পিট সীগার: ঘৃণা আর ধ্বংস পরাস্তকারী লোকনায়ক

ওমর তারেক চৌধুরী

প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৯

আমেরিকার বিশ্বখ্যাত লোক ও গণসঙ্গীত শিল্পী পিট সীগারের ৮০ বছরব্যাপী শিল্পী-জীবনের দৈহিক অবসান ঘটেছিল পাঁচ বছর আগে, ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি। বেঁচে থাকলে এ বছরের ৯ মে তিনি শততম জন্মবার্ষিকী পূর্ণ করতেন। শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রামসহ ন্যায়সঙ্গত সকল প্রতিবাদ আন্দোলনের সাঙ্গীতিক ভাষ্যকার হিসেবে শততম জন্মবার্ষিকীতে পিট সীগার স্মরণীয় হয়ে উঠছেন তার রাজনৈতিক চেতনাপুষ্ট শিল্পী ও সংগঠক জীবনের অবিচল ও আপসহীন বহুমুখী কর্মতৎপরতার কারণে। লোকসঙ্গীত ও প্রতিবাদের গানের চর্চা ও প্রয়োগে সঙ্গীতবিশারদ, ব্যাখ্যাতা ও তাত্ত্বিক, গানের সংগ্রাহক ও রচনাকারী, গায়ক, অনুপ্রেরণাকারী এবং সংগঠক হিসাবে তার অবদান পিট সীগারকে লোক ও গণসঙ্গীতের ইতিহাসে গণমানুষের নায়ক হিসাবে চিরজীবী করে রাখবে, জন্মশতবর্ষে এটা অবাক হবার মতো কোনো কথা নয়। কারণ বলা চলে, জীবিতাবস্থাতেই পিট সীগার আমেরিকার সীমানা পেরিয়ে দুনিয়ার বহু দেশেই অনুকরণীয় কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিলেন তার নিরলস সংগ্রামী অবদান ও আট দশক ধরে গড়ে তোলা এখনো জীবন্ত কয়েকটি উত্তরসূরী প্রজন্মর সোচ্চার উপস্থিতির জন্য। স্বাভাবিকভাবে, এই মুহূর্তে তাকে নিয়ে আমেরিকাসহ নানা দেশে, এমনকি পশ্চিম বাংলাতেও শ্রদ্ধাঞ্জলি, মূল্যায়ন, স্মৃতিচারণসহ নানা আয়োজনের ঢল নেমেছে। সেই শ্রদ্ধাঞ্জলির অংশ হিসাবে পিট সীগারের কর্মময় জীবনকে সংক্ষেপে স্মরণ করার এই নিরস প্রয়াস। শব্দ-বাদ্যযন্ত্র-বাগ্মিতা-নাটকীয়তা-চিন্তার স্বচ্ছতা-জীবন ও প্রকৃতির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি এবং ইতিহাসবোধে সমৃদ্ধ বহুমাত্রিক শিল্পী পিট সীগারকে শুধু কিছু বিবরণে (যেখানে তিনি নিজেই একজন অত্যন্ত সুলেখক) বর্ণনা করা সত্যিকার অর্থেই একটি খঞ্জ প্রয়াস।

আইনি প্রয়োজনে নিজের পরিচিতি তুলে ধরতে পারিবারিক ইতিহাস সম্পর্কে নিজের জানামতে নানা ধরনের মুক্ত চিন্তাভাবনাসহ বিচিত্র ভাবধারা, উন্নতমানের নৈতিক আদর্শ, তৎপরতা ও পেশার সাথে যুক্ত তিনশো বছরের প্রাচীন পূর্বপুরষদের একটি মনোজ্ঞ বর্ণনা পিট সীগার ৩৮ বছর বয়সে তার আইনজীবীকে লিখে দিয়েছিলেন ১৯৫৭ সালে। এই পূর্বপুরুষদের উঁচু শ্রেণির মানুষ ভেবে আর নিজেকে শ্রমজীবী শ্রেণির একজন হিসাবে বিবেচনা করে তরুণ বয়সে তিনি তাদেরকে উপেক্ষা করলেও, এই বিবরণ লেখার সময় তিনি তাদের বিষয়ে একটি বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন করে তার নিজের মানসিক গঠনের পেছনে তাদের রেখে যাওয়া ছাপের প্রশংসা করেছেন। পিট সীগারের পূর্বপুরুষদের জাতিগত পরিচয় ও তার সংমিশ্রণের বৈচিত্র্যটিও কম চিত্তাকর্ষক নয়। তার মায়ের রক্তে ছিল ফরাসি-আইরিশ-দিনেমার রক্তের ধারা; বাবার মধ্যে মিশে ছিল জার্মান ও ম্যাসাচুসেটসে অভিবাসী হয়ে আসা ইংরেজ বংশধারা। একজন পূর্ণাঙ্গ শিল্পী ও অসাধারণ যোগাযোগ-দক্ষ শিক্ষক হিসাবে পিট সীগার ছিলেন নাট্যভিনেতার মতো তুখোড় গল্পবলিয়ে— কথা, অভিব্যক্তি আর গানে তিনি নাড়া দিতেন তার শ্রোতাদের চেতনাকে। সম্ভবত এই পারিবারিক প্রেক্ষাপট ও চারপাশে দেখা আমেরিকার অনন্য বৈশিষ্ট্যের সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি লিখেছিলেন তার বিখ্যাত গান অল মিক্সড আপ (সবকিছু মিশে গেছে— আমাদের ভাষা, খাদ্য-পানীয়, চেহারা ও গড়ন, সবকিছু গড়ে উঠেছে নান বিপরীত বৈচিত্র্যময় ভিন্ন জিনিসের আদানপ্রদান, সহাবস্থান ও সংমিশ্রণের ফলে— আমরা সবাই অচেনা এবং চাচাতো-খালাতো ভাইবোন)। ভিন্নতা ও বিপরীতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, সংবেদী হবার মৌলিক গুণটি পিট সীগার হয়তো আয়ত্ব করেছিলেন তার পারিবারিক প্রেক্ষাপট থেকে।

