সাহিত্য ও আমাদের অস্তিত্ব

মুজতবা আহমেদ মুরশেদ

প্রকাশিত : জানুয়ারি ১২, ২০১৮

আমেরিকার লস এঞ্জেলেসে ২০১০ সালে অনুষ্ঠিত ফোবানা কনভেনশনে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমমন্ত্রিত হয়ে সাহিত্য আসরে ‘সাহিত্য ও আমাদের অস্তিত্ব’ শিরোনামে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেছিলের মুজতবা আহমেদ মুরশেদ। সভাপতিত্ব করেছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী। প্রবন্ধটি ছাড়পত্রের পাঠকদের উদ্দেশে...

সাহিত্য ও আমাদের অস্তিত্ব নিয়ে অলোচনা করতে গেলে অবধারিতভাবেই বলতে হয়, মানুষ চিরকাল তার অস্তিত্বের সংকট দ্বারাই তাড়িত। এ সংকট সে প্রত্যক্ষ করেছে তার জন্মের আদি থেকে। যখন সে ক্ষুধায় কাতর হয়েছে, মাথার ওপর বজ্র-বৃষ্টিতে শঙ্কিত হয়েছে, তখন থেকেই সে এসব সংকট মোকাবিলায় তৎপর হয়েছে। এসব সংকট যথাযথভাবে মোকাবিলার সাথে সাথে তার অর্জিত সফল্য ক্রমান্বয়ে তাকে তাড়িত করেছে সম্পদ সংগ্রহের দিকে। সম্পদ সংগ্রহের দিকে মানব সমাজের গভীর মনোনিবেশ তার ভেতর জন্ম দিয়েছে শক্তিবোধ আর সামাজিক মর্যাদাবোধের। এ দুটো উপাদানই মানবকে ধাবিত করেছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বিন্যাসের লড়াইয়ে। এভাবে মানব সমাজ তার অস্তিত্ব রক্ষার মোকাবিলার পর্যায় থেকে যে দৌড় শুরু করেছে, সে দৌড় আজও বহমান। আর এ দৌড়ের মাঝেই মানুষ নিজের ভেতর প্রত্যক্ষ করেছে প্রকৃতির সৌন্দর্য। ক্ষেপা দৌড়ে ক্লান্তিতে ভরে ওঠা মনের মাঝে চেয়েছে শিল্পের পরশ, চেয়েছে বাস্তবতার রূঢ় ভূমি থেকে একটু সরে এসে সাহিত্যের কল্পনা আর রূপকতায় নিজেকে নিমগ্ন করতে।
বিষয়টা এমন, অস্তিত্বের সংকট মোকাবিলায় যে সংগ্রাম, সেই সংগ্রাম থেকে রাষ্ট্রীয় কাঠামো বিন্যাসের যে ভাবনা অথবা নিজের ভেতর আবিষ্কৃত করা সামাজিক মর্যাদাবোধের যে তৃষ্ণা, তার স্বাভাবিক ছাপ, জন্মদাগের মতো শিল্প-সাহিত্যে লেগে আছে। মানুষ তার চলমান জীবনধারায় যে অভিজ্ঞতাগুলো অর্জন করে, সেগুলোই তার হাতে সৃজিত সাহিত্যের পরতে এসে অভিঘাত তৈরি করে। এ প্রক্রিয়াটাই মানব জীবনের সাথে সাহিত্যের সম্পর্কের গভীরতাকে পরিচালিত করে আসছে। মানুষের অস্তিত্বের সংকটের সাথে সাহিত্যের এ সনাতন ধারায় পথ পরিক্রমণ সভ্যতার গতিপথে নানাভাবে বিকশিত হয়েছে। প্রতিটা আলাদা অঞ্চলে, প্রতিটা একক সত্তার কবি, গল্পকার, উপন্যাসিক, নাট্যকার মুখোমুখি হয়েছেন আলাদা সব অভিজ্ঞতার এবং তাদের সৃজনশীল স্বত্তায় সেসব অভিজ্ঞতাগুলো দোলা দিয়েছে। অর্থাৎ পারিপার্শিক অবস্থার সাথে প্রতিনিয়ত মানব মনের ও মানুষের ব্যক্তিগতভাবে চিন্তা-চেতনার যে অভিঘাত সংঘটিত হয়, তার ওপর তির্যক আলোকপাত করেন একজন গল্পকার, আর কবি তা রূপকতায় রহস্যময় করে তোলেন। ফলে প্রতিটা অঞ্চলের লেখায় ভিন্নতা সুস্পষ্ট। প্রতিটা অঞ্চলের লেখায় নিজস্ব উপস্থাপনার ঢং কিংবা অবয়ব তৈরি হয়। প্রতিটাই আপন মতো করে বর্ণিল হয়ে ওঠে।
