করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ১৫৪৪২৩৮ ১৫০৩১০৬ ২৭২৫১
বিশ্বব্যাপী ২২৯৪৮৮৩৫৭ ২০৬১৪৪৭২২ ৪৭০৮২৭৮

আসাদুজ্জামান সবুজের গল্প ‘মা’

প্রকাশিত : আগস্ট ১৩, ২০২১

নুসরাত আরা রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা পড়ছে। বাবা তানভীর রহমানের কাছে বড় হয়েছে মা মরা নুসরাত। নুসরাতের বয়স তিন বছর থাকতে মা নিলুফা রহমান গত হয়েছেন। মেয়ের কথা ভেবে নুসরাতের বাবা আর বিয়ে করেনি। নুসরাত দেখতে যেমন মায়াবতী তেমন মেধাবী। বাবা তাই তাকে খুব পছন্দ করে। মেয়ের কোনো ইচ্ছে অপূর্ণ রাখে না। নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। ছোট থেকে মেয়ের অন্যকিছুই মন। তার সহপাঠীরা যখন খেলাধুলো বা গল্প আড্ডায় ব্যস্ত থাকতো নুসরাত তখন টিফিন বক্সের খাবার বের করে পথ শিশুকে খাওয়াতো। যা তার ভালো লাগে, আনন্দ দেয়। মানুষের জন্য কাজ করার ভিতর অন্য সুখ আছে, যা কোটি টাকা দিয়ে পাওয়া যাবে না। এটা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে নুসরাত।

বর্তমানে নুসরাতের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ‘মানুষের জন্য আমরা’ নামে একটা গ্রুপ আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন সহপাঠী এক হয়ে বছর দুই আগে গ্রুপটা খুলেছে। এরই মধ্যে সবার কাছে যা বেশ জনপ্রিয়। সেচ্ছায় রক্ত দান, বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, পথশিশুদের শিক্ষাসহ নানান সামাজিক ও সেবামূলক কাজ করাই ‘মানুষের জন্য আমরা’র একমাত্র লক্ষ্য। আর এসব কাজের অর্থ আসে সমাজের বিত্তবান ও প্রতিষ্ঠিত মানুষের সহযোগিতায়। নুসরতের বাবা মেয়ের এসব কাজে অনুপ্রেরণা দেন। সকালে টিভিতে ব্রেকিং নিউজ গতরাতে প্রবল ঝড়ে চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে শতাধিক আহত ও  নিহত বারো জন। অনেকের ঘরবাড়ি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিষয়টি নুসরাতকে ভাবায় খুব। বাবাকে বলে চট্টগ্রাম যাবে। পাহাড় ধসে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়াবে।

বাবা মেয়েকে সায় দেয়। অনুমতি পেয়ে মেয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে চুমো খায় কপালে। জোড় গলায় বলে, লাভ ইউ বাবা। বাবাও বলে, লাভ ইউ টু মা।
মেয়ে চলে গেলে দেয়ালে বাঁধানো কাচের ফ্রেমে বাবা-মাসহ ছোট নুসরতের ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে। রহমান সাহেবের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। নুসরাত বন্ধুদের ফোন করে। রাতের ট্রেনে তারা চট্টগ্রাম রওনা করে। ভোরে চট্টগ্রাম পৌঁছে নুসরাত বাবাকে ফোনে বলে তাদের ঠিকঠাক ভাবে পৌঁছানোর কথা। বাবা সাবধানে থাকতে বলে এবং কোনো প্রয়োজনে ফোন করতে বলে। নাস্তা সেড়ে তারা ঘটনাস্থল যায়। দলবলসহ কাজে লেগে পড়ে। কাজ করতে গিয়ে এক অসুস্থ মহিলা চোখে পড়ে। বেশ অসুস্থ। নুসরাত তার কাছে যায়। জড়িয়ে ধরে বুকে টেনে নেয়। মহিলা তার দিকে তাকিয়ে থাকে। নুসরতের মায়া হয়। বন্ধুরা তার ঘর ঠিক করে দেয়। প্রচুর জ্বর থাকায় নুসরাত ব্যাগ থেকে মেডিসিন বের করে খাইয়ে দেয়। দুইদিনে কাজ শেষ হয়ে যাওয়ায় সবাই ঢাকায় ফিরে যায়।

নুসরাত থেকে যায়। অসুস্থ আসমাকে ফেলে যেতে মন সায় দেয় না। ধীরে ধীরে আসমা ভাল হয়ে যায়। আসমা নুসরতের জন্য নিজে রান্না করে। খাইয়ে দেয়। মাথায় বেনি করে দেয়। নুসরাত আসমাকে মনের অজান্তে মা বলে ডাকে। মায়ের আদর কখনও পায়নি। বুদ্ধি হবার আগেই তো মা গত হয়েছেন। আসার আগে আসমার ঘরে পুরানো এক অস্পষ্ট ঝাপসা ছবি দেখে অবাক হয়ে যায়। পরের দিন নুসরাত ঢাকায় ফিরে আসে। আসার আগে আসমার হাতে কিছু টাকা দিয়ে আসে। আর বলে, ভাল থেকো মা। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় পার করেছি এই কয়েকদিন। যা কখনও ভুলবো না। আবার আসবো। কিছুদূর যাবার পর আবার ফিরে আসে। জড়িয়ে ধরে দুইজনেই কেঁদে ওঠে। এক অজানা মায়ায় আটকে পড়ে। ঢাকায় এসে মনমরা হয়ে পড়ে থাকে নুসরাত।