প্রগতিশীল চিন্তাভাবনা ও সঙ্গীতের সাথে উল্লেখযোগ্য সুখ্যাতিসম্পন্ন পরিবারে পিট সীগার ১৯১৯ সালে নিউ ইয়র্কে জন্ম নিয়েছিলেন। এই পারিবারিক প্রেক্ষাপট তার প্রথম জীবনের পথ চলাকে পরিচালিত করেছিল। তার মা কনস্ট্যান্স ক্লাইভার ছিলেন কৃতি শিল্পী। প্যারিস কনজার্ভেট্রি মিউজিকে তালিম নিয়ে কনসার্টে বেহালা বাজাতেন তিনি। মার আশা ছিল, তিন পুত্রের কেউ একজন বেহালা বাজাতে শিখবে। কিন্তু সেটা আর হয়নি। চার-পাঁচ বছর বয়সে নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্র ও সেগুলোর তীব্র শব্দ তৈরি করা দিয়ে বেড়ে ওঠা শুরু হয় পিট সীগারের। আট বছর বয়সে তাকে ধরিয়ে দেয়া হয় ইউকেলেলে নামের তারের বাদ্যযন্ত্র। তার বাবা চার্লস সীগার ছিলেন হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা একজন সঙ্গীতবিদ ও কম্পোজার; যিনি পরে ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলি বিশ্ববিদ্যালয়ে সঙ্গীত বিভাগ চালু করেন। আমেরিকাতে সঙ্গীতবিদ্যার শাখা হিসাবে নৃজাতিভিত্তিক সঙ্গীতবিদ্যার (এথনোমিউজোকোলজি) গোড়াপত্তনকারীদের অন্যতম ছিলেন চার্লস সীগার। বার্কলিতে সঙ্গীত বিভাগ চালু করার ছয় বছরের মাথায়, ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়, শান্তিবাদী হিসাবে তার সরব অবস্থান ও কিছু দিন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হবার কারণে তিনি চাকরিচ্যুত হন। সঙ্গীত বিশারদ হিসাবে তাঁর খ্যাতি ছিল আন্তর্জাতিকভাবে। কমিউনিস্ট হবার কারণে ৩৪ বছর পর আবারও তাকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছিল ১৯৫২ সালে, স্নায়ুযুদ্ধ শুরুর দিকে। এফবিআই এসে তার অতীত কর্মকাণ্ড ও তার সাথে জড়িতদের নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলে চার্লস সীগার বলেন, “আলঙ্কারিকভাবে বললে, আমি উদোম হয়ে সবকিছু দেখাতে পারি, কিন্তু অন্যদের সম্পর্কে আমি একটি কথাও বলব না।”

শৈশবেই মা তাকে সঙ্গীতের দিকে আকৃষ্ট করলেও পিট সীগারের বয়স যখন সাত বছর, তখন তার বাবা-মার বিবাহ বিচ্ছেদের ফলে বড় দুই ভাইসহ পিট বাবার কাছে বড় হওয়া শুরু করেন। যদিও পারিবারিক পরিবেশের বাইরেই তিনি প্রধানত বড় হয়ে ওঠেন। লেখাপড়ার শুরু হয় আবাসিক স্কুলে থেকে। স্কুলে পড়ার সময় পিট সীগারের হাতে খড়ি হয় ‘সাংবাদিকতায়’। স্কুলের প্রাতিষ্ঠানিক বিরক্তিকর ও বিলম্বে প্রকাশিত পত্রিকাটির বিপরীতে পিট নিয়মিতভাবে প্রতি সপ্তাহে নিজের লেখা ও সম্পাদিত পত্রিকা প্রকাশ করে দশ পয়সায় সেটি বিক্রি করতেন। কিছু দিন পর উৎসাহ হারিয়ে ফেললে স্কুলের পৃষ্ঠপোষক ধনাঢ্য ভদ্রমহিলার আগ্রহ ও শিক্ষকদের চাপে তাকে পত্রিকাটির প্রকাশ অব্যাহত রাখতে হয় ছয় বছর ধরে। অসাধারণ চিত্তাকর্ষক বাগ্মিতার গুণের পাশাপাশি পিট সীগারের লেখার মধ্যে গভীর চিন্তাভাবনার যে সাবলীল ও ব্যঞ্জনাময় প্রকাশ দেখা যায় সম্ভবত তার ভিত রচিত হয়েছে স্কুলে পত্রিকা চালাবার এই অভিজ্ঞতা ও নানাবিধ বিষয় নিয়ে তার গভীর অধ্যায়ন থেকে। সাংবাদিকতা করার ঝোঁক তার পরে আবার এলেও সেটাতে তিনি সফল হতে পারেননি। তার জীবনের মোড় চিরদিনের জন্য ঘুরে যায় সঙ্গীত ও রাজনৈতিক তৎপরতার দিকে।

বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী, তার সাবেক ছাত্রী রুথ ক্রোফোর্ডও ছিলেন বিখ্যাত সঙ্গীতবিদ। সৎমায়ের তরফের তার তিন বোন ও এক ভাইও পরবর্তীকালে বিখ্যাত লোকসঙ্গীত শিল্পী হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। পিট সীগারের চাচা অ্যালেন সীগার ছিলেন নামকরা কবি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যাওয়া ভাইয়ের প্রতি কমিউনিস্ট-শান্তিবাদী চার্লসের ছিল ভীষণ বিরাগ। যুদ্ধে যোগ দেবার কারণে তিনি ছোটো ভাইয়ের মুখ আর দেখতে চাননি; যুদ্ধে ভাইয়ের মৃত্যুর ফলে বাস্তবে সেটা তাকে করতেও হয়নি। কবি অ্যালেন সীগার ছিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিহত দ্বিতীয় মার্কিন সৈনিক। অ্যালেনের বিখ্যাত একটি কবিতার, আই হ্যাভ অ্যা রান্দিভ্যুঁ উইথ ডেথ, কথা চিন্তায় খেলে গেলে ১৯৬৯ সালে পিট সীগার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কালিমালিপ্ত ইতিহাস ও কর্মকাণ্ডের আলোকে দেশের পতাকার সমালোচনায় রচনা করেছিলেন তার বিখ্যাত গান দ্য টোর্ন ফ্ল্যাগ বা ছিন্ন পতাকা (নিজের দেয়া সুর নিয়ে সন্তুষ্ট হতে না পেরে তিনি সেটি আবৃত্তি করে শোনাতেন)। হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় পিট সীগার কমিউনিস্ট ইয়ুথ লীগে যোগ দেন; ইয়ুথ লীগের কর্মী হিসাবে তারা ইউরোপ ও এশিয়াতে হিটলার-মুসোলিনির ফ্যাসিবাদের হামলার বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকতেন র‌্যালিতে। তাদের তৈরি শিল্পীগোষ্ঠী পুতুল নাচের দল গড়ে কাজে নামেন শ্রমিকদের সচেতন করতে; গান বাঁধেন নিউ ইয়র্কের ২০,০০০ দুধ খামারিদের দুধের ন্যায্যমূল্য নিয়ে ধর্মঘটের সমর্থনে।

