করোনা আপডেট
আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ
বিশ্বব্যাপী

নেতাজির রাষ্ট্রভাবনা ও বর্তমান ভারত

পর্ব ৩

ড. জয়ন্ত চৌধুরি

প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০১৮

নেতাজি মনে করতেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌর প্রশাসন বিজ্ঞানের পর্যায়ে উন্নীত হতে পারবে এবং ব্যবহারিক প্রয়োগ সম্বন্ধে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণার নানা সম্ভাবনার পথ উন্মুক্ত হবে। পরবর্তীকালে ইউরোপে থাকাকালে তিনি ভিয়েনার পুরসভার সমাজতান্ত্রিক কার্যপ্রণালি দেখার সুযোগ পান। বম্বে পুরসভার অধিবেশনে আমন্ত্রিত হয়ে তিনি ভিয়েনা পুরসভার নাগরিক উন্নয়ন পরিকল্পনার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ভিয়েনা পুরসভা ১২ বছর পুরসভার দু’লাখ বস্তিবাসীর বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছিল। তার জন্য অতিরিক্ত ঋণ বা ট্যাক্স বসানোর প্রয়োজন হয়নি। পৃথিবীব্যাপী পুরসভা সচেতন বা অবচেতনভাবে পৌর সমাজতন্ত্রের দিকে এগিয়ে চলেছে। বাকিংহাম পুরসভা নাগরিকদের জন্য ঋণদান ব্যাংকের প্রবর্তন করেছে। সুভাষচন্দ্রের ভাষণ থেকে অনুধাবন করা যায় পৌর সমাজতন্ত্র আসলে ঐক্যবদ্ধভাবে সমাজের জনগোষ্ঠির সেবা প্রচেষ্টা।

সুভাষচন্দ্রের পুরসভার সময়কালীন নানা রাজনৈতিক আন্দোলন সংঘাতে যেমন জড়িয়েছেন তেমনি কারারুদ্ধ হয়ে বিচিত্রমুখি চিন্তা ও প্রকল্প রচনা-রূপায়ণের মধ্য দিয়ে ও তার নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে পরবর্তীকালে পৌরসভা সমাজতন্ত্রের প্রবক্ততা হয়ে ওঠে পৌর প্রশাসন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সুভাষচন্দ্রে এটি একটি অনন্য মৌলিক অবদান। সুভাষচন্দ্র পরবর্তীকালে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় অস্থায়ী আজাদ হিন্দ সরকারের রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে নানা আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বৃটিশমুক্ত মাতৃভূমি উজ্জ্বল ভারতের স্বপ্ন তুলে ধরেছিলেন। বিভিন্ন রাষ্ট্র প্রধানদের এক ভাবনার প্রেক্ষিতে বলেছিলেন, আজাদ হিন্দ সরকার ভারতকে স্বাধীন করলে সে দেশের মানুষের অধিকার থাকবে নতুন গণতান্ত্রিক উপায়ে সরকার গঠন ও নেতা নির্বাচন করার। তাই তিনি আজাদ হিন্দ সরকারের আগে ‘অস্থায়ী’ শব্দটি রেখেছিলেন। ভারতের জনগণের কাছে পরিচিত চরকা শোভিত ত্রিবর্ণ পতাকা বৃটিশ ভারতে অধিকৃত অঞ্চলে ওড়াতে তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন।