কিন্তু এই ভিন্নতার মাঝেই দেখা যায় মানুষের মৌলিক সংকট বা অনুভূতি প্রকাশের ভঙ্গিতে একটা ঐকতান, একটা অভিন্ন সুর। খুব শক্তিশালী একটা অভিন্ন মৌলিক ভাবনার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এ ধারার সাহিত্যের বিষয়বস্তুর মাঝে মানুষের অস্তিত্বের অতীত সংকটের রেফারেন্স, আর বর্তমান অবস্থার দুর্দশা বা সে থেকে পরিত্রানের লড়াইয়ের চিত্র ফুটে ওঠে। দৃঢ়ভাবেই বলা যায়, সেসব সাহিত্যেই প্রত্যক্ষ করা যায় মানব অস্তিত্বকে রক্ষা করার শপথ বা আগামীর নির্দেশনা। এ সুর যখন কোনো সাহিত্যে ধ্বনিত হয়, তখন সেই সকল সাহিত্য আমাদের পরস্পর পরস্পরকে একসূত্রে বেঁধে ফেলে। দেশ ও জাতির উর্দ্ধে বিশ্বমানবতার একটা একক সুর ধ্বনিত হয়।
যাই হোক, সাহিত্য যেহেতু সমুদ্রের বিশালতার মতো ব্যাপক। প্রতিটা অঞ্চলের সাহিত্য নিয়ে এক দফায়, এক আসরে আলোচনা করা কখনোই সম্ভব নয়। তাই বাংলাদেশ থেকে এই দূর প্রবাসে ফোবানার ব্যানারে বাঙালিদের যে মহামিলন, সেখানে বাঙলা সাহিত্যের সাথে আমাদের নিজেদের অস্তিত্বের সংকট আলোচনায়, সাহিত্যের প্রকাশ ভঙ্গি বা তার চিত্রগুলো নিয়েই দু চারটা কথা উপস্থাপন করতে চাই।
সাধারণত সাহিত্যের এই রকম আলোচনা খুবই তাত্ত্বিক এবং এর শেষও নেই। সকাল থেকে সন্ধ্যা অবদি হেঁটেও এর রাজ্য পার হওয়া সম্ভব নয়। এ ধারায় আলোচনা শুরু হলে দেখা যাবে, সব কঠিন কঠিন পরিভাষা ব্যবহার করে আলোচনা করতে হচ্ছে। যেমন নাকি সাহিত্যের প্রকরণবাদ, নব্য-সমালোচনা, কাঠামোবাদ, উত্তর কাঠামোবাদ, অবিনির্মান: আর ইতিহাস কেন্দ্রিক তত্ব টানতে গেলে দেখা যাবে টানতে হচ্ছে মার্কসবাদ, নারীবাদ, নব্য-ইতিহাসবাদ, প্রাচ্যবাদ, উত্তর উপনিবেশবাদ, নিম্নবর্গীয় সমীকরণ। মাথা চুলকে, ভ্রু কুঁচকে গেলার মতো এই রকম অজস্র কঠিন বিষয়বস্তু উপস্থাপিত করতে হয়। কেননা সাহিত্যের সঠিক আচরণটা বুঝতে হলে এইধারার আলোচনা এসেই পরে এবং এটাই নিয়ম বলে সকল গবেষক মেনে আসছেন। কিন্ত এই প্রক্রিয়ায় আলোচনা বড়ই নিরস ঠেকবে অনেকের কাছেই। আমার কাছেও ঠেকে। আমি নিজেই যারপর নাই এর থেকে অনেক দূরে থাকি।
তবে সাহিত্যের সাথে আমাদের এখনকার অস্তিত্বের রূপ বা বিষয়বস্তুর প্রকাশ ভঙ্গি খুব সরলভাবে বুঝতে হলেই একটু খানিক আপন দেশের সমাজ ও রাজনীতির গতিপথ অথবা পরিবেশগত অবস্থাটার দিকে চোখ ফেরাতে হয়। সাহিত্যের বিবর্তনের নিজস্ব ইতিহাস ঘাঁটতে গেলে বাংলাদেশের সমাজ, রাজনীতি, ভাষা, জ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, লৈঙ্গিক বৈষম্য ও ইতিহাস এসেই পরে।
আমি আপাতত এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে আলোচনা করতে গিয়ে, পুরো বিষয়টাকে বুঝতে, আমার পর্যবেক্ষণটাকে এভাবে সাজাতে চাই, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান রাষ্ট কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসার পর বাংলাদেশ নামের স্বাধীন স্বার্বভৌম ভূখণ্ডের মানুষ গত তিন-চার দশক ধরে স্বাভাবিক ও সম্মানজনক জীবনের জন্যে যে সংগ্রাম করে আসছে, বাংলাদেশের সাহিত্যে তারই প্রতিফলন পড়ছে। বাংলাদেশের মানুষের ওই সংগ্রাম গণতান্ত্রিক ও মানবিক সমাজ গঠনের প্রয়াস, তাই বাংলাদেশের আধুনিক সাহিতের প্রধান লক্ষণ গণতান্ত্রিক চেতনা ও মানবিক মুল্যবোধ।
