ভাব-অভিধান: তিনটি পরিভাষা

জগলুল আসাদ

প্রকাশিত : নভেম্বর ০৯, ২০১৯

Interpretive Community
এমন অবগত পাঠক সম্প্রদায় যাদের বিশেষ ভাষাজ্ঞান ও সাহিত্যবোধ আছে,  যারা আবার লেখকও বটে, তাদেরকে স্টানলি ফিশ ‘ইন্টারপ্রেটিভ কমিউনিটি’ বলে অভিহিত করেছেন। তারা সাহিত্যের মান ও উচ্চতা নির্দেশ করেন। ব্যাখ্যাকারী বা সমালোচক কোনও বিচ্ছিন্ন ও ভুঁইফোড় ব্যক্তি হন না,  ব্যখ্যার যে সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত আছে তাতে দাঁড়িয়েই তিনি সম্পাদন করেন তার ব্যাখাকার্য।

এই যে ব্যাখ্যাকারী সম্প্রদায়, পর্যালোচকগোষ্ঠী বা সারস্বত সমাজ তারা যে এসাম্পশান বা মূল্যবোধ তৈরি করেন তাকে ভিত্তি ধরেই ব্যক্তি কোনও টেক্সটকে তার পর্যালোচনার অধীন করেন। এভাবে কোনও ব্যক্তি-পাঠকের সাথে উক্ত টেক্সটের পূর্বতন বা সমসাময়িক পাঠকসম্প্রদায়ের এক ধরণের দৃশ্যমান বা অদৃশ্য সংযোগেই পাঠ-উন্মোচন ঘটতে থাকে। এই ইন্টারপ্রেটিভ কমিউনিটি ব্যক্তি পাঠক ও টেক্সটের মধ্যকার সংযোগ সেতুও বটে।

গ্রীক নাটকে কোরাস যেমন অডিয়েন্স ও নাটকের মধ্যে মধ্যস্ততা করে কিছুটা তেমনি ব্যপার। বা বলা যায়, একটা `নাগরিক সমাজ` বা  বুদ্ধিজীবি গোষ্ঠী যারা রাষ্ট্রের সাথে জনগণের `সংযোগসূত্র` হিশেবে কাজ করে ইন্টারপ্রেটিভ কমিউনিটি অনেকটা সেরকমই। Wolfgang Iser যখন টেক্সটের সাথে ব্যক্তি পাঠকের সম্পর্কের কথা তোলেন তখন Stanley Fish পাড়েন কীভাবে ইন্সটিটিউশনাল নানা প্রাক্টিসের মধ্য দিয়ে কোনও পাঠ্যবস্তুর অর্থায়ন (সিগ্নিফিকেশন) ঘটতে থাকে, সে কথা।

এই অর্থপরম্পরা থেকেই কোনও এক বা একাধিক অর্থ ব্যক্তিপাঠকের কোনও সংবেদনের সাথে যখন মিলে যায়, তখন ইন্টারপ্রেটিভ কমিউনিটির অংশ হিশেবে সেটিকে সে বিস্তারিত করে। তবে এ-ক্ষেত্রে এটি ধরে নেয়ার সুযোগ নেই যে, অর্থপরম্পরা কোনও বদ্ধ ব্যাপার। কেননা কোনও টেক্সটের `অভিনব` পাঠ নিজেও ব্যাখ্যার ওই ঐতিহ্যের মধ্যেই গৃহীত হয়ে ঐতিহ্যকে পুনর্বিন্যস্ত করে। অনেকটা টিএস এলিয়ট কবিতার ঐতিহ্য নিয়ে যেমনটি বলেছেন, তেমনি ব্যাখ্যারো ঐতিহ্য আছে।

ধরা যাক, যদি জীবনানন্দ দাশকে কেউ নতুন করে ব্যাখ্যা করতে চায় তবে দাশকে তন্ন তন্ন করে পাঠ করার পাশাপাশি বুদ্ধদেব বসু-সঞ্জয় ভট্টাচার্য-ভূমেন্দ্র গুহ হয়ে অলোকরঞ্জন, শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়, সুমিতা চক্রবর্তী, কিছুটা শঙ্খ ঘোষ, কিছুটা দেবেশ রায় হয়ে মান্নান সৈয়দ বা আকবর আলি খান পর্যন্ত ব্যাখ্যার যে-পরিক্রমা, তার উপর দাঁড়িয়ে নিজের `নতুনতর` ভাবনা সূত্রায়িত করতে হবে। ইন্টারপ্রেটিভ কমিউনিটি এভাবে নির্মিত ও পুনঃনির্মিত হয়।

Overdetermination
মার্ক্সিস্ট তাত্ত্বিক আলথুসারের overdetermination ধারণাটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ফ্রয়েড থেকে এ ধারণাটি নিয়ে সমাজসংস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। আমাদের কোনও বিশেষ অনুভূতির জন্য দায়ী কোনও একক কারণ নয়, বরঞ্চ একাধিক কারণসমষ্টি (Multiple Casuality)। এই অর্থে ফ্রয়েড Overdetermination পদটি ব্যবহার করেছেন। বাস্তবতাকে দুই বিপরীত ভাগে ভাগ করে দেখার চিন্তার যে সহজ ও ত্রুটিপূর্ণ বাইনারি প্রবণতা, সেটা Overdetermination এর ধারণা দিয়ে উতরে যাওয়া যায়।

