কণ্ঠশিল্পী নোবেল

কণ্ঠশিল্পী নোবেল

নোবেলকে নিয়ে নোংরামি বন্ধ হোক

শামীমা জামান

প্রকাশিত : আগস্ট ২১, ২০১৯

খুব অসুস্থ একটা চর্চা শুরু হয়েছে। সমালোচনার নামে মানুষের পিছে লাগা, মলমূত্র ঘেটে বের করা (এক্ষেত্রে কেউ নিজের পিছে লেগে থাকা মলের চিন্তা করে না), মল না থাকলে এডিটগুলের ভুসি দিয়ে মল বের করা। সেই এডিট মল দেখে মজা নেয়া। এই মজা নেয়া যে শুধু তরুণ প্রজন্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। নোবেলের মায়ের বয়সী ভদ্রমহিলারা ফোন করে জানতে চাইলেন, ‘এই এই নোবেলের ল্যাংটা ছবিটা কি সত্যি?’

‘ও নাকি নেশা কইরা রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকতো?’
‘আল্লাহ, চেহারাটা এত ইনোসেন্ট, এমন বাজে চরিত্র তা তো বোঝা যায় না।’

নাহ! এই আলাপ চালাতে কিম্বা অনলাইনে সন্তানের বয়সী নোবেলের ত্যানা পেঁচিয়ে শুয়ে থাকা ন্যুড ছবি দেখতে আপনাদের মতো মোটেই আগ্রহবোধ করছি না। রীতিমত অসুস্থ একটি চর্চা। ছবিটা এডিট না সত্যি, সে আলাপ পরে। এডিট হোক আর সত্যি ছবি হোক, বিষয়টা যে শত্রুতাবশত উঠে এসেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এবং এর জন্য নোবেলের ক্রেজী ফ্যানরা অনেকখানি দায়ী। নোবেলের ফ্যানরা ভয়ংকর কুৎসিত সব গালির জন্য এপার-ওপার দুই বাংলাতেই এরই মধ্যে খ্যাতি অর্জন করে নিয়েছে। এরা যে কী পরিমান ক্রেজি, আমার কিছুটা অভিজ্ঞতা হয়েছে।

নোবেলের কিছু মরণ হৃদয় ভক্ত আমার সাথে বোঝাপড়া করতে এসেছিল। কিছুদিন আগে আমি নোবেলকে নিয়ে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেই। তাতে করে তারা ধরে নিয়েছে, আমি নোবেলের পিছনে লেগেছি। কারণ কাকতালীয়ভাবে আমার স্ট্যাটাসটি দেয়ার পরই জাতীয় সংগীত নিয়ে নোবেলের বালখিল্য কথাবাত্রাগুলো ভাইরাল হয়। জাতীয় সংগীত নিয়ে নোবেলের কথাগুলো শুনলেই বোঝা যায়, ও কতটা অপরিপক্ক ছেলে। বাংলাদেশে শিক্ষিতদের মধ্যে দুই ধরনের মানুষ আছে। একদল রবীন্দ্রনাথকে হৃদয়ে ধারণ করে পূজা করে। আরেক দল রবীন্দ্রনাথকে শত্রু জ্ঞাপন করে ঘৃণা করে।

নোবেল এই দুই দলের কোনোটাতেই নেই। রবীন্দ্রনাথকে সে কতটুকু জানে, সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কারণ রবীন্দ্রনাথকে পড়লে সে রবীন্দ্রনাথের সাথে প্রিন্স মাহমুদের তুলনা করে প্রিন্স মাহমুদকে বিব্রত অবস্থায় ফেলতো না। যে গানটির প্রশংসা করতে যেয়ে নোবেল জাতীয় সংগীতকে ছোট করেছে, সে গানটির (তুমি মিশ্রিত লগ্ন মাধুরী) মাঝেই প্রিন্স মাহমুদ শ্রদ্ধাভরে জাতীয় সংগীতকে তুলে ধরেছেন। এই জাতীয় সংগীত অবমাননা নিয়ে কম জল ঘোলা হয়নি।