লোকাল গভর্নমেন্ট বা পঞ্চায়েতের ধাচে উত্তর-পূর্ব ভারতে বহু গ্রামে তিনি আজাদ হিন্দ এর বৃটিশমুক্ত শাসন কিছুদিনের জন্যে হলেও বজায় রাখতে পেরেছিলেন। আজাদ হিন্দের মুদ্রা ও টাকার পাশাপাশি নিজের ছবি ও আজাদ হিন্দ সরকারের প্রতীকসহ বণ্ড ছেড়েছিলেন যুদ্ধ ও প্রশাসন চালানোর খরচ যোগাতে। বৈদেশিক ঋণও তিনি মিটিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন। প্রবাসী ভারতীয়রা ধন, অর্থ সর্বস্ব নেতাজির আহ্বানে দান করেছিলেন তাদের অনেকেরেই অচেনা অদেখা মাতৃভূমির মুক্তি সংগ্রামে। সরকারের নিজস্ব টাকশাল না থাকায় রানির ছবি মুদ্রিত মুদ্রার উপর প্রথমদিকে আজাদ হিন্দের সিল দিয়ে কাজ চালানো হতো। পরবর্তীকালে নিজস্ব মুদ্রায় ডাকটিকিট, একাধিক বেতারপত্র, প্রশিক্ষণ শিবির, বিভিন্ন দপ্তর- যেমন প্রোপাগান্ডা, প্রেস প্রভৃতি পরিপূর্ণ চেহারায় এক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সম্পন্ন সরকার গঠনের সূত্রপাত ও অভিজ্ঞতা সম্ভবত কলকাতা পুরসভার দায়িত্বের মধ্যেই নিহিত ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে তিনি সামরিক ট্রেনিংয়ের সুযোগ পেয়েছিলেন ইউনিভার্সিটি ট্রেনিং কোর্সের সদস্য হিসেবে।

আজাদ হিন্দ সরকারের ভিতর জাতপাতধর্মবর্ণ বিদ্বেষের সমস্ত সীমারেখা ম্যাজিকের মতো মুছে দিয়েছিলেন নেতাজি। বহু বিদেশি ঐতিহাসিক গবেষক একবাক্যে স্বীকার করে গেছেন আজাদ হিন্দের ঐক্যবদ্ধ সাম্প্রদায়িক মানসিকতা মুক্ত ঐতিহ্যকে। ধর্মীয় বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে পারস্পরিক সম্বোধন হয়ে দাঁড়ায় ‘জয়হিন্দ’। যেখানে একমাত্র জন্মভূমি হিন্দুস্থানের জয়ধ্বনি পাওয়া যায়। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, শিখ, ইশাই সবার রান্না খাওয়া একই সঙ্গে হতো। তাদের একটাই পরিচয় ছিল, তারা ভারত মায়ের বীর সন্তান। নেতাজি ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত আধ্যাত্মিক ও ধর্মে বিশ্বাসী হলেও প্রকাশ্যে কখনো কোনো বিশেষ ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করেননি। তার কেবিনেটের হিন্দু, মুসলিম, শিখ, ইশাই সকল সদস্যদের নিয়েই চেট্টুর মন্দিরে গিয়ে আজাদ হিন্দের জন্য দান গ্রহণ করেছেন সমস্ত গোঁড়ামিকে সকলের সহমত ও সহনশীলতার মাধ্যমে। সুভাষচন্দ্র বুঝেছিলেন যে, একমাত্র জাতীয়তাবাদী মানসিকতাই পারে সাম্প্রদায়িকতার বিষ থেকে জাতিকে বাঁচাতে। ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৪০ সালে ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ সাপ্তাহিক পত্রিকায় সম্পাদকীয়তে তিনি লিখেছিলেন, ‘সাম্প্রদায়িক মানসিকতা চলে গেলে সাম্প্রদায়িকতা থাকতে পারে না।’