আলথুসার তার Contradiction and Overdetermination রচনায় এ নিয়ে আলোচনা করেছেন। মার্ক্স সমাজসংস্থানকে ভিত্তি (base structure) ও উপরকাঠামো (Super structure) এই দুই প্রায় জলনিরোধ ভাগে বিভক্ত করেছেন। এটাকে আলথুসার পর্যালোচনা করেছেন, অর্থকে সম্প্রসারিত করেছেন ও দেখিয়েছেন যে, এরা একে অপরকে Determine করে। ভিত্তি উপরকাঠামোকে যেমন প্রভাবিত করে, উপরকাঠামোও তেমনি ভিত্তিকে।

সমাজের ভিত্তিকাঠামো, মার্ক্সের মতে, উৎপাদন সম্পর্ক ও অর্থননৈতিক তৎপরতা। আর উপরকাঠামো হলো রাষ্ট্র, সংস্কৃতি, সংবিধান,আইন, বিচার ব্যবস্থা ইত্যাদি। তিনি দেখান, এই ভিত্তি ও উপরকাঠামো একে অপরে অন্তঃপ্রবিষ্ট, একে অপরকে তারা ডিটারমাইন করে। মার্ক্সের প্রধান দ্বন্দ্ব, অপ্রধান দ্বন্দ্ব; মাও জে ডং এর `মিত্রতামূলক দ্বন্দ্ব` ও `বৈরীতামূলক দ্বন্দ্ব` একটা পর্যালোচনাও সারা যায় এই আলথুসারীয় ধারণাটা দিয়ে। এটা একটা non-essentialist approachও, মানে কোনও কিছুর একটা একক সার বা নির্যাস আছে ভাবা ও সেটা দিয়ে সব কিছুকে ব্যাখ্যা করার সারবাদী, বা নির্যাসবাদী (Essentialist) ধারণার বাইরে নিয়ে যায় এই Overdetermination কন্সেপ্টটি।

সব আপাত বৈপরীত্যগুলো মিলে গঠন করে এক সমগ্রতা, টোটালিটি, Complex of the complexes. উত্তরাধুনিকতায় আলথুসারের এই ভাবনাটা বেশ গ্রহণযোগ্য ও প্রিয়। জগতকে সাদা ও কালো, এইভাবে ভাগ করাটা জগতের আরোতর মাত্রাকে উপেক্ষা করে। সাদা ও কালোর বাইরেও আছে `ধূসর` রং। সাদা ও কালো একে অপরকে নির্ণয় করে, এরা অন্তঃপ্রবিষ্ট। হয় তুমি আমার পক্ষে, না হয় বিরুদ্ধে; পক্ষে না হলেই বিপক্ষে, এই চিন্তাটা জর্জ বুশীয়,ফ্যাসিবাদ। Overdetermination ধারণা বাইনারি চিন্তার ফ্যাসিবাদকে উৎরিয়ে যায়। সমাজ, ইতিহাস, সাবজেক্টিভিটি আরো নানা কিছুকে এই Overdetermination এর ধারণাকাঠামো দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়।

Alienation Effect
Alienation Effect নামক কন্সেপ্টটি জার্মান নাট্যকার বার্টোল্ট ব্রেখটের। ট্র্যাজেডির উদ্দেশ্য হিশেবে এরিস্টটল যে-ক্যাথারসিসের কথা বলেছিলেন, ব্রেখটের এই ধারণা তার বিপরীত। নাটক আবেগ না, চিন্তা উস্কে দিবে। আপনি আবেগে নিমজ্জিত হবেন না, গল্পের ঘোরে হারিয়ে যাবেন না। বিদ্যমান বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্নমুখর হয়ে উঠবেন। নাটকে দর্শকের আবেগিক সম্পৃক্তি নয়, দরকার সামাজিক-বৌদ্ধিক সাড়া। যে কারো প্রযোজিত নাটক থেকে দরকার দর্শকের Distancing, যাতে সে বুঝতে পারে বাস্তবতার আরো গভীর রূপ।

প্রথাগত থিয়েটারে দর্শক সব মেনে নেয়, নাট্যে প্রশ্নহীন মগ্ন থাকে, যার ফলাফল হিশেবে বিদ্যমান বাস্তবতা শুধু টিকেই থাকে না, বরঞ্চ উৎপাদিত ও পুনরুৎপাদিত হয়। ব্রেখট, এ কন্সেপ্টে সমালোচনা করেন প্রথাগত বাণিজ্যিক ও বিনোদনমুখী বুর্জোয়া থিয়েটারকে, যে থিয়েটার আসলে বাস্তবতার স্থিতাবস্থা বজায় রাখে, যা দর্শককে কোনও ক্রিটিকাল এনগেইজমেন্ট দেয় না। ব্রেখট রাজনৈতিক। আবেগগত সম্পৃক্তি যেন চিন্তাকে নিস্ক্রিয় করে না দেয়, এই দিকটায় তিনি নজর ফেরান। চিন্তা/পর্যালোচনার সাথে সাথে বিদ্যমান ব্যবস্থা পরিবর্তনে দর্শকের মধ্যে আবেগ ও উদ্যম তৈরি তার উদ্দেশ্য।

এপিক থিয়েটারের তত্ত্বায়নসূত্রে ব্রেখট এই ডিসট্যান্সিং ইফেক্টের কথা বলেন। দর্শকদের উপর নাটকের কী প্রভাব পড়া উচিত এটা তার আলোচ্য। ব্রেখট বামপন্থি ভাবনাবলয়ের মানুষ। ব্রেখটের কাছে নাটক বিনোদনের অধিক; শিল্প একই সাথে নান্দনিক ও মতাদর্শিক।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক

ধারাবাহিক