মহামন্দার কারণে আর্থিক অনটন সত্ত্বেও ভালো লেখাপড়ার জন্য হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখান তার বাবা, চাচা ও দুই ভাইও পড়েছেন; ভর্তি করে দেয়া হয় পিট সীগারকে। তিনি পড়তে চেয়েছিলেন সাংবাদিকতা। কিন্তু হার্ভাডে তখন সাংবাদিকতা পড়ানো হতো না বলে তাকে ভর্তি হতে হয় সমাজতত্ত্ব পড়তে। এখানে তার সহপাঠী ছিলেন আমেরিকার প্রখ্যাত মার্কসবাদী অর্থনীতিবিদ পল সুইজি ও পরবর্তীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি। সমাজতত্ত্ব পড়তে ভালো না লাগায় তিনি হঠাৎ করেই মাঝপথে হার্ভাড ছেড়ে চলে আসেন। হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের ’৪০ সালের ব্যাচের সবথেকে বিখ্যাত স্নাতক যদি জন এফ কেনেডি হয়ে থাকেন, তবে সেই ব্যাচেরই সব থেকে সুপরিচিত ঝরে পড়া ছাত্র হিসাবে বিবেচিত হবেন পিট সীগার।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার সময় ভেবেছিলেন, ছয় বছরের পুরানো ‘সাংবাদিকতা’ করার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সাংবাদিক হবেন। সাংবাদিক হিসাবে কাজ খুঁজতে যখন ব্যর্থ হয়ে উঠছেন তখন লাইব্রেরি অফ কংগ্রেসের আমেরিকার লোকসঙ্গীত আর্কাইভের সঙ্গীতবিদ অ্যালেন লোমাক্স পিট সীগারকে তার সাথে গান নিয়ে কাজ করতে রাজি করিয়ে ফেলেন। অ্যালেন লোমাক্সের সাথে কাজ করার সময় নানা ধরনের গানের অনুলিপি তৈরি করার সুবাদে পিট সীগার আমেরিকার গানের ভাণ্ডার সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে থাকেন। গানের সাথে সেই পরিচিতি পরবর্তী সময়ে তার সঙ্গীত জীবনের চলার দিশা হয়ে উঠেছিল। অ্যালেন লোমাক্সের সাথে কাজ করার আগেই পিট চার ও পরে পাঁচ তারের ব্যাঞ্জো বাজানো শিখে ফেলেছিলেন; যা ছিল তার মূল বাদ্যযন্ত্র। ১৯৪০ সালে অ্যালেন নিউ ইয়র্কের ফরেস্ট থিয়েটারে ক্যালিফোর্নিয়ার অভিবাসী কৃষিশ্রমিকদের সাহায্যার্থে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পিট সীগারকে গান গাইবার সুযোগ করে দেন। যথেষ্ট বিড়ম্বনার সাথে সেটাই ছিল জনসমক্ষে তার প্রথম গান গাওয়া। এই ঘটনা আরো একটি বড় মোড় নিয়ে আসে পিট সীগারের শিল্পী জীবনে। এখানে তার প্রথম দেখা হয় ইতিমধ্যেই সুপরিচিত গিটারবাদক, সঙ্গীত রচয়িতা ও গায়ক, আমেরিকার লোকসঙ্গীতের দিকপাল উডি গার্থির সাথে। পরে এক পার্টিতে উডির সাথে পিট সীগারকে পরিচয় করিয়ে দেন অ্যালেন; সে সময় থেকে তৈরি হওয়া তাদের বন্ধুত্ব বজায় ছিল ১৯৬৭ সালে উডির জীবিতাবস্থা পর্যন্ত। নিম্নবর্গের মানুষের প্রতি সংবেদনশীল, প্রবলভাবে শ্রেণি সচেতন, উড়নচণ্ডি ভবঘুরে উডি তাকে টেনে নিয়ে যান আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে। তার কাছেই পিট শিখে ফেলেন মালগাড়িতে চড়ে ঘোরা আর পানশালায় গান গেয়ে পেট চালিয়ে নেবার কায়দা। উডির সাথে ঘোরার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয় পিটের। উডি গার্থির সাথে দেশময় ঘোরার সময় উডি তাকে সামাজিক সমস্যা ও অবস্থা সম্পর্কে জানতে, কাহিনি সংগ্রহ করতে এবং মানুষের সাথে কথা বলতে উৎসাহিত করেন। শ্রমিকদের উপর চালানো শোষণ আর বর্ণগত বিভাজন, ব্যক্তিগত সম্পত্তি কিভাবে গুটিকয় মানুষের হাতে সম্পদ জড়ো করছে আর বিপরীতে শ্রমিকদের অর্থনৈতিক অবস্থার অবক্ষয় ঘটাচ্ছে সেসব ঘটনা ঘুরে বেড়াবার মধ্য দিয়ে তারা দুজনে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। এমনই তিক্ত অভিজ্ঞতা ফুটে উঠেছে পিট সীগারের কণ্ঠে লেস রাইসের লেখা ব্যাংকস অফ মার্বল বা শ্বেতপাথরে গড়া ব্যাংক নামের গানটিতে:

আমি ঘুরেছি এদেশের
কিরণোজ্জ্বল ঝলমলে সৈকত থেকে সৈকতে
আর দেখার পথে ভেবেছি
কী অবস্থা নেমে আসছে চারদিকে
আমি দেখেছি ক্লান্ত কৃষককে
মাটি চষে যেতে
আর নিলামের হাতুড়ি তার বদলে
কিভাবে তার ঘরদুয়ার বিক্রি করে চলেছে।

কিন্তু শ্বেতপাথরে গড়া ব্যাংকগুলোয়
যার সব দুয়ারে রয়েছে সজাগ প্রহরী
আর টাকা উপচানো তার সিন্দুকগুলো ভরতে
কৃষক ঝরাচ্ছে মাথার ঘাম।