যদি সমগ্র দেশব্যাপী এক স্বাধীনতা সংগ্রাম আরম্ভ করা যায়, তখনই উবে যাবে সাম্প্রদায়িক মানসিকতা। ধর্ম নির্বিশেষে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন সমস্ত দেশবাসীকে বোঝাতে হবে, মানুষে মানুষে কোনো পার্থক্য নেই। আসল পার্থক্য ধনী আর দরিদ্র- এই দুই শ্রেণির মধ্যে। সুভাষচন্দ্র বুঝেছিলেন এবং বলেছিলেন যে, দেশের দরিদ্র, অভাব, অনটন, নিরক্ষরতা, বেকারত্ব এবং রোগব্যাধি দূর করতে গেলে দরকার এক স্বাধীন, ধর্ম নিরপেক্ষ জনদরদী সরকার। নেতাজির সহযোদ্ধা বিপ্লবী অনিল রায় তার ‘নেতাজির জীবনবাদ’ বইতে তুলে এনেছেন ভারতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সুভাষচন্দ্রের মেলবন্ধনের স্বরূপটিকে। সুভাষচন্দ্র শুধু ব্যক্তি নন, সঞ্চিত ঐতিহাসিক প্রয়োজনের যুগমূর্তি। নেতাজির কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে ভারতবর্ষের মর্মবাণী। এই গ্রহীষ্ণুতাই ভারতের সমাজ ধর্ম। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য। বিরোধের মধ্যে সমন্বয়, এই হলো চিরন্তন ভারতের স্বধর্ম। এই স্বধর্মের সঙ্গে সংগতি রেখে নেতাজি ডাক দিয়েছেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে বৃটিশ যখন দ্রুত দেশ ভাগের দেশভাগের মাধ্যমে ভারত ত্যাগের পরিকল্পনা করছিল, সেই যুদ্ধোত্তর পরিধির প্রেক্ষিতে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট অ্যাটলি বলেছিলেন যে, ‘আমরা আগ্নেয়গিরির চূড়ায় বসে আছি। আজাদ হিন্দ সেনানীদের লালকেল্লায় বিচার চাই এবং দেশজুড়ে গণ-অভ্যুত্থান ব্রিটিশকে বাধ্য করেছিলো ভারতবর্ষ ত্যাগ করে চলে যেতে। ‘তরুণের স্বপ্ন’ এর সেই দেশনায়ক পরাধীন দেশের যন্ত্রণা নিয়ে দেশ ছেড়েছিলেন প্রায় ৭৫ বছর আগে। নিজের জীবন বীণায় ঝংকার তুলে জাতিকে জাগাতে নিজের জীবনকে বিপন্ন করেছেন বারবার। জলন্ত দেশপ্রেম আর অদম্য সাহসের রূপকতাসম তার জীবনগাথায় জড়িয়ে আছে ভারতের পথচলার নির্দেশ, ভাবনা, পরিকল্পনা। শুধু যথার্থভাবে খুঁজে নেয়ার প্রতীক্ষা। আজকের সাইবার যুগে যুবসমাজের কাছে, স্যোশাল মিডিয়ার বদান্যতায় আইকন খুঁজতে, আইডল খুঁজতে, বাণিজ্যিক ভাবনার আড়ালে আশ্রয় নিতে হয়। অথচ চিরকালীন গর্বের যে ঐতিহ্য আমরা পেয়েছি, তিনি যা রেখে গেছেন তা হারিয়ে যায়- ‘ফুলের মালা আর ধূপের ধোঁয়ার আড়ালে’। নেতাজির স্বপ্ন আর সাধনায় খুঁজে পাওয়া যায় ভারতের মর্মবাণী, দেশপ্রেমের প্রকৃত অর্থ।

