কাজী জহিরুল ইসলামের গদ্য ‘মন নিয়ন্ত্রণের উপায়’

ছাড়পত্র ডেস্ক

প্রকাশিত : মে ২৯, ২০২৬

নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারা মানব জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নত দেশের মানুষেরা এখন এই কাজটি করার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছে। স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়ে হয়তো একটি আয়েশী জীবন পার করে দেয়া যায়, কিন্তু সেই জীবনে অর্জন তেমন কিছুই হয় না। প্রত্যেকের একক অর্জনের সমষ্টিই একটি জাতিকে সমৃদ্ধি এনে দেয়।

নিজের অর্জন তাই শুধু নিজের জন্য নয়, দেশ ও জাতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। নিজের জীবনকে বড় অর্জনের পথে ধাবিত করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশপ্রেম। শুধু তাই নয়, নিজের মেধা ও যোগ্যতার পূর্ণ সামর্থ্য কাজে লাগিয়ে বড় সাফল্য অর্জন করতে পারার মধ্য দিয়ে আমরা পৃথিবীর প্রতি আমাদের জন্মের ঋণ শোধ করি। বড় সাফল্য তারাই পায় যারা নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

এখন কথা হচ্ছে, কীভাবে আমি আমার মন নিয়ন্ত্রণ করব? বিশ্বব্যাপী এই কাজে সবচেয়ে বেশি যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় তা হচ্ছে, মেডিটেশন বা ধ্যান। ধ্যানের মধ্য দিয়ে মনকে কিছু সময়ের জন্য স্থির রাখার চর্চাকেই মূলত মেডিটেশন বলে। কীভাবে বসে তা করছেন, হাত কোথায় রাখছেন, নমস্কারের মতো করতল যুক্ত করছেন কিনা, মাটিতে বসলেন, নাকি চেয়ারে বসলেন, এসব গৌণ। মূল কাজ হলো মনটাকে স্থির করতে পারা।

মেডিটেশনের এটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মনকে স্থির করার অর্থ কী? মন কি একটি চলমান গাড়ি? হ্যাঁ, মন তার চেয়েও দ্রুতগামী। চিন্তার নানান স্টেশনের দিকে আমাদের মনগাড়ি ছুটে বেড়ায়। মেডিটেশনের সময় আমরা চেষ্টা করি তাকে একটি স্টেশনে পার্ক করে রাখতে। সেজন্য অনেক মেডিটেশন গুরু বলেন, একটি মনের বাড়ি নির্মাণ করুন। আপনার স্বপ্নের বাড়ি। মেডিটেশনের সময় আপনি সেই বাড়িতে অবস্থান করুন, অন্য কোথাও যাবেন না।

কিন্তু কাজটি তত সহজ নয়। আমাদের মন ক্ষণে ক্ষণেই ছুটে যায় নিজের অফিসে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে, স্ত্রী বা স্বামী-সন্তানের কাছে, পাওনাদারের কাছে, কীভাবে প্রমোশনটা হবে, কীভাবে চাকরি পাওয়া যাবে, পরীক্ষায় পাশ করব তো? গাড়িটা বুক করেছি সেটা কবে আসবে, আমেরিকার ভিসা পাব তো? ইউরোপে বেড়াতে যাওয়ার টাকাটা জোগাড় করতে হবে, ব্যাংকের লোনটা অনুমোদন হবে তো? মেয়েটার বিয়ে দিতে হবে, ছেলেটাকে ভালো একটা কলেজে ভর্তি করাতে হবে, আরও কত কী!

বিখ্যাত লেখক পাওলো কোয়েলহো বলেছেন, “তোমার সামনে দুটি রাস্তা, হয় তুমি মনকে নিয়ন্ত্রণ করো, নাহলে মন তোমাকে নিয়ন্ত্রণ করবে।” নেপোলিয়ন হিলও ঠিক একই কথা বলেছেন এবং আমরা সকলেই মোটামুটি তা নিজের জীবনে প্রত্যক্ষও করেছি। গৌতম বুদ্ধ বলেছেন, “পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে, পরিবারকে সুখী করতে চাইলে এবং সুস্বাস্থ্য উপভোগ করতে চাইলে নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করো।” এমনি আরও বহু মনীষী মন নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন।

মোটামুটি এই কথাগুলো আমরা সবাই জানি এবং কমবেশি নিজের জীবনে এর প্রতিফলনও দেখেছি। মনটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে মানলাম, কিন্তু করবটা কী করে? এ এক বিরাট প্রশ্ন।

যে সময়টা মেডিটেশন করি সেই অল্প একটু সময় আমরা চেষ্টা করি সব কিছু থেকে গুটিয়ে এনে মনকে ভাবনামুক্ত রাখতে। অনেকেই এই পরামর্শ দেন যে, শুধুমাত্র একটি বিষয়ে চিন্তাকে স্থির রাখুন। কিন্তু চিন্তা কী আর এক বিষয়ে স্থির থাকে! একটি বিষয় নিয়ে ভাবতে থাকলেও সেই একটি বিষয় থেকেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বহু ডালপালা গজিয়ে এক জটিল বৃক্ষ তৈরি হয়ে যায়, চিন্তারা জট পাকাতে শুরু করে।

যদিও মেডিটেশনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো একেবারে শূন্যে পৌঁছে যাওয়া, মানে মনের বাড়িটাও আর শেষ পর্যন্ত থাকবে না, আমি শূন্যে বিলীন হয়ে যাব। অনেকটা নির্বাণ লাভের মতো, মনের নির্বাণ। এটা কি আসলে আদৌ সম্ভব, এই জটিল মানব জীবনে?

আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, নিজের মনকে আমি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। ভাবছিলাম, আমি কেন তা পারি? আরও অনেকেই পারেন। আবার আমার আশপাশের বহু চেনা মানুষকে দেখি, তারা তা পারেন না। নিশ্চয়ই আমার জীবন-যাপনে, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে কিছু একটা আছে, যে অভ্যাস আমাকে মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে। অনেক ভেবে প্রশ্নটির উত্তর পেয়েছি। সেই কথাটিই আজ আপনাদের বলবো।

আমি সব সময় কী করবো, কী খাবো, কোথায় যাব তা আগে থেকে পরিকল্পনা করি। এই পরিকল্পনার মধ্যে সময় ও পরিমাণ নির্ধারণ করা থাকে। যেমন: আগামীকাল সকাল ১১ টায় এক কাপ ডিক্যাফ কফি খাব। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী আমি পরদিন ঠিক ১১টায় এক কাপ ডিক্যাফ কফি বানিয়ে খাব। একটু আগেও না, একটু পরেও না। এটা আমার দীর্ঘদিনের অভ্যাস। সব কিছু আগে থেকে প্লান করে রাখি এবং সেই প্লান অনুযায়ী এক্সিকিউট করি।

এই রকম ছোট ছোট বিষয়ের পরিকল্পনা করা এবং তা অ্যাচিভ করার মধ্য দিয়ে মন নিয়ন্ত্রণের একটা চর্চা হয় বলে আমি বিশ্বাস করি। আপনি যদি পরিকল্পনা করেন দুপুর ২টায় বাগানে কিছু গাছ লাগাবেন, আপনি আপনার মনকে দুইটা পর্যন্ত বহু কিছুতে যুক্ত হওয়া থেকে বিরত রাখতে পারবেন। কীভাবে গাছগুলো লাগাবেন, কতটুকু দূরে দূরে একেকটা গাছ বুনবেন, মাটিতে কম্পোস্ট দেবেন কিনা, এইসব নিয়ে আপনার মন ভাবতে থাকবে।

ঠিক দেড়টা সময় আপনার বন্ধু ফোন করে একটি ভালো রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালো। এখন আপনি কী করবেন? গাছ লাগানো বাদ দিবেন? আপনি চেষ্টা করবেন খাওয়ার প্রলোভন থেকে নিজেকে সংযত রাখতে এবং মূল পরিকল্পনায় স্থির থাকতে। এটা একটা নিয়ন্ত্রণ। তবে একান্তই যদি মনে করেন আরও অধিক গুরুত্বপূর্ণ নতুন কিছু চলে এসেছে, পরিকল্পনা পুনর্বিন্যাস করা দরকার, নিশ্চয়ই তা করবেন। কিন্তু চেষ্টা করবেন মূল পরিকল্পনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিছু এলে তা বাতিল করে দিতে। প্রথম কিছুদিন এটা আপনাকে রিলিজিয়াসলি করতে হবে।

সকল পরিকল্পনার সঙ্গে সময় নির্ধারণ করবেন এবং সঠিক সময়ে শুরু ও শেষ করবেন। এই চর্চা কিছুদিন করার পরে এটিই অভ্যাসে পরিণত হয়ে যাবে। তখন আপনি নিজের মনের ওপর অধিক নিয়ন্ত্রণ অনুভব করবেন। আবার বিশেষ কোনো কারণে মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজটা করতে পারলেন না, তখন চেষ্টা করবেন হতাশ না হতে, এটি নিয়ন্ত্রণের দ্বিতীয় ধাপ। ব্যর্থতার হতাশাকেও জয় করতে হবে। মন নিয়ন্ত্রণের এই চর্চাটিকে আমরা বলতে পারি প্লান অ্যান্ড এক্সিকিউট পদ্ধতি।

মন নিয়ন্ত্রণের আরও বহু কৌশল আছে। প্রবল ইচ্ছে নিয়ন্ত্রণ করা, কিছু সময় এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা, কয়েক ঘণ্টা বাকরুদ্ধ হয়ে নীরব থাকা, রোজা বা উপবাস করা, প্রিয় খাবার বর্জন করা ইত্যাদি। এর সবগুলোই আমি করি এবং খুব ভালো ফল পাই।

বুদ্ধ যেমন বলেছেন, মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে দেহের সুস্থতা উপভোগ করা যায়, কথাটি আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। মন নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়েই একজন মানুষ প্রকৃত ক্ষমতা অর্জন করে। ক্ষমতা আসলে বাইরে থাকে না, মানুষের মূল ক্ষমতা থাকে তার নিজের মধ্যেই। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছেন, তোমার ইন্দ্রিয় ও মনের মধ্যে যে যোগাযোগ ঘটে সেটার দখল নিতে পারাই মূল ক্ষমতা।

দার্শনিক অ্যারিস্টটল মনকে শিক্ষিত করতে বলেছেন। তার মতে, কেউ যখন কোনো চিন্তা গ্রহণ না করে তা বিবেচনা করতে পারে তখন বোঝা যায় তার একটি শিক্ষিত মন আছে। অর্থাৎ মনকে শূন্য বা নিরপেক্ষ রাখতে বলেছেন।

মন নিয়ে যত কথা দার্শনিকেরা, লেখকেরা বলেছেন, সব কিছুই মন নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত। এইখানের একজন মানুষের মূল শক্তি বা ক্ষমতা নিহিত।

লেখক: কবি ও কথাসাহিত্যিক