করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ১৫৪৪২৩৮ ১৫০৩১০৬ ২৭২৫১
বিশ্বব্যাপী ২২৯৪৮৮৩৫৭ ২০৬১৪৪৭২২ ৪৭০৮২৭৮

এহসান হাবীবের গদ্য ‘গভীর বনের শান্ত পরিযায়ী’

প্রকাশিত : আগস্ট ১২, ২০২১

ছোট্টবেলায়, খুব ছোট থাকতে আমি একবার ঢাকায় যাই। আব্বার সাথে। সেবার আমার প্রথম ঢাকায় যাওয়া। আম্মার ট্রেনিং চলছিল ঢাকায়। আমরা কিশোরগঞ্জ থেকে ট্রেনে করে যাই। জীবনের প্রথমবার ছোট ছোট চোখ দিয়ে ঢাকায় কী কী দেখছিলাম তার কিছুই আজ মনে নাই। শুধু মনে আছে, আব্বা আর আম্মা আমারে চিড়িয়াখানায় নিয়ে গেছিল। চিড়িয়াখানায় কত প্রাণী ছিল, মজার হরেক প্রাণী। দেখি আর অবাক হই, কী যে ভালো লাগে!

মস্তবড় হাতি আর পিচ্চি সজারু আমি মুগ্ধ হয়ে দেখি। একটা কী প্রাণী, আজব! ইয়া লম্বা গলা আর শরীর ভর্তি সুন্দর ছোপ ছোপ ফুল। জানলাম, এইটা জিরাফ। বিশ্বাস করেন এত এত প্রাণী দেখলাম, কোনোটাই আমারে এতটা টানে নাই যতটা জিরাফ টানলো। আমি হুট করে বায়না ধরলাম, এইটা আমারে কিনে দিতে হবে। সে কঠিন বায়না! আমি রীতিমতো কান্নাকাটি করা শুরু করলাম। আমার অল্প মাইনের চাকুরে বাপ খুব বোধহয় বিপদে পড়ে গেছিল।

খুব চিন্তা করতেছিল, কীভাবে আমারে জিরাফটা কিনে দেয়া যায়। তারপর বাপ আমারে জিরাফটা কিনে দিছিল। চিড়িয়াখানার একটা লোকের সাথে জিরাফ কিনার কথা চূড়ান্ত করলো আমার সামনে। লোকটাও বললো, জিরাফটা আমার। আমি তো ট্রেনে করে বাড়ি যাব কিন্তু জিরাফ তো অনেক বড়, ওতো ট্রেনে ধরবে না, ও হেঁটে হেঁটে আমাদের বাড়ি যাবে। আমি বাড়ি গিয়েই দেখবো জিরাফ আমাদের বাড়ির উঠোনে আছে। আমি খুব আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফিরে আসি।

ওমা! জিরাফ তো আসেনি।
বাবা বললেন, সকালে ঘুম থেকে ওঠলেই জিরাফ আসবে।
সকাল আসে, জিরাফ আসে না। জিরাফের জন্য আমার মন কেমন করতে থাকে। বাবা টের পান। বিকেলে লিচু গাছের তলায় বসে বাবা আমাকে বলেন, জিরাফটা আমাদের বাড়ি আসতে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেছে। জিরাফ আর আসতে পারবে না। জিরাফ তো আর মানুষ না যে পথ খুঁজে চলে আসবে।

সেই বিকেলে আমার কী কান্না! পরদিন থেকে আমি শুধু জিরাফটাকে খুঁজে বেড়াই। স্কুলে যাওয়ার পথে, বিকেলে জঙ্গলের ভেতর, ছুটির দিনে বিল পাড়ে, আমি যেখানেই যাই জিরাফটাকে খুঁজি। তারপর আমি কখন বড় হয়ে গেলাম। জিরাফ ভুলে যাই। আবার মনে পড়ে। প্রেম। সংসার। কন্যাগণ। এসবের ভেতরেও জিরাফটাকে মনে পড়ে। সেই ছোট্টবেলার মতো জিরাফটাকে মাঝে মাঝে খুঁজি। জীবন খুব একঘেয়ে আর বিরক্তিকর হয়ে গেলে আমি ছোট্টবেলার মতো জিরাফটার জন্য এখনো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদি।

তখন ছোট্টটা আমাকে জিজ্ঞেস করে, বাবা তুমি নিশ্চয়ই জিরাফটার জন্য কান্না করছো? আমি বড় হলে তোমাকে একটা বড় জিরাফ কিনে দেব। আমি আবারো বড় আরেকটা জিরাফের অপেক্ষার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকি। একটা জিরাফ নিশ্চয়ই  একদিন সকালবেলা আমার বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে ডাক দেবে। আচ্ছা, জিরাফের ডাক শুনতে কেমন? আপনি শুনেছেন?

লেখক: কবি