নোবেলের বয়স অল্প। কোনো কিছু বুঝে বলেনি এমনটি বলা যাচ্ছে না। কারন এভাবে বললে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে সে আশংকা নোবেল নিজেই করেছিল। আর যারা বলছে, নোবেল তার ভাল লাগা জানিয়েছে জাতীয় সংগীতকে খাটো করতে বলেনি, একথাটিও ঠিক নয়। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ গানটিকে জাতীয় সংগীত করার দাবিতে মিছিল হয়েছে এরকম একটি মিথ্যা তথ্য নোবেল জুড়ে দিয়েছে তার বক্তব্যে, যা কিনা চেতনার দাঙ্গা বাঁধাবার জন্য যথেষ্ট ছিল। যা গত কিছুদিন ধরে টক অব দ্য কান্ট্রি বললে ভুল হবে, ইন্ডিয়াতেও এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে।

নিউ ইয়র্কে সংগীতজ্ঞ ও এক্টিভিস্ট আলামিন বাবুর আহ্বানে জাতীয় সংগীত অবমাননার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। যেখানে উপস্থিত থাকার জন্য বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও যেতে পারিনি। আমার কাছে পুরো বিষয়টিকেই প্রচণ্ড ছেলেমানুষী মনে হয়েছে। একজন কভার প্রজন্মের শ্রেষ্ঠ কভার গায়ক প্রকৃত গায়ক হবার মনোবাসনা থেকে যদি প্রিন্স মাহমুদের মতো অসাধারণ একজন সুরকারের অতি প্রশংসা করে থাকে, তাতে করে তার দিক থেকে খুব দোষের কিছু ছিল না যদি না জাতীয় সংগীতকে পাল্টে ফেলতে মিছিল হয়েছে এমন সব উস্কানো কথা না বলতো।

সে তার নিজস্ব মতামত দিয়েছে। এমন মতামত তো চায়ের দোকানে ঝড় তুলে কতজনই দেয়। দিতে পারে। বস্তুত জাতীয় সংগীত অবমাননা নিয়ে এমন কোনো বিষয় কোথাও সুস্পষ্ট উল্লেখ নেই। বিষয়টি চেতনার। জাতীয় সংগীতের সুরের সাথে সিনেমা হলেও দাঁড়িয়ে সম্মান দিয়ে বড় হওয়া প্রজন্ম এমন ফালতু আলাপ মেনে নেবে না সদ্য জনপ্রিয় হওয়া কোনো তারকার মুখ থেকে। শিল্পীর সামাজিক দায়বদ্ধতা শব্দটাকে মনে রেখেই একজন শিল্পীকে কথাবার্তা বুঝে শুনে বলতে হয়। এখন কথা হচ্ছে, নোবেল যতটা না শিল্পী হতে পেরেছে তার চেয়ে অনেক বেশি তারকা বনে গেছে।

ওভাররেইটেড শব্দটা তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আবার যত বড় তারকা সে হয়ে উঠেছে তার থেকেও বড় হয়তো সে নিজেকে মনে করছে। সারেগামাপার মঞ্চে একের পর এক দেশীয় সিনিয়র শিল্পীদের অসম্মানের সাথে উচ্চারণ দেখে অন্তত তাই মনে হয়েছে। একের পর এক প্রিন্স মাহমুদের গান গেয়ে তুমুল হাততালি বিচারকদের প্রশংসা পাচ্ছে অথচ তার নামটি নিতে ভীষণ কার্পণ্য। এ নিয়ে প্রিন্স মাহমুদ দুঃখ করেছিলেন আমার কাছে। খালিদের নাম নোবেল কিভাবে তাচ্ছিল্যের সাথে উচ্চারণ করেছিল, সেই প্রসঙ্গে আমি প্রিন্স মাহমুদকে বলি। আরো কয়েক মাস আগেই সেই ভিডিও অনেকেই আমাকে ইনবক্সে পাঠিয়েছিল প্রতিবাদ জানানোর অনুরোধ করে। আমি লিখিনি।

গোপালগঞ্জের একটি ছেলে ওরকম একটি প্লাটফর্মে ভালো গান করছে, সেটা দারুণ ব্যাপার ছিল। না দিক সম্মান গোপালগঞ্জের তার সিনিয়র ভাইকে। কিন্তু দেখে সত্যিই খারাপ লেগেছিল। প্রিন্স মাহমুদই আমাকে বলেছিলেন, ‘না ভাবি, এসব আর মেনে নেয়া ঠিক হবে না।’ মূলত এরপরই আমি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেই ভিডিও ক্লিপটিসহ। যেখানে দুঃখ করে আমি লিখি, ‘দেখুন লেজেন্ড নোবেল কিভাবে ভারতীয়দের কাছে উঠতি শিল্পী খালিদকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। আমাদের একটা আর্টিস্ট আছে খালিদ, ওর একটা গান আছে নাতি খাতি বেলা গেল ব্লা ব্লা...ব্লা...