পশ্চিম উপকূলে ঘোরা শেষে নিউ ইয়র্কে ফিরে আসেন পিট সীগার। সেখানে শুরু হয় তার জীবনের আরেক পর্ব; সংগঠক ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর পাশে দাঁড়ানো সক্রিয় শিল্পীর এক সাঙ্গীতিক অভিযাত্রা। শ্রমিকদের গান সংগ্রহ করার সূত্রে নিউ ইয়র্কে পিটের পরিচয় হয় লী হেইস নামের গম্ভীর কণ্ঠের এক গায়কের সাথে। লী’র কাছে তিনি শোনেন তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কথা; লী ছিলেন এক র‌্যাডিক্যাল শ্রমিক কলেজের পাচক ও গানের দলের নেতা। লী’ই প্রস্তাব করেন একসাথে কাজ করার আর সেই প্রস্তাবের ভিত্তিতে পিট ও লী আরো দুই বন্ধুকে নিয়ে গড়ে তোলেন তাদের গানের দল আলম্যানাক সিঙ্গার্স। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দলে আরো বন্ধুরা এসে যোগ দিতেন, কেউ চলে যেতেন। গঠনের পাঁচ মাস পরে দলটির আদি চার সদস্য হাজির হন ২০ হাজার সদস্যর মটর শ্রমিক ইউনিয়নের ধর্মঘটী একদল শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সামনে গান গাইতে। এই প্রথম কনসার্টে চার সদস্যর আলম্যানাক সিঙ্গার্স ধর্মঘটী শ্রমিকদের এমন সব গান শোনান (যার মধ্যে ছিল পিট সীগারের নিজের লেখা প্রথম গান টকিং ইউনিয়ন) যা তারা আগে কখনও শোনেননি। আলম্যানাক সিঙ্গার্স তৈরির আগেই পিট আর লী শান্তি ও ভ্রাতৃত্বময় পৃথিবীর প্রত্যাশায় যৌথভাবে রচনা করেছিলেন তাদের বিখ্যাত গান, ইফ আই হ্যাড আ হ্যামার (হাতুড়ির গান নামে অনুবাদ করেছেন শিল্পী অনুপ মুখোপাধ্যায়)। পল রোবসনের পিকস্কীল কনসার্টেও পিট ও লী গানটি গেয়ে শুনিয়েছিলে শ্রোতাদের। উডি-পিট-লী প্রমুখেরা এই পর্বে নিজেদের নিয়োজিত করেন শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর জন্য গান গাইবার কাজে। প্রথম কনসার্টের পর ইউনিয়ন নেতারা মুগ্ধ হয়ে তাদের আমন্ত্রণ জানান সারা দেশে ঘুরে ঘুরে ইউনিয়নের জন্য গান শুনিয়ে সাংগঠনিক কাজে সহায়তা করতে। সে পর্বে অনেক গানের মধ্যে উডির ইউনিয়ন মেইড (ইউনিয়নের নারী সদস্যদের অনুরোধে রচিত) আর পিটের হুইচ সাইড আর ইউ অন? এর মতো গানের আবেদন আজো ফুরিয়ে যায়নি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধর সময় সেনাবাহিনীতে যোগ দেবার ডাকে উডি ও পিট সীগারকে কয়েক বছরের জন্য নিউ ইয়র্ক ছেড়ে যেতে হলে গানের দলটির অবসান ঘটে। বিমানের মেকানিকের প্রশিক্ষণ নিয়ে পিট চলে যান সাইপ্যান দ্বীপে। কিন্তু সেখানে তিনি মেকানিকের কাজ না করে বরং সৈনিকদের বিনোদনের জন্য গান গাওয়ার দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে আবার মনোযোগ দেন রাজনীতি ও সঙ্গীত সম্পর্কিত তৎপরতায়। পৃথিবীকে শ্রেয়তর করে গড়ে তুলতে নতুন ধরনের গান রচনা ও গাওয়াকে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে বন্ধুদের নিয়ে গড়ে তোলেন গানের নতুন সংগঠন পিপল’স সং। পিপল’স সং এক সময় নিষ্ক্রিয় হয়ে গেলে আবার লী হেইসসহ নতুন দুই শিল্পীকে নিয়ে গড়ে তোলেন জনপ্রিয় গানের দল উইভারস, যা অচিরেই প্রচুর জনপ্রিয়তা অর্জন করে জাতীয়ভাবে। তাদের গানের রেকর্ড বের হয়, কয়েকটি গান জনপ্রিয়তার তালিকার শীর্ষে থাকে দীর্ঘ সময় ধরে।
 
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৫০ য়ের দশকে কমিউনিস্টবিরোধী লালভীতি শুরু হলে পিট সীগারের বামপন্থী অতীত সরকারি আক্রমণের লক্ষ্যে পরিণত হয়। দলের বাকি তিন সদস্যরও পিট সীগারের মতোই কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সংশ্রবের ইতিহাস ছিল; যে কারণে উইভারস তাদের গানের অনুষ্ঠানগুলো হারাতে থাকে, রেকর্ড কোম্পানির সাথে চুক্তি বাতিল হয়ে যায়। ফলে এক পর্যায়ে উইভারস ভেঙে যায়। পিটের অতীত নিয়ে তদন্ত করার জন্য তাকে হাউস কমিটি অন আন-আমেরিকান অ্যাটিভিটিজে জবানবন্দি দিতে ডেকে পাঠানো হয়। মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর আওতায় পিট সীগার বাক স্বাধীনতার যুক্তিতে জবানবন্দি দিতে অস্বীকার করলে কংগ্রেসের সাথে সহযোগিতা না করার অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে ফেডারেল আদালতে সাজা পান তিনি, যদিও আপিলে সে সাজা থেকে অবশেষে নিজে মুক্ত হয়ে আসেন। কমিটির শুনানিতে তিনি নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসের বিষয়ে অবিচল অবস্থান গ্রহণ করেন দৃঢ়তার সঙ্গে।