চট্টগ্রামের স্মৃতিগুলো ভেসে বেড়ায়। আসমার নিজ হাতে ভাত খাইয়ে দেয়া, মাথায় চুলে বেনি করে দেয়াসহ নানান কিছু। রাতে বাবা এসে ডাকলে স্বজাগ হয় নুসরাত।
কোনো সমস্যা মা। মন খারাপ। কিছু হয়েছে তোর মা।
কোন কথা বলে না। চুপ করে থাকে। বালিশের নিচ থেকে সাদাকালো ছবিটা বের করে বাবার হাতে দেয়।ছবিটা দেখে মেয়ের মতো বাবাও চুপসে যান। বাবা আমি আবার চট্টগ্রাম যাব। ছবিটা না বলে নিয়ে এসেছি।
আমিও যাব তোর সাথে মা। তোকে আজ একটা কথা বলি। যা কখনও বলিনি। নিলুফা আর আমি একজন একজনরে ভালোবাসি। পরিবারের অমতে বিয়ে করে ফেলি। প্রথমে পরিবার মেনে না নিলেও পরে অবশ্য আমাদের মেনে নেয়। ভালই চলছিল সব ঠিকঠিক। ওহ সবাইকে মানিয়ে নিয়েছিল। সমস্যা হয় বছর পার হবার পর। আমরা সন্তান নিচ্ছি না কেন? বাড়ির সবাই থেকে শুরু করে আত্মীয় স্বজন আর বন্ধুবান্ধব সবাই। যদিও আমরা বেবির জন্য ট্রাই করছি। শেষে আর না পেরে ডাক্তারের কাছে যাই। তখন জানতে পারি, নিলুফা কখনও মা হতে পারবে না। বাড়িতে তা চেপে যায়। কিন্তু সবার অত্যাচার এতো বেড়ে যায় যে আমরা রাগ করে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাই। ঢাকায় চলে আসি। সবকিছু আবার নতুন করে শুরু করি। গুছিয়ে উঠেছি ঠিকই কিন্তু এখানে আসার পর নিলুফার আরেক সমস্যা হয়। কোনও শিশু দেখলে তাকে জড়িয়ে ধরে। আদর করে, প্রতিবেশীর বাচ্চাকে না বলে বাসায় নিয়ে আসে। এসব নানান কিছু। হঠাৎ করে আনমনা হয়ে থাকে। বাসার জিনিসপত্র ভাঙচুর করে। আমি থাকি অফিসে। বাসায় ওকে একা রাখা বিপদ। তাই গ্রাম থেকে নিলুফার এক দূর সম্পর্কের মামাতো বোনকে নিয়ে আসি। বাবা-মা নেই, সৎ মার কাছে মানুষ। নিলুফার মামাতো বোন আসার পর আরোও ভয়াবহ হয়ে ওঠে সব। একদিন নিলুফা তার মামাতো বোনকে বলে বসে তাকে একটা সন্তান দান করার জন্য। প্রথমে রাজি না হলেও পরে রাজি হয়। কখনও কখনও জীবনের বাস্তবতায় সত্য, বাকি সব মেকি। তোর জন্ম হয়। তোর বাবা আমি হলেও নিলুফা তোর গর্ভধারিণী নয়। তোকে পাবার পর নিলুফা সব ভুলে গিয়েছিল। আর নিলুফার মামাতো বোন একদিন কাউকে কিছু না বলে চলে যায়। অনেক খুঁজাখুঁজি করেও পায়নি। আর তোর বয়স তিন বছরের সময় অসুখে নিলুফাও মারা যায়। মারে ছবিতে যাকে দেখছিস সেই তোর গর্ভধারিণী। তোর মা।

এই বলে তিনি ছবিটা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকেন। চল মা এখনি বের হয়ে পড়ি। রাতেই ট্রেনে চট্টগ্রাম রওনা করে। ভোরে আসমার ঘরের সামনে অনেক মানুষের ভিড়। নুসরাত কিছু বুঝতে পারে না। তবে এটা বুঝে, নিশ্চয় কোনো কিছু হয়েছে। না হলে এত মানুষ কেন? ঘরের ভিতর ঢুকলে একটি মেয়ে কিশোরী জড়িয়ে ধরে কেঁদে ওঠে। আপা আপনি এসেছেন? খালা আর নেই। আপনার কথা বলছিল। আপনারে দেখতে চাইছে। আপনি আসছেন ঠিকই। কিন্তু আরেকটু আগে আসলেন না কেন? নুসরাত বাবাকে জড়িয়ে হাউ মাউ করে কেঁদে ওঠে। বাবা আমার মা নেই। মা ওহ মা...