আর এরপরই নোবেলের পাগলিনী ভক্তেরা আদার বক্সে পুশ করতে লাগলো। এইসব ভক্তদের নিয়ে কবি মারজুক রাসেলের স্ট্যাটাসটি ছিল সেরা। যদিও অশ্লীলতার কারণে এখানে সেটা উল্লেখ করছি না। তবে সারকথাটি এই, যারা ৯০ দশকের গান শোনেনি তাদের কাছে নোবেল অমৃতসম হওয়াটাই স্বাভাবিক। ৯০ দশকের পাগল করা সেই সব গান শুনে নোবেলের শান্তনু স্যার, শ্রীকান্ত আচার্য স্যারদেরই মাথা নষ্ট অবস্থা, আর এই অস্থির প্রজন্ম তো কোন ছাড়! তারা এখন পারলে নোবেলকে পুজোই দেয়। জেমস, হাসান, খালিদ এরা কারা?

তবে নোবেলকে নিয়ে মেয়েদের দিয়ে যে সব অভিযোগ করানো হচ্ছে, এসবের নিন্দা জানাই। অল্প বয়সে দুজন ছেলেমেয়ে একই সাথে প্রেমে পড়ে, একই সাথে সময় কাটিয়ে ছেলেটিকে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত করা, এই নয়া ট্রেন্ড বন্ধ হোক। বিয়ের প্রলোভন দেখানোর কী আছে! প্রেমে পড়লে বিয়ের স্বপ্ন সকলেই দেখে। সেই স্বপ্ন কেউ দেখাতেই পারে। সেই স্বপ্নে বিভোর হয়ে সাত আটবার শারীরিক আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার জন্য ছেলেটি একা দায়ী নয়। মেয়েটিও সমান দায়ী। তাই অভিযোগ অত্যন্ত হাস্যকর। আর যারা নোবেলের চরিত্র নিয়ে ট্রল করছে তারা কোন সাধু সন্ন্যাসী বলেন তো?

নোবেলের কপিক্যাট পাওয়ারফুল গলার প্রশংসা যেমন আপনি করতে পারেন, তার অহংকারী কথাবার্তার গঠনমূলক সমালোচনাও করতে পারেন। কিন্তু এই নোংরামি কেন?

অনেককেই বলতে শুনছি, নোবেলের অগ্রযাত্রা সবার হিংসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এত কথা। যারা এক জীবনে এত এত হিট মৌলিক গান, কালজয়ী গান গেয়ে ফেলেছেন তারা কেন নোবেলকে হিংসে করবে! নোবেলের ভক্তদের কী আজব মানসিকতা! এই ভক্তদের অতিরঞ্জিত আহ্লাদে তারকার অহং হয়। আর কেনা জানে, অহংয়ে পতন হয়। নোবেলকে বলবো, তাকে কথার্তা ও আচরণে সংযত হতে হবে, নিজের বুদ্ধির জোরে হোক আর ভাগ্যের জোরে হোক বটবৃক্ষের হাত তার মাথায় পড়ে গেছে। একটা কথা না বলে পারছি না। এইসব বাৎচিতের পর সেদিন বিকেলে, বাংলাদেশে তখন ভোর চারটা, প্রিন্স মাহমুদের ফোন।

বললাম, ‘কিরে ভাই ঘুমান না ক্যারে?’
অপরপ্রান্ত থেকে গম্ভীর কণ্ঠ, ‘এখনই ঘুমাবো ভাবি, একটা কথা বলে নেই, নোবেলকে নিয়ে আর কিছু বইলেন না, বাচ্চাছেলে।’
আমি তো থ।

 

লেখক: কবি, কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট

ধারাবাহিক