কারাদণ্ড থেকে রেহাই পেলেও লালভীতির জমানার অন্য অভিযুক্তদের মতোই তার পেশাগত ও আর্থিক জীবন চরম সংকটের মুখে পড়ে। গানের অনুষ্ঠান ও নতুন রেকর্ড বের করা, টিভি অনুষ্ঠানে হাজির হওয়া, চাকরি পাওয়া দুরূহ হয়ে পড়লে পিট সীগার নিজের মতো করে স্বাধীন ও ভিন্ন পন্থা গ্রহণ করেন। গান গাওয়া ও ব্যাঞ্জো বাজানো শিখিয়ে উপার্জনের ব্যবস্থা নিতে হয় তাকে। তিনি স্কুল-কলেজে, কিশোর-তরুণদের গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্পে ও অন্যান্য সমাবেশে লোকসঙ্গীত, কখনও বা সেসব গানের নতুন ভাষ্য, আবার কখনও বা দেশকে যেসব সমস্যা গ্রাস করছে তা নিয়ে গান গাওয়া শুরু করলে তার জন্য এক নতুন তরুণ শ্রোতৃমণ্ডলি ও শিল্পীর দল গড়ে উঠতে শুরু করে। এদের উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠতে থাকে আমেরিকাতে পরবর্তী সময়ে লোকসঙ্গীত আন্দোলনের ভিত। বৌডিন কলেজের তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ছাত্রদের জন্য ১৯৬০ সালে গাওয়া কিছু গানের খুব মানসম্পন্ন হারিয়ে যাওয়া রেকর্ডিং সম্প্রতি উদ্ধার হলে প্রথম বারের মতো গানগুলি ২০১২ সালে ডিজিটাইজড করে প্রকাশিত হয়েছে। কনসার্টের শেষে পিট ছাত্রদের উদ্দেশে বলেন, “যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত করতে পারে, তা হলো এটা জানা যে, তোমাদের অনেকেই এ গানগুলোকে গ্রহণ করছ এবং সেগুলোকে পৃথিবীর যেখানেই যাও সেখানে ছড়িয়ে দিচ্ছ। এটা হচ্ছে সবচেয়ে সেরা কাজ।”

এভাবেই পিট সীগার তাঁর কালো তালিকাভুক্তির অন্ধকার সময়কে পার করেছিলেন একটি প্রজন্মকে লোকসঙ্গীত ও প্রতিবাদের গানের ভেলায় ভাসিয়ে নিয়ে গিয়ে। এই শিক্ষাই হয়ে উঠেছিল আমেরিকাতে লোকসঙ্গীতের পুনর্জাগরণের অনুরাগী ও গাইয়ে তৈরির ভিত। লোকগানের সংগ্রাহক, ব্যাখ্যাতা, গায়ক ও উৎসাহদাতা হিসাবে পিটের সংগঠক ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নতুন শিল্পীদের টেনে আনা, উপস্থাপন করা, বিখ্যাত নিউপোর্ট লোকসঙ্গীত উৎসব আয়োজন, সিং আউট পত্রিকা সম্পাদনা করার মতো কাজের দীর্ঘস্থায়ী গুরুত্বগুলো আজো আমেরিকার লোকসঙ্গীত ও প্রতিবাদী গানের ধারাবাহিকতাকে বজায় রেখেছে প্রজন্মর পর প্রজন্ম ধরে। গানের সংগ্রহকারী হিসাবে পিট যেমন মূল্যবান কাজ করেছেন আমেরিকার গান নিয়ে, তেমনি দু’হাতে পৃথিবীর নানা প্রান্তের গান তুলে হাজির করেছেন আমেরিকাসহ অন্য দেশের শ্রোতাদের সামনে। প্রথম ভারত সফরের সময় কোনো শিল্পী বন্ধু তাকে ‘রঘুপতি রাঘব রাজা রাম’ ভজনটি শিখিয়ে দেবার পর দেশে ফিরে সেটি তিনি ১৯৬৫ সালে তার স্ট্রেঞ্জার্স অ্যান্ড কাজিনস নামের অ্যালবামে রেকর্ড করেছিলেন সেবারের বিশ্ব সফরের সময় সংগ্রহ করে আনা আরো নানা দেশের গানের সাথে। স্নায়ুযুদ্ধের চাপে আমেরিকাতে শ্রমিক ইউনিয়নের তৎপরতা সঙ্কুচিত হবার ফলে পিট সীগার ক্রমশ নতুন নতুন সামাজিক সমস্যা ও আন্দোলনের সাথে নিজেকে জড়িত করতে থাকেন। মধ্য-পঞ্চাশের দশকে আমেরিকাতে বর্ণবাদের শিকার কৃষ্ণাঙ্গদের সংগঠিত হতে থাকা নাগরিক অধিকার আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল হবার তাগিদ থেকে পিট সীগার তার গান নিয়ে সমবেত হন তাদের আন্দোলনের পাশে।

