মারিয়া সালামের গদ্য ‘আমাদের একটা ভয়ানক অসুখ হয়েছে’

প্রকাশিত : মে ২৩, ২০২৬

আমাদের একটা ভয়ানক ও বড় অসুখ হয়েছে, আমরা ভাইরাল-রাজনৈতিক রোগে আক্রান্ত। এই মন্তব্যের ব্যাখ্যা দেবার আগে একটা পরিসংখ্যান দিচ্ছি।

এপ্রিল মাসে ৬৮ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়, যার মধ্যে ৪৪ শতাংশই ১৮ বছরের কম বয়সী। এছাড়া ৩০টি গণধর্ষণ হয়েছে, প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ৫৭ শিশু, এদের মধ্যে মাদ্রাসার শিশুরাও আছে। এ সময় ২২০ নারী-শিশুর মধ্যে ১৩৩ নারী ও ৮৭ কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এছাড়া আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে ৩৬ নারী ও কিশোরী।

জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সাড়ে ৪ মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১১৮ কন্যাশিশু। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে ১৪ শিশু এবং ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা করা হয়েছে ৩ শিশুকে। ধর্ষণের শিকার ২ শিশু আত্মহত্যা করেছে। বিভিন্ন ঘটনায় জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত ১১৫ শিশু খুন হয়েছে। এসব ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, সব ক’টিতে শিশুরা প্রতিবেশী, আত্মীয় কিংবা ঘনিষ্ঠজনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে। আর মাদ্রাসায় বলৎকার ও নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছে বেশ কয়েকজন শিশু।

এই যে এত এত শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যায় আমরা মোটামুটি চুপচাপ ছিলাম। যেসব প্রতিবাদ হয়েছে সবই একটা নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে হয়েছে, তারপর একসময় থেমে গেছে। কিন্তু রামিসা হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলো, মোটামুটি সারা ঢাকার বেশির ভাগ সামাজিক প্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজ, এমনকি এলাকাভিত্তিক ক্লাবগুলো বিচারের দাবিতে পথে নেমেছে।

রামিসা হত্যার ২৪ ঘণ্টার ভেতরেই ধর্ষণের শিকার হয়ে ১০ বছরের মাদ্রাসাপড়ুয়া আরেক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে কোথাও কোনো আওয়াজ নাই। এমনকি রামিসার হত্যার বিচার চাওয়ার কোনো ব্যানারে কোথাও শিশুটির কথা বলা হচ্ছে না। কারণ, শিশুটি সোস্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হতে ব্যর্থ হয়েছে।

রামিসা হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে প্রথমে মিরপুরে রাস্তায় নেমে এসেছে হাজার হাজার তরুণ। সরজমিনে গিয়ে দেখলাম, প্রথম দিনের আন্দোলনে রামিসার প্রতিবেশীদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিবাদ করতে দেখা গেছে। এরপর মূল অভিযুক্ত সোহেল রানা গ্রেফতার হয়। প্রতিবেশীদের আন্দোলন তখন কিছুটা স্তিমিত হয়ে যায়। যেহেতু অভিযুক্ত ধরা পড়েছে, দেশের প্রচলিত আইন মেনে তার বিচারকাজ শুরুও হয়ে গেছে, প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং কঠোর পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছেন। এরপর আসলে রাস্তা অচল করে প্রতিবাদের কিছু থাকে না।

আইন তার গতিতে চলবে, যদি রামিসার হত্যাকারীকে আদালত জামিন দেয় বা বিচার পাওয়া নিয়ে শংকা তৈরি হয়, তখন পথে নামার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। কিন্তু এতকিছুর পরেও শুক্রবার রাস্তায় হাজার হাজার তরুণকে আন্দোলন করতে দেখা গেল। মিরপুর ১০ নম্বর গোলচক্করে সন্ধ্যার দিকে গিয়ে দেখলাম, বিশাল আয়োজন। অন্তত চার/পাঁচটা পিকআপ ভ্যানে ভাড়া করা হয়েছে সাউন্ড সিস্টেম। এসব আন্দোলনকারীদের মধ্যে বেশির ভাগই অবাঙারি স্থানীয় যুবক। যাদের পথে আন্দোলন করার অভিজ্ঞতা আছে, তারা অবশ্যই জানবেন এই বিশাল সুশৃঙ্খল আন্দোলন জোরদার করতে সে রকমই বিশাল আয়োজন দরকার হয়। সেই আয়োজন করার ক্ষমতা রামিসার পরিবারের যে নাই, সেটা আমরা জানি।