নেতাজি রাশিয়া থেকে ভারতে এসেছিলেন
নেতাজি অন্তর্ধান রহস্য উম্মোচনের দাবিতে, নেতাজি কেন ভারতবর্ষের মাটিতে প্রকট হতে পারলেন না, এই চেতনায় বাংলার ঘুমন্ত বিবেক জাগ্রত হয়ে উঠেছে। কবিগুরু জীবনপ্রান্তে জনজাগরণের এ চেতনা বিবেকের প্রতি সম্মান জানিয়েই বলেছিলেন, ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।’ অখণ্ড ভারতবর্ষের মুক্তি সাধনায় হাজার হাজার তরুণ-তরুণী দেশপ্রেমিক মানুষ নির্যাতিত হয়েছেন, প্রাণ দিয়েছেন। কিন্তু স্বাধীনদেশের সিংহভাগ পথঘাট, প্রকল্প, ইতিহাসের পৃষ্ঠা ভরে গেল এক বিশেষ পরিবার আর গুটিকয় নেতাদের স্তবগাথা ছবিতে। বাংলার দামাল ছেলে সুভাষচন্দ্রের কীর্তিকাহিনি অতি দীনভাবে পরিবেশন করা হলো, কোথাওবা রইলেন উপেক্ষিত। নেহেরু সুহৃদ বল্লভভাই প্যাটেল পরিকল্পনা মতো গোপন সার্কুলার জারি করে জানালেন, স্বাধীন ভারতের সেনাবাহিনীর কোনও ব্যারাকে, ক্যান্টিনে, প্রকাশ্যে কোথাও নেতাজির ছবি টাঙানো যাবে না। ‘লৌহ বিবেক’ এর অধিকারী মানুষটি আজাদ হিন্দ বাহিনীর কোনও তরুণ জোয়ান যাতে জাতীয় সেনাতে চাকরির সুযোগ না পায় সে ব্যবস্থাও করেছিলেন। স্বাধীন ভারতে নেতাজির প্রতি বিরোধীতার সেই শুরু। আজাদ হিন্দ ফান্ডের অর্থ-সম্পত্তি আত্মসাৎ, লোক দেখানো কমিটি কমিশন গড়া ইত্যাদি নেতাজি বিরোধীতার ধারাবাহিক সরকারি প্রচেষ্টা লিপিবদ্ধ করলে নব মহাভারত হয়ে যাবে।

নেহেরু আমলে জনমতের চাপে গঠিত শাহনাওয়াজ কমিটিও ইন্দিরা আমলের এক সদস্যের খোসলা কমিশন নির্দেশিত পথে হেঁটে রায় দেন, তাইহোকুর বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজীর মৃত্যু ও রেনকোজি মন্দিরে রক্ষিত চিতাভস্ম নেতাজীর। শাহনাওয়াজ কমিটির অন্যতম সদস্য ও নেতাজীর সেজোদা সুরেশচন্দ্র বসু আলাদা তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করেন এবং তথ্য প্রমাণসহ দেখান, বিমান দুর্ঘটনা নিছক গল্প ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেতাজির এই দাদার লেখা চিঠির উত্তরে জানিয়েছিলেন, ভারত সরকারের কাছে নেতাজির মৃত্যুর কোনও প্রমাণ নেই। তাইওয়ান সরকারের তদন্ত রিপোর্ট (যে দেশে বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছিল বলে বলা হয়ে থাকে) ভারত সরকারের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল পঞ্চাশের দশকেই এবং তা গোপন রাখা হয়েছিল। ওই রিপোটসহ ইন্দ-মার্কিন তদন্ত রিপোর্টগুলিতেও জানা গেছে, ব্রিটিশ-মার্কিন বাহিনীকে বোকা বানাতে নেতাজির পরিকল্পনা মতো বিমান দুর্ঘটনার গল্প প্রচার করা হয়। তাদের রিপোর্টে জানা যাচ্ছে, রেনকোজির ছাইভস্ম আদৌ কোনও মানুষের নাও হতে পারে। গত শতাব্দির শেষ ও বর্তমান শতাব্দির সূচনায় সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি মনোজকুমার মুখার্জীর নেতৃত্বে ভারত সরকার তৃতীয়বার নেতাজি অন্তর্ধান রহস্য উম্মোচনের জন্য তদন্ত কমিশন গঠন করতে বাধ্য হয়। শুরু থেকেই মুখার্জী কমিশনকে নানা অসহযোগিতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। মুখার্জী কমিশনকে ব্রিটিশ সরকার চিঠি দিয়ে জানায় যে, রোগ সংক্রান্ত গোপনীয় নথিপত্র যেগুলি ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশ করার কথা ছিল। সেই উপসিক্রেট ‘বোস পেপারস’ ২০২১ সালের আগে প্রকাশ করা যাবে না। ভারত সরকার নেতাজি সংক্রান্ত দুটি বিশেষ ফাইলের ওপর প্রভিলেজ দাবি করে জানায় যে, নেতাজির নথি প্রকাশিত হলে প্রতিবেশি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হবে এবং দেশের শান্তি বিঘ্নিত হতে পারে। এরই মধ্যে মুখার্জী কমিশনে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য, নথি এসে গিয়েছিল কমিশনের একজন ডিপোনেস্ট হিসেবে। সে সমস্ত তথ্য, সাক্ষ্য ও নথি দেখার সুযোগ ঘটেছিল। সোভিয়েত রাশিয়ায় নেতাজির মৃত্যু ঘটেছিল এমন একটি তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে কেউ কেউ মুখার্জী কমিশনে পিটিশন দিয়েছিল। সে দেশে কোনও কোনও সাক্ষিকে এ ব্যাপারে জেরা করার জন্য চেয়ারম্যান মুখার্জীকে আর্জি জানানো হয়েছিল।

