘটনা প্রবাহের গমনাগমন পূর্ববর্তী বাংলা উপন্যাসের বর্ণনাভঙ্গিকে নয়া অভিজ্ঞতার সামনে নিয়ে আসে। গিটারিস্ট, লম্বা চুল রাখা সৌম্য ছেলেটাকে দেখার যে সেন্স রাষ্ট্র ক্রিয়েট করে আসছে প্লেটোর সময় থেকে তার ফলশ্রুতিতে এখনকার রাষ্ট্রেও যেন পুলিশি মহড়া প্রদর্শনের জন্য এমন ছেলেকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছে, বন্দি করে রাখছে বিনা কৈফিয়তে। বোতাম আঁটা ক্লিনশেইভ ছেলেটির তুলনায় যেন সে প্রায় মানুষই না। এরকম সামাজিক চিত্র তুলে ধরে ধরেই উপন্যাসের অগ্রগতি।

পড়তে গিয়ে প্রথমে মনে হতে পারে, এটা হবে পরিকল্পিত খুনের গল্প কিন্তু পরক্ষণেই পাঠককে সচেতন করে তুলবেন ঔপন্যাসিক। এর ব্যতিক্রমী গঠনশৈলী বিষয়কে সান্নিধ্য দিয়ে কাহিনি এগিয়ে নিয়েছে। লেখক হাসনাইন হাসান একটি উপন্যাস শুরু করছেন। কোনও ঘটনা দিয়ে শুরু করবেন তা নিয়ে দ্বিধান্বিত। উপন্যাস সমাজকে খুব সমান্তরালভাবে দেখার সুযোগ করে দেয়। এজন্য একাধিক ঘটনাপ্রধান এই উপন্যাসে কোনও প্রধান ঘটনা নাই যেমন, আধুনিক বোধসম্পন্ন মানুষের কোনও বিষয়কেই কম গুরুত্ব দিয়ে দেখার অবকাশ নাই। লেখকের স্ত্রী, ছেলে, বন্ধু-পরিজন এবং উপন্যাসের চরিত্রও একসময় এসে উপস্থিত হচ্ছে। উপন্যাসের চরিত্রের সাথে লেখকের কথা হচ্ছে। লেখকের সাথে তার উপন্যাসের চরিত্ররা এসে যখন কথা বলছে তখন লেখকও উপন্যাসের একজন চরিত্র হয়ে যাচ্ছেন, যেভাবে লেখক সমাজেরও একজন।

শুভ্রনীল উঠতিবয়সী যুবক। শুভ্রনীলের পারিবারিক সংকটকে লেখক শুধু পারিবারিক সংকট হিসেবে দেখাননি। তার বাবা একটি পুরনো বাড়ির মালিক। কতিপয় এজেন্ট এসে বাড়িটাকে কিনে নিতে চাচ্ছে। বিনিময়ে শুভ্রনীলের পরিবারকে নতুন ফ্লাট দেয়ার প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছে দলটি। কিন্তু তার বাবা কোনও কিছুর বিনিময়েই বাড়িটি বিক্রি করতে রাজি হচ্ছেন না। বাড়িটিকে তিনি তার আইডেন্টিটি মনে করছেন। সম্পত্তির উত্তরোত্তর বৃদ্ধিতে নগরায়ন, নাগরিক জীবনের সুবিধা পাওয়ার জন্য হন্যে হয়ে নগরে ছুটে আসা মানুষ শেঁকড় আঁকড়ে নেই। এই শতাব্দীতে নগরকেন্দ্রিক হওয়া এদেশের বড় ভাঙনের একটা। এটা সুযোগও তৈরি করছে। পরিমলের আগ্রাসী রূপ মানুষের নগরকেন্দ্রিক হওয়ার মধ্য দিয়ে ভিন্নমাত্রা পাচ্ছে। বাড়ি ছেড়ে না দেয়ার কারণে শুভ্রনীলের বাবা খুন হচ্ছেন। তিনি যে খুন হবেন লেখক আগেই শুভ্রনীলকে বলে দিয়েছেন। এজন্য সে মৃত্যু তাকে ব্যথিত করছে না। এই ব্যথিত না হওয়া কামুর আউটসাইডারের মতো না, যেন অনেকটা অপারগতাজনিত নিয়তিবাদ। লেখকের এ অনুধাবন একজন সাহিত্যিকের সাথে একজন সমাজবিজ্ঞানীরও। পরিমলের সময়ে মানুষের জীবন-মৃত্যু মানুষের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে।