কিন্তু একটা রাষ্ট্রের প্রার্থনায় এদেশের কবি, গল্পকার, উপন্যাসিক, নাট্যকারদের মাঝে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন অনবদ্য উপাদান হিসেবে কাজ করেছে। তারা প্রায় সকলে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কলম দিয়ে ঝরিয়েছিলেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ! কবি শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, কবি আবুবকর সিদ্দিকী, ঔপন্যাসিক শওকত ওসমান, শওকত আলী, শহীদুল্লাহ কায়সার, নাট্যকার মুনীর চৌধুরীর মতো এমন মনীষি কবি এবং ঔপন্যাসিকরা দ্রোহের উত্তাপের ভেতর দিয়ে যে যাত্রা করেছিলেন, তা থেকেই ষাট দশক আর সত্তর দশকে হিরকখণ্ডের মতো মূল্যবান কবিতা, উপন্যাস ও নাটক জন্ম নিয়েছে। উদাহরণ টেনে এখানে, এই আসরে লেখার ফিরিস্তিটা লম্বা করা সঠিক বিবেচনা হবে না।
কিন্তু স্বভাবতই মনের কোণে ধ্বনিত হয়, বল বীর/ বল চির উন্নত মম শির/ শির নেহারি আমারি নত শির ঐ শিখর হিমাদ্রির। অথবা, স্বাধীনতা তুমি রবি ঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান/স্বাধীনতা তুমি কাজী নজরুল, ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো মহান পুরুষ।
শুধু এটুকু বলতে চাই, সেই রেষটা উঁচু নিচু পথ ধরেই এখনো এই বাংলাদেশের কাব্য, ছোটগল্প এবং উপন্যাসে, বিশেষভাবে জীবন সম্পৃক্ত উপন্যাস ও ছোটগল্পে আমাদের সামাজিক বাস্তবতা ব্যাপক আঙ্গিকে উপস্থিত। বলা যায়, এই যে এ সময়ে যারা লিখছেন, তারাও খুঁজে ফিরছেন নিজের গতিপথ। এখন জনসংখ্যা বেড়েছে, বেড়েছে পত্রিকা এবং ইলেকট্রনিক মাধ্যম। স্বভাবতই আমাদের সামনেও এখন প্রকাশিত কবি, গল্পকার, উপন্যাসিক এবং নাট্যকারের সংখ্যাও সেই অনুপাতে অনেক বেশি। তাদের ভেতর, হাতেগোনা কিছু কাজ অনেক শক্তিশালী। সেই সব সাহসী লেখায় গণহত্যার বিচার, মানবাধিকার, পরিবেশ বিপর্যয় থেকে রক্ষা সবই পরিলক্ষিত।
শেষে এসে বলি, আদি থেকে মানুষ নিজের অস্তিত্ব রক্ষার যে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছে, তারই প্রতিধ্বনি এখনো পাই আমাদের মাঝে, আর সেই অনুভূতি, অভিজ্ঞতা, নিজের জাতিকে শক্তিশালী দেখার দর্শন সকলি আমাদের কবিতায়, গল্প, উপন্যাস আর নাটকে উপস্থিত। তবে এটাও বোধ করি, এই উপস্থিতির হার আরোও অধিক হওয়া প্রয়োজন। যেন এখনকার সাহিত্য বাংলাদেশের মানুষের জীবন দর্শনের রক্ষা কবচ হয়ে উঠতে পারে।
আমিও এই দাঁড়িয়ে সময় উচ্চারণ করেছি:
শরণার্থী বাতাসের ভাবনায় খেলা করে
কেন নয় আজ মানুষেরা পাখি হয়ে আকাশে উড়ুক;
দিয়ে দিক ঈশ্বর মানুষেরে পক্ষি বানানোর ক্ষমতা আমায়।
বাতাসের বুকে ধ্বনি
ঈশ্বর, তুমি যা পারো নাই, আমি তাই করে দেব।
মানুষেরে সুখি করে দিয়ে দেব ঘরদোর আকাশে তাদের,
ভাত কাপড়, ঘটা করে প্রেমের আয়োজন, অঢেল চুম্বন।
মুছে দেব মানবের শরণার্থী কাহিল জীবন।