আমেরিকার নাগরিক অধিকার আন্দোলনের উজ্জীবনমুলক গান হিসাবে পরিচিতি আমরা করব জয় নিশ্চয় বা উই শ্যাল ওভারকাম সঙ্গীতটি পিট সীগারের হাতে নতুন চেতনায় পুনর্লিখিত হয়েছিল গির্জায় কৃষ্ণাঙ্গদের গাওয়া একটি পুরানো ধর্মীয় সঙ্গীত থেকে। ষাটের দশকের শেষ প্রান্তে এসে নাগরিক অধিকার আন্দোলন প্রবলতর হবার সময়, আমেরিকার শুভচেতনাসম্পন্ন অনেকের মতো পিট সীগারও ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী অবস্থানে সরব হবার প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন। ভিয়েতনাম থেকে মার্কিন সেনাবাহিনী সরিয়ে আনার দাবী জানিয়ে গাওয়া তার বিখ্যাত গান ব্রিং’য়েম হোম বা ওদের ফিরিয় আনো এবং প্রতীকি ঢঙে লেখা ও গাওয়া ওয়েস্ট ডীপ ইন বিগ মাডি গান দুটি সে সময়ে যুদ্ধবিরোধী জনমত গড়ে তুলতে শক্তিশালী ভূমিকা রেখেছিল। শেষোক্ত গানটির ‘বিগ মাডি’ শব্দটি মার্কিন স্ল্যাঙের অভিধানে ‘ভিয়েতনাম যুদ্ধ’র প্রতিশব্দ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে ওঠে। প্রচলিত জনশ্রুতি আছে, গানটি টেলিভিশনে প্রচারিত হবার পর প্রেসিডেন্ট জনসন (গানটিতে সেনাপতি হিসাবে জনসনকে অসাধ্য এই যুদ্ধ টিকিয়ে রাখার গোয়ার্তুমির জন্য ব্যঙ্গ করা হয়েছিল) কিছুদিন পরেই আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে না দাঁড়াবার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে কার্যত বিদায় নেন।

ভিয়েতনাম যুদ্ধ শেষ হবার দিকে পিট সীগার আরেক নতুন আন্দোলন গড়ে তোলার তাগিদ অনুভব করেন তার নিজের হাতে তৈরি কাঠের কেবিনের বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া হাডসন নদী নিয়ে। সে সময় পরিবেশ সচেতনতা ও আন্দোলনও গড়ে উঠছে ধীরে ধীরে, কীটনাশকের বিষক্রিয়া ও পরিবেশ দূষণ নিয়ে র‌্যাচেল কারসনের বই সাইলেন্ট স্প্রিং পড়ার পর তিনি হাডসন নদীর দূষণ নিয়ে উৎকণ্ঠিত হয়ে ওঠেন পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলনের সমর্থক হিসাবে। হাডসন নদীতে নৌকা বাওয়ার সময় নদীর দূষণে পিট বিরক্ত হয়ে সচেতনতা গড়ে তোলার জন্য একটি পালতোলা বড় পুরনো ধাঁচের নৌকা (স্লুপ) তৈরি করার কথা ভাবেন। সেই নৌকা তৈরির জন্য তহবিল সংগ্রহ করতে বড় ভূমিকা রাখেন পিট সীগার। স্বেচ্ছাসেবকদের হাতে তৈরি ক্লিয়ারওয়াটার নামের নৌকাটি এখনও হাডসন নদীতে চলে পরিবেশ রক্ষার কাজের অংশ হিসাবে। আর প্রতিবছরই অনুষ্ঠিত হয় ক্লিয়ারওয়াটার উৎসব। হাডসন নদীকে দূষণ মুক্ত করার পিটের উদ্যোগের সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে মার্কিন সরকারের পানি সংরক্ষণ সংক্রান্ত সরকারী নীতিতে; প্রণয়ন করা হয় যথাযথ নীতিমালা এবং দূষণের জন্য দায়ী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নদী-জলাশয় পরিষ্কার করার জন্য দায়ভার নিতে বাধ্য করা হয়।

এভাবেই পিট সীগার সারাজীবন ধরে একের পর এক সামাজিক আন্দোলনের সাথে সংগঠক ও শিক্ষক হিসাবে নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছেন। নতুন নতুন ধারার সাথে যুক্ত হয়েছেন সময়ের পরিবর্তনের সাথে, কখনও পরিপার্শ্ব থেকে শিখেছেন, তার সাথে হেঁটেছেন, কখনও বা আগে নেতৃত্ব দিয়েছেন সমাজ ও দুনিয়াকে প্রতিনিয়ত ইতিবাচকভাবে পাল্টাবার জন্য; যাতে পৃথিবী হয়ে উঠতে পারে মানুষের জন্য শান্তি-সম্প্রীতি-সমতা-ন্যায্যতাময় আবাসস্থল। তার এই অভিযাত্রায় গত শতাব্দীর আমেরিকার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনের— শ্রমিক আন্দোলন, নাগরিক অধিকার আন্দোলন, যুদ্ধবিরোধী শান্তি আন্দোলন, আনবিক বোমা বিরোধী আন্দোলন, পরিবেশ আন্দোলন, পুঁজিবাদী ব্যবস্থাবিরোধী অকুপাই ওয়াল স্ট্রীট মুভমেন্ট এবং সঙ্গীত শিল্পী হিসাবে লোকসঙ্গীতকে পুনরুজ্জীবিত করার আন্দোলন— পদাতিক ছিলেন পিট সীগার। পৃথিবীকে পাল্টাবার লক্ষ্যে মানুষকে পাল্টাবার কাজের এক নিরলস ও অবিচল শিক্ষক হিসাবে কাজ করে গিয়েছেন পিট সীগার।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার-মুসোলিনির ফ্যাসিবাদের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে পিট সীগারের সহযোদ্ধা উডি গার্থি তার গিটারের উপরে লেখেন, ‘এই যন্ত্রটি ফ্যাসিস্টদের খুন করে।’ উডির দেখাদেখি পিট সীগার তার ব্যাঞ্জোর উপরে লেখেন, ‘এই যন্ত্রটি ঘৃণাকে অবরুদ্ধ করে আর সেটাকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করে।’ পিট সীগার এমন বিরল এক শিল্পী যিনি আক্ষরিক অর্থে তার কথা রেখেছেন। তার ব্যাঞ্জোর সহায়তায় তার গান আর ভাবনা দিয়ে সত্যিই তিনি কখনও কখনও ঘৃণা, হিংসা আর ধ্বংসকে পরাভূত করেছেন মর্মর পাথরের ক্যাপিটল হিলের শুনানি কক্ষ থেকে হোয়াইট হাউজে আসীন প্রেসিডেন্ট জনসন পর্যন্ত; বর্ণবৈষম্যবিরোধী মিছিল-সমাবেশ থেকে হাডসনের বর্তমান স্বচ্ছ জলে লেখা আছে ঘৃণা ও ধ্বংসকে পরাস্ত করার সেই ইতিহাস। জন্মশতবর্ষে তাই আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্তে নানা ধরনের সংগঠন আর তার প্রেরণায় উজ্জীবিত শিল্পীর দল নানাভাবে পিট সীগারকে স্মরণের উদযোগ নিয়েছেন যুক্তিসঙ্গত কারণেই।
 