লেখকের বন্ধু আসির লেখককে চলমান ঘটনা বিশ্লেষণ করছে। সমকালে একাধিক ব্যাংকলুট আলোচিত ঘটনার একটা। ব্যাংক লুট হওয়ার আগেই সে লেখক কে কত টাকা লুট হবে তার পরিমাণ বলে দিচ্ছে। দুদিন পর পত্রিকায় সে খবর আসছে। এমন খবর রাখা, সমকালের চালচলন আয়ত্ত্ব রাখা মানুষটি গুম হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করেন লেখক। আশঙ্কাকে সত্যি করে আসির একদিন গুম হয়ে যায়। আপাত অর্থে যে অ্যাবসার্ডিজমের ভেতর দিয়ে আমরা চলছি লেখক এটাকে স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে এসে বর্ণনা দিচ্ছেন। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অ্যাবসার্ডিটি বা অ্যাবসার্ডিজমকে নতুন সংজ্ঞা দেয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে যেন। ‘বিপন্ন বিস্ময়’ যেনবা; এখানে বিস্ময়বোধ বিপন্ন হয়ে গেছে, সব অস্বাভাবিকই এখানে স্বাভাবিক হিসাবে সামনে দাঁড়াচ্ছে। `মাড়ি ও মড়কের সময়েও প্রেম থাকে। প্রেম হলো সর্বজনীন, সব সময়ের।` যে লেখক উপলব্ধি করেন প্রেম সৌন্দর্যের সে লেখকই তার উপন্যাসে কোনও স্বাভাবিক প্রেম দেখাননি। অস্বাভাবিক ও অসম প্রেম উপজীব্য হয়েছে। পরিমলের সময়ে প্রেম দ্বন্দ্ব ও ধন্ধকবলিত। মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ, বিশ্বাস নিমীলিত সমাজে ব্যক্তিস্বার্থই বড় হয়ে উঠছে। মানুষ বিচ্ছিন্নভাবে বেড়ে উঠছে। যোগাযোগের গভীর সমস্যায় প্রোথিত একের প্রতি অন্যের বিশ্বাস, আস্থার যে মানসিক টানাপোড়ন দেখানো হয়েছে সেটা প্রেম নয়, বরং শারীরিক চাহিদা মেটানোর সুযোগ খোঁজা যেন। মুস্তাক কিবরিয়ার সাথে শারমিনের সম্পর্ককে লেখক প্রেম বলতে আগ্রহী নন। এ সম্পর্ক ঠুনকো, ভেঙে যাবে এবং যেকোনও ইস্যু দেখিয়ে যে কেউ  যেকোনও সময়ে ভেঙে দিতে পারে বলে লেখক মনে করেন। কারণ এখানে কারো প্রতি কারো দায়বদ্ধতা নাই; সর্বোপরি কারো প্রতি কারো গভীর হৃদয় নাই। এটা যদিও পরকীয়া তবুও পরকীয়াও প্রেমে রূপ নেয়, নিতে পারে। `বীরাঙ্গনা কাব্য`তে মধুসূদন দত্ত সোমদেবের প্রতি গুরুপত্নী তারার যে প্রেম দেখিয়েছেন, তা বয়স, সামাজিক অবস্থান সবদিক থেকেই অসম। তবু তা প্রেম। শারমিন মুস্তাকের সম্পর্ক প্রেম নয় কারণ পরিমলীয় বিষণ্ণ সময়ে এমন মনন গড়ে উঠার সুযোগ নাই। এজন্য শারমিন তার ভিডিওটা ফেরত চায়। দৈহিক মিলনের কুহক এক নিমিষে ধূলিসাৎ হয়ে যায় এখানে। উপন্যাসে এসব বিষয় তুলে নিয়ে আসার উপযোগিতা আছে। এত সব ধর্ষণ, লুটতরাজি, একজনকে টেক্কা দিয়ে আরেকজনের বড় হওয়ার যে রাহাজানিকর ব্যাপারগুলো ঘটছে এগুলো নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে সেই একহাতে যে হাত জালের মতো  প্রসারিত করে দিচ্ছে পুঁজিবাদ, ভোগবাদ, পুরুষতান্ত্রিকতা ও ক্ষমতার মোহকে এবং এসব চরিত্র গড়ে উঠছে পুঁজিবাদের উত্থানের সাথে সাথেই।

পরিমলের লিঙ্গোত্থান এবং তা ক্রমশ বেড়ে চলা অ্যালিগরিক্যাল ব্যাপার। এখানে পরিমল শুধু একজন পরিমল নয় যার সাথে লেখকের দেখা হয়। পরিমল এত বিস্তৃত ধারণা যে, একসাথে তাকে ধারণ করা কঠিন। মানিক নামের যে ছেলেটি একশো মেয়েকে ধর্ষণ করার ইচ্ছে পোষণ করে সে পরিমল, সে ছেলেকে সিকিউরিটি দিয়ে যারা শাস্তি এড়াতে সাহায্য করে তারাও পরিমল, বারবার ব্যাংকলুট করার সাহস রাখে যারা তারাও পরিমল। যে উজ্জ্বল আলোয় শেষপর্যন্ত পরিমলকে নৃত্যগীতে মগ্ন হতে দেখা যায় তা পরিমলের ইচ্ছার চূড়ান্ত প্রকাশ। কাচের দেয়ালের ওপারের পরিমলকে মানুষ দেখতে পারে কিন্তু স্পর্শ করতে পারে না। এই যে অধরা উল্লম্ফন তা পুঁজিবাদ ও ভোগবাদের উচ্ছ্বসিত রূপ। ঔপন্যাসিক মঈনুল আহসান সাবের একবিংশ শতকের সাম্প্রতিক অতীত ও ঘটমান বর্তমানকে ধরতে চেয়েছেন এক ফ্রেমে। সহজ করে বুঝাতে সক্ষম হয়েছেন এই সময়ের নিয়ন্ত্রক এক পরিমল। টি এস এলিয়ট প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ের সমাজে যে বিকলাঙ্গতা অবলোকন করেছেন এবং ধরেছেন ওয়েস্টল্যান্ডে (১৯২২), তা ছিল পুঁজিবাদের প্রথম পাঠ। প্রায় এক শতক পর ভিন্ন ভূমণ্ডলে উত্থিত পুঁজিবাদ যে নিয়ামক তৈরি করেছিল তার চরম অবক্ষয়িত রূপ ধরা দিয়েছে `এখন পরিমল` এ। মঈনুল আহসান সাবেরের `এখন পরিমল বিষয়গত ও কাল বিবেচনায় ঊষর সময়ের প্রতিচ্ছবি সামনে নিয়ে আসে।