মুখার্জী কমিশন রাশিয়ায় যায়। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, প্রকাশিত কোনও সাক্ষিই কমিশনে বলেননি যে, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুকে সোভিয়েত দেশে হত্যা করা হয়েছে বা এখানে তিনি বলেছিলেন এমন কথা তারা কোনও ভারতীয় অধ্যাপিকাকে বলেননি। সোভিয়েত রাশিয়ায় নেতাজির অবস্থান সম্পর্কে মুখার্জী কমিশন নতুন তথ্য ও সাক্ষ্য পান। মুখার্জী কমিশনের সমস্ত কাজ সাক্ষ্য গ্রহণ ইত্যাদি ভারতীয় গণমাধ্যমে যথাযথ প্রতিকল্পিত হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই যারা কমিশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না তারা পরবর্তীকালে নেতাজি রহস্য নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েন। মুখার্জী কমিশনের যে রিপোর্ট অসম্পূর্ণ আখ্যা দিয়ে কেন্দ্রিয় সরকার গ্রহণ করেনি তা নেতাজি গবেষকদের কাছে অনেকাংশে গ্রহণীয় হয়ে উঠেছে। তাই হোকু বিমান দুর্ঘটনার তথ্য-প্রমাণ দিয়ে কমিশন মিথ্যা বলে চিহ্নিত করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই দিনের পর দিন চিতাভস্ম নিয়ে লোকদেখানো আদিখ্যেতা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। কমিশনের রিপোর্টটি খুঁটিয়ে পড়লে জানা যায়, সোভিয়েত রাশিয়ায় নেতাজি হত্যার কাহিনি নিছক গল্প ছাড়া কিছুই নয়। স্ট্যালিন রাশিয়ায় নেতাজিকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছিলেন এবং আজাদ হিন্দ সরকারকে স্বীকৃতি দিয়ে সে দেশে আজাদ হিন্দ দূতাবাস গড়ে দিয়েছিলেন এমন সত্যই প্রকট হয়।

একটি সাক্ষ্যে জানা যায় যে, সুভাষচন্দ্রের ব্যবহারের জন্য একটি ছোট গাড়ি ও ছোট বিমানের ব্যবস্থা ছিল। কেন্দ্রিয় সরকারের চূড়ান্ত অসহযোগিতার জন্য মুখার্জী কমিশনকে কাজ গুটিয়ে নিতে হয়। মেয়াদ বৃদ্ধি করা নিয়েও নিয়মিত টালবাহানা চলত। ভিয়েতনাম যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন অনেকেই কিন্তু কমিশনকে সেই সুযোগ আর দেয়া হয়নি।

চলবে...

লেখক: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ওপর ডক্টরেট, নেতাজি সম্পর্কিত অসংখ্য গবেষণাগ্রন্থের প্রণেতা ও সম্পাদক, আলিপুর বার্তা, কলকাতা