এ্টা প্রশংসনীয় ও ভালো লাগার বিষয় যে তথ্যপ্রযুক্তির কারণে পিট সীগারের সঙ্গীত আজ বাংলাভাষীদের মধ্যে অনেক বেশি পরিচিত ও সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা হচ্ছে তার সঙ্গীতের বাংলায় অনুবাদের প্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গের কয়েকজন বিশিষ্ট শিল্পীর উদ্যোগের কারণে। বহু দশক আগে সম্ভবত হেমাঙ্গ বিশ্বাসের অনুবাদে যে পিট সীগার বাংলাভাষীদের কাছে প্রথম পরিচিত হয়েছিলেন; আজ আরেক প্রজন্মর গণসঙ্গীত শিল্পী কঙ্কন ভট্টাচার্যের চমৎকার অনুবাদে ও তার সহশিল্পী মন্দিরা ভট্টাচার্যের যৌথ গাওয়ার মাধ্যমে পিট সীগারের অনেকগুলো বিখ্যাত গান বাংলাভাষী শ্রোতাদের কাছে মর্ম অনুধাবনে অনেক সহায়ক হয়ে উঠেছে। এজন্য তারাসহ শিল্পী অনুপ মুখোপাধ্যায় ও অঞ্জন দত্তকেও ধন্যবাদ ও প্রশংসা জানানো আমাদের কর্তব্য। জন্মশতবর্ষে ক্যালকাটা ইয়্যুথ কয়্যার পিটের উদ্দেশে যে সিডিটি প্রকাশ করেছে এবং ৩ মে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পিট সীগারকে নিয়ে যে আলোচনা-বক্তৃতা-গানের অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছে, তাও এই ধন্যবাদ ও প্রশংসার ভাগীদার। এদের মিলিত প্রয়াসে বাংলা ভাষায় পিট সীগার আরো প্রসারিত হোন এটাই আমাদের প্রত্যাশা। পিট সীগারের অনন্য লেখনির কথা আগে বলা হয়েছে। পিট সীগারের জীবনব্যাপী সংগ্রাম, লোকসঙ্গীতবিষয়ক মৌলিক চিন্তাভাবনা, তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা ও জীবনদর্শন সম্পর্কে সম্যকভাবে জানার জন্য তার সমৃদ্ধ ও সুখপাঠ্য লেখাগুলো পাঠ করা অত্যন্ত জরুরি। এসব লেখা বাংলায় অনূদিত হয়ে পাঠকের কাছে পৌঁছানোর জরুরি কাজটি হাত দেয়া অত্যন্ত মূল্যবান একটি কাজ হয়ে উঠতে পারে। আমরা করব জয় নিশ্চয়ই— মানুষকে এই অমোঘ সত্য শেখাবার জন্য পিট সীগার আরো আরো শতবর্ষজুড়ে আমাদের লোকনায়ক হিসাবে অমর হয়ে থাকবেন।

সহায়ক তথ্যর উৎস:
১. হাউ ক্যান আই কিপ ফ্রম সিঙ্গিং: পিট সীগার। লেখক:  ডেভিড ডানঅ্যাওয়ে।
২. রিমেম্বারিং পিট সীগার (১৯১৯-২০১৪)। মান্থলি রিভিউ সাময়িকী।
৩. পিট সীগার ইন হিজ ওউন ওয়াডর্স। লেখক: পিট সীগার। সংকলন ও সম্পাদনা: রব রোজেনথাল এবং স্যাম রোজেনথাল।
৪. হয়্যার হ্যাভ অল দ্যা ফ্লাওয়ার্স গন: এ সিঙ্গার্স স্টোরিজ, সংস, সিডস, রোবারিজ। পিট সীগার।

৫. ‘কট অন টেপ : পিট সীগার্স ১৯৬০ ভিজিট টু বৌডিন’। দ্য বৌডিন অরিয়েনট অনলাইন পত্রিকা। রুবেন শ্যাফির।

ধারাবাহিক