এই বিশাল আয়োজন যিনি বা যেসব সহৃদয় ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে করেছেন, তাদের অন্তরের অন্তঃস্তল থেকে সাধুবাদ জানাতে কার্পণ্য বোধ অবশ্যই করছি না। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, কেন তিনি বা তারা রামিসার ক্ষেত্রেই এতটা সোচ্চার হলেন, অন্যদের ক্ষেত্রে কেন নয়? হ্যাঁ, আমরা এটা বলতেই পারি, সব ঘটনা সবাইকে ছুঁয়ে যাবে, এমনটা নয়। হয়তো যিনি বা যারা এই আয়োজন করছেন, তারা রামিসার জন্য মন থেকেই কষ্ট অনুভব করেছেন। কিন্তু যেখানে মূল অভিযুক্ত দুজনই পুলিশের হেফাজতে, সোহেল রানা জবানবন্দিও দিয়েছে আদালতে, এরপর টাকা খরচ করে মাইক ভাড়া নিয়ে এবং রাস্তা অচল করে রামিসার মৃত্যুর শোককে উৎসবে পরিণত করতে পারলে কার কী লাভ হবে? সেটা মিছিলে উপস্থিত লোকজনকে দেখলে আর একটু চোখকান খোলা রাখলেই বোঝা সম্ভব।

কথাগুলো খুব নির্মম শোনাবে, আমাকেও গালাগাল খেতে হবে, তারপরেও বাস্তবতা হলো, রামিসার হত্যাকাণ্ড কখনোই অন্য আর হত্যাকাণ্ডের মতো নয়, এটা নির্ভেজাল রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। ফলে, যাদের এই হত্যাকাণ্ড থেকে সুবিধা নেওয়া প্রয়োজন, তারাই পথ আটকাচ্ছে, মাইক ভাড়া করে উৎসব করছে, ভাইরাল-ভাইরাল খেলছে। আর আমরা যেহেতু এই রোগের শেষ ধাপে আছি, আমরাও স্বাভাবিক লক্ষণগুলো না দেখেই ঝাঁপিয়ে পড়ছি। পরিস্থিতি জটিল এবং ঘোলা করতে সাহায্য করছি।

রামিসার হত্যা হয়েছে, তার পরিবার কিছুটা অর্থনৈতিক সমস্যায় থাকতে পারে। কিন্তু এই মুহূর্তে তার পরিবারের একমাত্র চাওয়া হবে, হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার। হত্যামামলা পরিচালনা করতে অর্থের প্রয়োজন। যেখানে দেশের প্রধানমন্ত্রী এই দায়িত্ব নিয়েছেন, সেখানে সেই চিন্তারও অবকাশ নেই। তাহলে, রামিসার বাবাকে কারা টাকা দিয়ে যাচ্ছে? কেন টাকা দিচ্ছে? রামিসা তো সংসারে উপার্জনক্ষম সদস্য ছিল না যে, তার মৃত্যুতে টাকার অভাবে সংসারে চাকা থেমে যাবে। একটা শিশু এভাবে মারা গেলে, তার ক্ষতিপূরণ দেবে রাষ্ট্র। কিন্তু সন্তানের মৃত্যুর তিন দিন না যেতেই কারা পিতার হাতে টাকার বান্ডিল গছিয়ে দেয়? তাদের চিনতে হবে। তা না হলে, হাজারো রামিসা এ রকম হত্যাকাণ্ডের শিকার হবে।

আমাকে প্রশ্ন করতে পারেন, তাই বলে কি ঘরে বসে থাকব আমরা? না, একদমই না। আমাদের প্রতিটি শিশুই সমান মূল্যবান সম্পদ। শিশুর সুরক্ষা এবং এক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের প্রশ্নে আমাদের আচরণ ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হবে সবার জন্য সমান। রামিসার মায়ের একটা স্টেটমেন্ট খুব গুরুত্বপূর্ণ। উনি বলেছেন, উনি বাচ্চার আর্তচিৎকার শুনেছেন, কিন্তু সেটা তার নিজের সন্তানের, তা বোঝেননি। এখানেই আমাদের সমস্যা, আমরা চোখের সামনে দেখা, কানে শোনা অনেক কিছুই অগ্রাহ্য করি। কারণ এটা আমাদের বিষয় নয়। অথচ যেকোনো সভ্য ও শিক্ষিত সমাজে কেউ শিশুর আর্তনাদ শুনলেই বিচলিত হবে, পুলিশে কল দেবে। এতটুকু সচেতন হলেই অনেক শিশু প্রাণে বেঁচে যাবে।

আমরা একজনের জন্য পথে নামব, আর হাজার রামিসা নির্যাতন, ধর্ষণ আর হত্যার শিকার হবে, আমরা মুখবন্ধ রাখব, সেটা যেন না হয়। প্রতিটি সন্তানের মৃত্যু আমাদের জন্য কষ্টের, সব নির্যাতন আর ষড়যন্ত্রের ঘটনা আমাদের জন্য ভাইরাল। আমাদের একটা শিশুও হত্যার শিকার যেন না হয়, একটা শিশুও যেন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হয়। আমরা ততক্ষণই পথে বসে থাকব, যতক্ষণ আমাদের শিশুরা অনিরাপদ। রামিসা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং সুষ্ঠু তদন্তই এখন একমাত্র চাওয়া। রাজনৈতিক ফায়দা নিতে যারা রামিসাদের মৃতদেহ নিয়ে ব্যবসায় নামে, তাদের প্রতি একরাশ ঘৃণা।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সংবাদকর্মী