লেখক: কবি ও কথাসাহিত্যিক

জাতীয় জাদুঘরে চলছে চলচ্চিত্রের মহাযজ্ঞ!

জাতীয় জাদুঘরে চলছে চলচ্চিত্রের মহাযজ্ঞ!

জানুয়ারি ১৮, ২০১৮

বাংলাদেশে তিনটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব হয়। এর একটি দ্বিবার্ষিক এবং দুইটি প্রতিবছর হয়। তিনটি উৎসবই হয় স্বেচ্চাসেবীদের আয়োজনে। এর মাঝে দুইটি উৎসবের আয়োজক দুইটি ফিল্ম সোসাইটি বা চলচ্চিত্র সংসদ। এই উৎসবগুলো আয়োজনের পেছনে অনেক কষ্টের গল্প থাকে।

মূর্তিকারিগরে প্রতিমূর্ত এক শহর

মূর্তিকারিগরে প্রতিমূর্ত এক শহর

ডিসেম্বর ১১, ২০১৭

প্রতিটা ইটই প্রাণ পেতে চায়। কিছু একটা হতে চায়। প্রতিটি ভবনের আত্মা আছে, আছে মন। যে ভবনের আত্মা নেই সেটির প্রেতাত্মাও আছে হয়তো। ওই রকম ভবনে থাকলে গা ছমছম করতেই পারে।